kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

এ বছর সাহিত্যে নোবেল পাচ্ছেন কে

শরীফ আতিক-উজ-জামান

২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এ বছর সাহিত্যে নোবেল পাচ্ছেন কে

এ বছর সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষিত হবে ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার। বৈশ্বিক মহামারির কারণে সীমিতসংখ্যক গণমাধ্যম প্রতিনিধির উপস্থিতিতে পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিকের নাম ঘোষণা করা হবে। তবে প্রযুক্তির মাধ্যমে দূর থেকে সবাই সেই অনুষ্ঠান দেখতে পারবেন। একাডেমির স্থায়ী সম্পাদক ম্যাটস মালম কর্তৃক নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিকের নাম ঘোষণা করার পর নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান অ্যান্ডারস ওলসন তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেবেন। উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতে পারবেন, তবে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার প্রদান সম্ভব হবে না। মাত্র আধঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত আনুষ্ঠানিক আয়োজন নোবেল কমিটির ওয়েবসাইট nobelprize.org-এ সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।

গত বছর একসঙ্গে ২০১৮ ও ২০১৯ সালের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। কারণটা সাহিত্যপ্রেমীরা কমবেশি অবগত আছেন। পেয়েছিলেন যথাক্রমে পোলিশ লেখক ওলগা তোকারচুক ও  অস্ট্রিয়ান লেখক পিটার হ্যান্ডকে। কিন্তু এ বছর কে পাচ্ছেন বিশ্বসাহিত্যের এই সম্মানজনক পুরস্কার?

এ বছর সম্ভাব্য নোবেল প্রাপক সাহিত্যিকের তালিকা দীর্ঘই বলতে হয়। প্রায় ৮৬ জন লেখক সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫ জন নারী লেখক। ১২ জন লেখকের নাম নতুনভাবে তালিকাভুক্ত হয়েছে, আবার কয়েকজন বাদও পড়েছেন। বাকিরা অনেক আগে থেকেই বিবেচিত হয়ে আসছেন। ১২ জনের মধ্যে আফ্রিকার একজন, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দুজন, ইউরোপের তিনজন, এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের তিনজন, দক্ষিণ আমেরিকা ও লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চল মিলে তিনজন রয়েছেন।     

২০১৭ সালে জাপানের কাজুও ইশিগুরো পেয়েছিলেন সাহিত্যের সম্মানজনক এই পুরস্কার। যদিও তাঁর চেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে হারুকি মুরাকামির নাম; কিন্তু তিনি পাননি। এবার জাপানের ওকো ওগায়া, হিরোমি ইতো ও ওকো তাওয়াদার নাম নতুন যুক্ত হলেও এত দ্রুত একই দেশে এই সম্মাননা ফিরে আসবে বলে মনে হয় না। তবে কানাডার মার্গারেট অ্যাটউডের সম্ভাবনা রয়েছে। ৮১ বছর বয়সী অ্যাটউড (জন্ম ১৮ নভেম্বর ১৯৩৯) বাজিতে প্রথম সারিতে আছেন। কবি-ঔপন্যাসিক-প্রাবন্ধিক অ্যাটউডের ঝুলিতে ম্যান বুকারসহ বেশ কিছু সম্মানজনক পুরস্কার রয়েছে। The Circle Game (1966), The Handmaid’s Tale (1985), The Blind Assassin (2000), The Tent (2006), MaddAddam (2013) ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তাঁর বেশ কয়েকটি উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তাঁর স্বদেশি অ্যালিস মুনরো ২০১৩ সালে সর্বশেষ এই সম্মাননা পেয়েছেন। 

কেনিয়ার এনগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো অনেক দিন ধরেই সম্ভাবনায় রয়েছেন; কিন্তু সম্মাননা পাননি। বর্তমানে তাঁর বয়স ৮২ বছর। যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা সব বিচারেই তিনি এই  পুরস্কারের দাবিদার। তবে আফ্রিকা থেকে মরক্কোর আবদেল লতিফ লাব্বির নাম নোবেলের তালিকায় নতুন সংযুক্তি। 

গত বছর চীনের ডেঙ ঝিয়াওহুয়া আলোচনায় ছিলেন। এ বছরও আছেন। চাংশা (Can Xue) ছদ্মনামে তিনি লিখে থাকেন। ১৯৫৩ সালে হুনান প্রদেশের যে শহরে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন তার নামও চাংশা। ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানেই বসবাস করতেন। তারপর বেইজিং চলে আসেন। তাঁর বাবা ছিলেন New Human Daily News পত্রিকার সম্পাদক। ১৯৫৭ সালে বামপন্থী সরকার তাঁকে উগ্র দক্ষিণপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে চাকরিচ্যুত করে বাধ্যতামূলক কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে সংশোধনের সুযোগ দেয়। একই পত্রিকায় কর্মরত তাঁর মাকেও দূরবর্তী গ্রামে একই কাজে বাধ্য করা হয়। পারিবারিক এই বিপর্যয় তাঁর শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় রকমের প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়েছিল। কোনো রকমে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনে সক্ষম হন তিনি। স্বশিক্ষিত লেখক চাংশা মূলত কবি ও কথাসাহিত্যিক। ধ্রুপদি পাশ্চাত্য ও রুশ সাহিত্য তাঁর প্রিয়। ২০১২ সালে চীনের মো ইয়ান নোবেল জিতেছিলেন।  তবে চীনের বেই দাওয়ের সঙ্গে ওয়াং অ্যানির মতো আরো দু-একজনের নাম উচ্চারিত হচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কো উন কিংবা দক্ষিণ ক্যারিবীয় সমুদ্রে ফ্রান্সের উপনিবেশ গুয়াডিলোপে জন্মগ্রহণকারী ঔপন্যাসিক মেরিসে কনডির (জন্ম ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৪) নামও উচ্চারিত হচ্ছে।

আমেরিকার ফিলিপ রথ মারা যাওয়ার পর জয়েস ক্যারল ওটস এককভাবে জোরালো দাবিদার হয়ে উঠেছিলেন মনে করলেও মেরিলিন রবিনসনও এই পুরস্কারের জোরালো দাবিদার। আমেরিকার এই নারী লেখক জন্মেছিলেন ১৯৪৩ সালের ২৬ নভেম্বর। Lila, Home, Housekeeping, Gilead, What Are We Doing Here প্রভৃতি গ্রন্থের লেখকের ঝুলিতে পুলিত্জার পুরস্কার রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার গেরাল্ড মুরনান এসেছেন আলোচনায়। ৮০ বছর বয়সী মুরনান মেলবোর্নের ভিক্টোরিয়া কলেজে সৃজনশীল সাহিত্য পড়ান। Tamarisk Row, A Lifetime on Clouds, The Plains, Landscape with Landscape, Inland, Emerald Blue তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। উত্তরাধুনিক ঘরানার লেখক হিসেবে তাঁর পরিচিতি রয়েছে।

গত বছর রাশিয়ার লুডমিলা উলিৎসকায়ার নাম শোনা গিয়েছিল। তাঁর সঙ্গে এবার লুডমিলা পেত্রশেভসকায়ার নামও শোনা যাচ্ছে। তবে প্রথমজন দৌড়ে অনেক এগিয়ে। তিনি এই সময়ের সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত রুশ কথাসাহিত্যিক। ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণকারী এই নারী লেখক মস্কোয় বেড়ে উঠেছেন। জীববিজ্ঞান, অণুপ্রাণবিজ্ঞান ও প্রাণরসায়নে অধ্যয়ন করে সাহিত্যের জগতে এসেছেন তিনি। চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও লিখেছেন। ষাটের দশকে ভিন্নমতের কারণে রাশিয়ার বামপন্থী সরকার তাঁকে গবেষণার চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়। তখন থেকেই তিনি সাহিত্যকে অবলম্বন করে এগোতে থাকেন। Daniel Stein, Interpreter তাঁর হলোকস্ট বিষয়ক উপন্যাস। ইহুদি, খ্রিস্ট ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সম্মিলনপ্রত্যাশী এই লেখকের আরো উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো Sonechka, The Funeral Party, Medea and Her Children ইত্যাদি।

ইসরায়েলের অ্যামোস ওজ মারা যাওয়ার পর ডেভিড গ্রোজম্যানকে নিয়ে সে দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখছেন।

ইতালির ক্লডিও ম্যাগরিস (জন্ম ১০ এপ্রিল ১৯৩৯) গতবার অনেকের চেয়ে বেশ এগিয়ে ছিলেন। এবারও তাঁর সম্ভাবনা রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্মান সাহিত্য পড়ান, পত্রিকায় কলাম লেখেন এবং রাজনীতিতে সক্রিয়। ১৯৯৪-৯৬ সাল পর্যন্ত সিনেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। Blindly I Dunabio (১৯৮৬) তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ। তিনি অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেনের নামি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেছেন।

স্পেনের জেভিয়ার মারিয়াস (জন্ম ১৯৫১) গত বছর প্রথম দিকে ছিলেন। এ বছরও তাঁর সম্ভাবনা রয়েছে। মাদ্রিদে জন্মগ্রহণকারী এই লেখক খুব অল্প বয়স থেকেই লেখালেখি শুরু করেছেন। All Souls, A Heart So White, Tomorrow in the Battle Think on Me, Your Face Tomorrow তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। 

সিরিয়ার অ্যাডোনিস (আলি আহমেদ সাঈদ) ৯৪ বছর বয়সে এখনো বেঁচে আছেন। কিন্তু তাঁর ভাগ্যে নোবেল জুটবে কি না বলা মুশকিল। তাঁকে ২০১১ সালে নিশ্চিত বিজয়ী মনে করেছিলেন অনেকে; কিন্তু সে বছর টমাস ট্রান্সট্রোমার পেয়েছিলেন সাহিত্যের এই সম্মানজনক পুরস্কার। হাঙ্গেরির পিটার নাদাসের সঙ্গে তাঁর স্বদেশি ল্যাজলো ক্রানজনাহোরকাইয়ের নাম শোনা যাচ্ছে। যেমন নরওয়ের জন ফসির সঙ্গে শোনা যাচ্ছে ডাগ সোলস্টাডের নাম।

এবার তালিকায় অনেক স্বল্পপরিচিত লেখকের নাম দেখা যাচ্ছে। নরওয়ের অণুগল্প রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জনকারী ৯১ বছর বয়সী লেখক জেল এসকালজেন ও ম্যান বুকার জয়ী ফ্রান্সের নারী লেখক এ এস বাইয়াতের নামও কেউ কেউ বলছেন। এ ছাড়া পোলান্ডের অ্যাডাম জাগাজেবস্কির নাম শোনা যাচ্ছে। সিমবোরস্কার পর তিনি কি পারবেন পোল্যান্ডে এই পুরস্কার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে? রোমানিয়ার লেখক মিরতিয়া কারতারেস্কু গতবারের মতো এবারও তালিকায় আছেন, সম্ভাবনায় কম। ডাচ লেখক সিজ নুটিবুমের (কর্নেলিস জোহান্স জ্যাকোবাস মারিয়া নুটিবুম)-এর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। সোমালিয়ার নুরুদ্দিন ফারাহ ২০১৮ সালে জোরালো দাবিদার ছিলেন, এ বছর তাঁর নাম বেশ নিচে। আরো আছেন আর্জেন্টিনার সিজার আইরা, মোজাম্বিকের মিয়া কুতো, দক্ষিণ আফ্রিকার এথুল ফুগার্ড, আন্তোজি ক্রোগ ও আইভান ভ্লাদিস্লাভিক, অ্যাঙ্গোলার পিপিতিলা, ইরানের শাহারনুর পারসিপুর, ফ্রান্সের অ্যানি আর্নেক্স, পাকিস্তানের কিশোয়ার নাহিদ, পর্তুগালের আন্তোনিও লোবো আন্তোনাস প্রমুখ। 

৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করার আগে সাহিত্যপ্রেমীদের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল প্রকাশ পায়। তাঁদের অনুমান কখনো কখনো মিলে গেলেও অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সবার ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে অখ্যাত কেউ পেয়ে গেছেন বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এই পুরস্কার। সাহিত্যরসিকদের মনঃপূত না হলেও নতুন লেখককে জানার আগ্রহ তৈরি করে এই সম্মাননা। অনেকের মতো সেই নামটি জানার জন্য আমরাও ৮ অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকলাম।

মন্তব্য