kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

লেখকের সম্পর্ক

বাবাকে যেমন দেখেছেন টনি মরিসন

দুলাল আল মনসুর

৭ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাবাকে যেমন দেখেছেন টনি মরিসন

এক বছর পার হয়ে গেল টনি মরিসনের মৃত্যুর। আমেরিকার কথাসাহিত্যিক টনি মরিসন ছোটগল্প, নাটক, শিশুসাহিত্য, সাহিত্য সমালোচনা এবং সর্বোপরি উপন্যাস লিখেছেন। মরিসন প্রধানত আফ্রিকান-আমেরিকানদের জীবনের চিত্র এঁকেছেন তাঁর উপন্যাসগুলোতে। তাদের সংস্কৃতি, তাদের ঐতিহ্য, সর্বোপরি তাদের অতীত ও বর্তমানের সম্পর্কের কথা বলেন তিনি। কৃষ্ণাঙ্গদের জীবন সম্পর্কে তাঁর লেখা পুরোপুরিই অনন্য। চিরাচরিত পদ্ধতি তিনি পরিহার করেছেন সচেতনে। মরিসনের অনন্য বর্ণনাভঙ্গির কারণে উপন্যাসের নিরপেক্ষ সর্বশেষ মূল্যায়ন অনেকটাই পাঠকের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। কাহিনির গণ্ডি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেন লেখক। কখনো কখনো সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী আংশিক বয়ানের দায়িত্ব নিলেও বেশির ভাগ আখ্যান তুলে ধরা হয় বিভিন্ন চরিত্রের বর্ণনায়। এভাবে তিনি বহুস্বরের সংমিশ্রণ ঘটান তাঁর উপন্যাসে। নারী, পুরুষ, শিশু—সব রকমের চরিত্রের নিজস্ব বয়ান সরাসরি হাজির করেন তিনি। তাঁর বর্ণনাভঙ্গি স্পষ্টভাবেই উইলিয়াম ফকনারের বর্ণনাকৌশল দ্বারা প্রভাবিত। তার পরও তাঁর নিজস্বতার জন্যই তিনি অনন্য। তাঁর এগারোটি উপন্যাসের প্রতিটিই মনে হয় একেকটা মাস্টারপিস।

ছোটবেলা থেকে মা-বাবার মুখে শোনেন আফ্রিকান-আমেরিকান লোককাহিনি, ভূতের গল্প। তাঁর উপন্যাসগুলোতে সর্বোপরি সমাজের কথা থাকলেও সে সমাজে পরিবারের নিজস্ব একটা পরিচিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিবারের বিভিন্ন স্তরের মানুষের প্রাণবন্ত ও অনন্য উপস্থিতি জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ফলে উপন্যাসের কাহিনি ও চরিত্ররা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য অবস্থায় হাজির হয়। গল্পকথা, গান, লোককাহিনি যেমন তাঁর লেখক-মানস তৈরি করেছে, বাস্তব জীবনের কিছু ঘটনা ও ব্যক্তির উপস্থিতি তাঁর লেখার শক্তি দিয়েছে। পরিবারের সদস্যরাও এদের অন্যতম। পরিবারের শিশু, মা-বাবা—এরা তাঁর উপন্যাসের মধ্যে বিচরণ করে নিজস্ব পরিচয়ের মধ্যে। তবে এদের কারো শিকড় বাস্তবের অতীতে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতোই বাবা চরিত্র খুব প্রাণবন্ত হয়ে এসেছে তাঁর অনেক উপন্যাসে। কোনো কোনো বাবা চরিত্রের মধ্যে তাঁর নিজের বাবার ছায়া স্পষ্ট দেখা যায়।

মরিসনের বাবা জর্জ উফর্ড বেড়ে ওঠেন জর্জিয়ার ক্যাটার্সভিলে। সেখানে পনেরো বছর বয়সে তিনি এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। একদল শ্বেতাঙ্গ দুজন কৃষ্ণাঙ্গকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরে ফেলে। নিহত দুজন ছিলেন জর্জ উফর্ডের পরিচিত, প্রতিবেশী। তাঁরা খুব অস্বাভাবিক জীবনযাপনও করতেন না। দুজনই ছিলেন ব্যবসায়ী। মরিসনের বাবা কিছুদিন পরই জর্জিয়া ছেড়ে ওহাইওতে চলে আসেন। তখন ওহাইওতে জর্জিয়ার মতো বর্ণবাদের তীব্রতা ছিল না। মূলত শান্ত পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের খোঁজে তিনি ওহাইওতে আসেন। সেখানকার ইউএস স্টিলে কাজ করার সময় পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটামুটি চলার মতো রাখতে অতিরিক্ত কাজকর্মও করেন তিনি। মরিসন সে পরিবেশে বড় হওয়ার স্মৃতি উল্লেখ করে বলেন, ওহাইওতে তাঁরা শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গেই বড় হন। নিজের পরিবারের অবস্থাও যেহেতু একই রকম ছিল, তাদের অনেকেই অন্য এলাকা থেকে আসেন। সবার মধ্যে মোটামুটি প্রীতির সম্পর্ক ছিল। যত দিন ওহাইওতে ছিলেন তিনি বর্ণবাদের চরম অবস্থা সরাসরি দেখেননি।

তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’তে ম্যাকটিয়ার পরিবারের কর্তা মি. ম্যাকটিয়ার। তার প্রধান পরিচয় একজন বাবার পরিচয়। তার সন্তানদের প্রতি, পরিবারের প্রতি খুব নিবেদিত সে, সন্তানদের বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখে, বিপদে-আপদে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে। তার বাড়ির ভাড়াটিয়া হেনরি ওয়াশিংটন একদিন তার মেয়ে ফ্রিডার বুকে হাত দিয়ে ফেলে। ঘটনা জানার পর মি. ম্যাকটিয়ার হেনরিকে বেদম পিটুনি দিয়ে তাড়িয়ে দেয়।

ছোটবেলার একটি স্মৃতি অনেক দিন স্পষ্ট মনে ছিল মরিসনের। তাঁর বাবা এক শ্বেতাঙ্গকে তাঁদের বাসার সিঁড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন বাইরে। মরিসন মনে করেন, হয়তো তাঁর বাবার জর্জিয়ার অভিজ্ঞতার কারণে মনের ভেতর এক ধরনের আশঙ্কা কাজ করত। সিঁড়ি বেয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে উঠে আসা কোনো শ্বেতাঙ্গ নিশ্চয়ই ভালো কোনো উদ্দেশ্যে আসতে পারে না। সেই আশঙ্কা থেকেই লোকটাকে তিনি তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাবার আশঙ্কার মধ্যে সত্য না-ও থাকতে পারে। তবে সে সময় তিনি বাবার কারণে বেশ নিরাপদ বোধ করেছিলেন। বাবার প্রসঙ্গ এলে মায়ের কথাও চলে আসে। তাঁর মা অবশ্য আরেকটু ভিন্ন মেজাজের ছিলেন। মায়ের কাছে কোনো মানুষের গায়ের রং, জাতপরিচয়, ধর্ম—এগুলোর কোনো মূল্য ছিল না। তিনি ব্যক্তিকে মূল্যায়ন করতেন তার নিজের গুণ দেখে। এসব পরিচয় দেখে কাউকে মূল্যায়ন করতেন না। তিনি কাউকে পছন্দ কিংবা অপছন্দ করে থাকলে সেটা শুধু ওই ব্যক্তির কাজকর্মের ওপর ভিত্তি করেই করতেন।

মরিসনের বাবা আসলে মোটেই মারকুটে স্বভাবের ছিলেন না। তিনি কখনো তাঁর সন্তানদের বকা দেননি—গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা। কখনো জোর করে নিজের মতামত তাদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেননি। তিনি খুব শান্ত স্বভাবের ছিলেন। পরিবারের প্রতি পুরোপুরি নিবেদিত ছিলেন। সুতরাং তিনি শুধু তাঁর সন্তানদের কথা ভেবেই লোকটাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা