kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

যেভাবে গল্প পড়ি ৩

জগদীশ গুপ্তের গল্প ‘মায়ের মৃত্যুর দিনে’

আহমাদ মোস্তফা কামাল

১০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জগদীশ গুপ্ত নামের একজন খুব নিঃসঙ্গ লেখক এসেছিলেন বাংলা সাহিত্যে। নিঃসঙ্গ এই অর্থে যে তাঁর কোনো পূর্বসূরি নেই, সমকালেও তাঁর কোনো বন্ধু ছিল না, তিনি ছিলেন তাঁর মতো, সম্পূর্ণ বিপরীত স্রোতের এক লেখক। রবীন্দ্রবলয় থেকে বেরোবার জন্য অচিন্ত্যকুমার-প্রেমেন্দ্র-বুদ্ধদেব বসুরা মিলে যখন জন্ম দিয়েছিলেন কল্লোল যুগের, রবীন্দ্রকথিত কল্যাণ ও মঙ্গলময় জগতের ভেতরেই যে ক্লেদাক্ত-পাপাসক্ত এক পৃথিবী আছে তার ছবি আঁকতে ব্যগ্র হয়ে উঠেছিলেন, সেই সময়েই অতি নিভৃতে জগদীশ গুপ্ত নির্মোহ-নিরাসক্ত ভঙ্গিতে লিখে যাচ্ছিলেন ক্লেদাক্ত-পরাজিত-জঘন্য-নির্মম-নিষ্ঠুর জীবনের আর নিয়তির কাছে মানুষের অসহায় পরাজয়বরণের গল্প। প্রেম ও মমতা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা, আদর্শ ও মূল্যবোধ, সুস্থতা ও সৌন্দর্যবোধ, শুভ ও কল্যাণবোধ তাঁর গল্পে চিরদিনই নির্মমভাবে উপেক্ষিত থেকে গেছে। রবীন্দ্রনাথকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি সচেতনভাবেই, যোগ দেননি কল্লোলগোষ্ঠীর সঙ্গেও, এমনকি তাঁর কোনো সাহিত্যিক পরিমণ্ডলও ছিল না, ছিল না সাহিত্য সমাজের সঙ্গে ওঠাবসাও। এ রকম একজন বিচ্ছিন্ন-নিঃসঙ্গ লেখক কিভাবে লিখে যেতে পারলেন জীবনভর, সে এক বিস্ময়।

তাঁর একটি গল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই আজকের পর্বে। 

‘মায়ের মৃত্যুর দিনে’ গল্পটি শুরু হয়েছে ‘কেশবলাল দত্ত ভারি ছটফট করিয়া বেড়াইতেছে’—এই বাক্য দিয়ে। এরপর তার ছটফটে স্বভাবের বিস্তারিত বিবরণ এবং বেশ সরস বর্ণনায় জানিয়ে দেওয়া যে এই ছটফটানির মূল কারণ তার কৃপণতা। পয়সা খরচের সম্ভাবনা দেখা দিলে এই ছটফটানি নিছক নির্দোষ থাকে না, রীতিমতো ‘বিষাক্ত হইয়া ওঠে’। চাকর মাইনে চাইলে মারতে উদ্যত হয়, বড় মেয়ের বিয়েতে অনেক খরচ হয়ে গেছে বলে তার প্রচণ্ড রাগ এখনো কমেনি, ওদিকে ‘আর একটি মেয়ে দ্রুতবেগে বড় হইতেছে। রাগ আর সহ্য হয় না বলিয়া কেশবলাল সুলোচনার দিকে তাকায় না’, ছেলের স্কুলের বেতন দিতে গেলেও ‘কেশবলালের মুখ দিয়া আগুন ছোটে।’ এহেন কেশবলালের বর্তমান ছটফটানির কারণ কিন্তু এগুলো নয়। তার মা খুবই অসুস্থ, মৃত্যুশয্যায়। ‘মাতৃবিয়োগ একটা বিপদ বটে, মাতৃদায়ও একটা অসুবিধাজনক, অর্থাৎ খরচ-করানো...’, কিন্তু এসবও কারণ নয়। তাহলে কী কারণ? পড়তে পড়তে মনে হয় যেন আসন্ন মাতৃবিয়োগের সম্ভাবনা সে মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু অচিরেই লেখক জানিয়ে দেন যে মায়ের সম্ভাব্য মৃত্যুকেও সে সহজভাবেই গ্রহণ করেছে এবং প্রস্থানকেই মায়ের জন্য মঙ্গলজনক বলে ভাবছে। তাহলে? এতক্ষণে জানা গেল, তার অনুজ রামলালকে (যে কি না ‘পশ্চিমের এক শহরে চাকরি’ করে) শেষবারের মতো দেখার জন্য অধীর হয়ে আছেন মা। তাকে খবর দেওয়া হয়েছে, সে চিঠিও পেয়েছে, কিন্তু ছুটি পাচ্ছে না বলে আসতে পারছে না। কেশবলাল আদৌ রামলালকে খবর দিয়েছে কি না তা নিয়ে মায়ের নিশ্চয়ই সন্দেহ হয়েছে, সে জন্য নাতিকে দিয়ে চিঠি লিখিয়ে নিজেই পাঠিয়েছেন। বড় ছেলের প্রতি এই আস্থাহীনতার কারণ বোঝা যাবে আরো পরে। কারণ জগদীশ গুপ্ত তাঁর গল্পগুলোতে শুরুর দিকে বেশ শান্তিপূর্ণ অবস্থা দেখান এবং ক্রমশ সেটিকে ঠেলে নিয়ে যান রূঢ়-অসহনীয় এক পরিস্থিতির দিকে। এই গল্পেও ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে কেশবলালের চরিত্র। একসময় দেখা গেল, কেশবলাল আসলে চায় না যে তার অনুজ এই মুহূর্তে বাড়ি আসুক। আর তাই চিঠি লিখে সে রামলালকে জানিয়েছে, মায়ের অবস্থা ততটা খারাপ নয়, হয়তো এ যাত্রায় টিকে যাবেন, অসুবিধা হলে সে যেন কষ্ট করে না আসে। মায়ের মৃত্যুর জন্য সব রকম প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছে কেশবলাল, তবু রামলাল চলে আসতে পারে এই সম্ভাবনায় সে অস্থির-কাতর এবং তার বর্তমান ছটফটানির সেটাই কারণ। কিন্তু হঠাৎই একদিন সে টেলিগ্রাম পায় রামলালের কাছ থেকে যে সে আজ রাতে আসছে। তখন আরো গূঢ় কারণটি জানা যায়। তার মা সারা জীবন ধরে শুধু স্বর্ণের গয়না গড়েছেন, ব্যবহার করেননি কখনো, কেশবলাল সেগুলোর দখল চায়। কিন্তু রামলাল যে আজই আসছে, কী করা যায় এখন? স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের পাশে বসে সে কাতরকণ্ঠে রামলালের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে থাকে। রামলাল যে কত খারাপ, সারা জীবন ধরে মাকে কষ্ট দিয়েছে, দাদা-বউদিকে একেবারেই মানে না, এমনকি বাচ্চাদেরও সে সহ্য করতে পারে না, মায়ের শেষ মুহূর্তেও সে একবার চোখের দেখা দেখতে এলো না, এই সব বলতে বলতেই সে জানতে চায়—‘মা, তোমার গয়নাগুলো?’ মা দ্বিধা না করে উত্তর দেন, ‘তোমার অর্ধেক, রামের অর্ধেক।’ নানা কৌশলে বারবার চেষ্টা করেও মায়ের কাছ থেকে কোনোভাবেই অর্ধেকের বেশি আদায় করতে পারল না সে। রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে-হতাশায় মুষড়ে পড়লেও তাল হারাল না কেশবলাল, কবিরাজকে ডেকে এনে মাকে দেখাল, কৌশলে জানতে চাইল, মা কেন মরছে না? কবিরাজ জানাল, আজ রাত টেকে কি না সন্দেহ...আর ‘লাফাইবার মতো করিয়া কেশবলাল চমকিয়া উঠিল: বলেন কি!’ তারপর যা ঘটল, তা অবিশ্বাস্য। মায়ের কাছে ফিরে দেখল তাঁর শ্বাসটান উঠেছে। ততক্ষণে প্রতিবেশীদের কেউ কেউ জড়ো হয়েছিল উঠোনে। কেশবলাল তাদেরই দুজনকে ডেকে নিয়ে তিনজনে মিলে আচমকা মাকে মাথার ওপর তুলে নিয়ে বাইরে এনে শুইয়ে দিল। মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তাদের হাতের ওপর, শূন্যে ভাসমান অবস্থায়। কেশবলাল দেরি না করে ফিরে গেল মায়ের ঘরে, বালিশের নিচ থেকে চাবি বের করে ট্রাঙ্কের তালা খুলে গয়নার বাক্সটি হাতিয়ে নিয়ে নিজের আলমারির ভেতরে লুকিয়ে রাখল। মা যে তাকেই সব দিয়ে গেছেন এ কথা কিভাবে রামলালকে বলতে হবে, তাও ভেবে নিল মুহূর্তের মধ্যে। তখনই একটা ঘোড়ার গাড়ি এসে বাড়ির বাইরে থামল—রামলাল এসেছে এবং ‘তিন লাফে কেশবলাল বাহির হইয়া আসিল; বস্ত্রাবৃত মাতৃদেহের পাশে ধপ করিয়া বসিয়া পড়িল’, স্বামী-স্ত্রী মিলে আয়োজন করল এক চমৎকার আহাজারি-নাটকের।

হতভম্ব হয়ে যেতে হয় এ রকম গল্প পড়লে। মানুষ এত নীচ হয়? এত হীন? এত লোভী? এত কুচক্রী? যত প্রশ্নই জাগুক মনে, জগদীশ গুপ্ত এত নির্বিকার-নির্মোহভাবে এসব বর্ণনা করেন যে বিশ্বাস না করে উপায় থাকে না। কোথাও কোনো ঘৃণা নেই, সমালোচনা নেই, কটুকাব্য নেই, বিদ্রুপ নেই, যেন খুবই সাধারণ একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন তিনি, এমনই সহজভঙ্গি তাঁর। জীবনে কি তিনি কেবল এই সবই দেখেছেন? এই গ্লানি, হতাশা, নীচতা, হীনতা, আপাত শুভ ও আনন্দের পেছনে লুকানো অশুভ চিন্তা ও পাপ? জানার উপায় নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা