kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

কবিতায় নিবেদিত রবার্ট ব্লাই ও টমাস ট্রান্সট্রোমারের বন্ধুত্ব

দুলাল আল মনসুর

৫ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



কবিতায় নিবেদিত রবার্ট ব্লাই ও টমাস ট্রান্সট্রোমারের বন্ধুত্ব

দুজন মানুষ তাঁদের মহান সৃষ্টি এবং সৃজনশীল চিন্তা-চেতনা বিনিময়ের মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারেন, তেমন উদাহরণ বিশ্বে অনেক আছে। এমন শিল্পচিন্তার বিনিময় ঘটে আমেরিকার কবি রবার্ট ব্লাই এবং সুইডেনের কবি টমাস ট্রান্সট্রোমারের মধ্যে। তাঁদের বন্ধুত্বের সূত্রে শুরু হয় পত্র যোগাযোগ। পরে দেখা-সাক্ষাৎও হয়। নিজেদের কবিতার অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাড়িয়ে দেন কবিতার বিশ্ববলয়।

রবার্ট ব্লাই আমেরিকার সমকালীন কবিতার অন্যতম কিংবদন্তিতুল্য কবি। জন্ম ১৯২৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায়। প্রাকৃতিক জগৎ, কল্পনাপ্রসূত বিষয় এবং যুক্তির বাইরের অভিজ্ঞতার জগতে স্থাপিত তাঁর কবিতার ভিত্তি। সম্পাদক ও অনুবাদক হিসেবে স্বদেশের ও সারা বিশ্বের কবিতায় এনেছেন নিবিড় সম্পর্কের প্রাণবন্ত প্রবাহ। আমেরিকার নতুন প্রজন্মের কবিতাপ্রেমীদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকাসহ বিশ্বের অনেক অজানা কবির কবিতার সঙ্গে। অনুবাদের মাধ্যমে আমেরিকার কবিতার ওপর জোরালো প্রভাব ফেলেছেন। 

রবার্ট ব্লাইয়ের বাবা-মা জ্যাকব ব্লাই ও এলিস ব্লাইয়ের বংশের শিকড় নরওয়েতে। ১৯৪৪ সালে স্নাতক শেষ করার পর এক বছর কাটান সেন্ট ওলাফ কলেজে, তারপর ভর্তি হন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে প্রাক-স্নাতক ছাত্রদের মধ্যে পান ডোনাল্ড হল, উইল মরগান, অড্রিয়ান রিচ, কেনেথ কোচ, ফ্রাংক ও’হারা, জন অ্যাশবেরি, হ্যারল্ড ব্রডকি ও জন হক্সকে।

১৯৫৪ সালে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৬ সালে ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে চলে যান নরওয়েতে, নরওয়েজীয় কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করার উদ্দেশ্যে। সেখানে নিজের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে পরিচিত হন। তখনকার দিনে যুক্তরাষ্ট্রে খুব কম পরিচিত কবিদের কবিতার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয় রবার্ট ব্লাইয়ের। গুনার একেলফ, হ্যারি মার্টিনসন, জর্জ ট্রাকল ছাড়াও পাবলো নেরুদা, সেজার ভায়েহো, আন্তনিও মাচাদো, রুমি, কবির, হাফিজ প্রমুখের কবিতার স্বাদ গ্রহণ করেন। তখনই সিদ্ধান্ত নেন, যুক্তরাষ্ট্রে কবিতার অনুবাদ প্রকাশের জন্য সাহিত্য ম্যাগাজিন প্রকাশ করবেন। ‘দ্য ফিফটিস’, ‘দ্য সিক্সটিস’, ‘দ্য সেভেনটিস’— এভাবে দশকে দশকে নাম এগিয়ে নিতে থাকেন তাঁর এই সাহিত্য ম্যাগাজিনের। বিভিন্ন ভাষার কালজয়ী কবিদের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন এই পত্রিকায়।

কবি, অনুবাদক ও লেখক টমাস ট্রান্সট্রোমারের জন্ম ১৯৩১ সালের ১৫ এপ্রিল সুইডেনের স্টকহোমে। সাহিত্যামোদীদের সর্বোচ্চ দৃষ্টি আকর্ষণকারী স্ক্যান্ডিনেভীয় কবিদের অন্যতম ট্রান্সট্রোমার। সাহিত্য সমালোচকরা তাঁর কবিতায় প্রকৃতির সৌন্দর্য এক উচ্চমার্গীয় মরমিবাদের মিশেল পান। ট্রান্সট্রোমারের কবিতাকে সবচেয়ে বেশি স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে রূপকের প্রতি তাঁর অস্বাভাবিক ঝোঁক। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘প্রেলিউড’-এর প্রথম পঙক্তি থেকেই রূপকের ব্যবহারের অপরিহার্যতা লক্ষ করা যায়। রূপকগুলোর প্রতিটিই আমাদের পরিচিত অভিজ্ঞতার ওপর নতুন আলো ফেলে। একই সঙ্গে প্রতিটিই নিজস্ব বিষয় থেকেই স্বাভাবিকভাবে উঠে আসতে থাকে। ট্রান্সট্রোমারের মেজাজ হালকা রসে চুবানো নয়, তবে গম্ভীর কথার খাতিরে তিনি রসিক হতেও জানেন। ট্রান্সট্রোমারের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম ‘সেভেনটিন পোয়েমস’, প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। ট্রান্সট্রোমারের কবিতা ৬০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি দেশীয় ও অন্তর্জাতিক বহু পুরস্কার পেয়েছেন এবং তাঁর পুরস্কারের তালিকায় সর্বশেষ যোগ হয়েছে ২০১১ সালের নোবেল পুরস্কার।

১৯৬৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চিঠিপত্র বিনিময় করেন রবার্ট ব্লাই ও টমাস ট্রান্সট্রোমার। চিঠির মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের কবিতা বিনিময় করেন; একে অন্যের অনুবাদের পরিমার্জনা করেন; পারিবারিক ঘটনাবলি, পেশাগত আলাপ, রাজনৈতিক মতামত বিনিময় করেন; যুদ্ধবিরোধী মতামত ভাগাভাগি করেন। উল্লেখ্য, তাঁদের দুজনেরই অবস্থান ছিল যুদ্ধের বিপক্ষে, বিশেষ করে ভিয়েতনাম যুদ্ধের। রিগ্যানের উত্থান সম্পর্কে দুজনই ছিলেন উদ্বিগ্ন। মাঝেমধ্যে তাঁদের দেখাও হয়েছে। কবিতাবিষয়ক আলোচনা এবং কবিতাপাঠের আসর আয়োজন করতে দুজন দুজনকে সহায়তা করেন। তাঁরা বিশ্বপাঠকের কাছে কবিতার পরিচিতি ও পাঠ সহজ করে দেন নিজেদের অনুবাদের মাধ্যমে। তাঁদের চিঠিপত্রের সংকলন নিয়ে ‘এয়ারমেইল : দ্য লেটারস অব রবার্ট ব্লাই অ্যান্ড টমাস ট্রান্সট্রোমার’ নামে একটি বই সম্পাদনা করেন মার্কিন কবি ও সম্পাদক টমাস আর স্মিথ। বইটি প্রকাশ করে প্রকাশক গ্রেউলফ প্রেস।

ব্লাইয়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ শুরু হওয়ার আগেই ব্লাইয়ের বন্ধু কবি জেমস রাইটের কবিতা অনুবাদ করেন ট্রান্সট্রোমার। রবার্ট ব্লাইয়ের সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘দ্য সিক্সটিস’ সম্পর্কে আগেই শুনে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। তাঁর সর্বশেষ কবিতার বই সম্পর্কে শুনে ব্লাইয়ের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়। ১৯৬৪ সালের বসন্তের একদিন ঘটে এক কাকতালীয় ঘটনা : ব্লাই তাঁর খামারবাড়ি থেকে নিজে গাড়ি চালিয়ে মিনিয়াপোলিসের ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার লাইব্রেরিতে গেলেন ট্রান্সট্রোমারের ‘দ্য হাফ-ফিনিশড হ্যাভেন’ বইটি সংগ্রহ করতে। বাড়ি ফিরে দেখেন, স্বয়ং ট্রান্সট্রোমারের পাঠানো একটা চিঠি এসেছে তাঁর নামে। এভাবেই শুরু হলো তাঁদের পত্র যোগাযোগ।

সিক্সটিস ম্যাগাজিনে অনুবাদে সুইডেনের কবিতা সংকলন প্রকাশের পরিকল্পনা করেন রবার্ট ব্লাই। ১৯৭৫ সালে রবার্ট ব্লাই ‘ফ্রেন্ডস, ইউ ড্র্যাংক সাম ডার্কনেস’ নামের কাব্য সংকলনে গুনার একেলফ ও হ্যারি মার্টিনসনের মতো ট্রান্সট্রোমারকেও অন্তর্ভুক্ত করেন। শিরোনামটি নেওয়া হয় ট্রান্সট্রোমারের ‘এলিজি’ কবিতা থেকে। রবার্ট ব্লাই ছাড়াও মে সোয়েনসন, রিকা লেসার, ডন কোলস, জন এফ ডিন ও রবিন রবার্টসন— এঁরা সবাই ইংরেজি অনুবাদে চমকে দেওয়ার মতো ট্রান্সট্রোমারের কিছু কবিতা তুলে আনেন।

নিক্সনের মতো ব্যক্তির প্রতি ব্লাই ও ট্রান্সট্রোমার উভয়েরই ছিল প্রচণ্ড ঘৃণা। ১৯৭৪ সালের চিঠিতে ট্রান্সট্রোমার লেখেন, ‘আপনারা, মানে আপনার দেশের মানুষেরাই তো তাঁকে ভোট দিয়ে বিশাল বিজয় এনে দিয়েছেন।’ যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্ব-ইতিহাসের একটা টালমাটাল সময়ের চিত্রও পাওয়া যায় তাঁদের চিঠিপত্রের মধ্যে। আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিপক্ষে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ জানান রবার্ট ব্লাই। তাঁর দেশের পাঠকরা ব্লাই এবং তাঁর সমমনাদের ডাকে অচেতন অবস্থা থেকে জেগে ওঠে। ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বরের ঘটনাবলির বর্ণনায় ব্লাই জানান, প্রতিবাদ জানানোর সময় একদিন গলওয়ে কিনেল, মিচ গুডমান, ড. স্পক প্রমুখের সঙ্গে তিনিও গ্রেপ্তার হন। তাঁদের একসঙ্গে কারাগারে ঢোকানো হয়। জেলখানায় ঢুকে দেখেন, আগে থেকেই বন্দি আছেন অ্যালেন গিন্সবার্গ। তাঁদের ঢুকতে দেখে গিন্সবার্গ প্রস্তাব করেন, ‘সব কবিই যেহেতু চলে এসেছেন, তাহলে কবিতাপাঠের আসর হয়ে যাক এখানেই।’ তাঁরা সত্যি সত্যি কবিতা পাঠ করা শুরু করেন জেলখানার ভেতরে। তারপর সেখানেই শুরু হলো গান এবং স্লোগানও।

তাঁদের বন্ধুত্বে পাওয়া যায় ঊষ্ণতার উপস্থিতি। হাস্যরসের উপাদান যথেষ্ট রয়েছে তাঁদের চিঠিপত্রের মধ্যে। ব্যক্তিগত অভ্যাসের কথাও এসেছে অনেক। ব্লাইয়ের একটা প্রবণতা ট্রান্সট্রোমারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে : তিনি সহজ-সোজা যেকোনো বিষয়কে সাধারণত ‘ডাক স্যুপ’ বলেন। বিষয়টা লক্ষ করার পর ট্রান্সট্রোমার বেশ কিছু চিঠির শেষে লেখেন, ‘ডাক স্যুপ টমি’। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়েও তাঁদের মধ্যে রসের আদান-প্রদান হয়েছে। ইতালির বর্ষীয়ান কবি ইউজেনিও মন্তালের নোবেল পুরস্কার পাওয়া উপলক্ষে ব্যঙ্গ করে ট্রান্সট্রোমার ব্লাইকে লেখেন, ৮০ বছর বয়স হওয়ার পর রবার্ট ব্লাইও এই পুরস্কার পেতে পারেন। ১৯৭২ সালের সাক্ষাতের পর ফিরে এসে লেখা এক চিঠিতে ট্রান্সট্রোমার লেখেন, ‘আপনার গাড়িটার ক্ষতি করে এলাম বলে দুঃখিত। ব্রেকের অবস্থা কেমন এখন? আগের চেয়ে ভালো? আপনার গাড়িতে উঠার সঙ্গে সঙ্গেই কী যেন হয়ে যায়! ওই একই কারণে আপনার চমৎকারদর্শন ঘোড়াগুলোর একটাতেও চড়া হলো না : আমি উঠলে যদি খোঁড়া হয়ে যায়!’ হালকা রসের সঙ্গে অনেক সময় তাঁদের মধ্যে নিবিড় আন্তরিকতার প্রকাশও দেখা যায়। ১৯৭১ সালের ৩১ মের চিঠিতে ব্লাই তাঁদের ছেলে মিকাহর জন্মের পর ট্রান্সট্রোমারকে লেখেন, ‘আমরা চাই, আপনি এবং মনিকা নবজাতকের দাদা-দাদি হন। সত্যি বলছি, আমরা সেটাই চাই। সামনের অক্টোবরে আপনারা যখন এখানে আসবেন, আপনারা রাজি থাকলে তখনই তার আকিকা করব। শারীরিক কোনো কষ্ট করতে হবে না, শুধু মাঝেমধ্যে আশীর্বাদ করে দিলেই হবে।’ এ রকম চিঠির জবাবে ট্রান্সট্রোমারও আন্তরিকতার সঙ্গে গাঢ় রসের মিশেল দিয়ে ব্লাইকে জানালেন, তাঁর স্ত্রী মনিকা স্বপ্নে দেখেছেন ব্লাই দম্পতির নবজাতককে। তবে বাইরে নয়, মায়ের পেটের মধ্যে। মনিকা দেখেছেন, শিশুটা মায়ের পেটের মধ্যেই বেশ বড় হয়ে গেছে। দেড় বছর বয়সী শিশুটা পেটের মধ্যে বসে ইঁচড়ে পাকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তাকে সহজে বাইরে আনা যাচ্ছে না। ১৯৯০ সালের ৩১ এপিলের চিঠিতে ট্রান্সট্রোমার লেখেন, ‘প্রিয় ওস্তাদ এবং বন্ধু, আপনাকে তো লিখব, ঠিক আছে। কিন্তু আরো অনেককে কেন লিখতে হবে আমাকে? বাস্তব কারণে ইদানীং কত কত চিঠি লিখতে হয়! জবাব দেওয়া হয়নি এমন চিঠির পিরামিডের নিচে আমি চাপা পড়ে আছি। ঘুম থেকে উঠছি চিঠির নিচ থেকে, রাতে ঘুমাতেও যাচ্ছি চিঠির স্তূপের নিচে। আশা করি, আপনার ওখানে সব খবর ভালো। মনিকা এবং আমি তিন সপ্তাহের ভেনিস ভ্রমণ শেষ করে ফিরলাম। ওখানে সত্যিকারের একটা ভৌতিক বাড়িই পেয়েছিলাম থাকার জন্য। ফিরতি পথে ট্রেনে এলাম। এখানে পৌঁছে সকালবেলা স্টকহোমের একটা পত্রিকা হাতে মনিকা চমকে গেল : আমি তথাকথিত নিউস্টাড প্রাইজ পেয়েছি।’ এখানে ট্রান্সট্রোমার রসিকতা করে এত সব পুরস্কার পাওয়ার জন্য ক্ষমাও চান, ‘এত এত পুরস্কার পাওয়ার জন্য মাফ করবেন।’

১৯৯০ সালের ৩০ এপ্রিলের চিঠিতে ট্রান্সট্রোমার একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা জানান : তিনি একদিন এক রাতের জন্য অসলোতে আসেন। ভোরের দিকে বেশ দ্রুত অসলো রেলস্টেশনে পৌঁছে দেখতে পান, রবার্ট ব্লাই তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। অবাক হয়ে তিনি আরো একটু কাছে এগিয়ে আসেন। কিন্তু অপর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পান না। তখন ট্রান্সট্রোমারের মনে হতে থাকে, উনি ব্লাইয়ের কোনো আত্মীয় হতে পারেন। প্রবল আগ্রহের কারণে ট্রান্সট্রোমার প্রায় জিজ্ঞেস করেই ফেলেন, তিনি রবার্ট ব্লাইয়ের আত্মীয় কি না। তবে সময়টা একেবারে ভোর হওয়ার কারণে নিজের আবেগ আপাতত নিয়ন্ত্রণ করেন। ট্রান্সট্রোমার চিঠিতে খানিক রসিকতাও করেন, ‘মনে হয় আপনার প্রেতাত্মাকেই দেখলাম, কী বলেন? তবে লোকটাকে আপনার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড় মনে হলো। আবার এ-ও হতে পারে, আপনার শামানদের মতো অলৌকিক ক্ষমতা আছে। আপনি সে ক্ষমতার বলে মাঝেমধ্যে অসলো রেলস্টেশনে উড়ে এসে দুই মিনিট বিশ্রাম নিতে পারেন, যখন আপনি আসলে মিনেসোটায় আপনার বাড়িতেই ঘুমাচ্ছেন কিংবা কোথাও মানুষজনের সমাবেশে বক্তৃতা দিচ্ছেন।’

আমেরিকায় ট্রান্সট্রোমারের কবিতার বিশাল পাঠকগোষ্ঠী তৈরিতে রবার্ট ব্লাই বিরাট ভূমিকা পালন করেন। একইভাবে আমেরিকার বাইরেও ট্রান্সট্রোমারের কবিতার পাঠক পরিসর বিস্তৃত হয় ব্লাইয়ের ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে আমেরিকার সাহিত্য সমালোচক ক্রিস্টোফার বোনফের মন্তব্য যথার্থই মনে হয়। তিনি বলেন, ‘ট্রান্সট্রোমার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতোই কবি। তবে তাঁর বন্ধু, অনুবাদক এবং সহযোগী কবি রবার্ট ব্লাইও মিশে আছেন তাঁর এ পুরস্কারে।

ট্রান্সট্রোমারের অনুবাদে সুইডেনসহ স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চলের পাঠকরা পেয়েছে ব্লাইয়ের কবিতা। ১৯৭০ সালের এক চিঠিতে ট্রান্সট্রোমার বন্ধু ব্লাইকে জানান, সুইডেনের এক ছোট শহরে এক আসরে তিনি ব্লাইয়ের কবিতার সুইডিশ অনুবাদ পড়ছিলেন। শ্রোতাদের মধ্য থেকে এক স্কুলবালক হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে কবিতাপাঠে আগ্রহ প্রকাশ করে। তাকে কবিতাপাঠের সুযোগ দেওয়া হয়। পাঠ শেষে সে ব্লাইয়ের কবিতার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ট্রান্সট্রোমারের কাছে জানতে চায়।

১৯৯০ সালে ট্রান্সট্রোমার পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁদের যোগাযোগ ছিল। ট্রান্সট্রোমার মারা যান ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল। আমেরিকার মাটিতে শিকড় রেখেই ইয়েটস, রিলকে, লোরকা, নেরুদার কবিতার আকাশে ডালপালা ছড়িয়ে আছেন ৯৪ পেরিয়ে যাওয়া বটবৃক্ষের মতো রবার্ট ব্লাই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা