kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

ধারাবাহিক উপন্যাস

১৯৭৫

মোস্তফা কামাল

৩ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



১৯৭৫

 

চার.

ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ির সংস্কারকাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। শেখ মুজিব ভাড়া বাড়ি ছেড়ে সবাইকে নিয়ে ৩২ নম্বরের বাড়িতে ওঠেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়িটির বিপুল ক্ষতি সাধন করা হয়। তাই সংস্কারকাজ শেষ করতেও কিছুটা বিলম্ব হয়। আর বাড়ি বদলের কাজ সত্যিই বড় কষ্টকর। সব কিছু গোছগাছ করার ধকল ফজিলাতুন্নেছাকেই সামলাতে হয়।

শেখ মুজিবের নির্দেশে সারা দেশে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলতে ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন শেখ মুজিব। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশটির সংবিধান প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে। ব্যস্ততার মধ্যেও শেখ মুজিব এক দিনের জন্য কলকাতা সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ এর আগে ১০ জানুয়ারি দিল্লি হয়ে ঢাকা ফেরার সময় কলকাতাও তাঁর সংবর্ধনার আয়োজন করেছিল। সময়ের অভাবে তখন তিনি কলকাতায় যেতে পারেননি। তিনি তখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারকে কথা দিয়েছেন, খুব শিগগির তিনি কলকাতা সফরের সময় বের করবেন।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বাংলাদেশের শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে, খাদ্য দিয়ে যে সহযোগিতা করেছে তা কখনো ভোলার নয়। মানবিকতা তো আর সরকারি আদেশ দিয়ে হয় না। মানবিকতা নিজের ভেতর থেকে তৈরি হয়। পশ্চিমবঙ্গের জনগণকে কৃতজ্ঞতা জানাতে অবশ্যই নিজের উদ্যোগেই তাঁর কলকাতা সফর করা উচিত বলে মনে করেন শেখ মুজিব।

সিদ্ধান্ত নিতে শেখ মুজিব দেরি করলেন না। অল্প কদিন পরই কলকাতা সফরে যান। তাঁকে স্বাগত জানাতে দিল্লি থেকে কলকাতায় ছুটে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। কলকাতায় দমদম বিমানবন্দরে বাঙালি জাতির জনককে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। পরে গড়ের মাঠে এক মহাসমাবেশের আয়োজন করা হয়। শেখ মুজিবকে একনজর দেখার জন্য লাখ লাখ মানুষ সমাবেশস্থলে উপস্থিত হয়। সেখানকার মানুষের মধ্যেও এক ধরনের স্বাধীন স্বাধীন ভাব। যেন তারাও হানাদারমুক্ত হয়েছে, স্বাধীনতা লাভ করেছে।

মহাসমাবেশে শেখ মুজিব বক্তৃতার শুরুতেই ভারতের জনগণ, সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আপনাদের সহযোগিতা না পেলে আমরা এত দ্রুত স্বাধীনতা পেতাম না। আপনাদের সহযোগিতার কথা আমরা চিরদিন মনে রাখব।

স্বাধীন বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করে শেখ মুজিব বলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে মানুষ করোনি।’ কিন্তু তিনি বেঁচে থাকলে আজ দেখতে পেতেন, বাঙালি মানুষ হয়েছে।

কলকাতা সিটি করপোরেশন শেখ মুজিবের সম্মানে নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করে। তিনি কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পরে কলকাতা রাজভবনে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। বৈঠকের শুরুতেই শেখ মুজিব ইন্দিরা গান্ধীকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি আপনার সেনাবাহিনী ফিরিয়ে আনবেন কবে?

এ প্রশ্নে ইন্দিরা গান্ধী কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার অল্প কদিনের মাথায় শেখ মুজিব ভারতীয় সেনা ফিরিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলবেন, তা কল্পনাও করেননি। তিনি বিব্রত ভঙ্গিতে বলেন, বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তো এখনো নাজুক। পুরো পরিস্থিতি বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা কি বাঞ্ছনীয় নয়? আপনিই বিষয়টা চিন্তা করে দেখুন। তবে আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে।

পরে সিদ্ধান্ত হয়, ১৭ মার্চ শেখ মুজিবের জন্মদিন। ওই দিনই ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার শুরু হবে। শেষ হবে ২৫ মার্চ।

ইন্দিরা গান্ধীর মুখে শেখ মুজিব এ রকম অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তের কথা শুনবেন, তা ভাবতেই পারেননি। তিনি তাঁকে অবাক করে দিয়েছেন। অন্যরাও অবাক বিস্ময়ে ইন্দিরা গান্ধীর দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছুক্ষণ ধরে সবাই একদম চুপ হয়ে আছেন। কী বলবেন তা নিয়ে ভাবছেন। অতঃপর শেখ মুজিব ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আপনি আবারও প্রমাণ করলেন, আপনি মহান নেতা! আপনাকে বাংলাদেশের জনগণ বরণ করতে চায়। ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে চায়। আপনি কবে সময় দেবেন? কবে ঢাকায় আসতে পারবেন বলেন।

ইন্দিরা গান্ধী হাসি হাসি মুখ করে বললেন, আসব, অবশ্যই আসব।

না না! শিগগিরই আপনাকে আসতে হবে। বাংলার মানুষ আপনাকে অভ্যর্থনা দিতে প্রস্তুত হয়ে আছে। আপনি যা করলেন তা চিরদিন বাঙালি মনে রাখবে। অবশ্যই মনে রাখবে।

শেখ মুজিবের কথায় খুশি হলেন ইন্দিরা গান্ধী। তিনি বললেন, আমি শিগগিরই ঢাকায় আসব। দিল্লিতে গিয়ে আমার কার্যসূচিটা দেখে আপনাকে জানাব।

আমি কিন্তু আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকব।

ইন্দিরা গান্ধী কোনো কথা না বলে সম্মতিসূচক মুচকি হাসি দিলেন।

শেখ মুজিব দেশে ফেরার পর খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। দিল্লি গিয়েই ইন্দিরা গান্ধী পররাষ্ট্র দপ্তরের মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন তাঁর ঢাকা সফরের কর্মসূচি। তিনি স্বাধীনতার মহানায়ক শেখ মুজিবের জন্মদিনে ঢাকায় থাকবেন বলে জানানো হলো। আর তার আগেই ভারতীয় সেনাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। এ কথা শুনে চমকে উঠলেন শেখ মুজিব। এভাবে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে মূল্যায়ন করবেন তা তিনি চিন্তাও করেননি। তিনি আনন্দে উদ্বেলিত। মনে মনে ভাবেন স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে ইন্দিরা গান্ধীর অসামান্য ভূমিকার কথা। আমাকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করতেও ইন্দিরা গান্ধী ব্যাপক অবদান রেখেছেন। তাঁকে আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করব? তিনি সফরের তারিখ ঘোষণা করে আমাকে যেমন চমকে দিয়েছেন; তেমনি আমিও এমন সংবর্ধনা দেব, যাতে তিনিও চমকে যান। কিন্তু শেখ মুজিবের জন্য যে আরো চমক অপেক্ষা করছিল তা তিনি টের পেলেন পরে।

ইন্দিরা গান্ধীও মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁর ঢাকা সফরের আগেই তিনি ভারতীয় সেনা দেশে ফিরিয়ে নেবেন। তা না হলে মুজিব হয়তো আবার বলে বসবেন। বৈঠকে বিব্রত হওয়ার চেয়ে ধন্যবাদ পাওয়া অনেক ভালো।

ইন্দিরা গান্ধী অবশ্য এও ভাবেন, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের নিরাপত্তার স্বার্থে আরো বেশ কয়েক মাস মিত্র বাহিনীর অবস্থান করা প্রয়োজন। স্বাধীনতা পাওয়ার চেয়ে রক্ষা করা কঠিন! কিন্তু এখন এ বিষয়ে মুজিবকে কিছুই বলা যাবে না। উনি দেশ স্বাধীন করেছেন। উনার চাওয়ার মূল্য অবশ্যই দিতে হবে।

অবশেষে ১২ মার্চের মধ্যে ভারতের সব সেনা ফিরিয়ে নেওয়া হলো।

এত দ্রুত ভারতীয় সেনাবাহিনী দেশে ফিরে যাবে—এটা ছিল সবার কল্পনার বাইরে। ভারতীয় সেনারাও ভাবেনি, তাদের এত দ্রুত ফিরিয়ে নেবে। তারা ধরেই নিয়েছিল, কয়েক যুগ তাদের বাংলাদেশেই থাকতে হবে। তা ছাড়া দেশে এখনো স্থিতিশীলতা আসেনি। যুদ্ধের পর অস্ত্র জমাদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। আমজনতার হাতেও অনেক অস্ত্র। দেশের ভেতরেও শত্রুরা লুকিয়ে থাকতে পারে। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভা তখনো ঠিকমতো বসতে পারেনি। এ সময় যদি কোনো অঘটন ঘটে! সামাল দেবে কিভাবে? ক্যুও তো হতে পারে!

এমন প্রশ্ন ও শঙ্কা সবার মনেই দানা বাঁধে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই বিস্মিত হয়ে শেখ মুজিবের বাড়িতে ছুটে গেলেন। তাঁদের মধ্যে তাজউদ্দীনও আছেন। তিনি উদ্বিগ্ন হয়েই শেখ মুজিবের কাছে জানতে চাইলেন, মুজিব ভাই, কী ঘটনা! ভারতীয় সেনারা যে চলে গেল!

কেন, অসুবিধা কী?

এ পরিস্থিতিতে এখনই ভারতীয় সেনাদের চলে যাওয়াটা কি ঠিক হলো! এখনো অনেকের হাতে অনেক অস্ত্র! সুযোগসন্ধানীরা সুযোগ নিতে পারে না!

শোনো, আমি নিজেই ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছি তাঁর সেনা ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু এত বড় চমক উনি আমাকে দেবেন তা আমি নিজেও ভাবিনি। যা হোক, আমি বলব ভালোই হয়েছে। দেশ স্বাধীন হইছে। এখন আর ভারতীয় সেনা দেশে রাখা ঠিক হবে না। আমাদের সমস্যা আমাদেরই সামলাতে হবে।

সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আমরা তো এখনো ঠিকমতো বসতে পারলাম না। আমাদের না আছে পুলিশ বাহিনী; না আছে সেনাবাহিনী।

তুমি চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। নজরুল, তুমি কিছু বলবে মনে হচ্ছে।

আপনার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে, মুজিব ভাই। তবে আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করা উচিত। সৈয়দ নজরুল ইসলাম বললেন।

সৈয়দ নজরুলের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গলা ঝেড়ে সামাদ আজাদ বললেন, আমরাই বোধ হয় প্রথম দেশ যে, স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তাদানকারী দেশের সেনাদের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটা আমাদের বড় ধরনের একটা অর্জন।

সামাদ আজাদকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ মুজিব বললেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। আমরা নিজেরা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করি, তাহলে কোনো সমস্যাই সমস্যা না। আচ্ছা শোনো, তোমাদের দুজনকেই বলি। ইন্দিরা গান্ধী ঢাকায় আসছেন। তাঁকে এমন সংবর্ধনা দিতে হবে, যাতে উনি নিজেই চমকে যান। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসংবর্ধনা ও সমাবেশের আয়োজন করতে হবে। ঢাকা শহরকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে উনি মনে করেন, শুধু আমরা নই, শহরটাও তাঁকে সংবর্ধনা জানাচ্ছে। আমার কথা বুঝতে পারছ তো?

তাজউদ্দীন বললেন, জি, মুজিব ভাই।

তাহলে যাও। কাজে নেমে পড়ো। ইন্দিরা গান্ধী তিন দিন ঢাকায় থাকবেন। এই তিন দিন কী কী কর্মসূচি রাখবা, আলোচ্যসূচি কী হবে তা নিয়ে চিন্তা করো। তাদেরও দাবিদাওয়া থাকবে, আমাদেরও থাকবে।

তাজউদ্দীন বললেন, জি, আমরা দেখছি।

একে একে নেতারা চলে গেলেন। শেখ মুজিব পাইপ ধরালেন। পাইপ টানতে টানতে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর ঢাকা সফর নিয়ে ভাবেন।

  ►চলবে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা