kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

ধারাবাহিক উপন্যাস

১৯৭৫

মোস্তফা কামাল

২৭ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



১৯৭৫

 

 

শেখ মুজিবুর রহমানের কেবিনেটে যাঁরা স্থান পেয়েছেন তাঁরা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শিল্প ও বাণিজ্য; তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থ ও পরিকল্পনা; ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, যোগাযোগ; খন্দকার মোশতাক আহমদ, সেচ ও পানিসম্পদ; এ এইচ এম কামারুজ্জামান, ত্রাণ ও পুনর্বাসন; আব্দুল মালেক উকিল, স্বরাষ্ট্র এবং ড. কামাল হোসেন আইনবিষয়ক মন্ত্রী। আবদুস সামাদ আজাদকে পররাষ্ট্র দপ্তরেই রাখলেন। একই তারিখে তিনি তোফায়েল আহমেদকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব ও রফিকউল্লাহ চৌধুরীকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। রফিকউল্লাহ চৌধুরী পঞ্চাশের দশকে ছাত্রলীগের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন।

 

প্রথম কেবিনেট বৈঠকেই শেখ মুজিব মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেন, এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার কাজ হচ্ছে—সংবিধান প্রণয়ন, দেশ পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন আদায় করা। এ ক্ষেত্রে আমাদের জোরালো কূটনৈতিক তত্পরতা চালাতে হবে। তিনি মন্ত্রীদের আন্তরিকতার সঙ্গে যাঁর যাঁর দপ্তর পরিচালনার আহ্বান জানান। আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের একটি সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দেন।

পরে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে শেখ মুজিব বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক পথে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১৯৭০ সালে তত্কালীন পাকিস্তান জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে একটি গণপরিষদ গঠন করা হবে। এ লক্ষ্যে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হবে। খসড়া সংবিধান বিবেচনা ও অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবিত গণপরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার ব্যাপারে কোনো রকম বিলম্ব করা হবে না।

শেখ মুজিব ঘোষণা করেন—স্বাধীন বাংলাদেশের মূল রাষ্ট্রীয় নীতি হবে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

পরদিনই শেখ মুজিব এক আদেশ জারি করেন। আদেশে মদ, জুয়া, হাউজি, ঘোড়দৌড় ইত্যাদি অনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে দেশে আইনসিদ্ধ বাহিনী ছাড়া অন্য কারো কাছে যাতে অস্ত্রশস্ত্র না থাকে সে জন্য মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত মুক্তিবাহিনী, মুজিব বাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের কাছে যে অস্ত্র রয়েছে তা দশ দিনের মধ্যে জমাদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। রমনা রেসকোর্স ময়দানকে উদ্যানে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে এর নতুন নামকরণ করা হয় ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান’।

শেখ মুজিবের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে শুরু করে। পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, নেপাল, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুগোস্লাভিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া প্রভৃতি দেশ স্বীকৃতির কথা ঘোষণা করে। এ ক্ষেত্রে ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকাও অনস্বীকার্য। তিনি বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন, রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের অনুরোধ করেছেন। তার ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জানানো অব্যাহত রেখেছে। দেশের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও সহযোগিতা করছে বেশ কয়েকটি দেশ।

সদ্যঃস্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি বিভিন্ন দেশের আগ্রহ দেখে শেখ মুজিব খুব খুশি। তিনি মনে মনে বলেন, আমাদের পাশে শুধু ভারত নয়, আরো অনেক দেশই আছে।

 

তিন.

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাই ভারতে ছিলেন। তাঁর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ভারত সরকারই করেছে। দেশের স্বাধীনতা অর্জনে অসামান্য ভূমিকার কারণে ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আসাম হয়ে দেশে ফেরার মুহূর্তেও তিনি ফরিদগঞ্জে জনসভা করেন। জনসভায় তিনি বলেন, মিসেস গান্ধীর মতো দয়ালু মানুষ হয় না। বাংলাদেশের জনগণ এই মহীয়সী নেত্রী এবং ভারতের জনগণের সহানুভূতির কথা কোনো দিন বিস্মৃত হবে না। স্বাধীন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়ার সময় জুলফিকার আলী ভুট্টোর একটি মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে মওলানা ভাসানী বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে একটা যোগসূত্র রাখার জন্য ভুট্টো সাহেব শেখ মুজিবকে অনুরোধ করেছেন। আমি ভুট্টো সাহেবকে বলে দিতে চাই, এটা শুধু আজকের জন্যই অসম্ভব ব্যাপার নয়, অনাগত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসম্ভব ব্যাপার হয়েই থাকবে। বাঙালিরা পাকিস্তানিদের বর্বরতার কাহিনি কোনো দিনই ভুলতে পারবে না।

দেশে ফেরার পর মওলানা ভাসানী জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শেখ মুজিব একটি নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠা করবেন। তাঁর প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন ও আস্থা রয়েছে। আপনারাও তাঁকে সহযোগিতা করুন।

মওলানা ভাসানীর সঙ্গে শেখ মুজিবের সম্পর্ক সাতচল্লিশ সাল থেকে। দিনে দিনে সেই সম্পর্ক গভীর হয়েছে। রাজনীতিতে অনেক চড়াই-উতরাই, ভাঙাগড়া হয়েছে। কিন্তু শেখ মুজিবের প্রতি ভাসানীর স্নেহ-ভালোবাসায় এতটুকু টান পড়েনি। আবার ভাসানীর প্রতিও শেখ মুজিবের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমেনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হওয়ার প্রতিবাদে ভাসানী সাহেবই ব্যাপক গণ-আন্দোলন গড়ে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরও ভাসানী সাহেব শেখ মুজিবকে পূর্ণ সমর্থন দেন।

মওলানা ভাসানী দেশে ফিরে নিজের গ্রামের বাড়ি সন্তোষে যান। ৯ মাস আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। পোড়া ভিটি গাছের পাতা, আগাছা, লতাগাছে ভরে গেছে। এখানে যে একটা ঘর ছিল তা চট করে কেউ বুঝতেই পারবে না।

মওলানা ভাসানী বাড়ির সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। আশপাশের অনেকেই ছুটে আসে তাঁর কাছে। তারা মওলানা ভাসানীর দুই পাশে এসে দাঁড়ায়। খবর পেয়ে পাশের বাড়ির রুহুল আমিনও তাঁর কাছে আসে। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর রুহুল আমিন বলল, হুজুর, আপনি আমাদের বাড়িতে আসেন।

জনৈক আজিজ মুন্সি বলল, হ যান। ওগো বাড়িতে গিয়া বসেন। আপনার ঘর তোলার ব্যবস্থা আমরা করতেছি।

মওলানা ভাসানী উদাস দৃষ্টিতে আজিজ মুন্সি আর রুহুল আমিনকে দেখলেন। তারপর আবার বাড়ির দিকে তাকালেন।

রুহুল আমিন বলল, হুজুর, আমারে চিনতে পারছেন? আমি খায়ের মাঝির ছেলে, আপনারে যে নৌকায় কইরা ভারতে পার কইরা দিল!

মওলানা ভাসানী রুহুল আমিনকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, তুই খায়ের মাঝির ছেলে!

জি হুজুর!

খায়ের মাঝি কই?

রুহুল আমিন মাথা নিচু করে। তার মুখে কোনো কথা নেই। সে কী বলবে, তা-ও বুঝতে পারছে না। রুহুল আমিন মনে মনে ভাবে, হুজুর বাবার কথা শুনলে কী করবেন? কী প্রতিক্রিয়া হবে তাঁর!

রুহুল আমিন নীরব থাকায় মওলানা ভাসানী উদ্বেগের সঙ্গে বললেন, কী রে রুহুল! চুপ কইরা আছস কেন! তোর বাবার কী হইছে! কথা কচ্ছিস না কেন?

পাশ থেকে আরেকজন বলল, ওর বাবা ফেরে নাই।

ফেরে নাই মানে! কোত্থেকে ফেরে নাই?

আপনারে নৌকায় নামাইয়া দিয়া আর ফেরে নাই।

হায় হায়! খায়ের মাঝি ফেরে নাই! কী হয়েছে? কোথায় গেছে সে?

আরেকজন বলল, সে কি ভারতেই রইয়া গেল! নাকি দেশে ঢোকার পর কেউ মাইরা ফেলল তা কেউ জানে না।

মওলানা ভাসানী কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলেন। বিড়বিড় করে দোয়া-দরুদ পড়লেন। তারপর রুহুল আমিনের কাঁধে হাত রেখে ওদের বাড়িতে গেলেন। তাঁকে দেখে রুহুলের মা ও ছোট বোনটা কান্নায় ভেঙে পড়ল। তিনি তাদের কী বলে সান্ত্বনা দেবেন তা বুঝতে পারছেন না। তিনি নিজেই ভীষণভাবে ব্যথিত। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, খায়ের মাঝির তো বাড়িতে চইলা আসার কথা। কী হইল আমিও বুঝতে পারছি না।

মওলানা ভাসানীর দুই চোখের কোটরে পানি টলমল করে। রুহুল আমিন আবেগপ্রবণ মানুষটিকে দুই হাত দিয়ে পেছন দিক থেকে ধরে চেয়ারে বসায়। কারো মুখে কোনো কথা নেই। রুহুল আমিনের মা আঁচল দিয়ে নিজের চোখ মোছেন। মওলানা ভাসানীর আবেগ তাঁকেও স্পর্শ করেছে। রুহুল আমিন বুকে পাথর চেপে সহ্য করে নিজের কষ্ট। কিছুক্ষণ পর সে তার মাকে বলে, মা, হুজুররে নাশতা খাওয়াইবেন না?

রুহুল আমিনের মা কোনো জবাব দিলেন না। তিনি ভেতরের ঘরের দিকে গেলেন। ঘরের বারান্দায় রান্নাঘর। তিনি চুলা জ্বালিয়ে পানি গরম করার জন্য পাতিল বসালেন। বয়ামের মধ্যে রাখা বিস্কুট বের করলেন। পিরিচে বিস্কুট সাজালেন। চা রেডি করলেন। তারপর রুহুল আমিনকে ডাকলেন। বাবা রুহুল, চা নিয়া যাও।

রুহুল চা আর বিস্কুট এনে মওলানা ভাসানীর সামনে রাখে। তাঁকে খাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। মওলানা ভাসানী চায়ের কাপ হাতে নিয়েও রেখে দেন। তিনি উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। রুহুলের মা ঘরের ভেতর থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, হুজুর, আমাগো তো আর কিছুই রইল না!

মওলানা ভাসানী সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, চিন্তা কইরো না। খোদা তায়ালা আছেন। তিনিই সবাইরে দেখে রাখবেন। রুহুল কি লেখাপড়া শেষ করছস?

রুহুল আমিন বলল, জি না হুজুর। আমি কলেজে পড়ি। প্রায় একটা বছর তো যুদ্ধেই শেষ হইল। লেখাপড়া বন্ধ রইল। এখন যদি আবার শুরু হয়!

তুই কি চাকরিবাকরি করতে চাস? মওলানা ভাসানী জানতে চাইলেন।

রুহুল আমিন বলল, হুজুর, লেখাপড়া করতে চাই।

ঠিক আছে। আমি তোরে লেখাপড়ার খরচ দিব। লেখাপড়া শেষ হইলে চাকরিও দিয়া দিব।

রুহুল আমিন ভীষণ খুশি। সে মওলানা ভাসানীকে কিভাবে সমাদর করবে তা নিয়ে ভাবে।

 মওলানা ভাসানীর শূন্য ভিটিতে ঘর তোলার জন্য গ্রামের মানুষ কাজ শুরু করেছে। কেউ কাউকে বলেনি। অথচ সবাই নিজ নিজ উদ্যোগে এসেছে এবং কাজে হাত লাগিয়েছে। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার! মওলানা ভাসানীকে দেখেই গ্রামের মানুষ ব্যাপকভাবে উজ্জীবিত। কেউ বাঁশ কাটছে, কেউ বাড়ির ভিটি পরিষ্কার করছে, কেউ গর্ত খুঁড়ছে, কেউ কোদাল দিয়ে মাটি কেটে কেটে উঁচু-নিচু সমান করছে।

মওলানা ভাসানী বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে লোকজনের কাজকর্ম দেখছেন। মানুষের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা তিনি উপলব্ধি করার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে একজন দৌড়ে এসে তালের পাখা দিয়ে তাঁকে বাতাস করতে শুরু করে। আরেকজন চেয়ার এনে বসতে দেয়। মানুষের ভালোবাসায় আবেগপ্রবণ হয়ে যান। তাঁর দুই চোখের কোটরে পানি জমে। কিছুক্ষণ পর সেই পানি গাল-থুতনি বেয়ে মাটিতে পড়ে।

►  চলবে

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা