kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

আমাদের বোরহেস প্রেম

মাসরুর আরেফিন   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



আমাদের বোরহেস প্রেম

সম্প্রতি আমার বন্ধু, কবি ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন হোরহে লুইস বোরহেস-প্রেমীদের জন্য দুটি জিনিস উপহার দিয়েছেন বিডিনিউজ২৪.কমের সাহিত্য পাতায়—একটি বোরহেসের এক ব্র্যান্ড নিউ সাক্ষাৎকার এবং আরেকটি বোরহেসকে নিয়ে নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিক মারিও ভারগাস যোসার দেওয়া সাক্ষাৎকার। এই দুইয়ের অনুবাদ এখন অবধি ইংরেজিতেও হয়নি। অতএব মূল স্প্যানিশ থেকে বাংলা করা এই অনুবাদ দুটি আমাদের জন্য বড় পাওয়া। বন্ধু রাজুকে ধন্যবাদ। তিনি একদম একরোখাভাবে আজ বোরহেস নিয়ে পড়ে আছেন প্রায় ৩০ বছর। তাঁর সঙ্গে বোরহেস বিষয়ে আমার কথাবার্তা হয়েছে প্রচুর। বোরহেস আমারও প্রিয় সাহিত্যিক। বোরহেস আমার এ-টু-জেড পড়া। স্রেফ কয়েকটা প্রবন্ধ বাদে তাঁর এক সুতো গল্প-কবিতা-সাক্ষাৎকার নেই, যা আমি পড়িনি এবং তাঁর একটা গল্পও নেই, যা অন্তত দুইবার পড়িনি।

বোরহেস—বিশ্বসাহিত্যের চিরকালীন সাদা-কালো বাইনারিতে ফেলে ভালো লাগা-মন্দ লাগা মূল্যায়নের দাগ বদলে দেওয়া বোরহেস, এককথায় সাহিত্য কী সেই সংজ্ঞা বিস্তৃত করে দেওয়া এবং সাহিত্যের দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত নন্দন একদম উল্টেপাল্টে দেওয়া বোরহেস—মেটাফরিক অর্থে নিজে একাই একটা পৃথিবীর সমান, তাঁর গল্প-কবিতা-সাক্ষাৎকার ও সাহিত্যিক ওয়ার্ল্ডভিউয়ের বিপ্লবী ব্যাপ্তি নিয়ে। একসময় আমি তাঁর বিশালত্বের সামনে আর দাঁড়াতে না পেরে ব্রেক চেপে ফেললেও দেখে ভালো লাগে যে রাজু আজও আটকে আছেন বোরহেস-পৃথিবী উন্মোচনের কাজে। তবে বলতেই হচ্ছে, বোরহেস নিয়ে রাজু আলাউদ্দিন এবং অন্য কারো কারো এতটা লেগে থাকার পরও, তাঁকে নিয়ে এখানে এত বেশি লেখালেখি হওয়ার পরও এ দেশে সাহিত্যচর্চার মাঠে বোরহেস আজও বড় কোনো নাম নয়। কারণ আমরাই হয়তো ব্যর্থ হয়েছি বাঙালি পাঠককে বোরহেস পড়ার আসল আনন্দটুকুর সন্ধান দিতে।

কজন লোক এখানে বোরহেস পড়ে? আরো দুঃখের কথা, এ দেশে বোরহেস মানে এখনো সেই গোলকধাঁধা, স্বপ্ন, চাকু, ঘোরানো সিঁড়ি, বই, লাইব্রেরি, মুখোশ, জ্যামিতির খেলা, বাঘ, পশুর খাঁচা, বৃত্তাকার গ্যালারি, অন্য লেখকের প্ল্যানড অনুকরণ, নন্দনতাত্ত্বিক ট্রিক, ধর্মের ফেরকাদের মধ্যে কোন্দল (রাফেজি-খারেজিপনা), গুপ্তবিদ্যা বা অকাল্ট, ডাবল বা এক মানুষের দুই মানুষ হওয়া, নানা আজব রেফারেন্স, নানা কিছুর পরোক্ষ উল্লেখ, আর জাদু।

আমরা আমাদের এখানে কিভাবে যেন বোরহেসের স্থিরতাশূন্য, নড়নড়ে, শুধু ইঙ্গিতময়, আর কোনো মতেই কংক্রিট নয়, এ রকম সব টেক্সটকে বানিয়ে ছেড়েছি স্থির, দৃঢ়, ফর্মুলাইক টেক্সট। আমরা বোরহেসের বহু অর্থবোধক ক্রিটিকাল এনকোয়ারিকে বুঝেছি শক্ত, মোটাদাগের সাফ সাফ কী যেন হিসেবে। এতে বোরহেস পড়ার শক বা ধাক্কা হয়ে গেছে রোজকার সাধারণ অভিজ্ঞতা, হয়ে গেছে পাসওয়ার্ডের মতো কিছু—মুখস্থ করা, পুনরাবৃত্তিমূলক উপপাদ্য। বোর্হেস পড়ার অস্বস্তি ও অপ্রাকৃত-অপার্থিব অনুভূতির আসল বিষয়টাই অগ্রাহ্য করে আমরা খাড়া করে ফেলেছি এক সহজ বোরহেস পাঠ, আর সেই পাঠের অনুভূতিগুলোকে নাম দিয়েছি ‘বোরহেসিয়ান’, যেমন ‘কাফকায়েস্ক’। ‘বোরহেসিয়ান’-এর মধ্যে বোরহেস নেই, যে রকম ‘কাফকায়েস্কে’ নেই কাফকা। সবাই জানে ‘বোরহেসিয়ান’ কী। অতএব ওর মধ্যে বোরহেস থাকতেই পারেন না। আমিও ওপরে পুরো এক লিস্ট দিয়ে বলে দিলাম ‘বোরহেসিয়ান’ কী এবং ইচ্ছা করেই ‘অপ্রাকৃত অপার্থিব অনুভূতি’ শব্দ তিনটা ব্যবহার করে বুঝিয়ে দিলাম বোরহেসকে কোন সেট ফর্মুলায় দেখি আমরা।

আমার নিজের বোরহেস দেখাও আগে ওরকমই ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেটা পুরো বদলে গেছে। আমার কাছে বোরহেস আর গেমপ্লেয়িংয়ের গণিতবিদ বা জাদুকর নন, বোরহেস মেটাফিজিকসের মাথা-আওলানো কথাকার নন। অবশ্যই তিনি গত শতকে আমাদের বাস্তবতার মধ্যে হেঁয়ালি, প্রহেলিকা ও অধিবিদ্যার (মেটাফিজিকস) এক বিশাল জ্ঞানগর্ভ মাথা ঢুকিয়ে দেওয়া নতুন ঘরানার প্রথম বড় এবং সবচেয়ে বড় ছোটগল্পকার; কিন্তু আমার কাছে ওটা এখন শুধু বোরহেসের উপরিতল; আসল বোরহেস আছেন ওই তলের নিচে। কী সেই আসল বোরহেস?

আগে আমি তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘টলন্ উকবার’কে ভাবতাম এ রকম : টলন্ নামে এক কাল্পনিক গ্রহ আছে, যে গ্রহের ডিজাইন সম্ভবত করেছেন দার্শনিক বিশপ বার্কলে, সেই গ্রহে কোনো স্থান ও কাল নেই, আছে শুধু একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি বা অনুক্রম, আর টলনের বাসিন্দাদের মুখের ভাষায় কোনো বিশেষ্য (noun) নেই, কারণ ওরা মনের ধারণার বাইরে কোনো বস্তুর অবস্থানকে চিন্তা করতে পারে না—আহ্, কী দারুণ অরিজিনাল সব আইডিয়া!

কিংবা আগে তাঁর আরেক বিখ্যাত গল্প ‘লাইব্রেরি অব ব্যাবেল’কে ভাবতাম যে বাহ্, কেমন এক লাইব্রেরি সেটা, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে সহাবস্থান বজায় রেখে ঘোরে ও বাড়ে সেই লাইব্রেরি এবং তার প্যাঁচানো তাকে তাকে বই নিয়ে মহাশূন্যে ঝোলে সে, আর সেই লাইব্রেরিতে কি না আছে এ পৃথিবীতে লেখা হয়েছে (বা লেখা সম্ভব) এমন সম্ভাব্য সব বই, আর ওই বইগুলো কি না লেখা বর্ণমালার সব অক্ষর নিয়ে সম্ভাব্য সব কম্বিনেশনে, অর্থাৎ অর্থহীন ওরা।—দুর্দান্ত!

বোরহেস বুঝতে স্পিনোজা পড়লাম, বার্কলে পড়লাম, স্পেঙলারিয়ান সাইকেলস্ ওল্টালাম, হিউম, সিদ্ধার্থ, আইডিয়ালিজম এসব নিয়ে বসলাম। কিন্তু এখন বুঝি ওসবের কোনো দরকার ছিল না। এখন বুঝি ভালো লেখা কখনো ধাঁধা না, সে জ্যামিতিও না এবং বোরহেস মানে উদ্ভট সৃজনশীল চিন্তাই শুধু না; বোরহেস মানে মানুষের ইতিহাস অর্থাৎ জ্ঞানের ইতিহাস ও ফোক-সংস্কৃতির যুদ্ধগুলোয় নায়কদের খামখেয়ালিপনাও না (তাঁর এক গল্পে যুদ্ধের উত্তুঙ্গ রক্তাক্ত মুহূর্তে শত্রু হয়ে যায় রক্তের ভাই)।

আমি এখন বুঝি যে পৃথিবীর সব ভালো লেখাই আসলে নৈরাজ্যের দলিল। কারণ এই আজব ও নির্লিপ্ত মহাবিশ্বে আমাদের অল্পদিনের জন্য আসা এবং খ্যাতি-প্রতিষ্ঠা-পরিবার-অর্থকড়ি-যৌন আনন্দ-শিল্প ও প্রকৃতির রূপে মুগ্ধতা-প্রেম-অধ্যয়ন এ সবই মহাকালের হিসাবে অর্থহীন, যেমন অর্থহীন আমাদের বিক্ষোভ ও আন্দোলনগুলো, তেমনই অর্থহীন আমাদের চাটুকারিতা, মিথ্যা বলা, নিষ্ঠুরতা ও নির্বিচার অন্যায় করার প্রতি মোহ ও ঝোঁকগুলো। সবটা মিলে এখানকার যে চরম বিশৃঙ্খলা তা আমরা চোখের সামনেই তো রোজ দেখতে পাচ্ছি। একদিকে রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা, সংসার, সরকার, নানা মতবাদ, বিশ্বাস, ধর্মবিশ্বাস, ধর্মবিরোধী বিশ্বাস, যার সব আমাদের নিয়ে ঠেলে দেয় বিশ্বাস ভঙ্গ-বিভ্রান্তি-অরাজকতা ও সংস্কারের পাতালে; অন্যদিকে (বোরহেসের নানা জায়গা থেকে ধার করে নিয়ে বলছি) মহাবিশ্বে আমাদের গ্রহের ঠুনকো এক অবস্থান, যার চারপাশে বাকি গ্রহগুলো ঘুরছে গোল হয়ে, সাগরের ঢেউ এক খেয়ালি নিয়ম মেনে আছড়ে পড়ছে সৈকতগুলোতে, সৈকতের ওপর দিয়ে ছুটছে ঘোড়া, হাওয়ার আচরণ যথেচ্ছাচারী, দূরের ছায়াপথ আসলে ভয়ের, কারণ সে আমাদের সংসারের অংশ হয়েও আমাদের জন্য কিছু মিন করে না এবং তৃতীয় আরেক দিকে আছে মানুষের স্বভাব—গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে সে ছোরা হাতে নিয়ে, সিঁড়ির বাঁকে সে দাঁড়িয়ে আছে অন্যকে সিঁড়ি থেকে ঠেলে ফেলে দিতে, আর ওই সিঁড়ির পাশে আলো কেমন ‘অনেক স্বল্প, আর সেই আলো জ্বলে একটানা’ এবং আমরা ওই সিঁড়ি থেকে পড়লাম তো পড়লাম গিয়ে অনন্ত পাতালে—‘যখন আমি মারা যাব, ওদের দয়ার হাতগুলো আমাকে রেলিং থেকে ছুড়ে ফেলে দেবে; পরিমাপ-অযোগ্য তলহীন বাতাস হবে আমার কবর, সেখানে আমার শরীর পড়তে ও ডুবতে থাকবে চিরকাল, আর সেই অনন্তকাল ধরে চলা পতনের থেকে জেগে ওঠা বাতাসের মধ্যে ক্ষয় ও নিশ্চিহ্ন হতে থাকব আমি।’ তো, মানবজীবনের এসব দিকের সবটা ছাপিয়ে আবার আছে মৃত্যু, বোরহেসের হিসাবে অনন্তের গর্ভে যাওয়ার চাবি, যা আবার দুটি কাজ করেছে—সব কিছুকে, সব চাওয়া-পাওয়া, দেনা-পাওনাকে অর্থহীন বানিয়ে দিয়েছে; আবার সময়কে আমাদের ধারণার অতীত এক সীমার বাইরে ঠেলে দিয়ে অনন্তকে মানুষের কাছে করে তুলেছে রহস্যময়, অপ্রাকৃত ও গা ছমছমে ধরনের লিরিক্যাল।

বোরহেসে এই লিরিসিজম যথেষ্টই আছে; কিন্তু সেটা তাঁর মতো করে। বোরহেসে ‘সিম্বল’ যথেষ্টই আছে; কিন্তু সেটা অন্য কারো মতো করে ‘ক’কে দিয়ে ‘জ’কে বোঝানোর সিম্বল নয়। বোরহেসেরটা বেশি মেটাফোর, কম সিম্বল। তাঁরগুলো ভাষায় ফোটানো আইডিয়া, একটাকে দিয়ে অবিরল তারা আরেকটার তুলনা বোঝাচ্ছে, যাতে পৃথিবী তার সম্পূর্ণ সৌন্দর্যে বা কদর্যতায় ফুটে ওঠে। অন্যদিকে সিম্বলিস্টরা কী করেন? তাঁরা তাঁদের অ্যাবস্ট্রাক্ট আইডিয়ার জন্য খাড়া করেন আরেক বস্তুকে, যেমন তাঁরা ধরা যাক বলেন—এই যে এই একটা মোটা লম্বা দৈর্ঘ্য ধরে বৃত্তাকার এক লোহার রড দেখছ, বোঝো যে এটার আসল মানে কিন্তু পুরুষাঙ্গ। বোরহেস এসব এতই ভালো বুঝতেন যে তিনি যেমন অস্বীকার করেছেন শতাব্দী-প্রাচীন প্রতীক-রূপকে ভরা ন্যারেটিভ কনভেনশনের পথে চলতে, তেমনই খারিজ করেছেন পুরনো সব ন্যারেটিভ ডিভাইসের ব্যবহার, এমনকি প্রশ্ন তুলেছেন ট্র্যাজেডি ও কমেডির আলাদা ধারণা নিয়েও।

বোরহেসিয়ান লিরিসিজমও তাই জাতে আলাদা। সেখানে পৃথিবীর অরাজক অবস্থা দেখে ‘বুড়ো মানুষগুলো দীর্ঘকাল ধরে বসে থাকে ল্যাট্রিনে, তাদের হাতে মেটাল ডিস্ক ও নিষিদ্ধ লুডোর গুটির পাত্র, আর মুখে মিনমিনিয়ে তারা নকল করে যায় দৈবের বিশৃঙ্খলাকে।’ যে জায়গা থেকে এটা কোট করলাম, তার একটু পরেই বোরহেসের নায়ক আশা করছে যে, একজন হলেও, মানব ইতিহাসে মাত্র একজন হলেও পড়েছে ওই ‘মহাগ্রন্থ’ (যা নিজেই ঈশ্বর, নিজেই মহাবিশ্ব)। নায়ক নিজে ব্যর্থ হয়েছে এই মহাগ্রন্থটা—যে গ্রন্থে আছে এ পৃথিবীর সব ধাঁধা ও সব খামখেয়ালিপনার সমাধান—খুঁজে পেতে; কিন্তু তার আশা যে অন্তত একটা মানুষ হলেও পড়েছে ওই বই, জেনেছে এই পৃথিবী আসলে কী, জেনেছে এ নশ্বর জীবনে বাঁচার সত্যিকারের তাৎপর্য কিসে। নায়ক বলছে : ‘ওই মহাগ্রন্থ পড়ার সম্মান, জ্ঞান ও আনন্দ যদি আমার না-ও হয়, তো সেটা অন্য কারো হোক। বেহেশত বলে তবু কিছু থাকুক, আমি না হয় নরকেই গেলাম। আমাকে না হয় নির্যাতনই করা হলো, ভেঙেচুরে পেটানো হলো, গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো, তবু অন্তত একটাবারের জন্য একটা উদাহরণ তো থাকুক, অন্তত একটা মানুষ তো থাকুক যার মধ্য দিয়ে ওই প্রকাণ্ড লাইব্রেরি তার থাকার যৌক্তিকতা খুঁজে পাবে।’

এই নিঃসঙ্গ, অত্যাচারপ্রবণ, রক্তাক্ত ও মৃত্যুময় পৃথিবীর থাকার যৌক্তিকতা নিয়েই এখানে প্রশ্ন তুলেছেন বোরহেস। তিনি বারবারই বলছেন—এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বিশৃঙ্খল, হান্ডুলবান্ডুল, গোলমেলে, আর বিশৃঙ্খলতাই এর মূল নিয়ম। এখানে আছে পার্থিব বিশৃঙ্খলতা, যা মানুষের সৃষ্টি; আবার ঐশ্বরিক বা দেবের বিশৃঙ্খলতাও, যা আসলে খোদার না থাকার কথা বলে, কিংবা থাকলেও বলে তার নির্লিপ্ততার কথা। দৈবের তরফ থেকে এই গা-ছাড়া উদাসীনতার মধ্যেও বোরহেস দেখতে পান আরেক অরাজকতাকে। কত আশা করে থাকে মানুষ যে অন্তত খোদা এই অন্যায়-অবিচারে তালগোল পাকানো অবস্থার মধ্যে একটু বুঝি শৃঙ্খলা আনবেন। কিন্তু সেই শৃঙ্খলা আসে না—‘টলন্’ গল্পে টলন্ গ্রহ থেকে বরং বিভিন্ন আবর্জনা এসে পড়তে থাকে পৃথিবীর মাটিতে, আর মানুষ ওই টলন্ গ্রহের চাপে-তাপে-প্রভাবে পড়ে ভুলে যেতে থাকে তাদের যার যার দেশের ইতিহাস, চিকিৎসাবিদ্যা, প্রত্নতত্ত্ব, এমনকি মুখের ভাষাও। বোরহেস বলছেন : ‘টলনের সঙ্গে যোগাযোগের হেতু, টলন্ থেকে পাওয়া অভ্যাসের হেতু, পৃথিবী এবার খুলে খুলে আসছে।...পৃথিবীই টলন্ হয়ে যাবে।’

আমি স্তব্ধ হয়ে যাই এই বয়সে এসে আমার নতুন বোরহেস পাঠে এবং স্পষ্ট দেখতে পাই হোরহে লুইস বোরহেস ও আন্তন চেখভ, এই মানব-পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দুই ছোটগল্পকার, এ দুজনে আসলে কোনোই ফারাক নেই। আন্তন চেখভ গল্প থেকে গল্পে আঁকেন স্বল্প আয়ুর দুঃখ-শোক-হতাশাভরা এ জীবনে সব সময় নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের বেঁচে থাকার দুর্বহ বোঝা, দুঃশাসন ও আতঙ্ককে সহ্য করে যাওয়ার বিষয়টা; বোরহেসও তাই। চেখভের কাছে এ পৃথিবী বৈষম্য, দরিদ্রতা, নীচতা, অন্যায় ও প্রতারণার বাসভূমি এবং প্রকৃতি কেমন সুন্দর ও ভয়াল-ভয়ানক। আর বোরহেসে পৃথিবী, এই বলের মতো ছোট একটা গ্রহ, বিশৃঙ্খল ও হাস্যকর, কারণ এর মানুষ ও এর রাজাগুলো (এর ঈশ্বরসহ) সব খেয়ালি, তারা অলসতা ও সময়ের চক্করের কাছে আত্মসমর্পণকারী, কখনো কখনো তারা প্রচণ্ড নিষ্ঠুর, আর রক্ত-চাকু-তরবারি ও আয়না তাদের সব থেকে বেশি প্রিয়।

রাজু আলাউদ্দিনের অনুবাদ করা বার্গাস যোসার বোরহেস বিষয়ক সাক্ষাৎকারটিতে দেখা যায় বারগাস যোসা বলছেন : ‘বোরহেসের কোনো বৈধ অনুকরণকারী নেই, যেমন আছে ফকনার বা জয়েসের।...ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের এবং ভিন্ন ভিন্ন ভাষার অনেক লেখক তাঁকে অনুকরণের চেষ্টা করেছেন। মৌলিকতার দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিবর্তে বোরহেস তাঁদের অনুকরণকারীতে রূপান্তর করেছেন।’ এটাও বোরহেসের অনন্যতা।

আমি বিশ্বাস করি, আপনি তলস্তয়, হেমিংওয়ে, ক্যাথারিন ম্যানসফিল্ড, ডোনাল্ড বার্থেলমে, তানিজাকি জুনিচিরো কিংবা অ্যালিস মানরোর মতো লিখতে পারবেন; কিন্তু কোনোভাবেই আপনি চেখভ, কাফকা ও বোরহেসের মতো করে পারবেন না। পৃথিবীর সব বড় শিল্পীই, আগেই বলেছি, আসলে পৃথিবীর নৈরাজ্য ও অরাজকতার ছবিই দুর্দান্ত সৃষ্টিশীলতা দিয়ে যাঁর যাঁর মতো করে আঁকেন। আমরা মডার্নিজমের চশমা পরে ওটাকেই বলি ‘মানবতার ছবি’ আর পোস্ট-মডার্নিস্ট চশমা পরে মোটামুটি একই জিনিসকে ডাকি ‘মেটাফিজিক্যাল’ বা ‘ভ্যালু-ফ্রি’ টেক্সট নামে। এগুলো কোনো বিষয় নয়। কারণ এগুলো ধরন-স্টাইল-প্রকরণের কথা। মূল বিষয়, আপনি পৃথিবীকে তার নিজস্ব ট্রেডমার্ক রূপে ধরতে পারলেন কি না, তার মোহ ও ধোঁকার কুয়াশা পেরিয়ে, তাকে হাট করে নগ্ন করে দেখিয়ে, পাঠকের সামনে সত্যের ঝলককে এক মুহূর্তের জন্য হাজির করাতে আপনি সক্ষম হলেন কি না। বোরহেস সক্ষম হয়েছেন—একদমই নিজস্ব এক পথে, একদম নতুন এক ভাষায়, একদম নতুন এক প্রকরণে।

আমার হিসেবে বোরহেসের লেখা সাত সেরা গল্পের একটা তাঁর ‘ব্লু টাইগারস’। ‘টলন্’, ‘লাইব্রেরি অব ব্যাবেল’, ‘আলেফ’, ‘কংগ্রেস’, ‘দি জহির’ এবং ‘দি ওয়েট’-এর পাশাপাশি আমার প্রথম সাত বোরহেসে আছে এই গল্প। এতে বিদেশি এক লোক ভারতের পাহাড়ি এক এলাকায় আসে বাঘ দেখার নেশায় (উফফ্, বোরহেস ও তাঁর বাঘ!)। ওই লোক শুনেছে, ওখানে নীল রঙের বাঘের দেখা পাওয়া গেছে। লোকটা নীল বাঘ খুঁজে পেল না; কিন্তু একদিন পাহাড়ের পথে সে পড়ে থাকতে দেখল নীল ছোট ছোট কিছু গুটি (ডিস্ক) বা পাথর। আশ্চর্য এই পাথরগুলো নিজেরাই সংখ্যায় বাড়ে, নিজেরাই কমে। তার পকেটে রাখা মাত্র কয়টা পাথর, কিন্তু—‘আমি সবচেয়ে বেশিসংখ্যক পাথর গুনলাম ৪১৯; আর সবচেয়ে কম, তিন।’ সে এবার বুঝতে চায় যে হচ্ছেটা কী? টেবিলে রাখলেও ওরা বাড়ছে কমছে, পকেটে রাখলেও বাড়ছে বা কমছে। সে বলে ‘ওদের এই কম-বেশির নাচনের মধ্যে কোনো শৃঙ্খলা, কোনো গোপন ডিজাইন আছে কি না তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা আমার নিষ্ফল হলো। আমি ভয় পেতে লাগলাম যে ওরা অন্য সব কিছুকে সংক্রামিত করে ফেলবে, বিশেষ করে ওদের নিয়ে নড়াচড়ায় উন্মুখ আমার আঙুলগুলোকে।’ তারপর দেখা গেল অঙ্কের চার বিষয়ের—যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ—কিছুই মানছে না পাথরগুলো। ‘চল্লিশটা পাথর ভাগ করে হলো নয়; ওই নয় আবার ভাগ করলাম তো দেখা গেল হচ্ছে তিনশ।’ এবার সে : ‘আমার স্বপ্ন শীঘ্রই রূপ নিল সন্ত্রাসে...আমার ব্যক্তিগত হ্যালুসিনেশনের রোগ ধরেছে এটা জানাটা কত ভালো হতো এই সত্য জানার থেকে যে, আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বিশৃঙ্খলতাকে সহ্য করতে পারে।...আমি ভয় পেতে লাগলাম বিষের কিংবা আমার পিঠে কোনো চাকু বসে যাওয়ার।’ গ্রামবাসী এই পবিত্র ও আতঙ্ক-জাগানো পাথরের পাল্লায় পড়া (ধর্মের সিম্বল কি এই পাথর?) বিদেশিকে মেরে ফেলবে, আমাদের সেই বোরহেসিয়ান-ভীতি যতটা না বোরহেসিয়ান তার থেকে বেশি এমন বাস্তব যে—তো এই হচ্ছে পৃথিবী, যে পৃথিবী নিয়ম-কানুন, আইন-প্রশাসনহীন এক সার্কাস, যেখানে অনিয়ন্ত্রিত ও অবিন্যস্ত বিভ্রান্তির এক ৭০ বছরের আয়ু আমাদের জন্য বেখেয়ালে বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র। আজও ‘ব্লু টাইগারস’ পড়ে রাত তিনটায় আমার চিৎকার করে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে আনন্দ-দুঃখ-উত্তেজনায়—পৃথিবীর এই বেহাল অবস্থার কথা, এই কুশাসনের কথা, এই স্বৈরাচারী উত্পীড়নের কথা বোরহেস এভাবে অবলীলায় চোখের একটা পলক না ফেলেও এক নতুন ভাষায় এবং সব সময়েই ছোট কোনো এক জায়গার মধ্যে পুরো মহাবিশ্বকে টেনে এনে কী সুন্দর বলে যেতে পেরেছেন, আর আমি কি না সাহিত্যের পেছনে ৩০-৩৫ বছরের প্রতিটা মুহূর্ত ঢেলে দেওয়ার পরেও তা পারছি না, সে কথা ভেবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা