kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অসামান্যতা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অসামান্যতা

বাংলাদেশে ঊনবিংশ শতাব্দীতে একটি রেনেসাঁ সংঘটিত হয়েছিল বলে অনেকে ভাবতে ভালোবাসেন; কিন্তু ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত ছিল যে ধর্মনিরপেক্ষতায়, যার ভেতরে রয়েছে ইহজাগতিকতা এবং রাষ্ট্র ও সমাজকে ধর্ম থেকে আলাদা করে ফেলা, সেই ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা তো তখন যেভাবে হওয়া উচিত ছিল এ দেশে সেভাবে হয়নি। বিদ্যাসাগর চেষ্টা করেছিলেন, শিক্ষার ভেতর দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষর জন্য জায়গা তৈরি করবেন। তাঁর লেখা পাঠ্যপুস্তকগুলোতে দেব-দেবীর কোনো আনাগোনা নেই। সবটাই বাস্তবিক জগতের ব্যাপার। ‘বোধোদয়’ বইতে ঈশ্বরের উল্লেখ মাত্র নেই দেখে আপত্তি ওঠাতে নিতান্ত বাধ্য হয়ে ঈশ্বরকে হাজির করেছিলেন, তবে মূর্তিমান হিসেবে নয়, ‘নিরাকার চৈতন্য’ হিসেবে। ওই বইয়ের সর্বত্র বস্তুজগতের ও ভূগোলের উপস্থিতিতে ঈশ্বরের অবস্থানটা ঈশ্বরের নিজের জন্যই বেশ অস্বস্তিকর ছিল। ‘জীবনচরিত’ বইতে তিনি কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন, হের্শেলের মতো যেসব বিজ্ঞানীর জীবনী উপস্থাপন করেছিলেন তাঁদের বিষয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের কিছু জানা থাকবার নয়, এমনকি উচ্চশিক্ষিত মহলেও তাঁদের নিয়ে আলোচনা তখন তেমন একটা চালু ছিল না। বিদ্যাসাগর চেয়েছিলেন ওই বিজ্ঞানীরা কী করে বড় হলেন সেটা শুধু নয়, বিশ্বজগৎ সম্পর্কে তাঁরা যে জ্ঞান প্রচার করেছেন সেটাও শিক্ষার্থীরা জানুক; তাদের কৌতূহল বৃদ্ধি পাক।

বিদ্যাসাগরের গদ্যে যে প্রাণবন্ততা দেখা যায় তার অনেকটাই এসেছে সমাজ পরিবর্তনে তাঁর নিজের অত্যন্ত জীবন্ত আগ্রহ ও অনমনীয় অঙ্গীকার থেকে। ওদিকে আবার তাঁর বুদ্ধিবৃত্তি যেমন ছিল প্রখর, হৃদয়ও ছিল তেমনি উষ্ণ। তাঁর কাণ্ডজ্ঞানের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিল আবেগ। গদ্য রচনার কাজটাকে তিনি দায়সারাভাবে নেননি, নিয়েছেন শিল্পকর্ম হিসেবে, তেমন শিল্পকর্ম যা পাঠক গভীরভাবে স্পর্শ করবে, তাকে ভাবাবে। ওই গদ্যে তাই একদিকে আছে শিল্পের শৃঙ্খলা, অন্যদিকে হৃদয়ের আবেগ। আবেগ সেখানে ভাবালু হয়নি, সচলতা তৈরি করে দিয়েছে। একই সঙ্গে ক্রিয়াশীল বৈদগ্ধ্য তাঁর গদ্যকে রক্ষা করেছে গ্রাম্য স্থূলতার হাত থেকে।

বাক্যে যতিচিহ্নের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তিনি প্রবহমানতা ও সুস্থিরতাকে একত্র করেছেন। বাক্যগুলো অঙ্গীকারের কারণে অস্থির, আবার শিল্পবোধ ও যুক্তিবিদ্যার কারণে সংযত। ছাত্র বয়সে তিনি কবিতাও লিখেছিলেন, তাঁর গদ্যে কাব্যগুণ যে নেই এমন নয়। তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী অক্ষয়কুমার দত্তও চমৎকার গদ্য লিখেছেন; সে গদ্যও ইহজাগতিকতা ও বৈজ্ঞানিকতায় ভরপুর। কিন্তু অক্ষয় দত্তের রচনা বিদ্যাসাগরের রচনার মতো প্রাণবন্ত ও প্রভাবশালী হতে পারেনি। কারণ বিদ্যাসাগরের আবেগ সেখানে ছিল না। সমাজ পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি ততটা অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন না, বিদ্যাসাগর যতটা ছিলেন।

মার্ক্স ও বিদ্যাসাগর সমসাময়িক। মার্ক্সের জন্ম ১৮১৮-তে, বিদ্যাসাগরের জন্মের দুই বছর আগে। একেবারেই পরস্পরভিন্ন দুটি সমাজে ও শ্রেণিতে তাঁদের বসবাস। মার্ক্স ছিলেন বিকশিত পুঁজিবাদী সমাজের মানুষ। অভাব ছিল না তাঁদের গৃহে, সুযোগ পেয়েছিলেন সর্বাধুনিক শিক্ষার, উত্তরাধিকার ছিল সমগ্র ইউরোপের জ্ঞানভাণ্ডারের। মার্ক্স ও বিদ্যাসাগরের কাজের ক্ষেত্র ও পরিধিও ছিল স্বতন্ত্র। মার্ক্স সরাসরি সমাজবিপ্লবের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন, বিপ্লবের স্বার্থে তিনি এক দেশ থেকে আরেক দেশে গেছেন, কখনো বহিষ্কৃত হয়ে কখনো স্বেচ্ছায়। দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পুরোপুরি আন্তর্জাতিক। বিদ্যাসাগর কখনো নিজের দেশের বাইরে পা রাখেননি। তাঁর পূর্বসূরি রামমোহন রায় ইংল্যান্ডে গেছেন; সেখানেই লোকান্তরিত হন, সমাধিস্থ হয়েছেন ব্রিস্টল শহরে। বিদ্যাসাগর ছিলেন পুরোপুরি বাংলায় প্রোথিত।

কিন্তু বিদ্যাসাগরের সঙ্গে স্বদেশি রামমোহনের যত মিল বিদেশি মার্ক্সের মিল তার চেয়ে কম নয়। বেশিই। কারণ ঘোষিত রূপে না হলেও অন্তরে বিদ্যাসাগরও ছিলেন সমাজবিপ্লবী। সংস্কার নয়, কাঠামোতেই পরিবর্তন আনতে চাইছিলেন। সে জন্য জ্ঞানচর্চার অত্যাবশ্যকতার বিষয়টা মার্ক্সের মতোই বিদ্যাসাগরও জানতেন। নিজে তিনি অহর্নিশ জ্ঞানের চর্চা করেছেন এবং লব্ধজ্ঞান লেখার মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যস্ত থেকেছেন। দুজনেই লিখতেন। উভয়েই অতি উৎকৃষ্ট সাহিত্য রেখে গেছেন। এবং তা ছিল প্রয়োজনের তাড়নাতেই লেখা, নিছক জ্ঞানচর্চার জন্য নয়, সাহিত্যের জন্য সাহিত্য নয়, সাহিত্য সৃষ্টি ছিল সামাজিক প্রয়োজনে। মার্ক্স ও বিদ্যাসাগর উভয়েই যুক্ত ছিলেন সাংবাদিকতার সঙ্গে। মার্ক্সের যাত্রা শুরু দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেই। পরেও তিনি সংবাদপত্রে লিখতেন। বিদ্যাসাগরের যোগ ছিল মাসিক ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার সঙ্গে। ‘সোমপ্রকাশ’ বের হতো প্রতি সোমবার, যে জন্য ওই নাম; সে পত্রিকায় সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে লেখা থাকত; এবং দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। বিদ্যাসাগর ‘সোমপ্রকাশে’র সম্পাদনা ও পরিচালনার সঙ্গে প্রত্যক্ষরূপে জড়িত ছিলেন। ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ ছিল সেকালের খুবই প্রভাবশালী পত্রিকা; বিদ্যাসাগর কিছুদিন তার দায়িত্বে ছিলেন। ‘সর্বশুভকরী’ নামে একটি মাসিক পত্রিকাও তিনি প্রকাশ করতেন; যে পত্রিকায় বিধবা বিবাহের পক্ষে লেখা হতো।

বিদ্যাসাগর ছিলেন আশ্চর্য রকমের বিজ্ঞানমনস্ক, স্বাধীনচেতা ও আধুনিক। সংস্কৃতিতে তিনি বুর্জোয়া বিকাশের জন্য কাজ করছিলেন। বুর্জোয়া সংস্কৃতির ইতিবাচক যেসব গুণ—ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ, উদ্যোগ, বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা, জ্ঞানের আদান-প্রদান, উন্নত রুচি—সেগুলোর তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন নিজের অত্যন্ত পশ্চাৎপদ সমাজে। একই কাজে ইয়ং বেঙ্গলের তরুণরাও নিয়োজিত ছিলেন; কিন্তু পথ ছিল ভিন্ন। বিদ্যাসাগর সমাজকে ওপর থেকে আক্রমণ করেননি, ভেতর থেকে বদলাতে চেয়েছেন। তাঁর ছিল দেশপ্রেম; সেই দেশপ্রেমের অর্থ মানুষের জন্য ভালোবাসা। আরো একটি ব্যাপারে তিনি বুর্জোয়ামনস্ক ছিলেন। সেটা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা। বেনিয়া হয়ে সুদের কারবার, মুত্সুদ্দিরূপে বিদেশিদের লেজুড়বৃত্তি, জমিদারির জোরে প্রজা শোষণ, এমনকি সরকারি চাকরির নিশ্চিত উপার্জন, এসব করতে চাননি। স্বাধীনভাবে বই লিখেছেন, ছাপাখানা খুলে সে বই ছেপেছেন, বই বিক্রির জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও বইয়ের দোকান খুলেছেন। শুরু করেছিলেন সরকারি কর্মচারী হিসেবেই, না করে উপায় ছিল না। কিন্তু অসম্মানজনক ঠেকায় সে চাকরি ছেড়ে দেন। বয়স তখন মাত্র ২৬। বেতন ছিল মাসিক ৫০ টাকা, তখনকার হিসাবে কম টাকা নয়। ওপরওয়ালা বাঙালি কর্মচারী মন্তব্য করেছিলেন, চাকরি ছেড়ে বিদ্যাসাগর খাবে কি? শুনে বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘বলে দিও বিদ্যাসাগর আলুপটল বেচে খাবে, তবু অসম্মানের চাকরি করবে না।’ তেমনটাই করেছেন; চাকরি ছেড়ে দিয়ে বই লিখে, ছেপে ও বিক্রি করে অর্থোপার্জন করেছেন। যে অর্থের পরিমাণ কম ছিল না। যথার্থ বুর্জোয়া ছিলেন বৈকি। পাঁচ বছর পর সরকারি লোকরা ডেকে নিয়ে আবার তাঁকে চাকরি দেন। এবার আর ছোট চাকরি নয়, আগের মতো সংস্কৃত কলেজের ‘সহকারী সম্পাদক’ নয়, কলেজের সর্বোচ্চ যে পদ, অধ্যক্ষের, সেটিই দেওয়া হলো। পদটি আগে ছিল না, তাঁর জন্যই তৈরি করা হয়। বেতন তিন গুণ, ১৫০ টাকা। অধ্যক্ষ পদের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার বিদ্যাসাগর করেছিলেন। কলেজে সংস্কার আনলেন। পাঠ্যক্রমে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে দিলেন। কলেজের দরজা অব্রাহ্মণদের জন্য উন্মুক্ত করলেন। দুই টাকা করে ভর্তি ফি চালু করলেন; উদ্দেশ্য ওই টাকা দিয়ে দরিদ্র ছাত্রদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করবেন। তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল স্কুল ইন্সপেক্টরের; দায়িত্ব পেয়ে তিনি কেবল যে স্কুল পরিদর্শন করেছেন তা নয়, নতুন নতুন স্কুলও স্থাপন করেছেন। সংস্কৃত কলেজের শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য নর্মাল স্কুল প্রতিষ্ঠাও তাঁর উদ্যোগেই ঘটে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা