kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

বোরহান তুমিও চলে গেলে

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

২৭ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বোরহান তুমিও চলে গেলে

অঙ্কন : প্রসূন হালদার

বোরহান, তুমিও চলে গেলে! একটা ব্যথাদীর্ণ মনের আর্ত হাহাকার ছাড়া আর কী জানাতে পারি! গত ডিসেম্বর মাসে যখন ঢাকায় যাই তখন ঠিক করেছিলাম তোমার বাসায় যাব। হয়তো এটাই হবে আমাদের শেষ দেখা। আমরা প্রায় সমবয়সী। ছিলাম কলেজে সহপাঠী। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সহযোগী। তোমার মতো আমিও নানা রোগে আক্রান্ত। তাই ভেবেছি, কে আগে যাব ঠিক নেই। তুমি আগে যাবে ভাবিনি।

ডিসেম্বরে যখন ঢাকায় যাই, তখন প্ল্যান করেই গিয়েছিলাম তোমার সঙ্গে দেখা করবই। কিন্তু ঢাকায় যে কয়দিন ছিলাম বেশির ভাগ সময়ই ছিলাম অসুস্থ এবং শয্যাশায়ী। তাই তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। সোমবার (২৩ মার্চ) লন্ডন সময় সকালে যখন খবর পেলাম, তখন এই দুঃখটাই মনে বেশি করে বেজেছে। শেষ দেখাটা হলো না।

এক মার্কিন সাংবাদিক বলেছিলেন, ‘প্রকৃত সাংবাদিকের কোনো বন্ধু নেই।’ আমারও বন্ধুর সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু তুমি ছিলে আমার ঘনিষ্ঠ ও প্রকৃত বন্ধুদের একজন। আমার প্রকৃত বন্ধুদের বেশির ভাগই এখন প্রয়াত। যদি পরকাল বলে কিছু থাকে, তাহলে শিগগিরই তোমার সঙ্গে দেখা হবে। কারণ আমার বয়স ৯০ ছুঁই ছুঁই। নানা রোগে শরীর জীর্ণ। হুইলচেয়ারে চলাফেরা করি। তার ওপর অকরুণ করোনা রোগে সারা পৃথিবী বিপর্যস্ত। এখন বিশ্বায়নের যুগ। তাই করোনা মহামারিও দেখা দিয়েছে বিশ্বায়নের রূপ ধরে। এই করোনার করোনাত্বেও চলে যেতে পারি। যদি যাই, বন্ধু তোমার যেন দেখা পাই।

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর একটি নাম নয়। একটি নক্ষত্র। পঞ্চাশের দশকের কবিতা ও কথাসাহিত্যের আকাশের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। পঞ্চাশের দশকের উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোর একে একে পতন ঘটেছে। একে একে চলে গেছেন শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শহীদ কাদরী এবং আরো অনেকে। এই সেদিন গেলেন আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক ও আশরাফ সিদ্দিকী। গত সোমবার চলে গেল ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর।

হাতের রেখা গুনে দেখেছি, পঞ্চাশের দশকের উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোর প্রায় সবাই একে একে চলে গেছেন। আমারও সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার শুরু পঞ্চাশের দশকে। কিন্তু নিজেকে নক্ষত্র বলি না। আমার ওপরে বর্ণিত নক্ষত্ররাজির কাছে আমি সন্ধ্যার প্রদীপমাত্র। কিন্তু এই নক্ষত্ররাজি ছিল আমার বন্ধু। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ছিল এই নক্ষত্ররাজির অন্তর্ভুক্ত। হয়তো শেষ নক্ষত্র। কিন্তু তার মূল্যায়ন করে কে?

আমাদের সাহিত্যের সবচেয়ে দুর্বল শাখা সমালোচনাসাহিত্য। অথচ সমালোচনাসাহিত্য ছাড়া কোনো দেশের সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না। অবিভক্ত বাংলায় জীবনানন্দ দাশ ছিলেন ত্রিশের কবিদের মধ্যে সবচেয়ে উপেক্ষিত কবি। তাঁর অসাধারণ মেধা তখন অনেকেই অনুধাবন করতে পারেননি, আধুনিক কবিতার সমঝদার সমালোচক তখন কলকাতায়ও কম ছিলেন। বলতে গেলে জীবনানন্দ দাশকে প্রথম আবিষ্কার করেন বুদ্ধদেব বসু।

এখন পশ্চিমবঙ্গে আধুনিক সাহিত্যের সমঝদার অনেক সমালোচক বেরিয়ে এসেছেন। জীবনানন্দ দাশের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়েছে। দুই বাংলাতেই জীবনানন্দ এখন নন্দিত কবি। আমাদের পঞ্চাশের কবি ও কথাশিল্পী বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরেরও প্রকৃত মূল্যায়ন বাংলাদেশে এখনো হয়নি। তাই তাকে নিয়ে সাহিত্যের অঙ্গনে কখনো তেমন হৈচৈ হয়নি। অথচ বোরহান শুধু কবিই ছিল না, ছিল অসাধারণ প্রাবন্ধিক এবং কথাশিল্পীও। তার কবিতায় পোস্ট মডার্ন কবিতার আভাস পাওয়া যায়। তার গল্প জীবনাশ্রয়ী। তার প্রবন্ধের ভাষা অননুকরণীয়। তার লেখা ব্যক্তিগত প্রবন্ধ আমি শুধু ভাষাশৈলীর জন্যই পড়তাম।

বোরহান শুধু সাহিত্যিক ছিল না, ছিল দেশের একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ত্বও। ভাষা আন্দোলন থেকে দেশের সব কয়টি আন্দোলনে ছিল সামনের কাতারে। এমনকি স্বাধীনতার যুদ্ধেও। রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে লেখা তার প্রবন্ধগুলোতে আধুনিক স্বৈরাচারীদের সম্পর্কে তার আলোচনা নিজস্ব মননপ্রসূত। বোরহান বাংলাদেশে চিত্রশিল্পের একজন বিরল সমালোচক ছিল। ছিল শিক্ষাবিদ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য।

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর সম্পর্কে লিখতে গেলে আমাকে একটি বড়সড় লেখা লিখতে হবে। তা আমি লিখব। না হলে তার কাছে আমার যে অশেষ ঋণ, তার কণামাত্রও শেষ হবে না। মনের শোক একটু কমলে সেটা লিখব। আজ তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের কথা লিখে তার প্রতি, আমার একজন আবাল্য বন্ধুর প্রতি আমার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জাগাব।

বোরহানের সঙ্গে আমার পরিচয় আকস্মিকভাবে। ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। পরীক্ষার পর দীর্ঘ তিন মাস অবকাশ। তারপর ফল বেরোয়। এই তিন মাস গ্রামে বসে কী করব—ভাবলাম বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ঢাকা শহর ঘুরে আসি। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ঢাকায় গেলাম। বরিশাল শহরে স্কুলে পড়ার সময় আলাউদ্দিন আল আজাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘জেগে আছি’ তখন সবে বেরিয়েছে। আজাদ ঢাকায় কলেজে পড়েন। আমি বরিশালে স্কুলে পড়ি। আমাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। দুজনেই দুজনের কাছে নিয়মিত চিঠি লিখতাম। তাতে সাহিত্যে কী করে ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা’ ফুটিয়ে তোলা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করতাম। ঢাকায় বেড়াতে এসে আলাউদ্দিন আল আজাদের সঙ্গে দেখা করলাম। তখন তিনি আরমানীটোলা ময়দানের কাছে তাঁর এক বন্ধুর বাসায় থাকতেন। আমাকে দেখে মহাখুশি। চা খেতে বসে তিনি আমাকে জানালেন, কলকাতা থেকে বুদ্ধদেব বসু ঢাকায় এসেছেন। কায়েতটুলীতে বান্ধব সমিতি আগামীকাল সকালে তাঁর একটি সংবর্ধনার আয়োজন করেছে। সেখানে যাবেন নাকি?

বুদ্ধদেব বসুর নাম তখন আমি জানি। কবিতাও পড়ি। তাঁকে দেখতে পাব জেনে মনটা আনন্দে নেচে উঠল। বললাম, যাব। আজাদ বললেন, ‘তাহলে আগামীকাল ৯টার দিকে এই বাসায় আসবেন। একসঙ্গে যাব।’ আনন্দে রাতে ঘুম হলো না। পরদিন সকালে আজাদের বাসায় রওনা হলাম। পৌঁছে সেখানেই চা-নাশতা সেরে রিকশা ডেকে কায়েতটুলীতে গিয়ে হাজির হলাম দুজনে।

পঞ্চাশের নক্ষত্র হিসেবে পরবর্তী জীবনে যাঁদের প্রতিষ্ঠা অর্জন, তাঁদের বেশির ভাগের সঙ্গে সেখানেই আমার প্রথম পরিচয়। শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, ফতেহ লোহানী, আশরাফ সিদ্দিকী এবং আরো অনেকের সঙ্গে। আজাদই সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁদের সঙ্গে একজন তরুণকে দেখলাম। আমারই বয়সী। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। কিন্তু অসম্ভব সুদর্শন। আজাদ তাঁর কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন। বললেন, উনি আপনারই মতো ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় এসেছেন। কবিতা লেখেন। খুবই ভালো কবিতা। আমরা যে নতুন কবিতা নামে কবিতা সংকলন বের করেছি, তাতে তাঁর কবিতা আছে।

মনে মনে একটু ঈর্ষা বোধ করেছি। আমরা সমবয়সী। আমিও কবিতা লিখি, কিন্তু আমার কবিতা নতুন কবিতা সংকলন গ্রন্থে বের হয়নি। চা-বিরতি পর্বে বোরহানের সঙ্গে ভালো করে আলাপ হলো। তার কবিতা দেখাল, আমার কবিতা তখনো পৌরাণিক ঢঙে লিখি। বোরহানের কবিতার সর্বাঙ্গে ত্রিশ-উত্তর যুগের আধুনিকতার দাগ। বুঝতে পারলাম, তার কবিতা কেন বাংলা ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা কবিতা-যুগের প্রথম কবিতা সংকলনে স্থান পেয়েছে।

নতুন কবিতা সংকলনটি সম্পাদনা করেছিলেন দুজন কবি। তাঁদের একজন আশরাফ সিদ্দিকী। তাতে শামসুর রাহমান ও হাসান হাফিজুর রহমানের পরস্পরকে নিবেদিত কবিতা ছিল। বুঝলাম, তাঁরা দুজন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শামসুর রাহমানের কবিতায় তখন ছিল জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রচণ্ড প্রভাব। প্রথম পরিচয়েই বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের সঙ্গে জমিয়ে আলাপ করেছি। তার বাড়ি চাঁদপুরের গুলবাহার গ্রামে। ইচ্ছা, ঢাকায় এসে সরকারি ঢাকা কলেজে ভর্তি হবে। আমিও ফল ভালো করতে পারলে ঢাকা কলেজে এসে ভর্তি হব বলে তাকে জানালাম। সেদিনই তার সঙ্গে আমার পরিচয় ও বন্ধুত্ব। যে বন্ধুত্ব আমাদের জীবনভর প্রসারিত ছিল।

তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা, যখন সে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য। এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই তার উপাচার্য হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার তাকে শেষ জীবনের এই প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়নি। প্রতিভার সমাদর সব সময় সব সরকার করতে জানে না। সে জন্যই মুসলিম লীগের শাসনামলে ড. শহীদুল্লাহ্ একজন বহু ভাষাবিদ ও পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হতে পারেননি। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে অবসরজীবনে যেতে হয়েছিল।

অনেক বড় বড় শিক্ষাবিদের মতো ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরও তার শিক্ষাবিদ জীবনের শেষ সম্মান পায়নি। কিন্তু একজন আধুনিক কবি হিসেবে, পঞ্চাশের নক্ষত্র হিসেবে যথার্থ সম্মান পেয়েছে। তার বন্ধু হতে পেরে আমি গর্বিত। তার সাহিত্যজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের বিচিত্র কথা নিয়ে একটা বড় লেখা লিখব। আবারও বলি—বোরহান, তোমার প্রয়াণে বেদনাসিক্ত অন্তরের অশেষ ভালোবাসা জানাই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা