kalerkantho

শনিবার । ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩০  মে ২০২০। ৬ শাওয়াল ১৪৪১

ধারাবাহিক উপন্যাস : ১৯৭৫

মোস্তফা কামাল   

১৩ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



ধারাবাহিক  উপন্যাস : ১৯৭৫

১০ জানুয়ারি ১৯৭২।

আজকের দিনটি অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা।

ঢাকা শহর আজ যেন নতুন রূপে সেজেছে। নতুন এক সূর্য এই শহরে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে। সেই আলো কানায় কানায় ছড়িয়ে পড়েছে। ৯ মাস আগের একদিন এই শহরে নেমেছিল কালরাত; সেই শহর আজ আনন্দনগরী। বিজয়োল্লাসের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে শহরজুড়ে। চারদিক থেকে স্লোগান উঠছে—শেখ মুজিব শেখ মুজিব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ। জয় বাংলা, জয় শেখ মুজিব। তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব।

সদ্যঃস্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলেন স্বাধীনতার মহানায়ক। তাঁর শুভাগমনে এই শহরের দালান-কোঠা, সবুজ প্রকৃতি, পিচঢালা রাজপথেও আজ খুশির ঝিলিক। আজ থেকে বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডটি যেন পূর্ণতা পেল। যেন পরিপূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করল।

বাংলার প্রাণপ্রিয় নেতাকে একনজর দেখার জন্য সারা দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ স্ব-উদ্যোগে ছুটে এসেছেন ঢাকায়। কেউ বাসে-ট্রেনে, কেউ নৌকায়, লঞ্চে-স্টিমারে, আবার কেউ হেঁটে এসেছেন। তাঁরা জড়ো হয়েছেন রেসকোর্স ময়দানে। কানায় কানায় পূর্ণ ময়দান গমগম করছে মানুষে। নানা জাতের অসংখ্য পাখি আকাশে উড়ছে। ময়দানের চারপাশের গাছের পাতা দুলছে। যেন তারাও স্বাগত জানাবে প্রিয় নেতাকে।

বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সরাসরি গাড়িতে রেসকোর্স ময়দানে এলেন। গাড়ি থেকে নেমে এক পা-দুই পা করে তিনি মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন। সবার চেয়ে উঁচু, সবার চেয়ে সুদর্শন মানুষটার দিকে লাখ লাখ চোখ স্থির হয়ে আছে। ওই তো! ওই তো আমাদের মহানায়ক! তুমুল করতালি আর বিজয়োল্লাসের মধ্য দিয়ে স্বাগত জানানো হলো প্রিয় নেতাকে। তাঁর সঙ্গে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা আছেন। আরো আছেন সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ প্রমুখ ছাত্রনেতা। তাঁরা বিমানবন্দরে নেতাকে বরণ করে রেসকোর্স ময়দানে নিয়ে এসেছেন। নেতার পরনে চিরচেনা ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। তার ওপর কালো রঙের মুজিব কোট। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা।

শেখ মুজিব মঞ্চে উঠে দাঁড়াতেই পুরো ময়দানে যেন তুফানের মতো ঢেউ উঠল। জনতার ঢেউ। সে এক অন্য রকম বিস্ময়কর দৃশ্য। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠল রেসকোর্স ময়দান। নেতা হাত নেড়ে জনতাকে অভিবাদন জানালেন। তাঁর চোখে আনন্দাশ্রু। চশমা খুলে রুমাল দিয়ে চোখ মুছলেন। আবেগাপ্লুত নেতা কী বলে শুরু করবেন, তা নিয়ে ভাবেন।

পাঁচ লক্ষাধিক জনতার সামনে দাঁড়িয়ে নেতা বললেন, আমি প্রথমে স্মরণ করি আমার বাংলাদেশের ছাত্র শ্রমিক কৃষক বুদ্ধিজীবী সেপাই পুলিশ জনগণকে, হিন্দু মুসলমানকে, যাদের হত্যা করা হয়েছে। আমি তাদের আত্মার মঙ্গল কামনা করে আপনাদের সামনে দু-একটা কথা বলতে চাই। আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে।

আমি আজ বক্তৃতা করতে পারব না। বাংলার ছেলেরা, বাংলার মায়েরা, বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী যেভাবে সংগ্রাম করেছে, আমি কারাগারে বন্দি ছিলাম। ফাঁসির কাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম আমার বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। আমার বাংলার মানুষ স্বাধীনতা আনবে। সেদিন যারা আত্মাহুতি দিয়েছে, শহীদ হয়েছে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি, তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আমার কবর হয়েছে। প্রায় ত্রিশ লক্ষ লোককে মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও এবং প্রথম মহাযুদ্ধেও এত লোক, এত সাধারণ নাগরিক মৃত্যুবরণ করে নাই; শহীদ হয় নাই—যা আমার সাত কোটির বাংলাদেশে হয়েছে। আমি জানতাম না, আমি আবার আপনাদের কাছে ফিরে আসব। আমি শুধু একটি কথা বলেছিলাম, তোমরা শুধু আমার একটি কথা রেখো। যদি আমাকে মেরে ফেলে দাও; আমার আপত্তি নাই। মৃত্যুর পরে আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে দিয়ে দিও। এই একটা অনুরোধ আমি তোমাদের কাছে রাখলাম।

আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে। আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের জনসাধারণকে। মোবারকবাদ জানাই সামরিক বাহিনীকে। আমি মোবারকবাদ জানাই রাশিয়ার জনসাধারণকে। আমি মোবারকবাদ জানাই ব্রিটিশ, জার্মানি, ফ্রান্স সরকার ও জনসাধারণকে। যারা আমাকে সমর্থন করেছে। আমি মোবারকবাদ জানাই আমেরিকার জনসাধারণকে। আমি মোবারকবাদ জানাই বিশ্বদুনিয়ার মজলুম জনসাধারণকে। যারা আমার এই মুক্তিসংগ্রামে সাহায্য করেছে। তাদের মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র, বাংলাদেশ স্বাধীন থাকবে। বাংলাদেশকে কেউ দাবাতে পারবে না।

আমি জানতাম না, আমার ফাঁসির হুকুম হয়ে গেছে। আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছে। আমি প্রস্তুত হয়ে ছিলাম। বলেছিলাম, আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। মানুষ একবার মরে দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম, আমার মৃত্যু থাকে যদি আমি হাসতে হাসতে যাব, আমার বাঙালি জাতকে অপমান করে যাব না। তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না। যাবার সময় বলে যাব, জয় বাংলা স্বাধীন বাংলা। বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা। বাংলার মাটি আমার মা।

শেখ মুজিব বক্তৃতা শেষ করে তাজউদ্দীনকে বললেন, আমি শেরেবাংলা ও সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মাজারে যাব।

তাজউদ্দীন সাহেব বিষয়টা অন্যদের জানালেন। নেতাদের অনেকেই আগে আগে চলে গেলেন। শেখ মুজিব সিনিয়র নেতাদের নিয়ে দুই নেতার মাজারের উদ্দেশে রওনা হলেন। গাড়িতে মাজারের দিকে যেতে যেতে তাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর কাছে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। বিমানবন্দর থেকে ফেরার সময়ও তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে অবহিত হন। তাজউদ্দীন সাহেবের কাছে যতটুকু তথ্য আছে তা তিনি নেতাকে জানান।

দেশের ক্ষয়ক্ষতির কথা শুনে শেখ মুজিব কাঁদতে কাঁদতে বললেন, তাজউদ্দীন, ওরা আমার দেশটার এত বড় ক্ষতি করল! এখন দেশটাকে কিভাবে গড়ে তোলা যায় তা নিয়ে চিন্তা করো। ক্ষয়ক্ষতি কিভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় তা নিয়ে ভাবো।

তাজউদ্দীন বললেন, জি মুজিব ভাই। রাতদিন আমাদের পরিশ্রম করতে হবে। আগে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

শেখ মুজিব বললেন, আরেকটা কথা, দেশের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করো। কড়ায়-গণ্ডায় পাকিস্তানের কাছ থেকে আদায় করতে হবে।

জি মুজিব ভাই। তাজউদ্দীন জবাব দিলেন।

এর মধ্যেই দুই নেতার মাজারের সামনে গিয়ে গাড়ি থামল। শেখ মুজিব গাড়ি থেকে নামলেন। তাঁর সঙ্গে সিনিয়র নেতারাও নামলেন। তারপর তাঁরা মাজারে গিয়ে জিয়ারত করলেন। প্রিয় নেতার মাজারে এসেও চোখের পানি ফেললেন শেখ মুজিব। মাজার থেকে তিনি সোজা বাসার উদ্দেশে রওনা হলেন।

৯ মাস আগে শেখ মুজিব ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে ছিলেন। সেই বাড়ি থেকে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। বাড়িটির বিপুল ক্ষয় সাধন করে পাকিস্তানি বাহিনী। তখন দেশ ছিল পরাধীন। টানা ৯ মাসের যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হয়। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়। কিন্তু ৩২ নম্বর রোডের বাড়িটি ফেরত পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া ওই বাড়ি বসবাসের উপযোগী করতে সময় এবং অর্থের প্রয়োজন। সংগত কারণেই ফজিলাতুন্নেছা শেখ মুজিবের মুক্তির খবর পেয়ে তড়িঘড়ি করে ধানমণ্ডির ১৮ নম্বর রোডে একটি বাড়ি ভাড়া করেন। সেই বাড়িতেই শেখ মুজিবকে নিয়ে আসা হচ্ছে। সবাই তাঁর অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

শেখ মুজিবকে বহনকারী গাড়িটি যখন বাসায় পৌঁছল তখন শেষ বিকেল। বাড়িতে আগে থেকেই শেখ মুজিবের মা-বাবা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে এবং অন্য আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত আছেন। তাঁরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। মনে হচ্ছে, দীর্ঘদিন পর তিনি বাড়ি ফিরলেন।

বাড়ির দরজায় পা দিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন শেখ মুজিব। তাঁকে পেয়ে এক এক করে সবাই জড়িয়ে ধরে কান্না জুড়ে দিলেন। বাড়িতে অন্য রকম এক আনন্দঘন আবেগময় অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো। সবাই কাঁদছেন। কিন্তু এ কান্না আনন্দের, এ কান্না প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার।

শেখ মুজিবের স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা রেণু কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শেখ মুজিবও প্রিয়তমা স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। তাঁর সঙ্গে কাঁদছেন হাসিনা, কামাল, জামাল, রেহানা, শিশু রাসেল, ওয়াজেদ মিয়াসহ সবাই।

শেখ মুজিব তাঁর মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। তাঁরা প্রিয় খোকাকে (শেখ মুজিবের ডাকনাম) কাছে পেয়ে চুমু দেন। ছেলেকে ভালো করে দেখেন। তাঁর জন্য দোয়া করেন। শেখ মুজিবও মা-বাবার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে এবং আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কথা বলেন। কত কথা যে পেটে জমা করে রেখেছেন তাঁরা! সব কথা বলা যায় না। সব আবেগ প্রকাশ করাও সম্ভব হয় না। তখন হয়তো চোখের জলে আবেগ ভেসে যায়।

শেখ মুজিবকে একনজর দেখার জন্য দিনভর বাড়িতে লোক আসছে। বাড়ির লোকদের সঙ্গে যে কিছুটা নিরিবিলি সময় কাটাবেন তার সুযোগ কোথায়? দলের লোক ছাড়াও অসংখ্য সাধারণ মানুষ আসছেন। জননেতা কি আর জনগণকে অবহেলা করতে পারেন! পরিবারের চেয়ে তো দেশের মানুষই তাঁর কাছে বড়। এক এক করে তিনি সবার সঙ্গেই দেখা করলেন। মতবিনিময় করলেন।

সন্ধ্যার পর একদল ছাত্রনেতা এসে হাজির হলেন। শেখ মুজিব ড্রয়িংরুমে ছাত্রনেতাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। বৈঠকে শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ আছেন। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কলকাতায় অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ভূমিকা সম্পর্কে শেখ মুজিবকে অবহিত করলেন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন সেক্টরের কমান্ডারদের মতাদর্শ ও ভূমিকা সম্পর্কেও অবহিত করেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সে বিষয়েও তাঁরা পরামর্শ দেন।

শেখ মুজিব সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তোমরা দেশের জন্য অনেক কষ্ট করেছ। অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছ। এই দেশের মানুষ তোমাদের কথা অবশ্যই মনে রাখবে। তোমাদের সঙ্গে আরো কথা হবে। কাল আবার তোমাদের সঙ্গে বসব। তোমাদের কথা শুনব।

ছাত্রনেতারা ভাবলেন, বঙ্গবন্ধুর বিশ্রামের প্রয়োজন। তাঁরা দ্রুত কথা বলা শেষ করে বিদায় নিলেন।  

►►►চলবে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা