kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

মানুষের মুখ

বিষয় বৃত্তান্ত হুমায়ুন ফরীদি

ফরিদুর রেজা সাগর

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিষয় বৃত্তান্ত হুমায়ুন ফরীদি

আমাদের খুব প্রিয় শিল্পী হুমায়ুন ফরীদির প্রসঙ্গে আসি। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। এক কোনায়, এক পাশে ‘খাবার দাবার’ বলে একটি রেস্তোরাঁ আছে। এই রেস্তোরাঁয় পিঠাপুলি পাওয়া যেত। তা ঢাকা শহরের প্রায় সবাই জানত এবং এটাই তখনকার সময়ে একমাত্র রেস্তোরাঁ!

একসময় সেই রেস্তোরাঁয় আমার এখনকার সব বিখ্যাত বন্ধু প্রচুর যাওয়া-আসা করত। গুলিস্তানের কাছাকাছি, স্টেডিয়ামের উল্টো পাশের সেই রেস্তোরাঁয় প্রচুর আড্ডা, খাওয়াদাওয়া আর সময় পার করার অসামান্য সব স্মৃতি আমাদের! অনেক শিল্পী, কলাকুশলীর চমৎকার সমাবেশ ঘটত ওখানে। সবাই আসত আমার আর শাইখ সিরাজের কাছে!

রেস্টুরেন্ট যখন ভরপুর থাকত, কাস্টমারদের পদচারণে মুখর হয়ে থাকত একতলা, দোতলা; তখন মাঝে মাঝে হুমায়ুন ফরীদি বলত, ‘চলো, আমরা বাইরে গিয়ে দাঁড়াই!’

ভেতরে অনেক লোক। তার মধ্যে আমরা যদি চেয়ার-টেবিল সব দখল করে আড্ডা দিতে থাকি, তবে তো মূল কাস্টমাররা ভেতরে ঢুকে বিরক্ত হয়ে যাবে।

‘খাবার দাবার’-এ বসার জায়গা থাকে না। শুধু আড্ডা হয়। এই ইমেজ একবার তৈরি হয়ে গেলে লোকজন আর ঢুকবে না। আসবে না। বসবেও না। বেচাবিক্রির বারোটা বেজে যাবে। সাগর-সিরাজের ব্যবসার দারুণ অসুবিধা হবে। ফরীদির এই যুক্তি মেনে নিয়ে আমরা খাবার দাবারের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতাম।

বেশির ভাগ সময় খাবার দাবারের বাইরের ফুটপাতে চেয়ার নিয়ে বসতাম। তখন ফুটপাতে এত হকার হয়নি। আশ্চর্যজনকভাবে সেই হকারের ভিড় খাবার দাবারের সামনে এখনো, এত বছর পরও হয়নি। মজার তথ্যটা এখানে দিয়ে রাখা ভালো, সেটা হলো যে জিপিওর এই মাথা থেকে নবাবপুর লেভেলক্রসিং পর্যন্ত প্রতিটি ইঞ্চি ফুটপাতে হকার রয়েছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে খাবার দাবারের সামনের এ জায়গাটুকুতে তখনো যেমন হকার বসত না, এখনো এত বছর পরও ফাঁকা!

ফুটপাতে আমরা যখন আড্ডা দিতে চেয়ার নিয়ে বসতাম, ফরীদি বলত, ‘দাঁড়াও, একটা মজার খেলা খেলি।’

আমরা বলতাম, ‘কী? কী সেই খেলা?’

ফরীদি কথা না বলে পকেট থেকে একটা নতুন এক শ টাকার নোট বের করত। সেটা দেখে আমরা সবাই চুপ করে সেই দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এক শ টাকার নোটটা রাস্তার ওপর রেখে দিত ফরীদি। রাখার পরে সেই নোটের সামনে-পিছে একেকজন লোক একেক রকমভাবে হেঁটে যেত। শত টাকার নোট তখনকার সময়ে অনেক বড় টাকা।

আমরা দেখতাম, হেঁটে ক্রস করার সময় কেউ আড় চোখে তাকাচ্ছে ওই টাকার দিকে। কেউ বা হেঁটে সোজা চলে যাচ্ছে। টাকার দিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না কেউ কেউ। আমরা ফরীদিসহ সবাই সেই দেখাটা উপভোগ করতাম! কিছু চালাক লোকের দেখাও মিলে যেত।

তাদের কেউ একজন টাকাটা দেখে আড় চোখে চারপাশের সব কিছু খেয়াল করত। কেউ তাকে নজরে রেখেছে কি না বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করত।

তারপর কোনো সন্দেহ না হলে পট করে টাকাটা তুলে নিত। যেমনি তুলে নিচ্ছে, সেটা দেখে ফরীদি ওর জলদগম্ভীর গলায় বলত, ‘ভাই! কী করেন ভাই?’

লোকটির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যেত। কাঁচুমাচু হয়ে লোকটি থতমত ভঙ্গিতে বলত, ‘না, না, কিছু করছি না! এটা পড়ে ছিল তো। সে জন্য উঠিয়ে দেখলাম।’

ফরীদি ভারী গলায় বলত, ‘পড়াটা পড়েই থাকতে দেন।’

লোকটি টাকাটা মাটিতে রেখে দ্রুত হেঁটে চলে যেত। এমন অদ্ভুত রকম মজা করত ফরীদি। ফরীদি একদিন খাবার দাবারে বসে আছে। একজন এসে আড্ডায় ব্যাঘাত ঘটাল।

ফরীদি চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করলেন, ‘কী ব্যাপার ভাই? কোনো সমস্যা?’

লোকটি দাঁত কেলিয়ে তাকিয়েই থাকল। ফরীদি খুব অবাক হলো। অনেকক্ষণ মানুষটি ফরীদিকে দেখেই চলেছে। ফরীদি প্রশ্ন করল, ‘কিছু বলবেন?’

লোকটি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘ভাই, কালকে আপনি নাটকে যে অভিনয় করেছেন! দুর্দান্ত।’

ফরীদি খুব গম্ভীর মুখে বলল, ‘আমি?’

নাছোড়বান্দা দর্শক বলতেই থাকলেন, ‘হ্যাঁ। কালকে আপনাকেই দেখেছি তো! কাল নাটকটাও ভালো ছিল। তেমন আপনার অভিনয়। কাল ছিলেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনে? দেখলাম তো। ভুল দেখেছি?’

ফরীদি আরো ভারী গলায় বলল, ‘না, না, আমি না। আমার ভাই কিংবা বাবা হতে পারে। আমার মতোই চেহারা।’

লোকটা হতভম্ব হয়ে কিছু না বলে সংশয় নিয়ে হেঁটে চলে গেলেন। ফরীদি যেমন মানুষকে অপ্রস্তুত করতে ভালোবাসত, তেমনি ফরীদিকেও কেউ কেউ অপ্রস্তুত করার উদ্যোগ নিত। ফরীদি একদিন খাবার দাবারে ঢুকল, ওকে দেখে শাইখ সিরাজ বলল, ‘আজ আসো ফরীদিকে অপ্রস্তুত করি। সবাইকে সে অপ্রস্তুত করে, আমরা আজ ওকে তাই করব।’

আমি চুপ। তাকিয়ে আছি—শাইখ সিরাজ কিভাবে ফরীদিকে বেকায়দায় ফেলবে তা দেখা যাক। সিরাজ বলল, ‘আসো, আমরা আজ ফরীদিকে নকশি পিঠা খেতে দিই।’

নকশি পিঠার প্লেট এগিয়ে দিলাম সিরাজের হাতে। সিরাজ সেই পিঠার প্লেট সযত্নে হাতে নিল। খুব সুন্দর করে সাজিয়ে সিরাজ সেই পিঠার সঙ্গে শসা-টমেটো সালাদ বানিয়ে দিল। নকশি পিঠার সঙ্গে শসা-টমেটোর সালাদ!

স্বাভাবিকভাবে সিরাজ আশা করল, ফরীদি চক্ষু কপালে উঠিয়ে প্রশ্ন করবে, ‘এইটা কী?’

ফরীদি খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, নির্বিকারভাবে সালাদ আর নকশি পিঠাগুলো খেয়ে ফেলল, যেন এটাই সে চাচ্ছিল। এটাই সবাই খায়। কোনো উচ্চবাচ্য নেই। যথারীতি আমাদের কিছু বলার থাকল না।

আরেকটা ঘটনার কথা বলি। ঢাকা থিয়েটারের মঞ্চ পরিবেশনা নিয়ে পুরো টিম বাচ্চু ভাইয়ের নেতৃত্বে গেছে চিটাগাং আর ফেনীতে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে ট্রেন এসে থামল। লোকজন জানালা দিয়ে দেখতে পেল হুমায়ুন ফরীদিকে। দেখেই ভিড় জমে গেল।

ফরীদি তত দিনে ভীষণ জনপ্রিয়। ‘সংশপ্তক’ ধারাবাহিক চলছে তখন। একগাদা ছেলে-মেয়ে তাকে দেখছে হাঁ করে। কেউ কেউ টিটকিরি দিয়ে বলছে, ‘কান কাটা রমজান।’ ‘কান কাটা রমজান।’ বারবার বলছিল বলে ফরীদি হঠাৎ করেই ভীষণ খেপে গেল। ‘এত এত চরিত্র করে জনপ্রিয়তা পেয়েছি। আর তোমরা আমাকে একই সুরে ডেকে যাচ্ছ, ‘কান কাটা রমজান?’

নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু দলের নেতা। সামাল দিলেন পরিস্থিতি। ট্রেনও ছাড়ল তখন।  ফরীদিও কিছুক্ষণ পরে শান্ত হয়ে গেল! এ তো গেল জনপ্রিয়তায় তুঙ্গস্পর্শী হওয়ার পরের গল্প। তার আগের একটা ঘটনা দিয়ে লেখা শেষ করি।

ফরীদি আর আফজাল সারা জীবন ভালো বন্ধু। ফরীদি লেখালেখি করে না কখনো। আফজাল হোসেন অভিনয়ের পাশাপাশি ভালো লেখেও। ঢাকা থিয়েটারের শোতেই গেছি পুরো টিম আবারও চট্টগ্রাম। ট্রেন এসে স্টেশনে থামতেই সিনিয়র টিম নিয়ে একটা দামি বাস চলে গেল হোটেলে। ফরীদিসহ অপেক্ষাকৃত অন্যান্য শিল্পী-কুশলীর জন্য থাকল বেবিট্যাক্সি। সেই বেবিট্যাক্সিতে চেপে হোটেলে পৌঁছে ফরীদি ঢুকল রুমে। আফজাল ও ফরীদির জন্য একটা রুম বরাদ্দ। দুই বন্ধু সচরাচর এক রুমেই থাকে। রুমে ঢুকেই ফরীদি সোজা বলল, ‘আফজাল দোস্ত, আমি আর বেবিট্যাক্সিতে চড়তে চাই না। তোদের মতো, তোদের সঙ্গে দামি মাইক্রোতে উঠব। ঢাকায় ফিরে আমাকে মাথায় রেখে একটার পর একটা নাটক লিখবি। আমি অভিনয় করব। তোর স্ক্রিপ্টে ক্রমেই পপুলার হয়ে যাব। তার পর থেকে আমাকেও বেবিট্যাক্সিতে না নিয়ে মাইক্রোতে তুলে নেবে। ঠিক আছে?’

হুমায়ুন ফরীদি হঠাৎ একবার ঠিক করল, সে যুক্তরাষ্ট্রে ঘুরতে যাবে। যথারীতি দূতাবাসে গেল। পাসপোর্ট জমা দিল। ডাক পড়ল। খুব সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর তারিখ দেওয়া হলো, ‘অমুক দিন এসে পাসপোর্ট নিয়ে যাবেন।’

ফরীদি যথারীতি পাসপোর্ট নিতে গিয়ে থ। ভিসার স্টিকার দেখে এগিয়ে গেল অফিসারের কাছে। অফিসারকে বলল, ‘আমার স্টিকার তুলে ফেলুন। আমি আমেরিকা যাব না।’

অফিসার অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, কেন? কী সমস্যা?

ফরীদির স্পষ্ট কথা, আমি চেয়েছি ১০ দিনের ভিসা। কেন পাঁচ বছরের ভিসা দেওয়া হলো?

অফিসার বললেন, তাতে অসুবিধা কোথায়?

ফরীদির কথা, অসুবিধা আছে। আমার এত বছরের ভিসা দিলে কেন হবে? চেয়েছি শুধু ১০ দিন। আসা-যাওয়া ছাড়া সাত দিন থাকব। পাঁচ বছরের ভিসাসহ পাসপোর্ট নিলে আমার তখন আবারও যেতে ইচ্ছা করবে। আবারও যাওয়া মানে আবারও টিকিট কেনা। আবারও যাওয়া-আসা এবং সময় খরচ। এত বছরের ভিসা নিয়ে কী করব আমি?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা