kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

ধন্য সেই পুরুষ

শামসুর রাহমান

১৪ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ২ মিনিটে



ধন্য সেই পুরুষ, নদীর সাঁতার পানি থেকে যে উঠে আসে

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে;

ধন্য সেই পুরুষ, নীল পাহাড়ের চূড়া থেকে যে নেমে আসে

প্রজাপতিময় সবুজ গালিচার মতো উপত্যকায়;

ধন্য সেই পুরুষ, হৈমন্তিক বিল থেকে যে উঠে আসে

রঙ বেরঙের পাখি ওড়াতে ওড়াতে।

ধন্য সেই পুরুষ, কাহাতের পর মই-দেয়া ক্ষেত থেকে যে ছুটে আসে

ফসলের স্বপ্ন দেখতে দেখতে।

 

ধন্য আমরা, দেখতে পাই দূর দিগন্ত থেকে এখনো তুমি আসো,

আর তোমারই প্রতীক্ষায়

ব্যাকুল আমাদের প্রাণ, যেন গ্রীষ্মকাতর হরিণ

জলধারার জন্যে। তোমার বুক ফুঁড়ে অহংকারের মতো

ফুটে আছে রক্তজবা, আর

আমরা সেই পুষ্পের দিকে চেয়ে থাকি, আমাদের

চোখের পলক পড়তে চায় না,

অপরাধে নত হয়ে আসে আমাদের দুঃস্বপ্নময় মাথা।

 

দেখ, একে একে সকলেই যাচ্ছে বিপথে অধঃপাত

মোহিনী নর্তকীর মতো

জুড়ে দিয়েছে বিবেক-ভোলানো নাচ মনীষার মিনারে,

বিশ্বস্ততা চোরা গর্ত খুঁড়ছে সুহৃদের জন্যে

সত্য খান খান হয়ে যাচ্ছে যখন তখন

কুমোরের ভাঙা পাত্রের মতো,

চাটুকারদের ঠোঁটে অষ্টপ্রহর ছোটে কথার তুবড়ি,

দেখ, যে কোন ফলের গাছ

সময়ে-অসময়ে ভরে উঠেছে শুধু মাকাল ফলে।

ঝলসে-যাওয়া ঘাসের মতো শুকিয়ে যাচ্ছে মমতা

দেখ, এখানে আজ

কাক আর কোকিলের মধ্যে কোনো ভেদ নেই। নানা ছল-ছুতোয়

স্বৈরাচারের মাথায় মুকুট পরাচ্ছে ফেরেববাজের দল।

 

দেখ, প্রত্যেকটি মানুষের মাথা

তোমার হাঁটুর চেয়ে এক তিল উঁচুতে উঠতে পারছে না কিছুতেই।

তোমাকে হারিয়ে

আমরা সন্ধ্যায় হারিয়ে যাওয়া ছায়ারই মতো হয়ে যাচ্ছিলাম,

আমাদের দিনগুলি ঢেকে যাচ্ছিলো শোকের পোশাকে,

তোমার বিচ্ছেদের সংকটের দিনে

আমরা নিজেদের ধ্বংসস্তূপে ব’সে বিলাপে ক্রন্দনে আকাশকে ব্যথিত

করে তুলেছিলাম ক্রমাগত; তুমি সেই বিলাপকে

রূপান্তরিত করেছো জীবনের স্তুতিগানে, কেননা জেনেছি

জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত তুমি।

 

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর রৌদ্র ঝরে চিরকাল, গান হয়ে

নেমে আসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা; যাঁর নামের ওপর

কখনো ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া,

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর পাখা মেলে দেয় জ্যোত্স্নার সারস,

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর পতাকার মতো

দুলতে থাকে স্বাধীনতা, ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর ঝরে

মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা