kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

কাজী আনিসের সোনার কলম

ইমদাদুল হক মিলন

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কাজী আনিসের সোনার কলম

কাজী আনিস আহমেদের একটি গল্প পড়তে পড়তে আমার মনে হলো আনিস বাঙালি, কিন্তু তাঁর লেখা একদমই বাঙালি লেখকদের মতো নয়। আমার যেটুকু সাহিত্য পড়া সেই অভিজ্ঞতা থেকে আরেকটু বাড়িয়েও বলতে পারি। আনিসের লেখা আসলে কারো লেখার মতোই নয়। কাজী আনিস আহমেদের লেখা একান্তই তাঁর নিজের লেখা। অন্য কারো লেখার সঙ্গেই তাঁর লেখা মিলবে না। তিনি লেখেন ইংরেজি ভাষায়। ইউরোপ-আমেরিকার বিখ্যাত সব কাগজে তাঁর লেখা ছাপা হয়। তাঁর লেখার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন সেই সব দেশের বড় লেখকরা এবং অসংখ্য পাঠক। বাঙালি পাঠক যাঁরা ইংরেজিতে আনিসের লেখা পড়েছেন তাঁদের অভিজ্ঞতা এক রকম, আর যাঁরা বাংলা অনুবাদে পড়েছেন তাঁদের অভিজ্ঞতা আরেক রকম। অনুবাদে প্রকৃত লেখার অন্তস্তলের আসল স্বাদ পাওয়া একটু কঠিন। তার পরও আনিসের বইগুলো বাংলা ভাষায় যাঁরা অনুবাদ করেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই অনুবাদক হিসেবে বিশেষভাবে খ্যাত ও সার্থক। যেমন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি কাজী আনিসের ছোট্ট উপন্যাস ‘চল্লিশ কদম’ অনুবাদ করেছেন। তিনি ভারতীয় অনুবাদক হিসেবে সাহিত্যিকমহলে অতি উচ্চ স্তরে বসে আছেন। লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের সঙ্গে বাঙালি পাঠকের অনেকখানি পরিচয় ঘটিয়েছেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। লাতিন লেখকদের বিখ্যাত সব গল্প-উপন্যাস বাংলায় অনুবাদ করে সেই সব লেখার স্বাদ গেঁথে দিয়েছেন বাঙালি পাঠকের অন্তরে। কাজী আনিসের ‘চল্লিশ কদম’ও দুর্দান্ত অনুবাদ করেছেন তিনি। আসল উপন্যাসটির স্বাদ ছত্রে ছত্রে ধরে রেখেছেন, তবে কোনো কোনো শব্দ ব্যবহারে বা সংলাপে তার কিঞ্চিৎ অমনোযোগিতা আমি লক্ষ করেছি। যেমন—দাওয়াখানা, জিগরিদোস্ত, মেছোমাইমালেরা, কাংস্য, হপ্তা—এই সব শব্দের ব্যবহার এখনকার বাংলা ভাষার লেখায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে ব্যবহার করা হয় না। আমরা ‘হপ্তা’ লিখি না, লিখি ‘সপ্তাহ’। আমরা ‘দাওয়াখানা’ লিখি না, ওষুধের দোকান কিংবা ফার্মেসি লিখি। ‘জিগরিদোস্ত’ কেউ কেউ ঠাট্টার ছলে বলেন। ‘মেছোমাইমালেরা’ শব্দটির অর্থই আমি ঠিকমতো বুঝিনি। ‘কাংস্য’ কণ্ঠগুলো আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। আমাদের পাঠকরা এই ধরনের শব্দের সঙ্গে পরিচিত নন। আর একজন মাছওয়ালা, তার নাম আব্দুল্লাহ, শিকদার সাহেবকে সে বলছিল, ‘মরশুমের পহেলা ইলিশ’। ‘মরশুম’ শব্দটা আমাদের এখানকার কোনো জেলে বলে না। ‘পহেলা’ও বলে না, বলে ‘পয়লা’। ‘মরশুম’কে বলে সিজেনের। তার মানে, বহু ইংরেজি শব্দ নানা রকমভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কথামালার ভেতর ঢুকে বসে আছে। আমরা অমন করেই বলি, অমন করেই লিখি। অর্থাৎ মানুষের মুখের ভাষাটিকে ধরতে চাই। আরেকটা জায়গায় দেখলাম, ‘ডসন আঁকত পৃথুলা সব মহিলাদের কীভাবে রিকশায় করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’ এখানে ‘পৃথুলা সব মহিলাদের’ কথাটা লেখা উচিত, ‘পৃথুলা সব মহিলা’ অথবা ‘পৃথুলা মহিলাদের’, ‘সব’ শব্দটির দরকার নেই। এটা বহুবচনের দ্বিত্বজনিত ভুল বা অপপ্রয়োগ। যাই হোক, এগুলো তেমন কোনো ত্রুটি নয়। অনুবাদটি পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে বলে বললাম। তারপর আবার এ রকমও মনে হলো, মানবেন্দ্রবাবু ইচ্ছে করেই এ রকম কিছু শব্দ লিখলেন কি না! এ রকম দু-একটি বাক্য লিখলেন কি না। আনিসের উপন্যাসের প্রকরণগত দিকটা ঠিক রাখার জন্য অথবা লেখাটি যে একেবারেই অন্য জাতের, সেই জাতটি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য কম ব্যবহৃত শব্দের খেলায় মূল উপন্যাসের আবহটি হুবহু বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অন্য রকম একটি পদ্ধতি গ্রহণ করলেন কি না! তা-ও হতে পারে।

‘চল্লিশ কদম’ আশ্চর্য রকমের এক লেখা। উপন্যাসটি শুরু হলো ‘আগের সন্ধ্যাতেই মারা যাওয়ার পর শিকদার সাহেব এখন মাটির ছয় ফিট তলায় শুয়ে আছেন। মারা যে গেছেন সে সম্বন্ধে নিজে তিনি খুব একটা নিশ্চিত ছিলেন না বটে, তবে যারা তাঁকে কবর দিয়েছিল তারা অবশ্য পুরোপুরি নিঃসন্দিগ্ধই ছিল। সাদা কাফনে আপাদমস্তক ঢাকা, সেখানে শুয়ে শুয়ে এখন আর তাঁর মুনকার আর নাকির এই দুই ফেরেশতার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।’ (একটি বাক্যে তিনটি ‘আর’) এইভাবে শুরু হলো ‘চল্লিশ কদম’। কবরে শুয়ে শিকদার সাহেব অপেক্ষা করছেন দুই ফেরেশতা মুনকার আর নাকিরের জন্য। লেখকের চিন্তাটাই অভিনব। কবরে শুয়ে একজন মৃত মানুষ অপেক্ষা করছে। এ এক ধাঁধা। আসলে কি মানুষটি মৃত? তারপর পর্যায়ক্রমে আসছে শিকদার সাহেবের জীবনের নানাবিধ ঘটনা। মানচিত্রে নেই এমন এক জনপদ জামশেদপুরের টুকটাক নানা কাহিনি। যে এলাকার সব গল্পকথা বা ঘটনার দুটো ভাষ্য থাকে। এ এক অবাক করা চিন্তার লেখা। অভিনবত্বে অনন্য। চিন্তা-চেতনায় অনন্য। গল্প বলার ঢংয়ে অনন্য। ওই যে আগে বললাম, বাঙালি লেখকরা সাধারণত এভাবে লেখার কথা ভাবেন না। কাজী আনিসের কলমের ডগায় জাদু মাখানো। তিনি কোথায় বাস্তবের সঙ্গে খুবই আলতো ভঙ্গিতে মিশিয়ে দিচ্ছেন জাদু বা অপার্থিবতা বা কোথায় তৈরি করছেন ধাঁধা এসব আবিষ্কার করতে না পারলে কাজী আনিসকে বোঝা মুশকিল। চলমান জগতের পরতে পরতে মিশে আছে যে রহস্যময়তা, সেই রহস্যময়তার নানা রং খুব সূক্ষ্ম ভঙ্গিতে তিনি তাঁর লেখায় ছড়িয়ে দেন। ফলে তাঁর লেখা হয়ে ওঠে নানা বর্ণে বর্ণিল। বহু রঙের খেলা থাকে তাঁর লেখায়। কোনো বাহুল্য নেই, অযথা বর্ণনা নেই, অকারণ শব্দের খেলা নেই, তবে প্রতিটি জায়গাতেই আছে বহুমাত্রিকতা। যেমন শব্দ ব্যবহারে, যেমন বাক্য গঠনে, যেমন গল্প বলার মুনশিয়ানায়। ছোট ছোট বাক্যে চট করেই গল্পের ভেতরে ঢুকিয়ে দেবেন পাঠককে। তৈরি করবেন এক মায়াময় জগৎ। মায়া আর বাস্তবতার এমন একটা মিশেল দেবেন, একবার গল্পের ভেতর ঢুকলে পাঠক একটা গোলকধাঁধায় পড়ে যাবেন, যখন বেরিয়ে আসবেন, পাঠক আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করবেন লেখাটি শেষ হয়েছে কিন্তু তার অন্তর্জগতে রয়ে গেছে অদ্ভুত এক ঘোর। এই ঘোর কাটিয়ে বেরিয়ে আসা মুশকিল। বড় লেখকের প্রধান গুণই হচ্ছে এটা। পাঠকের মনে এমনভাবে নিজের লেখা গেঁথে দেবেন, সেই লেখা মন থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব। কাজী আনিস এই প্রকৃতির লেখক।

কাজী আনিসের যে গল্পটির কথা শুরুতেই বলতে চেয়েছিলাম গল্পটির নাম ‘তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখের দিন’। কাজী আনিসের গল্পগ্রন্থ ‘গুডনাইট মি. কিসিঞ্জার ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থে গল্পটি আছে। গল্পের শুরুতে পর পর তিনটি লাইনের মধ্য দিয়ে অনেকখানি গল্প তিনি বলে ফেললেন। শুরুটা হলো এইভাবে, ‘আমি বন্ধুদের সাথে খুব আশনাই রেখে চলার চেষ্টা কখনো করিনি। তাই আমার কাছে আমজাদের চিঠি এসেছে দেখে একটু অবাকই হলাম। তা-ও আবার সে চিঠি এসেছে তার আত্মহত্যার পর।’

এ এক সুখ খোঁজার গল্প। বন্ধুত্ব এবং সমসাময়িক জীবনের গল্প। আত্মহত্যার গল্প। লেখক এক জায়গায় বলছেন, ‘আমি জানি, আত্মহত্যাগুলোকে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যারা জীবনের প্রতি পর্বে সুখি ও সফল, তাদের আত্মহত্যাগুলো একটি রহস্য। আর যাদের জীবন ডিপ্রেসনের এবং বঞ্চনার, তাদের আত্মহত্যাগুলো জীবন থেকে পালানোর এক চরম চেষ্টা। আমজাদকে এই দুই ভাগের কোনটাতেই ফেলা যাচ্ছিল না।’

তাহলে আমজাদ কেন আত্মহত্যা করল?

এই অনুসন্ধানই হচ্ছে গল্পটির মূলমন্ত্র। মাঝে মাঝে সে বন্ধুটির অফিসে আসত। যে বন্ধু আসলে গল্পের কথক। কী সুন্দর বর্ণনা আছে এই লেখায়! অতি সরল, অতি মায়াময় ভঙ্গিতে লেখা। নির্মেদ গদ্য বলতে যা বোঝায় এই গল্পের গদ্য তাই। একটা জায়গা আছে এ রকম, ‘আমি জানতাম না সে (আমজাদ) ঠিক কেন আমার অফিসে আসত। তবে এখানে তাকে আমি সব সময়ই বেশ পরিচ্ছন্ন ও সৌজন্যময় দেখেছি। মাথার চুলের সিঁথিটি সব সময় পরিপাটি। তেলে চাপানো চুলগুলোর মাঝে সিঁথিটি এমন চকচক করত, মনে হতো, মূল মাথাটি পুরো সাদা মোমের তৈরি। বিদেশ থেকে আনা কফি এক কাপ তার সাথে আমি আন্তরিকতার সাথেই খেতাম।’

চিঠির নামে বন্ধুকে আমজাদ যা পাঠিয়েছিল সেসব আসলে তার টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতির কথা, ভালো লাগা অনুভূতির কথা। এই সব অনুভূতির মধ্য দিয়ে সে কি আসলে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখের দিনটির অন্বেষণ করেছিল? আগেই বলেছি, কাজী আনিসের লেখা পাঠককে ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। এই গল্পও ঘোরেরই গল্প। আমাদের ঢাকা শহরটিকে, এই শহরের গলিঘুঁজি আর নানা স্তরের মানুষকে তৃতীয় একটি চক্ষু দিয়ে দেখেছেন কাজী আনিস। ঢাকা এবং ঢাকার মানুষের নানা রূপ কৃতী বিজ্ঞানীর মতো করে আবিষ্কার করেছেন। এই শহরের রূপ বদল দেখেছেন নিবিড়ভাবে। পাঠ করেছেন মানুষের জীবন। বুঝতে চেয়েছেন জীবনস্রোত। সব কিছু মিলিয়ে কাজী আনিস লেখক হিসেবে একেবারেই তাঁর উদ্ভাবিত নতুন একটি ভূমির ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের সৌভাগ্য, কাজী আনিস আহমেদ বাঙালি। এই স্বাধীন ভূখণ্ডে তাঁর জন্ম। এই মাটির মানুষদের মধ্যে তাঁর বড় হয়ে ওঠা এবং এই মানুষদের নিয়ে তিনি লিখছেন। কাজী আনিস আহমেদের মতো লেখককে নিয়ে বাঙালি জাতি গৌরব করতে বাধ্য। তাঁর হাতে সোনার কলম। এই কলম দীর্ঘজীবী হোক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা