kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

সায়াহ্ন

শরীফ আতিক-উজ-জামান

৭ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



সায়াহ্ন

‘শেষমেশ তোমাকে এই সিদ্ধান্তই নিতে হলো, বড়দা?’ পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে চোখ মেলে তাকায় আসিফ। ইজিচেয়ারে শুয়ে বই পড়তে পড়তে কখন যেন একটু তন্দ্রাভাব এসেছিল। এমনিতে সারা দিনে তার তেমন কোনো কাজ নেই, আর বিকেলের দিকে এখানকার বারান্দাটা খুব নির্জন থাকায় ইজিচেয়ারে বসে বই বা পত্রপত্রিকা কিছু একটা পড়তে থাকে। এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলা চলে। সন্ধ্যার দিকে মশার উৎপাত বাড়লে সে নিজের ঘরে ঢুকে যায়। আজ বিকেলে বসে সে ফরাসি ঔপন্যাসিক আলবেয়ার ক্যামুর ‘খ’ঊঃত্ধহমবৎ’-এর ইংরেজি অনুবাদ ‘দি আউটসাইডার’ পড়ছিল। চোখ মেলে ছোট ভাই আবিদকে দেখে একটু অবাকই হয়, কারণ সে যে এখানে এসেছে তা তার ভাই-বোনদের জানায়নি। অযথা একটা হৈচৈ এড়াতেই সে এমনটা করেছে। আর জানালেই বা কী হতো? সিদ্ধান্তটা তার একারই। কেউ বাধা দিলে কিছু হতো না, আর দিতও না। ছেলেকে সে নিষেধ করে এসেছিল কাউকে যেন না জানায়। তবে মনে হচ্ছে সে কথা রাখেনি। আজকাল কে-ই বা কথা রাখে। 

ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে সরাসরি এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না আসিফ। বুকের ওপর থেকে খোলা বইটা নিয়ে ভাঁজ করে, চেয়ারের গায়ে হেলান দিয়ে রাখা লাঠিটা নিয়ে তাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় আসিফ। বলে,

—‘চল ভেতরে গিয়ে বসি।’

দুজনে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। সাকল্যে ১০ ফুট বাই ১২ ফুটের ঘর। একটা খাট, একটা টেবিল, একখানা চেয়ার, জামা-কাপড় রাখার জন্য একটা আলনা, আর ছোট্ট একটা র‌্যাক—এইটুকু জায়গার মধ্যেই গাদাগাদি করে বসানো। নিজে বিছানায় বসে আসিফকে চেয়ারটা দেখিয়ে দিয়ে বলে,

—‘বোস।’

আবিদ একটু ইতস্তত করে, কিন্তু আসিফ হাত উঁচু করে বসার ইঙ্গিত করায় সে ধীরে ধীরে বসে পড়ে।

‘কিন্তু তুমি এখানে কেন এলে? সৌরভ কী করে তোমাকে আসতে দিল!’ একটু অসহিষ্ণু শোনায় তার কণ্ঠ। ভাইকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে আসিফ বলে,

—‘শোন, আমাকে কেউ এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেনি। সৌরভের এখানে কোনো ভূমিকাই নেই। ওর দোষ খুঁজতে যাস না। সব ভেবেচিন্তে আমি নিজেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতে সবারই ভালো হয়েছে বলে আমি মনে করি।’

—‘কিন্তু কেন? ছেলে, ছেলের বউ আর নাতির সাথে থাকতে তোমার কি অসুবিধা হচ্ছিল?’

—‘আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না, কিন্তু ওদের হচ্ছিল।’

—‘এইতো, যা ভেবেছি। নিশ্চয় ওরা তোমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। তোমাকে বাধ্য করেছে ঘর ছাড়তে।’ আবিদের গলা চড়তে থাকে। তাকে থামিয়ে দিয়ে আসিফ শান্ত কণ্ঠে বলে,

—‘তুই যা ভাবছিস তা নয়। আমারই মনে হলো, আমি ও বাড়িতে না থাকলে সবারই সুবিধা।’

—‘কিসের সুবিধা? তোমার বাড়িতে তুমি থাকবে, তাতে অন্যের সমস্যাটা কী? ভাবি নেই আজ তিন বছর হলো, তুমিসহ ওই বাড়িতে মোট চারজন প্রাণী। একসঙ্গে থাকা গেল না!’

—‘থাকতে চাইলে থাকতে পারতাম। কিন্তু আবিদ, জীবনের একটা ছন্দ আছে, বুঝলি। এই যে চারপাশের প্রকৃতি দেখেছিস, এগুলোর বেড়ে ওঠা, নড়াচড়া—সব কিছুর মধ্যেই একটা সুর-তাল-লয়-ছন্দ আছে, আমরা শুনতে পাই না। ঠিক তেমনি মানুষের সম্পর্কগুলোর মধ্যেও একটা সুর-তাল-লয় আছে, শোনা যায় না, কিন্তু কেটে গেলে বোঝা যায়। আমরা সেটাকে উপেক্ষা করেই জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে যাই, কোনো উপায় থাকে না বলে। আমি একটু সাহস করে উপায়টা খুঁজে নিলাম।’

—‘ওরা কি তোমার খেয়াল রাখছিল না? একসময় তুমি কি ওদের খেয়াল রাখোনি? কত যত্ন করে ছেলেকে বড় করলে!’

এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে আসিফ বলে,

—‘শোন, সন্তান জন্ম দিলে তাকে জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, না হলে সে ব্যর্থতার দায়ও পিতার কাঁধে পড়ে। কিন্তু পিতাকে সন্তানের প্রতিষ্ঠা করতে হয় না, টানতে হয়। একটা দায়িত্ব, আরেকটা বোঝা। বোঝা টানা কি সহজ কথা! আমরা চার ভাই-বোনে আমাদের মা-বাবাকে কতটুকু ভালো রাখতে পেরেছিলাম বল? খুব আস্থা নিয়ে বলতে পারবি, আমাদের দায়িত্ব পালনে কোনো ফাঁক ছিল না! আর সৌরভ তো একা।’

—‘বড়দা, আমি তোমাকে ঠিক বুঝি না। তবে ছোটবেলা থেকেই দেখছি তুমি অন্যদের থেকে যথেষ্ট আলাদা। তোমার ভাবনা, রুচি, দায়িত্ববোধ—সব কিছু অন্যদের থেকে ভিন্ন। সব সময় নিজের ওপর দায় নিয়ে নাও। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে দেখেছি তোমার ওপর সুযোগ নিতে। কেউ কেউ তো তোমাকে ঠকালো পর্যন্ত! বাবাও কি তোমার ওপর খুব সুবিচার করেছিলেন? তার কারণেই কি তুমি বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওনি? বিয়ের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও যখন তোমাদের কোনো সন্তান হচ্ছিল না তখন তোমার ওপর চাপ বাড়ছিল ভাবিকে তালাক দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য, কিন্তু তুমি শোনোনি। ফলে তোমাকে বাড়ি ছাড়তে হলো, তুমি হাল ছাড়লে না। ভাবিকে নিয়ে ছুটলে দেশ-বিদেশের ডাক্তারের কাছে, প্রায় ১০ বছরের মাথায় সৌরভ এলো। সবাই খুব খুশি। এমন ভাব করতে লাগল যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু তোমার এই এক দশকের যন্ত্রণা কে বুঝেছিল বলতে পারো?’

—‘আবিদ, কারো কারো জীবনের লড়াইটা একেবারেই তার একার। সেখানে কোনো সহযোদ্ধা থাকে না। দেখ, আমার জীবনের লড়াইটা আমি একাই লড়ে গেছি। কাউকে সঙ্গে পাইনি। হয়তো এমনই হয়। আজ এখানে চলে এসেছি, বলতে পারিস সেটাও সেই লড়াইয়েরই একটা অংশ, হয়তো শেষাংশ।’

—‘কিন্তু ওরা তোমাকে আসতে দিল?’

—‘না, দিতে চায়নি। আমি জোর করে এসেছি। সে কথা তো তোকে বললাম। আচ্ছা বল তো, একটা অসুস্থ মানুষের দায়িত্ব সার্বক্ষণিক কি কেউ বইতে পারে? সৌরভ একা কত সামলাবে? সকালে ছেলেকে স্কুলে দিয়ে অফিসে যায়, দুপুরে ওর মা গিয়ে তাকে নিয়ে আসে, আবার খাইয়েদাইয়ে কোচিং সেন্টারে পাঠায়, সৌরভ ফেরার সময় তাকে নিয়ে আসে। তারপর সন্ধ্যায় তাকে নিয়ে পড়তে বসা, বউমার রান্নাবাড়া কত কাজ! এর মাঝে আমার খেয়াল রাখাটা বাড়তি চাপ নয়? সপ্তাহে ডায়াবেটিস টেস্টের জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, ডাক্তার দেখানো, মাসে একবার পেনশন তুলতে যাওয়া—এসব কাজের জন্য ওর ওপরই আমাকে নির্ভর করতে হয়।’

—‘কিন্তু উপায় কী? বাবার জন্য এগুলো করবে না?’

—‘করবে না তা-ও কখনো বলেনি। ও-ই তো করে। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হলো, ওর খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার কারণে ওরা কোথাও বেড়াতে যেতে পারে না। আবার রেখেও যেমন যাওয়া যায় না, সাথে নিয়ে যাওয়াও সমস্যা। কিন্তু ওদের তো বেড়াতে ইচ্ছে করে।’

—‘বেড়াতে তুমিও খুব পছন্দ করো, বড়দা। ঈদ বোনাসের টাকা বাঁচিয়ে সবাইকে নিয়ে বেড়াতে যেতে। আমরা কত আনন্দ করেছি। কিন্তু তোমাকে কেউ নিয়ে গেছে বলে শুনিনি।’

এ কথার তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর দেয় না আসিফ। দরজা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়। অন্ধকার নেমে এসেছে চারপাশে। অন্ধকারের মধ্যে কি বিষণ্নতা মেশানো থাকে? কোনো দুঃখ? বেদনার রং কি কালো? তার কি কোনো ঘ্রাণ থাকে? বেশ কিছুক্ষণ পর একটা ভারী শ্বাস ফেলে সে বলে,

—‘বুঝলি আবিদ, বাঙালির জীবনে যত বিপর্যয় ঘটে গেছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হলো একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়া। ভেবে দেখ, আমরা যদি একসঙ্গে থাকতে পারতাম তাহলে যে সমস্যাগুলো আজ খুব বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে সেগুলোকে কোনো সমস্যাই মনে হতো না।’

—‘একসঙ্গে থাকার সমস্যাও তো কম নয় বড়দা। খরচখরচা কে বেশি দিল, কে কার চেয়ে বেশি কাজ করল তা নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকে। তার চেয়ে...’ মিনমিন করে বলে আবিদ। আসিফ তাকাতেই থেমে যায় সে। সেই চাহনিতে কী আছে সে ব্যাখ্যা করতে পারবে না; তা কি বেদনা, অসহায়ত্ব, কৌতুক নাকি ক্রোধ। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আসিফ বলে,

—‘অনেক হাঁড়ি-পাতিল একসঙ্গে থাকলে একটু ঠোকাঠুকি হয়ই, তাতে খুব বড় ধরনের ক্ষতি হয় না। যেদিন থেকে মানুষ টাকার পেছনে ছুটতে শুরু করেছে সেদিন থেকেই সে ভীষণ স্বার্থপর হয়ে উঠেছে। একাকী সুখী হতে চাইছে। আর একাকী সুখী হতে গেলে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়। আধুনিক মানুষের সব থেকে বড় ট্র্যাজেডি হলো বিচ্ছিন্নতা। গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে গলা ফাটাই আমরা, গণতন্ত্র আর পুঁজিতন্ত্র একসঙ্গে চলে, আর পুঁজিতন্ত্র মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। মানবিক অনুভূতিগুলো ধ্বংস করে দেয়।’

—‘তাই বলে কি সবাই নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে বৃদ্ধাশ্রমে চলে আসে? নিজের কষ্ট-ঘামে গড়ে তোলা ঘরবাড়ি অন্যের ভোগে ছেড়ে দিয়ে একা নিঃসঙ্গ জীবন কাটায়? তোমাকে ফিরে যেতে হবে বড়দা। আমি মেজদার সঙ্গে কথা বলেছি।’

—‘না, না, ওকে শুধু শুধু ফোন দিচ্ছিস কেন? ও অনেক ব্যস্ত মানুষ। ওর কথা বলার সময় কোথায়? ভোরে ঘুম থেকে উঠে অপারেশন থিয়েটারে ঢোকে। সেটা সেরেই ছোটে মেডিক্যাল কলেজে, দুপুরে ফিরে জরুরি অপারেশন, বিকেল পাঁচটা থেকে দশটা পর্যন্ত চলে রোগী দেখা, এরপর আবার অপারেশন, যদি থাকে। রাত একটা-দুইটায় ঘুমাতে গিয়ে ভোর সাড়ে পাঁচটা-ছয়টায় ওঠা। কত টাকা মাসে কামাই করে তোর কোনো ধারণা আছে? বাড়িতে দুটি বেশি পয়সা পাঠাত না। সে বেলায় হিসাবটা সমান সমান। তোকে আর আমাকে ইঙ্গিত করে বলত ওরা যা দেয় আমিও তা-ই দেব। তবে ওর টাকার দরকার।’

—‘বড়দা, মেজদার ফোন। ভাইব্রেশন মুডে থাকা ফোনটা তার হাতে তুলে দিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোনটা তার হাত থেকে নিয়ে কানে লাগিয়ে আসিফ বলে,

‘হ্যালো আরিফ, কেমন আছিস তুই? তোর স্ত্রী, ছেলে-মেয়েরা ভালো আছে?’

ওপাশ থেকে কী উত্তর দেয় তা একমাত্র আসিফই শুনতে পায়। ফোনটা কানে লাগিয়ে কয়েক মিনিট আরিফের কথা শোনে। তারপর বেশ ঠাণ্ডা গলায় কাটা কাটা স্বরে বলে,

—‘শোন আরিফ, আমাকে কেউ জোর করে এখানে পাঠায়নি। আমি নিজেই এসেছি। আর এত কথা কেন বলছিস। আজকাল কোন ছেলে-মেয়ে মা-বাবাকে দেখে? তোর নিজের কথা ভুলে গেলি? বছরে একবার বাড়িতে গেছিস কখনো? ঈদেও তোর একটা অজুহাত থাকত। ইংল্যান্ডে একটা সেমিনারে যাওয়ার আগের রাতে মা মারা গিয়েছিলেন। তোকে জানানো হলে তুই বলেছিলি এই সেমিনারটা তোর ক্যারিয়ারের জন্য অনেক জরুরি। আর যেহেতু মারাই গেছে, তাই কদিন পরে গেলে তো আর কোনো ক্ষতি দেখছি না। তুই মায়ের জানাজায় যাসনি, ইউরোপে গিয়েছিলি। অবশ্য চেহলামে এসে মায়ের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে খুব করে কেঁদেছিলি। হ্যালো, হ্যালো, যা বলছিলাম, শোন, টাইম ইজ মানি। তুই তোর কাজ কর। এসব বিষয়ে মাথা না দিলেও চলবে।’

আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনের সংযোগ কেটে দেয় আসিফ। আবিদের দিকে তাকাতেই সে কেমন যেন কুঁকড়ে যায়। তার পরও অনুযোগের সুরে বলে,

—‘কিন্তু বড়দা, এটা না করলেই কি চলত না?’

—‘না, চলত না।’ নিজের কণ্ঠস্বর নিজের কাছেই রূঢ় মনে হয় আসিফের। বুঝতে পেরে নরম স্বরে বলে,

—‘শোন, বয়সী মানুষের মনে সব সময় একটা ভয় থাকে। বলতে পারিস কি সেটা? অপ্রয়োজনীয় ও পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ার ভয়। এই বুঝি সে রাষ্ট্র, সমাজ, বন্ধুবান্ধব, পরিবার—সবার কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেল! এই ভয় যাদের জীবনে বাস্তব হয়ে দেখা দেয় তাদের মতো দুর্ভাগা আর নেই। অর্থ থাকলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অবহেলা আর লাঞ্ছনা-গঞ্জনায় জীবনটা নরক হয়ে যায়। তাইতো আমার চলে আসা। কেউ যেন আমাকে অপ্রয়োজনীয় ভাবতে না পারে। এই আশ্রমে যারা আছে তাদের পরিচয় জানলে তুই অবাক হয়ে যাবি। সাবেক আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যাংকার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কে নেই! আমরা ভেবেছি আমাদের মতো যারা এখানে আসবে তারা শুধু মৃত্যুর প্রহর গুনবে না। এখানে আমরা একটা লাইব্রেরি করেছি, আমার সব বই লাইব্রেরিতে দিয়েছি। যাঁরা নিজেরাই চলাফেরা করতে পারেন তাঁরা লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়েন, আড্ডা দেন, আর যাঁরা পারেন না তাঁরা দরকারি বইটা আনিয়ে নেন। ওখানে হারমোনিয়াম, ডুগি-তবলা রয়েছে, অনেকে গান-বাজনা করেন, আমরা মাসে একটি করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করব ভেবেছি। কেউ গাইবেন, কেউ কবিতা পড়বেন, কেউ অভিনয় করবেন। আমরা বাকি জীবনটা উপভোগ করতে চাই।’

এতক্ষণ অবাক হয়ে তাঁর কথাগুলো শুনছিল আবিদ। কী বলবে ঠিক ভেবে উঠতে পারে না। অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ করে বসে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে মাথাটা তুলে কী যেন বলতে যাচ্ছিল, হাতের ইশারায় থামিয়ে দেয় আসিফ। বলে,

—‘দেখ, আমরা কি সত্যিই কেউ কারো জন্য ভাবি? হামিদ সেই কবে দেশ ছেড়েছে। বিদেশি বউ নিয়ে সেই কবে এসেছিল। শেষ ওর সাথে কবে কথা হয়েছে মনে করতে পারি না। মা-বাবার মৃত্যুর পরও ও আসেনি। এভাবেই চলছে আমাদের, যার যার তার তার।’

এমন সময় ‘দাদু দাদু’ বলে হইহই করে ঘরে ঢোকে ইফতি। অবাক আসিফ নাতিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আদর করে। দাদুর গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় ইফতি বলে,

—‘দাদু, তুমি এখানে কেন? চলো, বাড়িতে চলো। বাবা আমার সঙ্গে একটুও খেলে না। তুমি আর আমি ঘোড়া ঘোড়া খেলব।’ পরম মমতায় নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আসিফ। তারপর বলে,

—‘আমি তো আর এখন ঘোড়া হতে পারব না দাদুভাই। আমার হাঁটুতে অনেক ব্যথা। তা ছাড়া তোমার কত পড়াশোনা। তোমার তো খেলার সময় নেই।’

—‘আমার এত পড়া ভালো লাগে না। আমার খেলতে ভালো লাগে, গিটার বাজাতে ভালো লাগে, গান গাইতে ভালো লাগে।’

নাতির মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দেয় আসিফ। চোখটা ছলছল করে ওঠে তার। বলে,

—‘কী করবে দাদুভাই, লেখাপড়া না করলে যে পিছিয়ে যাবে।’ তারপর স্বগতোক্তির মতো বলে,

—‘কম্পিটিশন, ক্যারিয়ার, এস্টাবলিশমেন্ট এই সব ভারী শব্দের নিচে ওদের শৈশব চাপা পড়ে গেল। জীবনের মানবিকবোধগুলো আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতেই পারছে না। উন্নতি মানেই সুপারমার্কেট, ইমারত, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, ইট-কাঠ-পাথর। এসব ভারী জিনিসে ঘা খেতে খেতে আমাদের সংবেদনশীলতা শেষ হয়ে গেল।’

—‘দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ওদের সব কথাই শোনে সৌরভ। ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে বলে, ‘বাবা, চলো, ফিরে চলো।’

ছেলের কথার প্রত্যুত্তরে মাথা নাড়ে আসিফ। তারপর ছেলে ও ভাই দুজনকেই উদ্দেশ করে বলে,

‘যা, তোরা বাড়ি যা, সবাইকে বলিস আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়ে কেউ যেন অযথা দুশ্চিন্তা না করে।’

এ কথার পর অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলে না। হিম নিস্তব্ধতা ঘিরে থাকে ঘরটিতে। ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আবিদ। সৌরভ আর ইফতিকে নিয়ে নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সৌরভ কী মনে করে পেছন ফিরে বিছানায় বসে থাকা বাবার মুখের দিকে তাকায়। কিন্তু কে বসে আছে ওখানে? খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে সে। ভালো করে চেনার চেষ্টা করে। কিন্তু বারবার মনে হয় ওখানে যে বসে আছে সে তার বাবা নয়, ওখানে বসে আছে সে নিজে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা