kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ভালমানুষের জগৎ

পরিচিতের ভেতরে অপরিচিত রূপের সন্ধান

শ্যামল চন্দ্র নাথ
ভালমানুষের জগৎ : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। প্রকাশক : কথাপ্রকাশ। প্রচ্ছদ : আনিসুজ্জামান সোহেল। মূল্য : ৩০০ টাকা

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পরিচিতের ভেতরে অপরিচিত রূপের সন্ধান

বছর দুয়েক আগে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছিলেন, ‘যা ভাবি তা নির্দ্বিধায় বলতে পারি না।’ কিন্তু তিনি প্রতিনিয়তই বলেন। কারণ, তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন সমাজতান্ত্রিক, একজন বুদ্ধিজীবী। এই যে বুদ্ধিজীবী শব্দটি ব্যবহার করলাম, এর একটি মাহাত্ম্য আছে। মাহাত্ম্য এই যে বুদ্ধিজীবী সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবেন। সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে কথা বলবেন। জারি রাখবেন তাঁর অনিবার্য সত্য কথন। সেই কথনের কথা যখন বলছি, তখন পাঠ করছি আমাদের বাতিঘর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘ভালমানুষের জগৎ’। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখালেখির যাত্রাপথটা ছিল গল্প দিয়ে। তিনি লিখেছেন একাধিক উপন্যাসও। কিন্তু তিনি অন্যতম প্রাবন্ধিক ও চিন্তক । এ বইয়ে রয়েছে ১১টি গল্প। তার প্রতিটিতেই আছে ব্যক্তি, আর রয়েছে নানা ঘটনা। ব্যক্তি ছাড়া ঘটনা তো কল্পনাতীত। তাই ঘটনাই জন্ম দিচ্ছে একেকটি গল্পের। ব্যক্তির কারণেই এবং ব্যক্তিকে ঘিরেই ঘটনা। কিন্তু ব্যক্তি সমস্যাটাই প্রধান। ব্যক্তির জন্য মূল সমস্যাটা দাঁড়িয়েছে আত্মপরিচয়ের। আত্মপরিচয়ের সূত্র ও সীমানা নির্ধারণ করে দিতে আসে অন্য মানুষেরা। তারা অপরজন ও আপনজন হিসেবে আসে; উপস্থিত হয় শত্রুপক্ষ হিসেবেও। ফলে এই গল্পগ্রন্থের মানুষেরা আমাদের অনুভূতি দাবি করে। এর অন্যতম কারণ, লেখক নিজেও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এ বইয়ের গল্পগুলো পড়তে গিয়ে আরো দেখি, সহানুভূতির যে কথা উচ্চারণ করলাম; তা শিল্পের সীমা লঙ্ঘন করেনি।

তাঁকে আমি বর্তমান সময়ের বাংলা ভাষার অন্যতম প্রাবন্ধিক বলে বিশ্বাস করি পাঠে ও আলোচনায় কিংবা সম-আলোচনায়। সেই কথা আমি অনুচ্চারিত রাখতে চাই না। চাই না বলেই বলছি, তাঁর লেখায় আমরা দেখব নানা সময়ে, নানাভাবে প্রবন্ধে গল্পের খোঁজ পাওয়া যায়। গল্পে যাতে প্রবন্ধ ঢুকে না পড়ে সে বিষয়ে তিনি সচেতন। এই গল্পগ্রন্থ পাঠে আরো দেখি—গল্পগুলোর ভেতরে প্রবন্ধের অনুপ্রবেশ ঘটেনি, যা ঘটেছে তা হলো ইতিহাস। কারণ, ব্যক্তি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ইতিহাসসচেতন। আবার ব্যক্তি তো ইতিহাসের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। ইতিহাস তাই অনিবার্য হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের সংকটটি যেমন ব্যক্তিগত, তেমনি আবার সমষ্টিগতও। তাই এই দ্বৈত সত্যের আভাসও আমরা এই গল্পগুলোতে পাব। আরো পাব সমাজের রুগ্ণ দশার চালচিত্র। যখন আমি পড়ছিলাম ‘হারাবার কিছু নেই’ গল্পটি, তখন দেখি এ তো সমাজবাস্তবতাকে চোখের পাপড়ির মতো শুধু নাড়া দেয়নি, দিয়ে যাচ্ছে হৃদয় ও মস্তিষ্কের ভেতর শিহরণ। তখনই গল্পে উচ্চারিত হলো, ‘আমার বোধ হয় উচিত ছিল দুই হাত দিয়ে পথ করে দেওয়া। কিন্তু তার দরকার হয় না, ঠেলে-ধাক্কিয়ে নিজাম নিজেই উঠে যায় ফেরির দোতলায়। উঠেই বলে, ‘দেখছ, দেখছ পাগলদের কারবার।’ কথাটা সে ঠিকই বলেছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে একমত হয়ে যাই। এমন একটি ভঙ্গি করি মাথা ও মুখের সাহায্যে যে এত বড় সত্য কথা পৃথিবীতে আর কেউ কখনো বলেনি, কখনো বলবে কি না তা নিয়েও ঘোরতর সন্দেহ।’ এটা তো শুধু সমাজবাস্তবতার কথা, তিনি গল্পে বললেন। যখন ব্যক্তির মুক্তির কথা আমরা ভাবব, তখন যা দেখি, তা এই গল্পে চোখের পাতা ও বুকের পাটাতন একই সঙ্গে ভিজে যাবে।

তিনি এই গল্পে বলছেন, ‘কিছুক্ষণ আগে, নিচে, আরিচার ঘাটে দাঁড়িয়ে বলেছিল নিজাম, ‘কী অসম্ভব বাজে ওয়েদার’, আমি বিলম্ব না করেই যোগ করেছি, ‘সে-ই! বৃষ্টির এতটুকুও লক্ষণ নেই।’ বিপদ হতো ও যদি বলে বসত, ‘খুব ভালো লাগছে এই গরমটা।’ বলতেও তো পারত, বড়লোকে কী না পারে। আমাকে বিপদে ফেলার জন্যও বলতে পারত সে। তখন আমি কী করতাম কে জানে। ভয় নিজেকে নয়, ভয় নিজামকেই। মনে মনে যদি হাসে! আমার তো খুবই সন্দেহ এই যে আমাকে যে তার কর্মচারী করেছে এর পেছনে ঠিক বন্ধুপ্রীতি নেই। আজকাল বিশ্বস্ত লোক পাওয়া যায় না বলে যে ঘোষণা সে জারি করেছে, সেটাও মূল কারণ নয়। আসল ব্যাপার প্রতিশোধ নেওয়া।’

ফলে আমরা আমাদের চারপাশের জগত্টাকে যেভাবে দেখি কিংবা কল্পনা করি বা যেভাবে পরিচিত হয়ে উঠি, সেই পরিচয়ের বাইরেও নানা অপরিচিত ঘটনা রয়েছে, রয়েছে সংবাদ। এই বইয়ের ১১টি গল্পেই ব্যক্তি থেকে সমাজ, সমাজ থেকে বৈশ্বিক বাস্তবতার ক্যানভাসও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে এই গল্পগ্রন্থে। তাঁর গল্প বলার ঢং, ভাষার নির্মিতি, চরিত্র চিত্রায়ণের চেয়েও আরো দুটি বিষয় বেশি ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে—সেটি হলো, পরিচিতের ভেতরে অপরিচিত রূপের সন্ধান এবং নিজস্ব দর্শনের বিশাল ক্যানভাস। এই ক্যানভাস শুধু আঁকায় না, আঁকিয়েও নেয়। এই আঁকানোর প্রতিটি গল্পই স্বতন্ত্র ও প্রাণবন্ত।

তাই বারবার বলি, সেটা হোক গল্প কিংবা প্রবন্ধ, উপন্যাস কিংবা ব্যক্তির মুক্তির কথা—সেখানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখা অবশ্য পাঠ্য। পাঠ্য ব্যক্তি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা