kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

লেখকের বিচিত্র জীবন

টমাস মানের দীর্ঘ ছায়া

দুলাল আল মনসুর

১০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টমাস মানের দীর্ঘ ছায়া

আধুনিক জার্মানির শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক মনে করা হয় টমাস মানকে। প্রবন্ধকার ও সমাজ সমালোচক হিসেবেও তাঁর ব্যাপক প্রভাব। মানের উপন্যাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রতীকের ব্যবহার ও দৃষ্টিভঙ্গির তির্যক দর্শন। কথাসাহিত্যে এঁকেছেন শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মানুষদের মনোজগতের গহিন চিত্র। জার্মান মানস প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তিনি গ্যেটের উত্তরসূরি, কোমলতা আর সৌন্দর্যের দিক থেকে হাইনের উত্তরসূরি এবং গভীরতায় তিনি কান্টের অনুসারী। ব্যক্তি মানের দীর্ঘ ছায়া পড়েছে নিজের লেখায়। অন্যদিকে স্রষ্টা মানের ছায়া পড়েছে উত্তর প্রজন্মের ওপর।

১৯০১ সালে উপন্যাস ‘বুডেনব্রুকস’ প্রকাশ করার পর থেকেই নিজের দেশে নাম ছড়িয়ে পড়ে। তখন বয়স মাত্র ছাব্বিশ বছর। ১৯২৪ সালে এটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়। তবে তার আগে শুধু জার্মানিতেই এ উপন্যাসের ৫০টি সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। তখন ব্রিটিশ ও আমেরিকার সাহিত্য সমালোচকরা এ উপন্যাসটিকে জন গলসওয়ার্দির ‘দ্য ফোরসাইট সাগা’র সঙ্গে তুলনা করেন। ১৯২৯ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর সারা বিশ্বের পাঠকদের নজর পড়ে তাঁর লেখার ওপর।

দীর্ঘ জীবনে প্রথম মহাযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব, ইতালির ফ্যাসিবাদের উত্থান, জার্মানির জাতীয় সমাজতন্ত্র, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ও স্নায়ুযুদ্ধ—এত সব বড় ঘটনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। যে দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর সময়ের বিশ্বসমাজ দেখেছেন সে দৃষ্টির কারণে তিনি লেখক হিসেবে এবং অবশ্যই একজন সচেতন মানুষ হিসেবে অনন্য মর্যাদা পেয়েছেন। জীবন ও কর্ম দুটোই প্রতিনিধিত্বমূলক : তাঁর যাপিত জীবন জাতির সব মানুষের জীবনেরই একটি ক্ষুদ্র তবে যথাযথ প্রতিনিধি; লেখার মধ্যে ধারণ করেন সমাজের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও চিন্তার অবয়ব।

পূর্বপুরুষদের দুটো বিপরীতধর্মী কৌশলের মিশেল সমান্তরালে উপস্থিত মানের লেখায় : একদিকে গ্যেটের কৌশল, অন্যদিকে নিেশর। গ্যেটে মনে করতেন, তাঁর লেখার মধ্যে রয়েছে নিজের সামগ্রিক সত্তার টুকরো টুকরো উপস্থাপনা। নিেশর মতে, গভীর কোনো কিছু সৃষ্টি করতে দরকার হয় মুখোশের, নিজেকে রাখতে হয় আড়ালে। ব্যক্তিসত্তার প্রকাশ ও অব্যক্তিক বাস্তবতা—এ দুটোর দিকে দৃষ্টি রেখে মান ব্যবহার করেন রূপক আত্মপরিচয়। মান মনে করেন, তাঁর সময়ের মানুষদের কথা বলতে হলে নিজের কথার মধ্যে বলতে হবে। প্রথম দিকে ধারণা ছিল, লোকজন তাঁর লেখা আক্ষরিক অর্থে পড়ছেন। 

স্কুলে পড়ার সময়ই মান দুটি ভিন্ন জগতের অস্তিত্ব সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারেন : একটার পরিচয় বহন করে আত্মা, আরেকটার পরিচয় বহন করে জীবন। আত্মার জগত্জুড়ে থাকে শিল্প, মন ও কল্পনা। অন্যদিকে দৈনন্দিন বাস্তবতা বা ধরাছোঁয়া যায় এমন বুর্জোয়া কিংবা বস্তুবাদী মূল্যবোধ হলো জীবনের উপাদান। জার্মান রোমান্টিক কবিদের প্রভাবে এবং শোপেনহাওয়ার, ওয়াগনার ও নিেশর প্রভাবে তাঁর বিশ্বাস গাঢ় হতে থাকে, মানুষের অন্তস্থ প্রয়োজনটাকে লালন-পালনের জন্য শুধু সাধারণ জীবনযাপন ও কাজকর্ম যথেষ্ট নয়। তিনি মনে করেন, এ দুই জগতের মিল ঘটানো সম্ভব এবং তাঁর ‘রয়েল হাইনেস’ উপন্যাসে এ দুটির সংশ্লেষণ ঘটানোর চেষ্টা করেন। এ উপন্যাসে তিনি নিজেকে এক নিঃসঙ্গ প্রিন্সের পুরাণে তুলে ফেলেন। পুরাণের পর্যায়ে অবস্থান করা এই প্রিন্স (কিংবা শিল্পী) বাস্তবতার পর্যায়ে নেমে আসে এবং আমেরিকার একজন ধনী, তবে নামহীন অখ্যাত এক নারীকে বিয়ে করে। মানের জীবনে কাতিয়াকে বিয়ে করার ঘটনাটি এ কাহিনির পটভূমি হিসেবে সক্রিয় আছে বলেই মনে হয়।

উপন্যাস ‘ড. ফস্টাস’ ফস্ট কাহিনিরই নব রূপায়ণ। বিশ শতকের প্রথম ভাগের প্রেক্ষাপটে জার্মানির অস্থির সময়ের চিত্র রয়েছে এখানে। মধ্যযুগের উৎস থেকে জার্মানির সংস্কৃতির পথকে তুলে ধরার জন্য আকারে ইঙ্গিতে ব্যক্তিগত নামধাম ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সাধারণ অর্থে চরিত্র এবং নামগুলো দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের কথাই মনে করিয়ে যায়। মান এভাবে কাজে লাগান বহুস্তরের উপাদানের মাঝে পরোক্ষ সম্পর্ক তৈরির নিজস্ব কৌশল।

‘দ্য ম্যাজিক মাউনটেন’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হ্যান্স কাস্তর্প এক বণিক পরিবারের সন্তান। তার মা-বাবার অকালমৃত্যুর কারণে কিছুদিন পিতামহের কাছে, কিছুদিন মামার কাছে পালিত হয়। পেশা শুরু করার আগে সে তার এক তুতোভাইকে দেখতে যায় দাভোসের এক স্বাস্থ্যনিবাসে। এখানকার চিত্র ইতিহাসের প্রথম মহাযুদ্ধ শুরুর আগের দশকের। হ্যান্সের জীবনের খানিক মিল পাওয়া যায় মানের নিজের জীবনের সঙ্গে। প্রথমত তাঁর বাবাও অকালে মারা যান। দ্বিতীয়ত মানের স্ত্রী কাতিয়া ফুসফুসের সমস্যার কারণে দাভোসে চিকিৎসাধীন ছিলেন কয়েক মাস। ১৯১২ সালে মান সেখানে স্ত্রীকে দেখতে যান। লেখার প্রেরণা ও কাহিনির মিল দুটিই মানের দাভোস অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

শুধু নিজের লেখার ওপর নয়, পরবর্তী সময়ের অনেক লেখক-শিল্পীর ওপর রয়েছে টমাস মানের ব্যাপক প্রভাব। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের নোবেলজয়ী লেখক হাইনরিখ বোল, আমেরিকার নাট্যকার ঔপন্যাসিক যোসেফ হেলার, জাপানের কবি নাট্যকার অভিনেতা চলচ্চিত্রকার ইউকিও মিশিমা, তুরস্কের নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিক ওরহান পামুক, কানাডার নোবেলজয়ী লেখক এলিস মুনরো প্রমুখের ওপরে মানের স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। আরো স্পষ্ট উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, এডিনবরার ঔপন্যাসিক এন্ড্রু ক্রুমির উপন্যাস ‘মোবিয়াস ডিক’-এ একজন লেখক উপন্যাস লেখেন। সে উপন্যাসগুলো টমাস মানের উপন্যাসের মতো। হারুকি মুরাকামির উপন্যাস ‘দ্য নরওয়েজিয়ান উড’-এর প্রধান চরিত্র মানের ‘ম্যাজিক মাউনটেন’ উপন্যাস পড়েন। ইংরেজ নাট্যকার অ্যালান বেনেটের নাটক ‘দ্য হ্যাবিট অব আর্ট’-এ দেখানো হয়েছে, কবি ডাব্লিউ এইচ অডেনের সঙ্গে দেখা করতে যান সুরকার বেনজামিন ব্রিটেন। ব্রিটেন টমাস মানের উপন্যাস ‘ডেথ ইন ভেনিস’-এর ওপর অপেরা লিখেছেন। তিনি অডেনের সঙ্গে আলোচনা করতে যান অডেন তাঁর জন্য গীতিনাট্য লিখে দেবেন কি না—এই আশায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা