kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

কলাপাতায় মালিশ

নাসিমা আনিস

২৯ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কলাপাতায় মালিশ

অঙ্কন : মাসুম

কুহেলি কুহুকে আচ্ছন্ন কোনো কবিতা আমি লিখতে পারিনি জীবনানন্দ দাশের মতো সত্যি কিন্তু আমি যে কবি সে কথা কেউ অস্বীকার করলে আমি মানব কেন! আর এখন দেশ ছেড়েছি বলে কবিতা ছেড়েছি, এ কথা বলে রাগাবেন না প্লিজ। ডিভি পেয়ে এসেছি, দেশভাষা তো ছাড়িনি বাহে! ছাড়িনি কবিতা, কবিতাও আমাকে ছাড়েনি। এই বিপৎকালে এসব মনে আসে কেন, সত্যি আসে আমার। এমন হতে পারে কিন্তু। হাসপাতালে কোনো কঠিন সময়েও আমার মাথায় কখনো চটুল একটা গানের সুর গুনগুন করে, করেই চলে অহেতুক, কেন এমন হয় আমি জানি না।

এখন এসব এলোমেলো ভাব আর একটা বেদনাভরা চাঁদ মাথার ওপর বিষাদ ছড়ালে এসব মাথায় আসে! ক্লান্তিতে কুয়াশার মতো ঝরে পড়ার উপক্রম হলে এসব মনে পড়ে। রোগীর সেবা করে তিন রাত তিন দিন নির্ঘুম কাটার পর এসব মনে আসে। তিনটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে যাওয়ার মুহূর্তে শ্বাসকষ্ট তাঁর—ভেঙে পড়তে পড়তে একবার শুধু অস্ফুট বলেছি মরে যাব এবার সত্যি! নাহ্ কেউ শুনতে পায় সেভাবে তো বলিনি। উবার ডেকে উত্তেজনা বশে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে আছি ম্যানহাটানের একা রাস্তায়। যেন গাড়িটা অন্য কেউ নিয়ে নেবে ঢাকার রিকশার মতো নজর এড়ালেই, দেরি হলে জোর করে লাফিয়ে উঠে পড়বে ছিনতাইকারীর মতো আর আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকব!

মধ্যরাতের ফাঁকা রাস্তা, বারো ডিগ্রি সেলসিয়াসের কোমল ঠাণ্ডা। শীতটা আমাদের বসন্তের শিমুলগাছের পাঁচ পাতার ঘূর্ণির মতো, ফুল-ফল শেষ হয়ে কচি পাঁচ পাতা মতো, বাতাসটা বুকে লাগে, মুখে লাগে কারো মুখ ভেসে ওঠে, কবিতার চরণও আসতে পারে মৃদু পায়ে! কিন্তু আমি কাঁপছি তিরতির করে। আমার হাতের গ্লাভসটা এলোমেলো করে পরা তাড়াহুড়ায়, ঠিক করার সময় নেই। এত এত ভাবছি, ভাবনার সময় আছে কিন্তু ঠিক করতে গেলেই যেন কোনো অনাসৃষ্টি আমায় পেয়ে বসবে, আমি উবার মিস করব কিংবা পেছন থেকে শাহজাদি ডেকে বলবে, মা, বাবা কেমন করছে, বাবার কষ্ট হচ্ছে! আপনাদের এমন হয় না! একই সঙ্গে অঙ্গে মনে এবং অন্যে!

 সামান্য কুয়াশা থাকায় রাস্তার আলো রহস্য সৃষ্টি করতে পারেনি। এখন কি জ্যৈষ্ঠ মাস পড়েছে, মে মাসের অর্ধেক! খুব গরমে গাছে গাছে আম ঝুলছে, টুস করে পড়বে পড়বে ভাব!

 বারোটা বেজে গেছে ঘড়িতে, বেজে যাবে কারো জীবনের বারোটা এটা মানতে পারছি না জ্যৈষ্ঠ মাস পড়ুক না পড়ুক।

 লাইন দিয়ে বসে আছি বাইরের বাড়ির দালানের রোয়াকে, হাওয়া দিচ্ছে বেশ, বৈশাখ মাস। ডানের কতবেলগাছটার পাতার ফাঁক গলে জ্যোত্স্নার ছিটে ছিটে আলো পড়েছে লেপা উঠানে। বেশ জ্যোত্স্না, মা বললেন। বড় ভাই কলাপাতা দিচ্ছেন আর বলছেন, ধুয়ে দিয়েছি ইডিয়েট এত শুঁকতে হবে না নাকে নিয়ে! মেজো ভাই সাদা ভাতের ওপর মালিশ দিচ্ছে এক হাতা করে। খাসির চর্বি দিয়ে মিষ্টিকুমড়া আর বেগুনের মালিশ। তার পরই এলো লাল লাল খাসির কষা মাংস, ঘরে পালা খাসি।

—যা হবে না! কবজি ডুবিয়ে খাব, মেজো ভাই কয়বার যে বলল!

 মা আজকে রাজরানি, বসে আছেন বেতের একটা চেয়ারে—রান্না কি পরিবেশন থেকে আজ মুক্তি। ভেতর ঘরে নানি, এশার নামাজ পড়ে আসবেন, তারপর দুজনে বসবেন তিন ছেলের সাথে। বড়’পা বাচ্চাদের নিয়ে বসেছে আমাদের সাথে, তিনি আর বড় দুই ভাবি খাদেম হবেন তখন। শেষপাতে অমৃত টক-মিষ্টি দই, নানির হাতে পাতা, ভাণ্ড উল্টে পরীক্ষা করেছে মেজো ভাই—ম্যাজিক। নানি তো এ বাড়ির একজন, পনেরো বছরে বিধবা এক কন্যা নিয়ে—পীর সাহেবের কন্যা, ব্রিটিশ দারোগার স্ত্রী! নাতি-নাতিনরাই তাঁর ছেলে। শহরে যাওয়ার সময় বুকের সাথে বুক মিলিয়ে বলবেন, ছেলে আমার! আর মা একটু দূরে, সামান্য পেটে ধরার হকদার।

আরেকটু দই! মেজো ভাই হাতাটা এগিয়ে দিতেই কে বলে উঠল, ওসব নিয়ে ভেতরে যাও, কাল বৈশাখী শুরু হয়ে গেছে! নানি দরোজায় দাঁড়িয়ে, —ছাগলের ঘরের দরোজাটা ভালো করে বেঁধে দাও গো গিয়ার মা, উড়িয়ে নিয়ে গেল ...! কলাপাতা উড়ছে, মায়ের আঁচল উড়ছে, এক দিনের রাঁধুনি বড় ভাইয়ের গামছা ঘাড় থেকে উড়ে কতবেলগাছে নাকি কোথায়!

 জ্যৈষ্ঠ এলো কি! মৃদু হাওয়া, কনকনে নয়, উবার আসবে, আসবে তো!

 ঘরে চাল-ডাল ছাড়া মাছ-মাংস-ফল কিচ্ছু নেই, সকালে অর্ডার করতে গেছি, মৃদুস্বরে বলে, স্যরি ম্যাম...। তখনো ওর হালকা জ্বর, লেবু আর আদাজল সাপ্লাই দিচ্ছি, এসবও শেষ হয়ে আসছে। তখন শাহজাদি মৃদুস্বরে বলে, মা, আমার গলায়ও ব্যথা।— যাও ভাপ নাও, ও আল্লাহ তোরও!

কুকুরের কান্না কোনো দিন শুনিনি এ দেশে, আজকে সন্ধ্যা থেকে পাশের বাড়ির বেজমেন্ট থেকে কুকুরের চাপাকান্না ভেসে আসছিল, তখনই বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা হতে চলেছে। মিসেস ব্রুচের জানি না কী অবস্থা। পরশু অ্যাম্বুল্যান্স এসে নিয়ে গেছে বৃদ্ধাকে, তিন দিন আগে গেছে ওর স্বামী —এখন সে ভেন্টিলেটরে।

রাত দশটায় ভিডিও কনফারেন্স ডেকেছে ঢাকা থেকে রিতু, সব কটা পরিবার অংশ নেবে, কে কেমন আছে! কিন্তু আমি ফোন কেটে দিয়েছি বারবার, প্যানিক করে লাভ কী! চোখে ঘুম নেই কতকাল। পাগলের মতো সন্ধ্যায় তিনটা ডায়জিপাম খেয়ে শুতে গেছি দেখি হু হু করে জ্বর আসছে আমার, না গলায় ব্যথা নেই, নাকে সর্দিও নেই। এখন নেই, আসতে কতক্ষণ!

এখন দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে, হাঁটু ভেঙে আসছে। চোখ ঝাপসা—দূরে কোনো গ্রোসারি শপ নাকি ডিপার্টমেন্টাল শপ, বাতি জ্বলছে লাল আর সোনালি, না লাল আর সবুজ কিংবা অন্য কোনো রঙের আলো! আকাশটা কবিতার মতো, উপুড় করা মায়া। টলটল করছে হালকা মেঘ। বৈশাখের কুচকুচে কালো মেঘ যদি হতো, ঠাণ্ডা বাতাস দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত তারপর তছনছ, শৌখিন রাঁধুনির গামছার মতো সব উড়িয়ে নিয়ে যেত—রোগ-শোক উবার অ্যাম্বুল্যান্স মায় আমি, সবটা সব কিছু। রাস্তাটা টলটল করে জলে, আমি চেয়ে দেখি কী যেন কিলবিল করে জরির মতো নাকি খেয়ে ফেলা আমড়ার বিচির মতো। আমি তো চোখে মাইক্রোস্কোপ দিইনি, সামান্য মাইনাস থ্রি পাওয়ার চশমা। সেই মহিলা, যে এসেছিল কিলবিল জীবাণু ছড়াতে, সে সাদা স্কার্টে উড়ে উড়ে যাচ্ছে বৈশাখের ঝড়ে—হ্যাঁ ভাবি, সে মহিলা ডিটেক্ট হয়েছে নাকি, সে সব পাবলিক প্লেসে গেছে, মানুষের গা ঘেঁষে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাঁচি-কাশি দিয়েছে, দেবে না কেন, ওইটাই তো তার অ্যাসাইনমেন্ট, হায় আল্লাহ, আর কোনো চীনাকে বিশ্বাস করবেন না, ওরা খুব হারামি, দেখলেন না ইউটিউবে সালমান শাহের মৃত্যুর জন্যও তো ওরা দায়ী, ওই যে আমেরিকা থেকে এক মহিলা তো বলেই দিয়েছে সালমান শাহের হত্যাকারী কে। জুতা বানাতে গিয়েছিল বাংলাদেশে কত বছর আগে ওই যে আজিমপুর চায়নিজ বিল্ডিং, জানেন না! অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করেছে। এখন আমেরিকাকে হুমকি মনে করছে, ট্রাম্প তো বলেই দিয়েছেন পরীক্ষাগারে বানানো ভাইরাস, অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে কতজনকে পাঠিয়েছে কী করে জানব ভাবি—অন্তত পাঁচজন! অপর প্রান্ত থেকে ভাবির একই কথা, চীনা এক মহিলা দিয়ে গেছে আরো হয়তো কেউ।—আমার পাশের বাসার বৃদ্ধ ভেন্টিলেটরে, বৃদ্ধা হাসপাতালে গেল, মনে হয় না বাঁচবে, হায় আল্লাহ কী হবে ভাবি!

—এই আন্দাজে-বান্দাজে কী সব ফোনে বলছ!

চাঁদটা যেন নেমে আসতে চাইছে, তার কি এই ভাইরাসের সাথে মিতালির ইচ্ছে! ওহে এ যে বিধ্বংসী করোনা বোমা, এর সাথে কী তোমার, কেন ভাব!

 তিনটা পামগাছ, নান্দনিক নিশ্চয়, এখানে তো সবই তাই, ঝড়ে মাথা উড়ছে। টুং করে একটা শব্দ এলো মেসেঞ্জারে, তারপর আরো কয়েকটা হয়তো, আমার পা কাঁপছে, পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে, পা গেঁথে যাচ্ছে, না আমার তো কিছু হয়নি, আমি ঠিক আছি। শাহজাদির বাবার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, শাহজাদির গলা ব্যথা, আমার সামান্য জ্বর... উবার আসবে কি! নাকি অ্যাম্বুল্যান্স!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা