kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

ধা রা বা হি ক উ প ন্যা স ১১

১৯৭৫

মোস্তফা কামাল

২৯ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



১৯৭৫

মেজর জলিল প্রথমে রবের সঙ্গে মোলাকাত করলেন। তারপর বুকের সঙ্গে বুক মিলিয়ে তাঁকে বিদায় দিলেন। আ স ম রব চলে যাওয়ার পর মেজর জলিল ড্রয়িংরুমে পায়চারি করছেন আর ভাবছেন, দলকে কিভাবে শক্তিশালী করবেন। সারা দেশে সংগঠনের ভিত্তি গড়ে তুলতে না পারলে কাজ হবে না। বঙ্গবন্ধুর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার মধ্যে নতুন একটি রাজনৈতিক দলকে জনপ্রিয় করা কঠিন। তার পরও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নতুন প্রজন্মের ছেলেপেলেদের ছাত্রলীগে টানতে হবে। তাদের টগবগে রক্ত; উদ্দীপ্ত চেতনাকে কাজে লাগাতে হবে।

টেলিফোন বেজে ওঠার শব্দ শুনে চমকে ওঠেন মেজর জলিল। তিনি ফোন ধরে শুধু হ্যালো বললেন। আর কোনো কথা বললেন না। শুধু শুনলেন। তারপর হনহন করে বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন।

 

এগারো.

প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন লেখক-সাংবাদিক খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী মোহাম্মদ হানিফের মাধ্যমে তিনি তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় চেয়েছেন। তিনি জানেন, প্রধানমন্ত্রী শত ব্যস্ততার মাঝেও তাঁকে সময় দেবেন। কারণ শেখ মুজিব তাঁকে ভীষণ পছন্দ করেন। লেখক-সাংবাদিক হিসেবে তো বটেই, শেখ মুজিবের একজন প্রিয় মানুষও তিনি। বিশেষ করে তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ শেখ মুজিবকে ভীষণ আকৃষ্ট করে। বইটি প্রকাশিত হয় উনিশ শ সাতান্ন সালে। এর পর থেকেই শেখ মুজিবের কাছে তাঁর গুরুত্ব বেড়ে যায়। সর্বমহলেই তিনি দামি লেখক হিসেবে সমাদর পেতে থাকেন। পত্রিকায় তাঁর লেখা বিশেষ আগ্রহ নিয়ে মানুষ পড়ে। এ দেশের শিক্ষিত সমাজের কাছে তিনি গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসেবে মর্যাদা লাভ করেন।

একটি গ্রন্থ একজন লেখককে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তা নিশ্চয়ই সবাই উপলব্ধি করতে সক্ষম। শুধু ভালো লেখার কারণেই নয়, গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার আরেকটি বড় কারণ তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বইটি দু-দুবার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কারাগারেও যেতে হয় লেখককে। এর ফলে বইটি পড়ার জন্য পাঠকদের ব্যাপকভাবে আগ্রহ তৈরি হয়। ভাসানী সাহেবের ইউরোপ সফর নিয়ে এত চমৎকার করে তিনি লিখেছিলেন যে সেটি সত্যিই পাঠকদের হৃদয় ছুঁয়েছিল। খুব নাড়া দিয়েছিল।

বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে দু-চার কথা না বললেই নয়। উনিশ শ চুয়ান্ন সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগকে সমূলে উৎপাটন করে ক্ষমতায় আসে যুক্তফ্রন্ট। যুক্তফ্রন্টের তিন কাণ্ডারি হিসেবে পরিচিত ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। শেরেবাংলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মওলানা ভাসানী গেলেন ইউরোপে। সঙ্গে নিলেন তাঁর আজীবনের সঙ্গী একটি মাত্র স্যুটকেস, যার দৈর্ঘ্য ষোলো ইঞ্চি। এর মধ্যে জায়গা পেয়েছে একটি গামছা, একটি লুঙ্গি, একটি খদ্দরের পাঞ্জাবি, একটি টুপি, কিছু তামাকপাতা আর চুনের একটি ডিব্বা।

ইউরোপে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসও সফরসঙ্গী ছিলেন। বিধির কী লীলাখেলা! ইউরোপ সফরে যাওয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল এবং ৯২-ক ধারা জারি করে। এতে মওলানা ভাসানীর দেশে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ইউরোপে থাকাকালে তাঁদের বিচিত্র অভিজ্ঞতার বয়ান দেওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তানে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি ও বিশ্বপরিস্থিতি লেখক উপন্যাসের ঢঙে তুলে ধরেন।

লেখক খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস কয়েক বছর ধরে মুজিববাদের দর্শন নিয়ে কাজ করছেন। মুজিববাদ নিয়ে বই লেখার অভিপ্রায় তাঁর। কিন্তু মুজিববাদ নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন আছে। কেন মুজিববাদ? এর মূলে কী আছে? কেন মুজিববাদের দর্শন নিয়ে এত কথাবার্তা; এত আলোচনা?

লেখক ইলিয়াস তার জবাব দেন এভাবে, মুজিববাদ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের চর্চিত ও প্রচারিত রাজনৈতিক দর্শন বা মূল্যবোধের সমষ্টি। তার রাজনৈতিক দর্শনের চার মূলনীতি হলো—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। বঙ্গবন্ধু নিজেই উনিশ শ বাহাত্তর সালের সাতই জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বলেছেন, আগে তাঁর স্লোগান ছিল ছয় দফা। এখন চার স্তম্ভ। স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণীত হলে মুজিববাদের চার স্তম্ভ রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হয়। সংগত কারণেই মুজিববাদের প্রথম স্তম্ভ হচ্ছে জাতীয়তাবাদ।

শেখ মুজিব মনে করতেন, বাংলাদেশের সব অধিবাসী বাঙালি। বাঙালি সংস্কৃতিতে কোনো ভেদাভেদ নেই। বাংলা ভাষা ও আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করাই মুজিববাদের মূল লক্ষ্য। তিনি তাঁর বক্তৃতায় সর্বস্তরে বাংলা চালুর তাগিদ দেন। তিনি মনে করিয়ে দেন ভাষার জন্য বাঙালির রক্তদানের কথা। তিনি নিজেও অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। জেল খেটেছেন। অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। এর মধ্য দিয়েই মুজিববাদের ধারণা জন্মলাভ করে। বলা হয়ে থাকে, একাত্তর সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে যে মতাদর্শের শাসন কায়েম হয়েছে সেটাই মুজিববাদ। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রও মুজিববাদের অন্যতম ভিত্তি। 

খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস মনে মনে ভাবেন, মুজিববাদ নিয়ে বই লিখতে হলে শেখ মুজিবের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তা না হলে বইটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যাঁর দর্শন নিয়ে বই লিখব তাঁর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করব না; তা কি হয়! যাঁর দর্শন তাঁর মুখ থেকেই সরাসরি শুনতে হবে। পাঠকের সামনে তা তুলে ধরতে হবে। তাহলে বইটি সব মহলে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

গণভবন থেকে লেখককে জানানো হলো, ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর সড়কের বাড়িতে শেখ মুজিব তাঁকে চায়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। চা খেতে খেতে তিনি লেখকের সঙ্গে কথা বলবেন। অবশেষে নির্ধারিত সময়েই শেখ মুজিবের সঙ্গে লেখকের দেখা হলো। কুশল বিনিময় হলো। চা-নাশতা দেওয়া হলো। শেখ মুজিব লেখককে চা-নাশতা খেতে অনুরোধ করলেন। নিজেও চা নিলেন। তারপর রাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে কথাবার্তা হলো। একপর্যায়ে লেখককে উদ্দেশ করে শেখ মুজিব বললেন, ইলিয়াস সাহেব, আপনি মুজিববাদ নিয়ে গবেষণা করছেন। আপনি সম্ভবত একটি বই লিখতে চান? আমি আপনাকে কিভাবে সহযোগিতা করতে পারি?

খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস বললেন, জি বঙ্গবন্ধু। অনেক দিন ধরে গবেষণা করছি। এটি এখন বই আকারে প্রকাশ করতে চাই। আপনার সঙ্গে কথা না বলে তো সেটি সম্ভব নয়! আপনার কাছে আমার কিছু প্রশ্ন আছে।

শেখ মুজিব বললেন, খুব খুশি হলাম। আপনি ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন। আচ্ছা, আপনার কী প্রশ্ন বলেন?

খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস বললেন, বঙ্গবন্ধু, আমরা দীর্ঘকাল আপনার রাজনৈতিক জীবনের সংস্পর্শে থেকে লক্ষ করে এসেছি যে বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহাসিক ধারার বিকাশ ও বাঙালি জাতির চেতনার স্তর বিবেচনায় রেখে আপনি এ দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট পথনির্দেশ দিয়ে আসছেন। নিজস্ব একটি মতবাদ ব্যক্ত করে আসছেন। এখন আমার প্রশ্ন—আপনি জিন্নাহবাদ, গান্ধীবাদ, নাসেরবাদ, ইহুদিবাদ, মাওবাদ, টিটোবাদ, লেনিনবাদ ও মার্ক্সবাদের আলোকে আপনার মতবাদের মূল্যায়ন সম্পর্কে কী ভাবছেন?

শেখ মুজিব জবাবে বললেন, দেখুন, ছাত্রজীবন থেকে আজ পর্যন্ত আমার এই সুদীর্ঘকালের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের কতিপয় চিন্তাধারার ওপর গড়ে উঠেছে। এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী তথা সব মেহনতি মানুষের জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সাম্য প্রতিষ্ঠাই আমার চিন্তাধারার মূল বিষয়বস্তু। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। কাজেই কৃষকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে আমি জানি শোষণ কাকে বলে। এ দেশে যুগ যুগ ধরে শোষিত হয়েছে কৃষক, শোষিত হয়েছে শ্রমিক, শোষিত হয়েছে বুদ্ধিজীবীসহ সব মেহনতি মানুষ। এ দেশে চলে জমিদার, জোতদার, মহাজন ও তাদের আমলা টাউটদের শোষণ। শোষণ চলে ফড়িয়া, ব্যবসায়ী ও পুঁজিবাদীদের। শোষণ চলে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও নয়া উপনিবেশবাদের। এ দেশের সোনার মানুষ, এ দেশের মাটির মানুষ শোষণে শোষণে একেবারে দিশাহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের মুক্তির পথ কী—এ প্রশ্ন আমাকেও দিশাহারা করে ফেলে। পরে আমি পথের সন্ধান পাই।

 শেখ মুজিব আরো বলেন, আমার কোনো কোনো সহযোগী রাজনৈতিক দল ও প্রগতিশীল বন্ধুবান্ধব বলে শ্রেণিসংগ্রামের কথা। কিন্তু আমি বলি জাতীয়তাবাদের কথা। জিন্নাহবাদ এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িকতাবাদের বিষবাষ্প। তার জবাবে আমি বলি, যার যার ধর্ম তার তার। এরই ভিত্তিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের কথা। সেই সঙ্গে বলি গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের কথা। শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সমাজতন্ত্র চাই। কিন্তু রক্তপাত ঘটিয়ে নয়। গণতান্ত্রিক পন্থায়; সংসদীয় বিধি-বিধানের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করতে চাই সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। আমার এই মতবাদ বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করেই দাঁড় করিয়েছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, যুগোস্লাভিয়া নিজ নিজ অবস্থা মোতাবেক গড়ে তুলছে সমাজতন্ত্র। আমি মনে করি, বাংলাদেশকেও অগ্রসর হতে হবে জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র—এই চারটি মূল সূত্র ধরে। বাংলাদেশের নিজস্ব পথ ধরে। আমার এই মতবাদকে অনেকে বলছে মুজিববাদ। এ দেশের লেখক, সাহিত্যিক কিংবা ঐতিহাসিকগণ আমার চিন্তাধারার কী নামকরণ করবেন সেটা তাঁদের ব্যাপার; আমার নয়। নামকরণের প্রতি আমার কোনো মোহ নেই। আমি চাই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। আমি চাই আমার স্বপ্ন সোনার বাংলা নির্মাণের পূর্ণ বাস্তবায়ন। 

লেখক খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসকে উদ্দেশ করে শেখ মুজিব বললেন, ইলিয়াস সাহেব, আপনি নিশ্চয়ই আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন?

জি জি পেয়েছি। আপনি অনুমতি দিলে মুজিববাদ নামেই বইটি প্রকাশ করব।

শেখ মুজিব হাসলেন। তারপর বললেন, অনুমতি তো পেয়েই গেলেন। সময়টা ভালো বেছে নিয়েছেন। বইটির ভালো কাটতি হবে।  

খোন্দকার ইলিয়াস মুজিববাদ বইটি প্রকাশের অনুমতি পেয়ে খুশিতে আটখানা। উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে বললেন, বঙ্গবন্ধু আপনার দর্শন; কাটতি না হওয়ার উপায় আছে! আমি কৃতজ্ঞ। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ বঙ্গবন্ধু।

শেখ মুজিব হাসি হাসি মুখ করে বললেন, বই বের হলে আমাকে একটা কপি দিয়েন কিন্তু!

অবশ্যই বঙ্গবন্ধু, অবশ্যই। আমি নিজে এসে দিয়ে যাব। এবার আপনি অনুমতি দিলে আমি যেতে চাই।

ঠিক আছে। ভালো থাকবেন।

চলবে ►►

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা