kalerkantho

সোমবার । ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৪ ফাল্গুন ১৪২৬। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪১

রক্তমাখা স্মৃতির সাগর

রিজিয়া রহমানের অখণ্ড আত্মজীবনী

আহমেদ মোজাফ্ফর
রক্তমাখা স্মৃতির সাগর : রিজিয়া রহমান প্রকাশক : ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ। মূল্য : ৭০০ টাকা

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



রিজিয়া রহমানের অখণ্ড আত্মজীবনী

অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হলো কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমানের অখণ্ড আত্মজীবনী ‘রক্তমাখা স্মৃতির সাগর’। এর আগে ২০১১ সালে প্রকাশিত হয় লেখকের আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড ‘নদী নিরবধি’ এবং ২০১২ সালে দ্বিতীয় খণ্ড ‘প্রাচীন নগরীতে যাত্রা’। আলোচ্য গ্রন্থে এ দুটি বইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রিজিয়া রহমানের ‘দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়ি’ শীর্ষক অগ্রন্থিত তৃতীয় খণ্ডটি। ‘দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়ি’ শব্দঘর পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।  

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান (১৯৩৯-২০১৯) ছোটগল্প, কবিতা, শিশুসাহিত্য, আত্মজীবনী, অনুবাদের পাশাপাশি ৩০টির বেশি উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর উপন্যাসে বিষয়বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস থেকে আধুনিক বাংলাদেশের জন্মকষ্ট, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বাস্তবতা, বস্তিবাসী, বারবনিতা, চা শ্রমিক, সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন-লড়াই, প্রবাসীজীবনের নানা সংকট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট উপজীব্য হয়ে উঠেছে। ব্যক্তিজীবনে তিনি এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক, সামাজিক নানা পটপরিবর্তনের সাক্ষী। জন্ম কলকাতায়। শৈশবও কেটেছে ওখানে। দেশভাগের কারণে রিজিয়া রহমান চোখের সামনে বদলে যেতে দেখেন সমাজ, রাষ্ট্র, এমনকি নিজের আত্মপরিচয়টিও। বাবা সরকারি ডাক্তার ছিলেন। দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে চলে এলে পোস্টিং দেওয়া হয় ফরিদপুর। ওখানেই রিজিয়া রহমানের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক শেষ করেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময়টা তিনি প্রত্যক্ষ করেন ঢাকায়। এসব কারণে তাঁর স্মৃতিকথার আলাদা একটা গুরুত্ব আছে। সদ্যঃস্বাধীন দেশে বারবনিতাদের নিয়ে ‘রক্তের অক্ষর’-এর মতো সাহসী উপন্যাস যিনি লিখেছেন, তাঁর আত্মজীবনী আমাদের জন্য বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠবে, সেটাও স্বাভাবিক।

 

আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড ‘নদী নিরবধি’তে লেখকের পারিবারিক ইতিহাস উঠে এসেছে। তাঁর পরিবার একটার পর একটা অভিবাসন ঘটিয়েছে ভারতবর্ষে। তাঁর পূর্বপুরুষের আগমন ঘটেছিল মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তান থেকে। সুফি-দরবেশের সহযাত্রী হয়ে। সম্ভবত সমরখন্দে ছিল তাঁর আদি নিবাস। পরিবারটি দিল্লি হয়ে পশ্চিমবঙ্গে আসে এবং দেশভাগের পর পূর্ব বাংলায় থিতু হয়। অন্যদিকে রিজিয়া রহমানের মা ঢাকা জেলার শাইনপুকুর জমিদার পরিবারের মেয়ে। ফলে রিজিয়া রহমানের আত্মজীবনী কোনো ব্যক্তির একক জীবনের কথা নয়, এই ভূখণ্ডের ইতিহাসের কথা হয়ে ওঠে।

আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ড ‘প্রাচীন নগরীতে যাত্রা’য় ফরিদপুর, চাঁদপুরের জীবন শেষ করে এবার ঢাকার জীবনে আসার গল্প উঠে এসেছে। ঢাকায় তখন বড় ধরনের পরিবর্তন চলছে, কি সামাজিক, কি রাজনৈতিক—সব ক্ষেত্রেই। তৃতীয় খণ্ডে আমরা পাই মুক্তিযুদ্ধের সময়টাকে। মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপঞ্জির অন্তর্বয়ান আমাদের অনেক অজানা বিষয়ের দিকে নিয়ে যায়।  রিজিয়া রহমানের মতে, বাঙালির জাতীয়তাবোধ রাতারাতি তৈরি হয়নি। এ দেশের অধিবাসীরা পৃথিবীর নানা স্থান থেকে আগত মানবপ্রবাহ, বিভিন্ন ভাষাভাষী, সংস্কৃতি-ধর্মের মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক মিশ্র জাতি। আর এই বহুত্ববাদী স্রোতকে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছে বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষার বিবর্তনের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির জাতীয়তার পূর্ণত্ব প্রাপ্তির বিষয়টি। আইডেনটিটি বা আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটিও বারবার তাই সামনে এসেছে। অস্বীকার করা যায় না, বাঙালি ‘আইডেনটিটি ক্রাইসিস’ বা আত্মপরিচয় বিভ্রান্তি কাটিয়ে ওঠার জন্যই ঐতিহাসিক দুটি ঘটনার প্রয়োজন হয়েছে, একটি আমাদের ভাষা আন্দোলন, অন্যটি মুক্তিযুদ্ধ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা