kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

বঙ্গবন্ধুর বিশ্বযাত্রা

সেলিনা হোসেন   

১৪ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর বিশ্বযাত্রা

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

উদযাপিত হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। বাঙালি, বাঙালিত্বের নির্যাস যুক্ত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর অমোঘ উচ্চারণ ‘ফাঁসির মঞ্চেও যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। জয় বাংলা।’ এই উচ্চারণের সঙ্গে তিনি বলিষ্ঠ নেতৃত্বে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় বাঙালিকে উজ্জীবিত করে বাঙালিত্বের গৌরবকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সময়ে তাঁর মৃত্যু বিশ্বজোড়া বাঙালির সামনে শুধু শোকের দিন নয়। গৌরব ও মর্যাদার জায়গা থেকে তিনি বাঙালির সামনে মৃত্যুহীন মানুষ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ম্যাগাজিন নিউজ উইকের প্রচ্ছদে ছাপা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি অসাধারণ উক্তি। তাঁকে poet of politics অভিধায় চিহ্নিত করা হয়েছিল। তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিকামী মানুষের অসাধারণ যোদ্ধা হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছিলেন।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—নিরলস এক রাষ্ট্রনায়ক’ প্রবন্ধে লিখেছেন : “আমার সৌভাগ্য যে, ১৯৭১ সালের ১৫ই জুন রাজ্যসভায় আমি প্রস্তাব করেছিলাম মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশের সরকারকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার। আমার বক্তব্য এখনো পড়া যাবে রাজ্যসভার কার্যবিবরণী থেকে। যখন এক সদস্য আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে, আমি বলেছিলাম : ‘আমার প্রস্তাব রাজনৈতিক সমাধানের। যার পূর্বশর্ত বাংলাদেশের সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। রাজনৈতিক সমাধানের জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সরকারকে সকল ধরনের সহায়তা করা।’ আমি সভাকে মনে করিয়ে দিই যে, এই ধরনের স্বীকৃতির অনেক উদাহরণ আছে বিশ্বের ইতিহাসে।...” গর্বিত বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কী কী করা দরকার তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভালোভাবেই জানতেন। তিনি কোনো সময় নষ্ট না করে সেই স্বপ্নপূরণের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।

ব্রিটিশ এনজিও অক্সফামের সাবেক কর্মকর্তা জুলিয়ান ফ্রান্সিস ‘মননে স্মরণে বঙ্গবন্ধু’ প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখেছেন : ‘১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমি অক্সফামের হয়ে দিল্লিতে কাজ করছিলাম। আমার মনে আছে, ওই দিন পরিবার নিয়ে টিভিতে আমরা ভারতের স্বাধীনতা দিবসের উৎসব উপভোগ করছিলাম। হঠাৎই টিভিতে এক জরুরি খবরে বলা হয়, শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। আমার মনে আছে, খবরটি শুনেই আমি শোকে কাতর হয়ে পড়ি, কান্নায় ভেঙে পড়ি। প্রায় ৪৫ বছর পর আজও সেই দিনটি মনে পড়লে আমি অজান্তেই আবেগপ্রবণ হয়ে যাই।’

চল্লিশের দশকে প্রখ্যাত লেখক এস ওয়াজেদ আলি তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘এখন বাঙালি কেবল ভারতবর্ষের নয়, কেবল প্রাচ্য ভূখণ্ডের নয়, সমগ্র বিশ্ববাসীর পথপ্রদর্শক হবে—সত্য, সুন্দর, শুভ জীবন-পথের।’ চল্লিশের দশক থেকে ষাটের দশক—মাত্র দুই দশক সময়ের ব্যবধানে এমন একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত হওয়ার সম্ভাবনা শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্ববাসী পথপ্রদর্শকের জায়গায় স্থান দিয়েছে। এই অবদান বঙ্গবন্ধুর বিশ্বযাত্রা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ‘ভাইয়েরা আমার’ প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখেছেন : ‘যে ভাষণ মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনে এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রেরণা ছিল, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বজ্রকণ্ঠের এ ভাষণ মানুষের মাঝে শক্তি জুগিয়েছিল, রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা দিয়েছিল, সে ভাষণ ছিল নিষিদ্ধ।’

১৯৭৫ সালের পর ২১ বছর সময় লেগেছে এই ভাষণ জনগণের সামনে সরকারিভাবে প্রচার করার জন্য। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর সরকারি গণমাধ্যমে এই ভাষণ প্রচার শুরু হয়।

আজ এই ভাষণ ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ বা বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। জাতিসংঘের ইউনেসকো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত করেছে।

বি এন আহুজা সম্পাদিত ‘দ্য ওয়ার্ল্ডস গ্রেট স্পিচেস’ শীর্ষক রেফারেন্স বইয়ে এই ভাষণ স্থান পেয়েছে। লেখক ও ইতিহাসবিদ জেকব এফ ফিল্ডের বিশ্বসেরা ভাষণ নিয়ে লেখা ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস : দ্য স্পিচেস দ্যাট ইনস্পায়ার্ড হিস্টোরি’ গ্রন্থেও স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ।

বিশ্বের বিখ্যাত যত ভাষণ বিশ্বনেতারা দিয়েছেন, সবই ছিল লিখিত, পূর্ব প্রস্তুতকৃত ভাষণ। আর ৭ই মার্চের ভাষণটি ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত, উপস্থিত বক্তৃতা। এই ভাষণ ছিল একজন নেতার দীর্ঘ সংগ্রামের অভিজ্ঞতা ও আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা। একটা যুদ্ধের প্রস্তুতি। যে-যুদ্ধ এনে দিয়েছে বিজয়। বিজয়ের রূপরেখা ছিল এ বক্তৃতায়, যা সাত কোটি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ছিল ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা।

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে বাঙালির আত্মমর্যাদার জায়গা খুলে দিয়েছিলেন বিশ্বের সামনে। জাতিসংঘের সরকারি ভাষা ছয়টি। ইংরেজি, ফরাসি, রুশ, চীনা, স্প্যানিশ ও আরবি। এই কটি ভাষা আলোচনার সময় অনুবাদকরা অনুবাদ করে বলতে থাকেন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য দেশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

নিউ ইয়র্কে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বজিত সাহা ২৫ সেপ্টেম্বরকে বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। তাঁর প্রস্তাবের আলোকে নিউ ইয়র্ক স্টেট সিনেটর স্টেভেস্কি এই দিনটিকে ‘বাংলাদেশ ইমিগ্র্যান্ট ডে’ হিসেবে রেজল্যুশন পাস করার জন্য সিনেটে উপস্থাপন করেন। ২০২০ সালের ১৪ জানুয়ারি এই প্রস্তাব পাস হয়।রেজল্যুশনের শেষ ধারাটি ছিল এমন : Resolved, That this Legislative Body pause in its deliberations to memorialize Governor Andrew M. Cuomo to proclaim September 25, 2020, as Bangladeshi Immigrant Day in the State of New York, and to recognize the many contributions of Bangladeshi-Americans  to  New  York;  and  be it further. Resolved, That copies of  this Resolution, suitably engrossed, be transmitted to Andrew M. Cuomo, Governor of the State of New  York; and Bishawjit Saha, CEO and Founder of the Muktadhara Foundation.

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১৭ মার্চকে আন্তর্জাতিক বঙ্গবন্ধু দিবস হিসেবে গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত স্মারক সিলমোহর প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ডাক বিভাগ ইউএসপিএস। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের আবেদনে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চ মঙ্গলবার সকাল ১১টায় নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস পোস্ট অফিসে এই স্মারক ডাকচিহ্ন আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করেন পোস্ট অফিসের সুপারভাইজার স্যালাজার ফাতিমা।

২০১৯ সালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা বঙ্গবন্ধুকে ফ্রেন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড বা বিশ্ববন্ধু হিসেবে অভিষিক্ত করেন। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট একটি দেশের একজন রাজনৈতিক নেতার এই অর্জন বাঙালি জাতির গৌরবময় অর্জন।

২০১৬ সালে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের আবেদনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের পোস্ট অফিস স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। ২০২০ সালের ১০ মার্চ স্টেট সিনেটর জন ল্যুর প্রস্তাবনায় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে নিউ ইয়র্ক স্টেট বিশেষ রেজল্যুশন পাস করে।

মুক্তধারা ফাউন্ডেশন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভার্চুয়াল বইমেলার আয়োজন করে। ১৮ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ পর্যন্ত এই মেলা চলবে।

স্মরণের বরণমালায় বঙ্গবন্ধুকে সুশোভিত রাখা বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এ জায়গা থেকে বিযুক্ত থেকে আমরা যেন নিজেদের ক্ষুদ্র করে না ফেলি। বিশ্বের মানুষ যেভাবে বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন করেছেন সে বিশ্বযাত্রা থেকে বঙ্গবন্ধুকে পিছু টানা জাতি হিসেবে আমাদের ব্যর্থতার পরিচায়ক।

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছেন : ‘শেখ মুজিবের মৃত্যুর খবর আমাকে অত্যন্ত মর্মাহত করেছে। তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তাঁর অসামান্য বীরত্ব সম্পূর্ণ এশিয়া ও আফ্রিকার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।’ কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি। কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় উনি হিমালয়তুল্য।’

ফিলিস্তিনের সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াসির আরাফাত বলেছেন : ‘মুজিবের বিশিষ্টতা ছিল তাঁর অদম্য লড়াকু নেতৃত্ব ও উদার মন।’ বিশ্বের অনেক নেতা বঙ্গবন্ধুকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মূল্যায়ন করেছেন।

কবি কামাল চৌধুরী তাঁর ‘বঙ্গবন্ধু : চিরন্তন আলোকশিখা’ প্রবন্ধে বলেছেন : ‘জীবনকালে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মহানায়ক ও বিশ্বনেতা হিসেবে পরমভাবে আদৃত ছিলেন। বিশ্ব মিডিয়ায় তিনি ছিলেন রাজনীতির কবি ও সিংহহৃদয় নেতা। তাঁকে তুলনা করা হয়েছে সাইমন বলিভার আর জর্জ ওয়াশিংটন প্রমুখের সঙ্গে, বিসুভিয়াস ও হিমালয়ের সঙ্গে; পদ্মা-মেঘনা, যমুনার জলপ্রবাহের সঙ্গে। মৃত্যুতে তাঁকে তুলনা করা হয়েছে আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী প্রমুখের সঙ্গে। মাত্র ৫৫ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে তিনি জনমানসে রূপকথার মহানায়কের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। মৃত্যুতে পরিণত হয়েছেন চিরকালীন শোকের প্রতীকে। বস্তুত পৃথিবীর ইতিহাসে তিনি যুগপৎ বিজয়ী বীর ও ট্র্যাজেডির মহানায়ক।’

বিশ্বজুড়ে যাঁকে এত গভীর শ্রদ্ধায় মূল্যায়ন করা হয় তাঁকে নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল ছিনিমিনি খেলবে না। এই প্রত্যাশা দেশবাসীর। ক্ষমতায় যে রাজনৈতিক দল থাকুক বঙ্গবন্ধুকে মর্যাদার আসনে রেখে নিজেদের আত্মসম্মান ঠিক রাখবেন—এটাই প্রত্যাশা।

গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে বরণ করি তাঁর একশতম জন্মবার্ষিকী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা