kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’ পাঠের ভূমিকা

বিশ্বজিৎ ঘোষ

৭ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’ পাঠের ভূমিকা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমগ্র জীবনের সাধনায় যেসব কাজ করেছেন, আজকের দিনে তা ভাবলেও কখনো কখনো বিস্মৃত হতে হয়। তাঁর এমন একটি কাজ ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’ সম্পাদনা। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজস্ব শিল্পরুচি ও বিবেচনাবোধ থেকে যে সংকলন প্রস্তুত করেছিলেন, প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তা নিয়ে দেখা দিল বিপুল আলোড়ন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যাপকভাবে নন্দিত ও নিন্দিত হতে থাকলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’ প্রকাশেরও অগে, ১৯২৭ সালে, নরেন্দ্র দেবের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা কবিতার সংকলন ‘কাব্য দীপালী’। সে গ্রন্থ সম্পর্কেও পাঠক ও সমালোচক বিরূপ মত প্রকাশ করেছিলেন।

যেকোনো সংকলনই সম্পাদকের ব্যক্তিগত রুচি, বিশ্বাস ও শিল্পবোধ দ্বারা গ্রথিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’ গ্রন্থ সম্পর্কে একই কথা প্রযোজ্য। রবীন্দ্রনাথের নির্বাচনে উনিশ-বিশ শতকের অনেক কবির রচনা গৃহীত হয়নি; সমালোচককে তা-ই তীব্র বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া দেখাতে প্ররোচনা জুগিয়েছে। বিতর্কের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে তা দেখে মনে হতে পারে রবীন্দ্রনাথের নির্বাচন বেশির ভাগ শিল্পবোদ্ধার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। সমালোচনার ঝড় দেখে প্রকাশের অব্যবহিত পর রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থটি প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। রবীন্দ্রনাথ তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেন যে সমালোচনার আলোকে তিনি নতুন করে গ্রন্থটি প্রকাশ করবেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিরূপ সমালোচনার চাপে তিনি এই কাজে আর অগ্রসর হননি।

‘বাংলা কাব্যপরিচয়’ সম্পর্কে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য এই যে গ্রন্থটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল দুবার। প্রথমে ১৯৩৮-এর ১৩ জুন এটি প্রকাশিত হয়। কিন্তু প্রকাশের দিন সন্ধ্যার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের কাছে আসে একগাদা অসন্তোষজনক চিঠি ও প্রতিবাদপত্র। ফলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয় ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’। কয়েকটি কবিতা বর্জন করা হয়। জীবনময় রায় নিজের কবিতার অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে তীব্র আপত্তি করায় তাঁর কবিতা বাদ দিয়ে পৃষ্ঠাসংখ্যা ঠিক রাখার জন্য নতুন করে ছাপিয়ে জুড়ে দেওয়া হয় নিরুপমা দেবীর কবিতা। আর প্রথম সংস্কণেরই দ্বিতীয় মুদ্রণে ত্রুটির দায় স্বীকার করে রবীন্দ্রনাথ জুড়ে দিলেন এই ভাষ্য—

কোনো একটিমাত্র সংস্করণে এ রকম কাব্য সংগ্রহের কাজ সম্পূর্ণ হতেই পারে না। ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’-এর এই প্রথম সংস্করণে নিঃসন্দেহেই অনেক অভাব রয়ে গেছে। অনেক কবিতা চোখে পড়েনি। অনেক নির্বাচন যোগ্যতর হতে পারত। যে সংকলনে রচয়িতারা স্বয়ং তৃপ্ত হননি তাঁদের নির্দেশ পালন করলে হয়তো তা সন্তোষজনক হওয়ার সম্ভাবনা থাকত।

আধুনিক কবিতার ধারা অবিরাম বয়ে চলেছে, সুতরাং তার সংগ্রহ ভাবী সংস্করণে পূর্ণতা ও উৎকর্ষ লাভ করবে— এই প্রত্যাশা সংস্করণ কর্তার মনে রইল।

‘বাংলা কাব্যপরিচয়’-এর প্রথম সংস্করণের দ্বিতীয় মুদ্রণ ঠিক কবে প্রকাশিত হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। কেননা দ্বিতীয় মুদ্রণের সময় কোনো তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। তবে ধারণা করা যায়, ১৯৩৮ সালের ২৬ জুলাইয়ের আগেই তা প্রকাশিত হয়েছিল। কেননা বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’-এর যে কপিটি আছে, তাতে সুধীরচন্দ্র কর স্বাক্ষরিত এক টুকরা কাগজ লাগানো আছে মলাটের পরের পৃষ্ঠায়। সেখানে লেখা আছে—‘প্রথম সংস্করণেই প্রথম এই বই এ রকম ছাপা হয়ে বাজারে বেরিয়েছিল, পরে সংশোধন হয়ে আবার নতুন করে বেরয়, এইখানাই সংশোধিত কপি।’—এরপর আছে সুধীরচন্দ্র করের স্বাক্ষর, তারিখ ২৬.০৭.১৯৩৮। তারিখ দেখে বোঝা যায়, ২৬ জুলাই ১৯৩৮-এর মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছিল ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’-এর প্রথম সংস্করণের সংশোধিত দ্বিতীয় মুদ্রণ।

‘বাংলা কাব্যপরিচয়’-এ রবীন্দ্রনাথ অনেকটা সাহসের সঙ্গে ত্রিশোত্তর বেশ কিছু আধুনিক কবির কবিতা স্থান দিয়েছিলেন। যদিও তাঁদের কবিতা নিয়ে তখনো চলছিল এক ধরনের সংশয় ও অবজ্ঞা, তবু রবীন্দ্রনাথ তাঁর সংকলনে চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, কৃত্তিবাস, কাশীরাম, আলাওল, রামপ্রসাদের পাশাপাশি স্থান দিয়েছেন দিনেশ দাস, জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার, মনীশ ঘটক, অজিতকুমার, অন্নদাশঙ্কর, বুদ্ধদেব, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, হরপ্রসাদ মিত্রের মতো আধুনিক কবিদের। ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’-এ ত্রিশোত্তরকালের জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, কামাক্ষীপ্রসাদ, বিষ্ণু দে, সমর সেন প্রমুখ কবির কবিতা গ্রথিত হয়নি বলে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেয়। তবু রবীন্দ্রনাথের হাতেই বাংলা কবিতার কালানুক্রমিক বিকাশের একটা ইতিহাস প্রথম পেয়ে যান বাঙালি পাঠক—এ কথা স্বীকার করতেই হবে। সুমিতা চক্রবর্তী যথার্থই লিখেছেন। “...ঘাটতি সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথই প্রথম বাংলার আধুনিক কবিদের বাংলা ভাষার কবিতা-পরম্পরায় মর্যাদার আসন দিয়েছিলেন—এ কথা স্বীকার করতে হবে। এর আগে ‘আধুনিক’ বাংলা কবিতার কোনো সংকলন প্রকাশিত হয়নি; কোনো সংকলনে আধুনিক বাঙালি কবিদের জায়গাও হয়নি। রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাবনার বিস্তার এবং পরবর্তীকালের কবিতা সম্পর্কে তাঁর ভবিষ্যৎ-দৃষ্টির প্রসার আমাদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে। বিশেষভাবে যদি মনে রাখি যে তিনি নিজে আধুনিক কবিতার একান্ত অনুরাগী ছিলেন না।”

‘বাংলা কাব্যপরিচয়’ গ্রন্থের অসম্পূর্ণতা কিংবা ঘাটতির দায়িত্ব রবীন্দ্রনাথের ওপর এককভাবে পড়েছে বটে, তবে এর পশ্চাতেও একবার দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। প্রসঙ্গত প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের কথা স্মরণ করা যায়। ‘রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্য প্রবেশক’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন—“‘বাংলা কাব্যপরিচয়’ সম্পাদন করিতে গিয়া কবিকে এইবার বহু কাব্য ও ‘অনেক ইংরেজি কাব্যসংকলন’ পড়িতে হইতেছে। কাব্যসঞ্চয়ন-সম্পাদনে তাঁহার প্রধান সহায় ছিলেন কাননবিহারী মুখোপাধ্যায়। কাননবিহারী যে-সব কাব্য কবির গোচর করিতেন তাহা হইতেই প্রধানত বাছাই চলিত।” প্রভাতকুমারের এই ভাষ্য থেকে এটা সুস্পষ্ট যে এই সংকলনের সব কবিতা রবীন্দ্রনাথ এককভাবে নির্বাচন করেননি। তাঁকে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছিলেন কাননবিহারী মুখোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ নিজেও জানিয়েছেন সে কথা—‘এই গ্রন্থে কবিতার সংগ্রহকার্যে স্নেহাস্পদ শ্রীযুক্ত কাননবিহারী মুখোপাধ্যায় প্রভূত সাহায্য করেছেন নতুবা এই দায়িত্ব বহন করা আমার পক্ষে অসাধ্য হোত।’

‘বাংলা কাব্যপরিচয়’-এ কবিতা বিন্যাসের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি অনুসৃত হয়নি—এটিই এই সংকলন সম্পর্কে এক ধরনের বিরূপ সমালোচনা সৃষ্টি করেছিল। এ ধরনের সংকলনে কবিদের কবিতার সংখ্যা শিল্পমান নির্দেশক হলেও রবীন্দ্রনাথ অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কবিদের, যাঁদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিবিড়, কবিতা বেশি করে গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বুদ্ধদেব বসু। জীবনানন্দের কবিতা খণ্ডিতভাবে গৃহীত হয়েছে বলেও বুদ্ধদেব ভয়ংকর অভিযোগ তুলেছেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত রবীন্দ্রনাথের কাছে চিঠি লিখে তাঁর নিকৃষ্ট কবিতা সংকলন থেকে বর্জনের অনুরোধ জানিয়েছেন। এমন আরো নানা সীমাবদ্ধতা-অভিযোগের কথা বলা যাবে। শঙ্খ ঘোষ জানাচ্ছেন, এসব সীমাবদ্ধতা আসলে আধুনিক কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রমানসের সংশয়ের ফসল। ‘রোমাঞ্চকর এক সংকলন’ প্রবন্ধে তিনি জানাচ্ছেন—রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত এই সংকলনটি থেকে আধুনিক কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রমানসের যে সংশয়ের পরিচয় পাওয়া যায়, সেটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।

বহু ধরনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’ গ্রন্থই যে হাজার বছরের বাংলা কবিতার প্রথম সংকলন সে কথা অস্বীকারের উপায় কোথায়? সংকলনটি রবীন্দ্রনাথের একক হাতে সম্পাদিত হলে এটি পূর্ণতা পেত বলেই আমাদের ধারণা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা