kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

যেভাবে গল্প পড়ি ৮

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প সতী

আহমাদ মোস্তফা কামাল

২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এত জনপ্রিয় এবং এত বিপুলভাবে পঠিত যে একবার মনে হয়েছিল, তাঁকে নিয়ে লেখার আর কিছু বাকি নেই। সে জন্য এই ধারাবাহিক রচনায় তাঁর কোনো গল্প নিয়ে লিখিনি। কিন্তু তাঁকে বাদ দিয়ে তো বাংলা কথাসাহিত্যের আলাপ সম্পূর্ণ হয় না। নতুন করে তাই ভাবতে হলো। ১৫ সেপ্টেম্বর ছিল তাঁর জন্মদিন, এই লেখাটি তাঁর জন্মবার্ষিকীতে আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শরৎচন্দ্রের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণ নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে— আমাদের আবেগ ও আর্তি, প্রেম ও হাহাকার, অসংগতি ও অনাচার, আনন্দ ও আর্তনাদ, ক্রোধ ও উচ্ছ্বাস, স্মৃতিকাতরতা ও বেদনাবিধুরতা ইত্যাদি এমন নিপুণ ও সূক্ষ্মভাবে ধরা পড়েছে তাঁর লেখায় যে আমরা নিজেদেরই আবিষ্কার করি সেখানে। তাঁর বিষয় নির্বাচন ও বর্ণনাভঙ্গিতে আছে এমন এক জাদু যে পাঠককে তা আবেগপ্রবণ করে তুলবেই। কিন্তু এমন কি কোনো গল্প নেই যেখানে তিনি নির্লিপ্ত-নির্মোহ-নিরাসক্ত, আবেগের রাশ টেনে ধরা লেখক? এ প্রশ্ন মনে আসতেই মনে পড়ল তাঁর ‘সতী’ গল্পটির কথা। হ্যাঁ, এটি এমন এক গল্প, যেখানে চেনা শরৎচন্দ্রকে খুঁজে পাওয়া যায় না, বরং দেখা মেলে একজন নির্লিপ্ত পর্যবেক্ষকের। 

পূর্ববঙ্গের ছোট্ট শহর পাবনার ‘হরিশ একজন ভালো উকিল। কেবল ওকালতি হিশাবেই নয়, মানুষ হিশাবেও বটে।’ গল্পের শুরুর দিকেই স্ত্রী নির্মলার সঙ্গে তার কটু সম্পর্কের আভাস মেলে। এ-ও বোঝা যায়, নির্মলার সন্দেহবাতিকগ্রস্ত স্বভাবের জন্যই সম্পর্কের ধরনটি এই রকম। নির্মলা কোনো এক লাবণ্যপ্রভার কথা জানতে চায় যে কি না ‘এখানকার মেয়ে স্কুলের ইনসপেক্টরস হয়ে আসছে’ বলে সে খবরের কাগজে জেনেছে। এতে দোষের কিছু নেই অথচ কথাটা শুনে হরিশের মন তিক্ততায় ভরে ওঠে এবং ‘এই সহজ কথা কয়টির ইঙ্গিত অতীব গভীর’ বলে লেখক জানিয়ে দেন, ব্যাপারটা সহজ কিছু নয়। গল্প এগোয়, এই তিক্ততার কারণও জানা যায়। হরিশ ও লাবণ্যপ্রভার পিতারা একসময় সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, বদলিসূত্রে তাঁরা বরিশালে থাকার সময় দুজনের পরিচয় ঘটে। পরিচয় পর্যন্তই, প্রেম পর্যন্ত গড়ানোর আগেই হরিশের ‘নিষ্ঠাবান হিন্দু’ বাবা রামমোহন তাঁর ছেলেকে ব্রাহ্মসমাজের সদস্য লাবণ্যপ্রভার সম্ভাব্য প্রেম থেকে বাঁচাতে বিয়ের ব্যবস্থা করেন। হরিশ তখন ‘এমএ পাশ’ করা যুবক, তবু তার মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি রামমোহন বাবু। তাঁর স্ত্রী যদিও ছেলের মতামতের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, কিন্তু তিনি পিতৃতান্ত্রিক দাপটের সঙ্গে সে কথা এড়িয়ে গেছেন। শুধু তা-ই নয়, নিজের দৃষ্টিভঙ্গি জানাতেও ভোলেননি তিনি—‘মেয়ে ডানাকাটা পরি না-হোক, ভদ্রঘরের কন্যা। সে যদি তার মায়ের সতীত্ব আর বাপের হিঁদুয়ানি নিয়ে আমাদের ঘরে আসে, তাই যেন হরিশ ভাগ্য বলে মানে।’ তো, লাবণ্যপ্রভার সঙ্গে হরিশের কিছু না হলেও সে রয়ে গেল নির্মলার ঈর্ষা হয়ে।

বিয়ের সময় নির্মলার মা তাকে বলে দিয়েছিলেন—‘মা, পুরুষ-মানুষকে চোখে-চোখে না-রাখলেই সে গেল। সংসার করতে আর যা-ই কেন না-ভোলো কখনো এ-কথাটি ভুলো না।’ না, ভোলেনি সে। একদিন হরিশ কীর্তন শুনতে গিয়েছিল, ফিরতে একটু রাত হলে নির্মলার জেরার মুখে পড়ল—গান কেমন লাগল, গায়িকা দেখতে কেমন ইত্যাদি। হরিশ সরল মনেই তার মুগ্ধতার কথা স্বীকার করতেই চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলল নির্মলা—‘রাতটা একেবারে কাটিয়ে এলেই পারতে।... আমি কচি খুকি নই, জানি সব, বুঝি সব। আমার চোখে ধুলো দেবে তুমি?’

না, সে উপায় কোথায়? এ রকম সন্দেহবাতিকগ্রস্তদের চোখে কেউ ধুলো দিতে পারে নাকি? তার ওপর নির্মলা ‘সতী মায়ের সতী মেয়ে’, এই ঘোষণা সে প্রায়ই দেয়। হরিশের বসন্ত হলে আর কবিরাজ ‘রক্ষা পাওয়া কঠিন’ বলে মন্তব্য করলে নির্মলা ‘আমি যদি সতী মায়ের সতী মেয়ে হই, আমার নোয়া-সিঁদুর ঘুচাবে সাধ্যি কার? তোমরা ওঁকে দেখো, আমি চললুম।’—বলে শীতলার মন্দিরে হত্যে দিয়ে পড়ল। এক সপ্তাহের মধ্যে সতীশ সেরে উঠলে শহরময় ধন্য ধন্য রব পড়ে গেল। যমের মুখ থেকে স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে পারে এ রকম সতী বউ থাকা কি যেনতেন কথা? কিন্তু সতীশের জীবন যে অচল হয়ে পড়তে চলেছে! সন্ধ্যার পর বাইরে যাওয়া বন্ধ করেছে সে, বন্ধুদের উপহাস-টিটকারি শুনতে হয় বলে তাদের ত্যাগ করেছে, ওকালতির প্রয়োজনে কোনো নারী মক্কেলের সঙ্গে নিজের ঘরে বসে আলাপ করতেও তার বুক কাঁপে। এক বিধবা নারী মক্কেলকে তো নির্মলা কুিসতভাবে আক্রমণই করে বসল। এ রকমভাবে জীবন চলে?

এই যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য হরিশ স্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের কথা ভেবেও কখনো লোকলজ্জা, কখনো বা নির্মলার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ চিন্তা করে পিছিয়ে এসেছে। কিন্তু লোকলজ্জা থেকে তার মুক্তি মিলল না। লাবণ্যপ্রভা এই শহরে এসেছে বদলি হয়ে। যদিও সে তত দিনে এক সন্তানের মা এবং বিধবা, তবু নির্মলার সন্দেহের তালিকায় সে এক নম্বরে। তার সঙ্গে হরিশের যোগাযোগ আছে কি না এই জেরার জবাবে হরিশ সব সময়ই তা অস্বীকার করে এসেছে। কিন্তু লাবণ্যপ্রভা তো আর তা জানে না। সে শহরে এসে হরিশের বাড়িতে এলো নির্মলার সঙ্গে পরিচিত হতে। সপ্রতিভ-সরল-নির্মলচিত্তের লাবণ্যপ্রভা হরিশের সঙ্গে তার বারকয়েক দেখা হওয়ার কথা বলল। হরিশ যে সব সময় বউয়ের প্রশংসাই করে, বউয়ের গল্পই বলে সে কথা জানালেও স্বামীর মিথ্যা ধরতে পেরে নির্মলার সন্দেহ আর ক্রোধের আগুন এত দূর গড়াল যে আত্মহননের জন্য আফিম খেয়ে বসল সে। শহরময় খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরি হলো না। এ রকম সতীসাধ্বী স্ত্রী ঘরে থাকতে হরিশ এসব নষ্টামি করে বেড়াচ্ছে, এ যেন ভাবাও যায় না। নিন্দায় মুখর হয়ে উঠল সারা শহর। হরিশের মুখ দেখানোর আর উপায় রইল না।

নির্মলা চাইত তার স্বামী সর্বদা তার নিয়ন্ত্রণে থাকুক, সন্ধ্যা হওয়ার আগে ঘরে ফিরুক, তার কোনো সামাজিক জীবন না থাকুক, ‘সতী’ নারীর গর্বিত পতি হয়েই সে সুখে থাকুক। কী বোঝাতে চাইলেন শরৎচন্দ্র এই গল্প দিয়ে? তিনি তো সর্বদা নারীদের প্রতি সমাজের বৈষম্যমূলক আচরণের এবং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে ছিলেন, লিখেছেনও বিস্তর। কিন্তু এখানে নারীই আধিপত্যকামী। কী মানে এর? মনে হয়, তিনি যেন বোঝাতে চেয়েছেন, নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে সবাই আধিপত্যকামী হতে পারে এবং যে-ই হোক সেটি পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যেরই একেকটা প্রকাশ। নির্মলার যে এত ‘সতী’ বলে গর্ব, এই ধারণাটিও তো পুরুষতন্ত্রেরই সৃষ্টি। তারা নারীকে ‘সতী’ হিসেবে দেখতে চায়, যদিও নিজেরা নষ্টামি করে বেড়াতে পারলে খুবই আনন্দিত হয়। অনেক নারীই পুরুষের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে নিজেদের অলংকার হিসেবে গ্রহণ করে—যেমনটি করেছিল নির্মলা—প্রকারান্তরে তারা যে পুরুষতন্ত্রেরই উদ্দেশ্য সাধন করছে তা বুঝতেও পারে না। অপরের জীবন বিষিয়ে তোলা ছাড়া পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আর কোনো ভূমিকা নেই, তা সেই মনোভঙ্গি পুরুষের মধ্যেই থাকুক আর নারীর মধ্যেই থাকুক।

গল্পের শেষে, অপদস্থ-অপমানিত-ক্লান্ত-বিপন্ন হরিশ একলা ঘরে বসে ভাবে— ‘নারীর একনিষ্ঠ প্রেম খুব ভালো জিনিশ, সংসারে তার তুলনা নেই।... কিন্তু আমি জানি ব্রজনাথ কীসের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং একশো বছরের মধ্যে আর ও-মুখো হননি। কংস-টংস সব মিছে কথা। আসল কথা শ্রীরাধার ঐ একনিষ্ঠ প্রেম।... তবু তো তখনকার কালে ঢের সুবিধে ছিল, মথুরায় লুকিয়ে থাকা চলতো। কিন্তু এ-কাল ঢের কঠিন। না আছে পালাবার জায়গা, না আছে মুখ দেখাবার স্থান। এখন ভুক্তভোগী ব্রজনাথ দয়া করে অধীনকে একটু শীঘ্র পায়ে স্থান দিলেই বাঁচি।’

এই আধিপত্যকামী একনিষ্ঠ প্রেম কতটা অসহনীয় হয়ে উঠলে একজন ‘ভালো মানুষ’ নিজের মৃত্যু কামনা করে, বুঝতে আর বাকি থাকে না! 

মন্তব্য