kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ কার্তিক ১৪২৭। ৩০ অক্টোবর ২০২০। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ঝুড়ি

মোস্তফা মামুন   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



ঝুড়ি

অঙ্কন : মাসুম

সালাম সাহেবের সব কিছু একটু কম কম। মাথায় চুল কম। শরীরে মাংস কম। চোখে দৃষ্টি কম; এমনকি যে শার্টটা উনি পরে থাকেন তাতে কাপড়ও একটু কম। গায়ের সঙ্গে টাইট হয়ে লেগে থাকে বলে ইদানীংকার কলেজছাত্রদের মতো কম বয়সী দেখায়।

এ রকম মানুষের শত্রু-বন্ধু কোনোটাই খুব বেশি থাকার কথা নয়। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, সালাম সাহেবের চারপাশের সবাই শত্রু। কেউ তাঁকে পছন্দ করে না। বেশির ভাগই এড়িয়ে চলে। যারা এড়িয়ে না গিয়ে মুখোমুখি হয়, ওরা দু-চারটা বাজে কথা শুনিয়ে দেয়।

এই যেমন—এখন বাথরুমে যাওয়ার সময় শুনতে পেলেন, ওঁর ফুফাতো ভাই আর মামাতো ভাই তাঁকে নিয়েই কথা বলছে।

ফুফাতো ভাই আরিফ ফিসফিস করে বলল, ‘ভাব সব ছুটে গেছে। রিটায়ার্ড করে গেলে জানো তো... অবস্থা হয় ময়লার ঝুড়ির মতো।’

খুবই হাসির কথা নয়; কিন্তু মামাতো ভাই বিপুল ওর বিশাল ভুঁড়ি দুলিয়ে বলল, ‘যা বলেছ.... ময়লার ঝুড়ি; কিন্তু সেটাতে ময়লা ফেলার মানুষও নেই।’

তিনি বাথরুমে ঢুকে যাচ্ছিলেন; কিন্তু ময়লার ঝুড়ি কথাটা বেশ লাগল। রাশভারি ধরনের বলে নিজের সম্পর্কে খুব বেশি মূল্যায়ন তিনি শুনতে পাননি, আজ তাই কৌতূহল হয়। ময়লার ঝুড়ি কেন বলা হচ্ছে? যুক্তিটা কী? যত দোষই থাকুক তিনি অপরিচ্ছন্ন নন, কম দামি হলেও সব সময় ধোয়া কাপড়চোপড়ই পরেন। তা ছাড়া ঝুড়ি ব্যাপারটায়ও প্রশ্ন আছে। কারো কারো মাথার সাইজের কারণে বালতি বলে ডাকা হয়। কান বড় হলে খরগোশ, চেহারার কারণে হনুমান-বাঁদর এসবও শুনেছেন; কিন্তু ময়লার ঝুড়ি আসে কোথা থেকে।

কিন্তু ওদের আলোচনাটা ঝুড়ি পেরিয়ে একটু ভিন্ন খাতে গেছে।

আরিফ বলল, ‘কী যে ভাব ছিল? একবার আমি দেখা করতে গেলাম। দেড় ঘণ্টা বসিয়ে রাখল বাইরের ঘরে। ভাবো, সেখানে বসে আছে গ্রাম থেকে আসা মিসকিনজাতীয় লোকজন। আমার তো এদের গায়ের গন্ধে বমি আসছিল।’

‘অন্যায়। খুব অন্যায়। মিসকিনদের সঙ্গে তোমাকে বসানো বিরাট অন্যায় হয়েছে।’

‘তারপর সিরিয়ালে সেই মিসকিনের দল আগে। ওদের নাম ডাকে, আমাকে ডাকে না। আমি গিয়ে বেয়ারাকে বললাম, বলো আরিফ এসেছে। ওর আপন মামাতো ভাই...’

‘তারপর?’

‘বেয়ারা আরেক ধাপ আগানো। বলে, অফিসে স্যারের কোনো মামাতো ভাই নেই। দুই টাকার বেয়ারার ওই সাহস হয় কী করে? এর মানে বলে রেখেছিল, আত্মীয়-স্বজন কেউ যদি যায় তাহলে যেন দুর দুর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।’

বিপুল একটু হতাশ হয়। আরিফের গল্পটা যথেষ্ট অপমানের নয়। ওরটা আরো অনেক বেশি লজ্জার। বলতে গিয়েও তাই আটকাল। আত্মীয়-স্বজনকে তার খুব চেনা আছে। এখন শুনে খুব সালামের নিন্দা করবে; কিন্তু রাতে আবার বউকে বলবে, ‘জানো, বিপুলকে একবার সালাম ভাই বলেছিল, দালালি করতে আমার কাছে এসো না। তুমি তো একেবারে পুরো গ্রাম্য দালাল।’

বিপুল তাই প্রসঙ্গ ঘোরায়, ‘যা করেছে! যুগ্ম সচিবেই এই অবস্থা, পুরো সচিব হলে তো টেকাই যেত না।’

যুগ্ম সচিব তথ্যটা অবশ্য পুরো ঠিক নয়। সালাম সাহেব রিটায়ার করেছেন অতিরিক্ত সচিব হিসেবে। কয়েক মাস অবশ্য। বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন যুগ্ম সচিব হিসেবেই; কিন্তু নিজের ব্যাচের ফার্স্ট-মাঠপর্যায়ে তুমুল দক্ষতার কারণে অনায়াসে সচিব হতে পারতেন তিনি। পারেননি যে এর কারণ তিনি খুব ভেবে দেখেননি। যখন যে দায়িত্ব পেয়েছেন, জীবন দিয়ে সেটাই করেছেন। শেষ দিকে তো সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় ওকে নিয়ে বিপাকেই পড়েছিল। সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে রাজনৈতিক তদবিরের পোস্টিংগুলোতে খুব ঝামেলা করছিলেন। পাঠানো হলো প্রাণিসম্পদে। হাতি-ঘোড়া নিয়ে আর কী করার আছে! দেখা গেল, সেখানেও ঠিকই ঝামেলা পাকিয়ে ফেললেন। চলতে থাকা ১১টি প্রকল্প বাতিল করে তদন্তের নির্দেশ দিলেন। তাতে প্রভাবশালী সংসদ সদস্য, ডাকসাইটে সচিবসহ বহু হোমরাচোমরার বিপক্ষে সুস্পষ্ট চুরির অভিযোগ। বিদেশ যাওয়ার প্রকল্প বাতিল করলেন কয়েকটা। আফ্রিকার বণ্য প্রাণী সংরক্ষণ, আমাজনে ঘাসের চাষজাতীয় মিশনে এক গুচ্ছ কর্তার যাওয়ার কথা। সবাই খেপে গেলেন। এবার পাঠানো হলো পানিসম্পদে। সেখানেও পানি ঘোলা করে অনেককে ঘোল খাওয়ালেন। শেষ পর্যন্ত তাই ওএসডি। তবু চাকরি শেষের কয়েক মাস আগে একটা সান্ত্বনার প্রমোশন। ব্যাচমেট ক্যাবিনেট সেক্রেটারি, দক্ষতার সব ক্ষেত্রে ওর চেয়ে অনেক পিছিয়ে, রাজনৈতিক লাইনবাজির ওস্তাদির কারণে সারা জীবন দ্রুত প্রমোশন আর ভালো পোস্টিং পেয়েছে। সরকার বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে এত সুন্দর বদলে ফেলত যে সবাই ওকে ডাকত গিরগিটি। সে রাগ করার বদলে হেসে বলত, ‘পৃথিবী এখন গিরগিটিদের ভালোবাসে। আমি পৃথিবীর নিয়মটা মেনে চলি মাত্র।’ সেই ‘গিরগিটি’ বন্ধুই কেন যেন দয়া করে ওকে একটা প্রমোশন দিয়েছিল।

বাথরুমে গিয়েও কথাটা মাথা থেকে গেল না। ময়লার ঝুড়ি। কেন?

সামনে সামনে পেলে জিজ্ঞেসই করে বসতেন হয়তো; কিন্তু ওদের আর সেখানে দেখা গেল না। আত্মীয়-স্বজন আরো অনেকে এসে গেছে। একজনকে নিয়ে বেশিক্ষণ পড়ে থাকার সুযোগ কারো নেই।

রেবেকা পেছন থেকে এগিয়ে এসে পিঠে টোকা দিয়ে বললেন, ‘কোথায় থাকো তুমি? মানুষজনের সঙ্গে একটু আলাপ করতে হবে না?’

‘সবাইকেই তো আমি কমবেশি চিনি।’

‘তোমার এই সচিবভঙ্গির চেনায় হবে না। আত্মীয়ের মতো চিনতে হবে। দু-একটা কথা বলতে হবে। এখন রিটায়ার, লোকজনের দরকার আছে।’

রেবেকা এটাও রোজ মনে করিয়ে দেন। রিটায়ার হওয়ার পর তার হিসাবে মানুষের প্রয়োজন কমে যাওয়ার কথা, রেবেকার মতে হিসাবটা উল্টা।

রেবেকা বললেন, ‘এই যে আসো, সেলিনা আপার মেয়েজামাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। জানো তো, চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক ওরা।’

‘না, জানি না। চলো।’

রেবেকা তুমুল উৎসাহে একটা বিচিত্র গড়নের ছেলের সঙ্গে ওকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি অবশ্য পরিচিত হওয়ার বদলে ছেলেটাকে ঘিরে ভিড়টাই বেশি খেয়াল করলেন। দ্বিগুণ বয়সী নারী-পুরুষ তার কথায় মুগ্ধ। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে।

ছেলেটি হাত মিলিয়ে বলল, ‘আসবেন। আসবেন। আত্মীয়-স্বজন না এলে আর কার জন্য অত কিছু করা।’

রেবেকা মুগ্ধ হয়ে বললেন, ‘তোমার আংকেল সেক্রেটারি ছিলেন। এখন রিটায়ার্ড। অনেক জায়গায় জয়েনিংয়ের প্রস্তাব আছে; কিন্তু উনি নাকি প্রাইভেট কম্পনিতে জয়েন করবেন না। তুমি একটু বুঝিয়ে বলো।’

‘বলব। বলব।’ ছেলেটি একটু নিরাসক্ত। আলোচনা কোন দিকে যাবে বুঝতে পারে। অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছে, মানুষ নানা ডাল বেয়ে শেষ পর্যন্ত চাকরি পর্যন্ত গিয়ে থামে।

রেবেকা বললেন, ‘দাও বাবা, তোমার কার্ড দাও।’

সে কাকে যেন ইঙ্গিত করল। একটা উগ্র ধরনের মানুষ এসে পকেট থেকে কার্ড বের করে দেয় অবহেলায় এবং একটু ধাক্কা দিয়ে যেন ওদের সরিয়েও দেয়। সে-ও অভিজ্ঞ। মালিকের চোখ দেখেই বুঝতে পারে কাকে কখন সরিয়ে দিতে হয়।

কার্ড পেয়ে এবং ধাক্কা খেয়ে সরে আসতেই দেখা একজন জবরজং সাজের মহিলার সঙ্গে। রেবেকা ‘ও সেলিনা আপা’ বলে উচ্ছ্বাস না দেখালে নিজের খালাতো বোনকে চিনতেই পারতেন না।

সেলিনা বললেন, ‘ভালোই আছ তাহলে।’

রেবেকা আরো বিগলিত, ‘সবই আপনাদের দোয়া।’

‘যাক ভালো থাকলেই ভালো। আবার কার্ডটার্ড নিয়ে জামাইয়ের কাছে চলে যেয়ো না।’

রেবেকা একটু ব্রিবত, ‘না... নিয়ে রাখলাম আর কী! নিজের পরিচিতজন এত বড়, এটা তো একটা গর্বের বিষয়।’

সেলিনা গম্ভীর, ‘সেই গর্ব তো আমাদেরও ছিল। একবার গিয়েও ছিলাম সালাম ভাইয়ের কাছে।’

সালাম সাহেবের আবছা ঘটনাটা মনে পড়ে। উনি তখন যশোরের মণিরামপুরের ইউএনও, পাশের থানায় পোস্টিং ছিল সেলিনার জামাইয়ের, স্বাস্থ্য বিভাগে একটা ছোট চাকরি করতেন।

সেলিনা বলেন, ‘কী কপাল দেখো, আজ হৃদির জামাইয়ের কাছে চাকরি চেয়েছ অথচ তখন হৃদির ভর্তির ব্যাপারে ছোট্ট একটা সাহায্য তোমার জামাই করেনি।’

রেবেকা মীমাংসার স্বরে বলেন, ‘বাদ দেন। ওসব তো কত আগের ঘটনা।’

‘মনে পড়ে। সব মনে পড়ে। দুর্দিন পেরিয়ে এলে তখন দুর্দিনের কথাই বেশি মনে হয়। উনি বলে দিলেই হৃদি সরকারি স্কুলে ভর্তি হতে পারে। একটা মাত্র ফোন। কিন্তু তোমার জামাই করল না।’

রেবেকা বললেন, ‘ও তো একটু নীতিবান ছিল। জানেনই তো। আমি সারা জীবন বুঝিয়েছি।’

সালাম সাহেবের এখন স্পষ্টই মনে পড়ে। সেলিনার জামাইয়ের অনুরোধে খোঁজ নিয়েছিলেন, ভর্তি পরীক্ষায় ৫৫ নম্বর হয়েছে, ওরা নেবে ৫০ জন। উনি ওকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, ‘দেখো, আমি ফোন করলে হয়তো ওকে নিয়ে নেবে; কিন্তু তাহলে যোগ্য ৫০ জনের একজন বাদ পড়বে। এটা কি ঠিক হবে? অন্যায় হবে না!’

রেগে গিয়ে জামাই বলেছিল, ‘এটা অন্যায়! সাহায্য করবেন না সেটা বলেন। আপনাদের সরকারি কর্তাদের টাকা দিয়ে সব করাতে হয়।’

অবাক ব্যাপার, পরে ঠিকই সে কাজটা করিয়ে নিয়েছিল। স্থানীয় চেয়ারম্যানকে ধরে।

তিনি একটা অন্যায় কাজ করেছিলেন অবশ্য। এক অনুষ্ঠানে দেখা হওয়ার পর সেই চেয়ারম্যানকে ভর্ত্সনা করে বললেন, ‘সামান্য স্কুলে ভর্তির জন্য তদবির করেন... খুব খারাপ কথা।’

সেটাও ওর কানে গিয়েছিল। তাই নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড।

নিজেকে বড় ব্যর্থ মনে হয় তাঁর। চাকরিতে যে প্রাপ্য মর্যাদা পাননি, খুব যে টাকা-পয়সা হয়নি, এখনো ভাড়া বাসায় থাকতে হয়, এসবের জন্য নয়। মানুষকে যে নিজের যুক্তিটা বোঝাতে পারেননি। অদ্ভুত কাণ্ড, সবাই সারা জীবন এসেছে অন্যায় আবদার নিয়ে। শেষ দিকে তিনি অপেক্ষা করতেন কেউ একজন একটা যৌক্তিক কাজ নিয়ে আসবে। নিজে অন্যায়ের শিকার হয়েছে। তাহলে তিনি জান দিয়ে কাজটা করে দেবেন।

ঠিক তখনই প্রচণ্ড হুল্লোড়। ছোটাছুটি। ভিড়। ভিডিও ক্যামেরাওয়ালা দৌড়াতে গিয়ে উল্টে পড়ে গেল। বোরহানির জগও ভাঙল কোথায় যেন।

বোঝা যায় ভিআইপি কেউ এসেছেন বোধ হয়। দেখা গেল, ডাকসাইটে এক ক্যাবিনেট মন্ত্রী। 

তিনি একটু আড়ালে সরে গেলেন। দেখা হলে নির্ঘাত কিছু অপমানজনক কথা শুনতে হবে। ইনি যখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনিও সেখানে। বড় একটা ঝামেলা হয়েছিল। পরে অবাধ্যতার শাস্তি হিসেবে ওকে ভূমি আপিল বোর্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মন্ত্রী মহোদয় এখন বিয়ের স্টেজের দিকে যাচ্ছেন। ঝকঝকে আলো তাড়া করছে। ওর বাহিনী তো আছেই, সঙ্গে আমন্ত্রিতদেরও ধাক্কাধাক্কি। ছবি ওঠানোর লড়াই। ফেসবুক বলে একটা ব্যাপার আছে। সেখানে লাইক নেওয়ার জন্য, নাকি এখন সবাই ছবির জন্য এমন কাঙাল।

ঠিক তখনই দুর্ঘটনাটা ঘটল। মন্ত্রী এই পাশের অতিথিদের সম্ভাষণের জবাব দিতে গিয়ে তাকিয়েছিলেন এদিকে। তারপর প্রায় চিৎকার করলেন, ‘আরে সালাম সাহেব যে... আপনি এখানে?’

মন্ত্রী একজনকে চিনতে পারছেন, ডাকছেন, এর মানে মানুষটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ওর সঙ্গেও সেলফি তোলা উচিত কি না তাই নিয়ে সেলফিবাজরাও ভাবনায়।

মন্ত্রী কাছে ডেকে বললেন, ‘এই যে ছবি তোলো এই মানুষটার। বুকের পাটা আছে। কাউকে ছাড় দেয়নি।’

সালাম সাহেব ক্ষীণ কণ্ঠে বলেন, ‘বাদ দিন স্যার। আমি এখন রিটায়ার্ড।’

‘উফ্ তাতে অনেকের শান্তি হয়েছে। আমারও। ধরুন, এখন সেচ মন্ত্রণালয়ের সচিব আপনি, তাহলে আমি কী ঝামেলায় পড়তাম।’

হো হো করে হাসেন মন্ত্রী। সালাম সাহেব পরবর্তী আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হন। মন্ত্রী-রাজনীতিকরা এভাবে নাটক করে অডিয়েন্সকে নিজের দিকে টেনে নেয়। তারপর মোক্ষম অপমানটা করে।

মন্ত্রী বলে চলেন, ‘বুঝলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ে থাকার সময় আপনি তো তখন ডেপুটি সেক্রেটারি বোধ হয়...’

‘জি স্যার।’

‘আমার একটা ফাইল আটকে দিল। অনুরোধ-হুমকি কিছুতেই কাজ হয় না। আমার কৌতূহল হলো। কী করলাম জানেন?’

সবাই ব্যগ্র। জানতে চায় মন্ত্রীর কীর্তি।

‘আমি ওর এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে ধরলাম। আমার চেনা মানুষ। জীবনে তো অফিসার কম দেখিনি, বাইরের দুনিয়ায় নিয়ম দেখায়, নিজের মানুষ হলে সব মাফ।’

‘তারপর স্যার?’

‘তারপরই তো ঘটনাটা। সেই আত্মীয়কে উনি রীতিমতো অপমান করে বের করে দিলেন। কাজটা হলো না। বড় লস। পার্সোনালি তো বটেই, পলিটিক্যালিও। শত্রুপক্ষ প্রচার করল নিজের মিনিস্ট্রির উপসচিবের কাছেই ধরা। এলাকার প্রতিপক্ষ এটা নিয়েই ঘোঁট পাকাল যেন পরেরবার আমি নমিনেশন না পাই। আরেকটু হলে গেছিলাম আর কী! পরে ভূমি আপিল বোর্ডে উনাকে ট্রান্সফার করে নিজের মান রক্ষা করলাম।’

সবাই চুপ। সালাম সাহেবের নিন্দা, না প্রশংসা—ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

মন্ত্রী নাটকীয় ভাবে বললেন, ‘এর পর থেকে ভাই মনে মনে আপনাকে স্যালুট করেছি। আমরা রাজনীতি করি, অনেক হিসাব মাথায় রাখতে হয় বলে ন্যায়-অন্যায় বহু কিছু করি, তবু যাঁরা সত্যিকারের অফিসার, তাঁদের মন থেকে শ্রদ্ধাও করি।’

এরপর কায়দা করে হাত তুলে বললেন, ‘স্যালুট আপনাকে।’

নিজের প্রশংসা কোনো দিন এভাবে শোনেননি বলে সালাম সাহেব ঠিক বুঝতে পারলেন না কী করণীয়। কিন্তু তাঁকে অবাক করে দিয়ে ব্যাপক একটা হাততালি।

মন্ত্রীর চ্যালারাই শুরু করেছিল। খেয়াল করে দেখলেন তাঁর আত্মীয়-স্বজনও শামিল হয়েছে। আরিফ আর বিপুলকেও দেখা গেল বিপুলবিক্রমে হাততালিতে ব্যস্ত।

মন্ত্রী বললেন, ‘এ রকম মানুষ দেশের সম্পদ। আর পুরো পরিবারের গর্ব। আসুন, সবাই ছবি ওঠান।’

লাইন পড়ে গেল ছবি ওঠানোর। সেলফির আবদার মেটাতে হলো আত্মীয়-স্বজনের ছেলে-নাতিদের।

রাতে বাসায় ফিরে সালাম সাহেব বললেন, ‘বুঝলে, ময়লার ঝুড়ি জিনিসটা কিন্তু বেশ।’

রেবেকা ঠিক যেন শুনতে পেলেন না, ‘কিসের ঝুড়ি?’

‘ময়লার ঝুড়ি।’

‘ময়লার ঝুড়ি!’

‘কেউ খেয়াল করে না, নোংরা হয়ে থাকে অথচ দেখো ঝুড়িটা না থাকলে পুরো দুনিয়া ময়লা হয়ে যেত।’

‘কী আবোল-তাবোল বকছ? পাগল হয়ে গেলে নাকি?’

সালাম সাহেব হাসেন, ‘তা যাই বলো, জিনিসটা কিন্তু খুব কাজের।’

‘আচ্ছা হয়েছে। খুব কাজের। ময়লার ঝুড়ি নিয়ে এখন ঘুমাও।’

পাশ ফেরেন রেবেকা। তিনিও ঘুমান। অসম্ভব গর্ব নিয়ে।

মন্তব্য