kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭। ১১ আগস্ট ২০২০ । ২০ জিলহজ ১৪৪১

কবির খেয়ালি মন

স্থাপত্যের ভাষায় কথা বলেন নেরুদা

দুলাল আল মনসুর

৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্থাপত্যের ভাষায় কথা বলেন নেরুদা

পাবলো নেরুদা নোবেলজয়ী কবি। তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আরো কিছু বিষয় ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে : তিনি ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন; তিনি লোকজনকে নিমন্ত্রণ করে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে ভালোবাসেন। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং কূটনীতিক হিসেবেও দেশের বাইরে কর্মরত ছিলেন। বলা হয়, নেরুদা ‘ক্রিয়েটিভ পাওয়ার হাউস’। ৩০ বছর বয়স থেকেই তাঁর লেখা প্রকাশ হতে থাকে, চলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ছিলেন কবি নেরুদা। একবার তাঁর কবিতা পাঠের আসরে উপস্থিত জনতার সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কনিষ্ঠ স্ত্রী মাতিলদা এবং কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেরুদার বাড়ি লা চাসকোনায় গিয়ে দেখতে পান পিনোশের হুকুমে পুলিশ সেখানে তছনছ করে অনেক কিছু নষ্ট করে ফেলেছে। অনেক মূল্যবান জিনিস নিয়েও গেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রিয় কবির সব স্মৃতি এবং স্মৃতিবাহী সব বস্তু মানুষের কাছে মহামূল্যবান। মাতিলদা সিদ্ধান্ত নেন, কবির এই বাড়িটাতে এখনো যা যা আছে সেগুলো নিয়েই এটাকে তিনি জাদুঘরে রূপান্তর করবেন।

নেরুদা লেখার ভাষায় যা বলেছেন তার সঙ্গে আরো বেশি বলতে চেয়েছেন স্থাপত্যের মাধ্যমে। নেরুদা সমুদ্র ভালোবাসতেন। নিজেকে ক্যাপ্টেন বলতেন তিনি। সমুদ্রের প্রতি ভালোবাসা থেকেই লা চাসকোনাকে তিনি নৌকার আকার দেওয়ার চেষ্টা করেন। সান্তিয়াগোতে অবস্থিত তাঁর এই বাড়ির সামনে সমুদ্র না থাকলেও বাড়ির এ রকম আকার দেওয়া হয়েছে। স্থাপত্য গুণসম্পন্ন জিনিস ছাড়াও ছোটখাটো অনেক জিনিস সংগ্রহ করে রেখেছেন এখানে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা ভ্রমণের সময়কার সাক্ষী হয়ে আছে এগুলো। অন্যান্য জায়গার জিনিসপত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে রাশিয়া, চীন, পেরু ও রুয়ান্ডার স্মারকবস্তু। নেরুদার প্রিয় ফল তরমুজ। চারপাশের দেয়ালে তরমুজের চিত্র স্পষ্ট। শোবার ঘরে তাঁর বন্ধু চিত্রকরদের আঁকা পেইন্টিং রেখেছেন। এগুলোতে প্রতীক এবং ব্যক্তিগত অর্থ আরোপ করা হয়েছে। যাঁদের লেখা পড়ে তিনি প্রেরণা পেয়েছেন, সেসব লেখক-কবির ছবি দিয়ে ভরা আছে একটা রুম। অন্যদের মাঝে আছে পো, বোর্হেস, হেমিংওয়ের ছবি। এ ছাড়া জীবনে যাঁদের সঙ্গে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁদের ছবিও আছে এখানে। পাবলো পিকাসো, মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল আস্তুরিয়াস, আর্থার মিলার, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারা, এমনকি জোসেফ স্তালিনও আছেন এই গ্যালারিতে।

শোবার ঘরটা তৈরি করেছেন বাতিঘরের আদলে। বাড়ির ডাইনিংরুমটা বানানো হয়েছে জাহাজের ক্যাপ্টেনের কেবিনের মতো করে। নেরুদা মজা করতে ভালোবাসেন। অতিথিদের সঙ্গেও নানা রকম খেলায় মাতার রেকর্ড আছে তাঁর। তাঁর ডাইনিংরুমের একটা আলমারিতে একটা সল্টশেকার এবং একটা পেপারশেকার আছে। একটার গায়ে লেখা আছে ‘মরফিন’, আরেকটার গায়ে লেখা ‘মারিজুয়ানা’। লেখা যা-ই থাকুক না কেন, একটাতে লবণ আরেকটাতে মরিচের গুঁড়া। এই আলমারির ভেতরেই আছে আরেক বিস্ময় : এটির ভেতর দিয়ে অন্য রুমেও চলে যাওয়া যায়। তাঁর মজা করা বিষয়ে নেরুদা একসময় বলেন, ‘আমি এই বাড়িটা খেলনা বাড়ি হিসেবে তৈরি করেছি। আমি এখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খেলায় মত্ত থাকি।’ সৃজনের সঙ্গে যেহেতু মজা করার বিষয়টি জড়িত, সেহেতু নেরুদাও এ রকম মজা উপভোগ করার চেষ্টা করেন। আসলে জীবনটাকেই তিনি খুব সিরিয়াসলি নেননি। সে জন্যই তাঁর মন প্রফুল্ল ছিল এবং সৃজন প্রক্রিয়া বহমান ছিল।

মেধাবী বক্তিদের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করেন নেরুদা। জরুরি কাজে কোনো দেশে গেলে সেখানকার শিল্পী-সাহিত্যিকদের সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করতেন। যাঁরা তাঁর নিজের মতো রুচির ছিলেন তাঁরা ছাড়াও তাঁর থেকে মেজাজ-রুচিতে আলাদা ব্যক্তিদের সঙ্গেও দেখা-সাক্ষাৎ হতো। শুধু দেখা-সাক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকত না, তিনি সরাসরি তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করতেন, মতামত বিনিময় করতেন। ভিন্ন মতের হলেও তাঁদের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতেন।  

নেরুদা রুটিন-জীবন পছন্দ করতেন না। প্রকৃতির স্বভাব বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করে বৈচিত্র্য আনার জন্য এবং ত্রুটিপূর্ণ বা অসম্পূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে থাকার জন্যই এ বাড়িটা এভাবে তৈরি করেন। সব সময় সতর্ক থাকার জন্য, সচেতন থাকার জন্য বৈচিত্র্যের দরকার ছিল তাঁর। তিনি জানতেন, অস্বস্তিকর পরিবেশ তাঁকে সৃজনশীল রাখে, সতেজ রাখে। নতুন এবং অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়ারও দরকার ছিল। কারণ তিনি জানতেন, নতুনতর দৃষ্টিভঙ্গিই দরকার সৃজনশীল কাজের জন্য। সৃষ্টির প্রেরণা ও প্রবাহ সব সময় অবিরত ধারায় না-ও আসতে পারে। এলেও সে প্রবাহে বাস্তবের চেহারা দেওয়ার কাজ খুব সোজা কথা নয়। প্রেরণার ক্ষণস্থায়ী স্বভাবের কারণেও নেরুদা স্থাপত্যসামগ্রী দৃষ্টির সামনে রেখেছেন। সৃজনশীল কাজের জন্য সহায়ক এসব বস্তু তাঁর মনের খোরাক হিসেবে কাজ করেছে, তাঁকে খুশি রেখেছে, তুষ্ট রেখেছে।

উল্লেখ্য, নেরুদা এই বাড়িটি নির্মাণ শুরু করেন ১৯৫৩ সালে তাঁর তখনকার দিনের গোপন প্রেমিকা মাতিলদা উরুতিয়ার জন্য। লা চাসকোনা নামের মধ্যেও আছে মাতিলদার চেহারার প্রতিফলন : বাড়ির নামের অর্থ ‘উদ্দাম চুলের গোছা’। মাতিলদার চুলের সঙ্গে মিল রেখে এমন নাম দেওয়া হয়েছিল। নেরুদার বিচিত্র রুচির প্রতিফলন রয়েছে এ বাড়িটিতে। এখানে মাতিলদার একটা ছবি আছে, যার দুটি মুখ বানানো হয়েছে : এক দিকের মুখ জনসাধারণের কাছে চেনা উরুতিয়া নামের সংগীতশিল্পীর, আরেকটা দিক তার ভিন্ন, সেটা প্রেমিক নেরুদার চেনা। আরো একটি বিশেষ বিষয় আছে, এই ছবিটিতে : উরুতিয়ার চুলের মধ্যে লুকিয়ে আছে নেরুদার মুখ।

বর্তমানে লা চাসকোনা দেখাশোনা করে পাবলো নেরুদা ফাউন্ডেশন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা