kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭। ১১ আগস্ট ২০২০ । ২০ জিলহজ ১৪৪১

প্রকৃতিপুত্র দ্বিজেন শর্মা

মোকারম হোসেন

৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রকৃতিপুত্র দ্বিজেন শর্মা

কিছু মানুষের জীবনের সঙ্গে কৃতকর্মের তকমা জুটে যায়। তখন মানুষ নয়, বরং তার কর্মপরিচয়ই আমাদের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। আমরা সমাজের আর দশজন মানুষ থেকে তাকে আলাদাভাবে চিনি। এমনই একজন মানুষ ছিলেন বৃক্ষাচার্য দ্বিজেন শর্মা, যার নামের সঙ্গে আরো অনেক বিশেষণের পাশাপাশি বৃক্ষ বিশেষণটি বেশ গভীরভাবেই যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। বৃক্ষ আর দ্বিজেন শর্মা একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠল। যেন তিনি জন্মেছেন প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েই। কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠানের ছায়ায় এ দেশের অজস্র মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখলেন। বাগান করার কথা ভাবলেন, বৃক্ষ হন্তারকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ারও দীক্ষা পেলেন।

১৯২৯ সালের ২৯ মে বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার শিমুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া দ্বিজেন শর্মা শৈশবেও কি ভেবেছিলেন—তাঁর জীবনটা প্রকৃতির এমন মায়াজালে জড়িয়ে যাবে! রূপকথার গল্পের মতো আশ্চর্য সুন্দর জন্মস্থানের মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি তাঁর জীবনকে কতটা প্রভাবিত করবে? জন্মস্থানের প্রকৃতি একজন প্রকৃতিপ্রেমী দ্বিজেন শর্মার মানস গঠনে কতটা ভূমিকা রেখেছে তা তাঁর অসংখ্য স্মৃতিকথা ও আলাপচারিতা থেকে জানা যায়। প্রায় এক যুগ আগে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমি যে পরিবেশে বড় হয়েছি সেখানে গাছপালা ছিল। আমার বাবা গাছ লাগাতে উৎসাহী ছিলেন। আমার ভাই-বোন সকলেই এসব দেখেছে। কিন্তু সবাই আমার মতো প্রভাবিত হয়নি। আমি যে হয়েছি এটা এপিজেনেটিক্যাল সিস্টেমের কোনো জটিল নিয়মেই ঘটেছে। হ্যাঁ, আমি ছোটবেলা থেকে গাছপালা, জীবজন্তু খুবই ভালোবাসি, বিশেষ করে পাখি। ছেলেবেলায় হাঁড়িচাঁচা, হলদে পাখির সৌন্দর্য আমাকে স্বপ্নাচ্ছন্ন করে রাখত।’

এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় তাঁর প্রকৃতিপ্রেম শুধু বৃক্ষকেন্দ্রিক ছিল না। পাহাড়, নদী, পাখি ও বিচিত্র প্রাণজগৎ তাঁর মুগ্ধতার বিষয় ছিল। তাঁর কর্মপরিধি ও কল্পনার জগৎ দৃশ্যত বহুধাবিস্তৃত হলেও ঘুরেফিরে প্রকৃতিই ছিল আরাধ্য বিষয়। সমাজ সংস্কারক ও বিজ্ঞান চিন্তক এই স্বাপ্নিক মানুষটি তাঁর ৮৭ বছরের পরিপূর্ণ জীবনে প্রকৃতিকেই ধ্যান-জ্ঞান করেছেন। হৃদয় নিংড়ানো সমস্ত ভালোবাসাই ছিল প্রকৃতিকে ঘিরে। প্রকৃতিকে ভালোবেসে তিনি সবচেয়ে দরকারি যে কাজটি করেছেন তা হলো সমকালে তো বটেই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন অমূল্য সব গ্রন্থ, যা প্রকৃতিবিমুখ একটি জাতিকে নতুন করে পথ দেখাচ্ছে। প্রকৃতি, বিজ্ঞান এবং সাহিত্যের সম্পর্ক কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ও পরিপূরক হতে পারে, দ্বিজেন শর্মার রচনানিচয়ে তা নানাভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি নির্মাণ করেছেন জনবোধ্য এক আশ্চর্য ভাষাশৈলী। কিন্তু আজীবন নিসর্গী এই বৃক্ষাচার্য লেখালেখির শুরুতে হতে চেয়েছিলেন ভিন্ন কিছু!

মূলত প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে এ বিষয়ে লেখালেখি শুরু। রমনা নিসর্গের সৌন্দর্য তাঁকে ঢাকার গাছ নিয়ে বই লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। মোটরসাইকেল চালিয়ে সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াতেন। কোথায় কী গাছ আছে, কোন গাছ লাগানো হচ্ছে সেই সন্ধান করতেন। নিসর্গকে শুধু পর্যবেক্ষণই নয়, এসব নিয়ে বই লেখার কাজও শুরু করেন, যা বাংলা একাডেমি থেকে ১৯৮১ সালে ‘শ্যামলী নিসর্গ’ নামে প্রকাশিত হয়। বলতে দ্বিধা নেই, ‘শ্যামলী নিসর্গ’ অদ্যাবধি বৃক্ষানুরাগীদের প্রকৃতি সমীক্ষা ও লেখালেখিতে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রতিটি বৃক্ষের আলোচনায় তিনি তুলে ধরেছেন প্রাসঙ্গিক কবিতার উদ্ধৃতি, গাছপালার আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য, ব্যক্তিগত অনুভূতি ও উপযোগিতা। বৃক্ষ পরিচিতিমূলক গ্রন্থের ক্ষেত্রে এটি একটি নতুন ধারা, যার প্রবর্তক স্বয়ং দ্বিজেন শর্মা।

একজন শ্রেষ্ঠতম প্রকৃতিবিদ হিসেবে দ্বিজেন শর্মার সবচেয়ে বড় অর্জন মোটাদাগে দুটি। প্রথমত, তিনি এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রাণে প্রকৃতিপ্রেমের মর্মবাণী সঞ্চারিত করতে সক্ষম হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি অনেক নিবেদিতপ্রাণ উত্তরসূরিও তৈরি করতে পেরেছেন। তাঁর কাছে আমাদের অপরিশোধ্য ঋণ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা