kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

রাতের দিন

শামীম আজাদ

৫ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



রাতের দিন

অঙ্কন : মাসুম

একদিন, রাতের বেলা। আমি ঈশিতার খাবার ঘরে বসে লিখছি। পুরো বনানী সুনসান। মাঝে মাঝে চেয়ারম্যানবাড়ির কুকুরগুলোর কুঁইকুঁই আর মোড়ের গেটে রিকশা থেমে যাওয়ার শব্দ।

রাত সোয়া একটা। যুগপৎ দুটি কম্পিউটার নিয়ে কাজ করছি। একটির লেখা পড়ে পড়ে অন্যটিতে মৌলিক কিছু চিন্তা লিখছি। দুই হাতের দুই মধ্যমা কি-বোর্ডের খোঁপ থেকে খোঁপে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে দুই হাতের তর্জনীরা আর নির্দেশিকারা উঠে আছে খরগোশের কানের মতো। কি-বোর্ডের তরঙ্গে তিড়িংবিড়িং নড়ছে আমার আঙুল, উঠছে-নামছে হাত। আমার খরগোশ ছেড়ে দিয়েছি বিস্তর গাজরের ক্ষেতে।

এভাবেই, গভীর রাতে আমি লিখি। আমার পৃথিবী হুড খুলে পাশে বসে থাকে। এভাবে কম্পিউটারে লিখছি ২০ বছর। তার আগের ২০ বছর, বিয়ের পর থেকেই লিখেছি খাতা-কলমে, নিউজপ্রিন্ট প্যাডে, বলপয়েন্টে। কিন্তু সবই রাতে। সবাই ঘুমালে পরে। লিখতাম বারান্দায়, বাথরুমে, রান্নাঘরে, শোবার ঘরে টেবিল লাইটে ঘোমটা পরিয়ে।

ঈশিতা উঠে ঘুম চোখে ফ্রিজ খুলে জলের বোতল হাতে কতক্ষণ আমাকে দেখছে জানি না।

লেখা থামিয়ে বলি, কিছু বলবি?

—নাহ। তোমাকে দেখি। সেই কবে থেকে রাতের বেলা লেখো।

আমিনা, ঈশিতাকে পেটে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবসিডিয়ারি বিষয় ইংরাজি ও সমাজবিজ্ঞান পরীক্ষা দিয়েছি। মেয়েটাকে কোলে নিয়ে অনার্স করেছি আর পাশে রেখে এমএ করেছি। ওকে দুধ খাওয়াবার বিরতিতে ক্লাস করার কালে সময়মতো ব্লাউজের ভেতর দুধে ভেসে যেত বলে ব্রার ভেতরে তুলো ও নরম কাপড় ভরে ক্লাসে গেছি। লাইব্রেরিতে পড়েছি। রাতে ও ঘুমে গলে গেলে পা টিপে টিপে উঠে এসে লেখার টেবিলে বসেছি। পড়তে পড়তে বা লিখতে লিখতে একসময় টের পেয়েছি, ছোট্ট একজোড়া কোমল হাত পেছন থেকে আমার ব্লাউজ নিচে পেটের খোলা অংশে নড়ছে, আদর করছে। আমি কিছু বলছি না, লিখে যাচ্ছি। এবার হাত জোড়া আমার বাহুর খোলা জায়গাগুলোতে খেলছে। আমি তবু কিছু বলছি না, কাজ করে যাচ্ছি। এবার ঈশুমণি সে খেলা রেখে পেছন থেকে চেয়ার বেয়ে, আমার পিঠ ছাপানো পিচ্ছিল চুল বেয়ে উঠে ঘুরে থপ করে মুখোমুখি আমার খাতার ওপর বসে পড়েছে। তার ঘন পাপড়ি ভরা এক জোড়া চোখে দুষ্টু হাসি। ভাবখানা এমন, বধ করেছি আমার শত্রু। এখন দেখি কী করে পড়ো! আমি তখন ওর কপালের ফ্রিঞ্জ সরিয়ে চুমু দিয়ে হেসে টেবিল গুটিয়ে আবার তাকে ওর ঘরে বিছানায় নিয়ে যেতাম। পেছনে শুনতে পেতাম আজাদের ক্ষীণ নাসিকাধ্বনি! সে লোক জানেই না আমার রাতের কারবার। ভাবে আমি খুব মেধাবী। কত অল্প পড়ে পড়ে পাস দিয়ে যাচ্ছি ফটাফট। বহুমুখী গুণ আমার!

আর আমি তাকে বলিও না। আমি ভাবি, এটাই তো হওয়ার কথা। মেয়েরা সবার পর ঘুমাবে, সবার আগে জাগবে। কম আর শিশু উচ্ছিষ্ট খাবে, কিন্তু বেশি দেবে। মানুষ দাওয়াত করলে সে খালি শাটল কর্কের মতো দৌড়াবে। সব করে সে যখন খাবার প্লেট হাতে নেবে তখন মেহমানদের বিদায় আসন্ন হবে। তাইতো সেই কবে থেকে সবার সব দাবি মিটিয়ে চুপি চুপি উঠে রাতের পর রাত জেগে থেকে আমি আমারে করেছি নির্মাণ। আমার বৃদ্ধি রাতে রাতে... এই জীবনে আমার মুক্তি রাতের আলোয়!

—ওই সময়টায় যে আর কোনো কাজ থাকে না।

সে হেসে বলে, জানি। ওই সময়টায় তোমাকে বাসার কারো জন্য আর কিছু করতে হয় না। কেউ জ্বালায় না। কারণ সবাই ঘুমায় তখন।

এখন আমি লন্ডনের লি নদীর পাড়ে থাকি। এ দেশে কাজ করছি বহু বছর। লেখারই কাজ। দেশে এলে ঈশিতার বনানীর বাড়িতেই উঠি। আগে দেশে থাকার সময় অনেক বছর কাটিয়েছি ধানমণ্ডিতে ধুন্ধুমার। আমরা সে সময় দু-দুটি সুন্দর একতলা বাড়িতে ছিলাম। একটি ছিল কবি সিকান্দার আবু জাফরের, আর অন্যটি অধ্যাপক আব্দুল হাই স্যারের। সে এক অসাধারণ অনুভূতি! রাতের বেলা আমি তাদের আছর প্রার্থনা করতাম। কখনো ভাবতাম, বাংলা ভাষার কীর্তিমান দুই পুরুষের বাড়িতে থাকছি, তাই হয়তো আমি লিখতে পারি। পাগল না?

দুটি বাড়িরই গাড়ি বারান্দায় বেগুনি বাগানবিলাস ছিল। দিনে তার ফিনফিনে হাওয়া ছিল। সুপ্রচুর নারকেলগাছ ছিল। তার ঘন সবুজ ঝরঝরে পাতার ফাঁকে ঝোড়ো হাওয়া ছিল। ঘন সবুজ নেট দেওয়া বিশাল বারান্দা ছিল। দুই বাড়িতেই কুকুর ছিল। আমি যখন রাতে একা জেগে জেগে বারান্দার রাইটিং ডেস্কে বসে লিখতাম তখন বাইরে নারকেলবীথির শোঁ শোঁ শব্দ শুনতাম। কুকুর টপ্সী কিংবা টিপটপ সারা বাড়ি চক্কর দিয়ে ঠিক আমি যেখানে, তার বাইরের কংক্রিটে বসে কুঁইকুঁই  করত। বহুদিন আমার রাতের সঙ্গী ছিল ওই নারকেলপাতার শাণিত শব্দ আর পালিত সারমেয়র শ্বাস। কিন্তু কী আশ্চর্য, বাইরের ওই নিকষ অন্ধকারে ভূতের ভয় পেতাম না। আমিও হয়তো মানুষ ভূত! আমাকে মেনে নিয়ে যদি তারা থাকে থাকুক!

জানি আমি যদি নারী না হতাম, লেখার সময় আমার স্ত্রী চা করে দিত। বাচ্চাদের দূরে সামলে  রাখত। হঠাৎ শব্দের দরকার হলে ডিকশনারিটা এগিয়ে দিত। আমার লেখার ডেডলাইনের সময় বাসায় কাউকে নিমন্ত্রণ দিত না। এলোমেলো কাগজপত্র রেখে ঘুমিয়ে পড়লে গভীর মমতায় তা গুছিয়ে রাখত। সকালে ঘুম পুষিয়ে নেওয়ার জন্য নিজে চুপি চুপি শব্দ না করে উঠে যেত।

—মা! কী অদ্ভুতভাবে তুমি টাইপ করো!

বলে জলের বোতলটা টেবিলে নামিয়ে আমার পেছনে গিয়ে পিঠে হাত রাখে। ওর মুখে কৌতুক।

—‘আমার মা আসলেই অদ্ভুত!’

—কেন রে, মা?

—তুমি না টাইপ করো যেন পিয়ানো বাজাচ্ছ। কম্পিউটারের কি-বোর্ডকে এভাবে পিয়ানোর মতো ব্যবহার করতে আমি জীবনেও কাউকে দেখিনি।

—তো, কথা তো আসলে সত্য। এটাই তো আমার বাজনা। আমার গান। সিমাস হিনির দুই আঙুলের মধ্যে বন্দুক সমতুল্য। সেখানেই তার কলম শ্বাস নেয়, গান গায়।

“Between my fingers and my thumb,

The squat pen rests; snug as a gun.”

আর আমার আঙুলের টুকুশটাকুশ টোকায় আমার লেখা জন্মায়।

—তবে হিনি এভাবে সারা রাত জেগে থেকে সারা জীবন লিখেছেন কি না জানি না যদিও।

—নারীদের সংসার করে লেখক হতে হলে করতে হয়। জানিস, বড় লেখক আমাদেরই ঢাকার বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী প্রতিভা বসুও খুব গুণী লেখক ছিলেন। কিন্তু তাঁর কোনো লেখার টেবিল ছিল না। সবার কাজ শেষে তিনি সিঁড়ির নিচে পা ছড়িয়ে বসে লিখতেন!

—আমরা তা করব না। তোমাদের আসলে আরেকটু স্বার্থপর মানে নিজের প্রতি ফেয়ার হওয়া উচিত ছিল।

—আমরা আসলে নিজেকে ক্ষয় করেই নিজের জন্য সময় খরিদ করেছি।

—তো এখন তো দিনে লিখতে পারো।

—পারি। কিন্তু পারি না দুই কারণে। এক, অভ্যাস। দুই, এত লেখা থাকে যে দিনে-রাতে লিখেও কুলাতে পারি না।

এবার সে আমাকে একটা চুমু দিয়ে আমার মায়ের কথা মনে করায়। আমার মা একবার আমার বাসায় ছুটি কাটিয়ে গাড়িতে উঠার সময় বলেন, ফুরি, তোর বাসাত আর আইতাম নায়। আম্মার প্রচণ্ড অভিমানী স্বর। পাশে দাঁড়িয়ে আছে হলিক্রস স্কুলে পড়া ঈশিতা। সামনে রুস্তমের কোলে সজীব।

—কেনে গো, আম্মা? ভাবলাম নিশ্চয়ই এখানে থাকার সময় তাঁর সঙ্গে কেউ কিছু একটা করেছে।

—তুই আস্তা রাইত গুমাস না। লেখস আর মাজে মাজে বাচ্চাইনরে দেকিয়া যাস। আম্মা আমাদের কাছে এলে বাচ্চাদের সঙ্গে শুতেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাতে তাঁর সমস্যা কী? তিনি যা বললেন তাতে বুঝতাম—তাঁর কন্যা সারা দিন কলেজে পড়িয়ে, বিচিত্রার কাজ করে ঘরে এসে রান্নাবান্না ও বাচ্চাদের দেখাশোনা করার পরেও আবার রাতেও কষ্ট করে! এভাবে তো চলে না। আমার আয়ু কমে যাবে। এখন জায়ান আছি, কিন্তু ষাট হলে ঠিকই টের পাব এবং বাচ্চারা বড় হলে তো কাজ করতে পারি, নাকি?

আম্মার অভিযোগ শোনার পর আমি তাঁকে গাড়ি বারান্দা থেকে ভেতরে নিয়ে আসি এবং বলি আমি হাত তুলে রাখলেও কিন্তু পৃথিবী আমাকে ফেলে ঠিক চলে যাবে। যখন হাত নামিয়ে কাজে যেতে চাইব, তখন ওই সব জায়গা ভরে গেছে। আমাকে শুরু করতে হবে আমার চাইতে ঢের ছোটদের সঙ্গে। আমার প্রজন্মে এটা হবেই। হয় আর্লি স্টার্ট অ্যান্ড ব্রেক অর লেইট স্টার্ট ও জুনিয়র গ্রেডে কাজ। আম্মা তবু বলেন, ষাইট অউক। বুজবে তখন!

ষাট হয়ে গেছে কবে! মা নেই, আছে আমার ঈশিতা। সে আমাকে আলতো করে একটা চুমু দেয়। রাবার ব্যান্ডে খাটো চুলগুলো গুছিয়ে বেঁধে ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দেয়। তারপর তার কন্যা আনাহিতার ঘরে নিঃশব্দে প্রবেশ করে বেরিয়ে জলের বোতল হাতে ওর ঘরের দরজার দিকে পা বাড়ায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা