kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

জয়তুন

শেখ আবদুল হাকিম

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



জয়তুন

অঙ্কন : মাসুম

সব সময় বুদ্ধিতে শাণ দিচ্ছে এবং প্রতি মুহূর্তে সতর্ক, জয়তুন খুব সাবধানে মেথিঝোপের ডালপালার ফাঁক গলে একটু বেরোল। যখন দেখল, ছায়ার ভেতর ফোয়ারার পাশে যে দুজন মানুষ টেবিলে বসে রয়েছেন, তাঁদের একজন পাদ্রি মাইকেল পিটারসন, ওর মনিব এবং প্রভু এবং বরাবরের মতো শেখ জানেমান সালমানের সঙ্গে আলাপ করছেন, ভয়-ডর ঝেড়ে ফেলে সেদিকে এগোল সে। তবে গতি খুব ধীর।

কাছাকাছি পৌঁছে থামল জয়তুন, ওর গভীর কালো চোখে আলোর বিচিত্র খেলা দেখে আপনার মনে হতে বাধ্য যে সে খুব মন দিয়ে ওঁদের কথা শুনছে। কিন্তু সত্যিটা হলো জয়তুন তার ছোট্ট মগজের সবটকু, নিজের মুখের সবটুকু দিয়ে তরমুজের হলুদ শাঁস খেতে চাইছে। জয়তুন হলো সাধারণ এক কচ্ছপ, দামেস্ক শহরে আশপাশের সব ঘাসজমিতে ওদের চলাফেরা করতে দেখা যায়।

জয়তুন অপেক্ষা করছে, ওদিকে নিজের গল্প বলে যাচ্ছেন শেখ জানেমান সালমান—

‘তারপর, আমি যেমনটা বলেছি আপনাকে, সর্বগুণের ভাণ্ডার রেভারেন্ড মাইকেল পিটারসন, ওই সিংহটা আজও তাবারিয়াতের আশপাশে কোথাও আস্তানা গেড়ে জীবন কাটাচ্ছে এবং স্বীকার না করে উপায় নেই—এককালে অসম্ভব শক্তিশালী ছিল ওটা, দেখতেও ছিল মাশআল্লাহ খানদানি, যাকে বলা হতো পশুরাজ সিংহদের মধ্যে সবচেয়ে সেরা সিংহ!  কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, একদিন একটা ছাগলকে ধাওয়া দিচ্ছিল সে, আর তাতেই ঘটল বিপত্তি। তখন একটা গর্জন ছাড়ল সে। এটার সত্যতা সম্পর্কে আমাকে নিশ্চিত করা হোক!’ তার এমন কথা শুনে সরব হলেন, ‘ও হে তাবারিয়াতের সিংহ, চেষ্টা করে দেখো দেখি তুমি তোমার শিকারকে বয়ে নিয়ে যেতে পারো কি না!’ সিংহ তখন তার প্রকাণ্ড দাঁত বসাল ছাগলের শিরদাঁড়ায়। যেন মনে হলো লিবেনেস পাহাড়কে তুলতে চেষ্টা করছে সে। তার বাঁ পা অসার হয়ে জমিনে পড়ে থাকল।

‘শেখ সালমান’, বললেন পাদ্রি পিটারসন,  ‘এসব গল্প শুধু শিশুদের মুখে মানায়।’

‘তাহলে, কিভাবে!’ জবাব দিলেন সালমান।

‘আমি একজন খ্রিস্টান’, উত্তর দিলেন পাদ্রি, অল্প একটু হলেও বিব্রত। ‘তবে দীর্ঘকাল হলো, আমরা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছি, আমরা যারা পাশ্চাত্যের সভ্য চার্চের ধর্মযাজক—বিশ্ব সৃষ্টি করার সময় যে নিয়ম প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল, নিজেকে মিথ্যুক প্রমাণ না করে ঈশ্বর সেসব বদলাতে পারেন না। আমাদের বিবেচনায় মিরাকলে বিশ্বাস রাখাটা কুসংস্কার, সেটা আসলে ছেড়ে দেওয়া উচিত ওই সব সন্ন্যাসীর ওপর, যারা রোম আর রাশিয়ার চার্চে রয়েছেন এবং যারা সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে জীবন যাপন করছে।

সালমান বললেন, মহাশক্তিধর সোলায়মানের গলার হাড়ে যে জাদুকরী ক্ষমতা আছে, তার সাহায্যে আমি অনেক বড় বড় অলৌকিক ঘটনা ঘটাতে পারি। আমাদের সামনে ওই যে কচ্ছপ রয়েছে, আমি ওটাকে রোজ একটু একটু করে বড় করতে পারব। এই ধরুন, এক আঙুলের চওড়া দিক যতটুকু ততটুকু!’

হাত বাড়িয়ে জয়তুনকে জমিন থেকে তুলল শেখ সালমান, সাবধানে নামিয়ে রাখল টেবিলের ওপর। সন্ত্রস্ত কচ্ছপ আবার নিজের মাথা শক্ত খোলের ভেতর ঢুকিয়ে নিচ্ছে। তরমুজের রসালো শাঁসের বিপরীতে জয়তুনের খোলে কালো দাগ দিয়ে ঘেরা সোনালি রঙের চৌকো আকৃতি ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। শেখ সালমান সুর তুললেন—

‘তুমি নিজেই একটা মিরাকল, ও হে কচ্ছপ! কারণ, দেখো তোমার মাথা একটা সরীসৃপের মাথা, তোমার লেজ একটা বীবরের লেজ, তোমার হাড় পাখির হাড়, তোমার আবরণ পাথর বললেই হয়, অথচ তুমি ভালোবাসা কী জিনিস তা বোঝো, যেমনটা বোঝে মানুষও। এবং তোমার ডিম থেকে, ও রে পাথরের কচ্ছপ, বাকি সব কচ্ছপ সামনে চলে আসে।’

‘তুমি নিজেই একটা মিরাকল, ও হে কচ্ছপ! লোকে বলবে তুমি বর্ম পরে থাকো, ওটা বর্ম ছাড়া আর কিছু নয়, এবং দেখো! তুমি আসলে একটা পশু, যার খিদে পায়। খিদে পেলে এই তরমুজ তুমি খাও, ও হে কচ্ছপ! মন লাগিয়ে খাও আর আজ রাতে গায়েগতরে বাড়তে থাকো, সেটা যেন আমার নখের দৈর্ঘ্যের সমান হয়, আল্লাহর যদি অনুমতি থাকে!

তার গলার একঘেয়ে সুরে আশ্বস্ত বোধ করল জয়তুন, শক্ত খোল থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিল। প্রথমে সে নিজের শিংসদৃশ্য ছোট্ট নাকের ডগাটা দেখাল, তারপর কালো চোখ, এরপর চ্যাপ্টা আর চোখা লেজ এবং সব শেষে নখ বসানো ছোট ছোট শক্তিশালী পা। তরমুজের দিকে আরো একবার তাকাল সে, তারপর যেন সম্মতি জানানোর একটা ভঙ্গি করল এবং শুরু করল খেতে।

‘আপনার কথামতো ওসব কিছুই ঘটবে না!’ মন্তব্য করলেন পাদ্রি পিটারসন, গলার স্বরে একটু হলেও দ্বিধাদ্বন্দ্বের রেশ লেগে রয়েছে।

পাদ্রি পিটারসন জয়তুনের মাপ নিলেন এবং স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে, তাঁর পোষা কচ্ছপ এক আঙুলের চওড়া দিক যতটা, ততটা সত্যি সত্যি বেড়েছে। স্বভাবতই তিনি খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন।

এভাবে দিনের পর দিন আকারে বড় হতে লাগল জয়তুন, আর শুধু আকারেও নয়, তার শক্তিও সেই অনুপাতে বাড়তে লাগল, বাড়তে লাগল রাক্ষুসে খিদেও। প্রথম দিকে আকারে ছোট্ট পিরিচের মতো ছিল, প্রতিদিন কয়েক আউন্স পুষ্টি গ্রহণ করত। তারপর মাঝারি পেয়ালার আকার পেল, তারপর একটু বড় পেয়ালার, তা থেকে একটা বাসনের। সে তার শক্তিশালী চঞ্চু দিয়ে একটা বাড়ি মেরেই তরমুজের খোসা ফাটিয়ে দিতে পারে; ভারী চোয়াল নেড়ে ফলের মিষ্টি শাঁস খাওয়ার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায়। ওই শব্দই জানিয়ে দেয়, তরমুজ খেতে কত ভালোবাসে জয়তুন। এই একটা জিনিস, তরমুজ, যদি দেওয়া হয়, কখনো কম খাবে না সে। সবার চোখের সামনে এক সপ্তাহের মধ্যে এত বেশি বাড়ল, মাঝারি বাসন থেকে বড় বাসনের আকার পেয়েছে।

পাদ্রি পিটারসনের অনুসারী লোকজন একসময় জানতে পারল যে তিনি নিজের বাড়িতে একটা কচ্ছপ পুষছেন, যেটা অলৌকিক সব কাণ্ড করছে, পাশ্চাত্যে চর্চিত বাপ-বেটার ঐশ্বরিক ক্ষমতার কোনো সাহায্য নিচ্ছে না। ধার্মিক পিটারসনের জন্য ব্যাপারটা মোটেও সুবিধার কিছু হলো না। তবে মিরাকলে বিশ্বাসী নন, এই বক্তব্যে অটল থাকলেন; অথচ যেদিন থেকে জাদুু দেখানো শুরু করেছেন, সেদিন থেকে তাঁর বাড়িতে ভুলেও একবার পা ফেলেননি শেখ সালমান। পাদ্রির বাড়ির চৌহদ্দি এড়িয়ে চলেন। তাঁর সময় কাটানোর জায়গা হলো ছোট ক্যাফে; দরজার কাছে ফেলা টেবিলে বসে হয় ধ্যানমগ্ন থাকেন, নয়তো দিবাস্বপ্ন দেখেন, আর খানিক পরপর গাঁজায় দম দেন।

তারপর একদিন, গাঁজার নেশায় বুঁদ হয়ে ক্যাফেতে বসে আছেন শেখ সালমান। দেখতে পেলেন, পথ দিয়ে হেঁটে আসছে হাসিব। পাদ্রি পিটাসনের চাকর হাসিব, বাজার থেকে প্রচুর সবজি আর তরকারি নিয়ে বাড়ি ফিরছে। তাকে দেখে রাজকীয় ভঙ্গিতে চেয়ার ছাড়তে গেলেন শেখ সালমান—যদিও নেশার কারণে তাঁর পা টলে উঠল। টলমল করছেন, তার পরও হাসিবের পিছু নিলেন।

‘করুণার পাত্র!’ চেঁচাচ্ছেন, পাদ্রি পিটারসনকে লক্ষ করে। ‘সত্যি কথা বলতে কি, আপনি একটা নর্দমার কীট! তা না হলে জাদুর প্রভাব নষ্ট করতে চাইতেন না। উল্লাসে নাচুন, কারণ জাদুটা সত্যি নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আপনার উল্লাসের পিছু নিয়ে যেন প্রবল হতাশা চলে আসে, কারণ প্রভাবটা এমন এক ভঙ্গিতে নষ্ট হয়েছে যে আপনি সেটার স্বপ্নও দেখেননি। এবার তার ফল ভোগ করুন। এখন থেকে আপনার ওই কচ্ছপ দিনকে দিন ছোট হতে থাকবে!’

নতুন সবজি খেতে দেওয়ায় প্রথমে খুব বিরক্ত হলো জয়তুন। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তরমুজই তার সবচেয়ে প্রিয় খাবার। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন পিটারসন। ‘জয়তুন পরিমাণে খুব বেশি খাচ্ছে, আর সেটাই হলো সমস্যার মূল।’ নিজেকে বললেন তিনি। ‘যত বেশি খাবে তত বেশি বাড়বে, এটা তো জানা কথা। ওটাকে যদি কম খেতে দেওয়া হয়, তাহলে নিশ্চয়ই অত বেশি বাড়বে না। আর সে যদি মারা যায়, লাশটা আমি ফেলে দিয়ে আসব। ফলাফল যা-ই হোক, সেটা ভালো কিছুই হবে।’

তবে পরদিন দেখা গেল, ক্ষোভ আর দুঃখ ভুলে খুব নম্র ভঙ্গিতে সবজি খাচ্ছে জয়তুন। দুদিন পর আবার তার জন্য সবজি নিয়ে এলো হাসিব; কিন্তু জয়তুনকে দেখেই অবাক গলায় বলল, ‘জনাব, একি! আপনার কচ্ছপ তো ছোট হয়ে গেছে!’

পাদ্রি তাঁর কাঁধ ঝাঁকাতে চেষ্টা করলেন; কিন্তু বাস্তব সত্য ঢেকে রাখা অসম্ভব হয়ে উঠল—জয়তুন যে অবশ্যই কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেছে! এবং মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে গোটা দামেস্ক জেনে ফেলল, জয়তুন এখন আগের চেয়ে ছোট। পাদ্রি পিটারসন যখন নাপিতের দোকানে গেলেন, গ্রিক নাপিত তাঁকে বলল, ‘স্যার, আপনার কচ্ছপ কোনো সাধারণ কচ্ছপ নয়!’

আর রাস্তায় বের হলে পাদ্রি পিটারসনকে দেখা মাত্র ফেরিওয়ালা, গাধার চালক, ভিস্তি, মাছওয়ালা, কাবাবওয়ালা, রুটিওয়ালা, পুঁতিওয়ালা, চুড়িওয়ালা থেকে শুরু করে আধকানা ভিখারি পর্যন্ত চেঁচাতে শুরু করে, ‘মিস্টার কচ্ছপ! মিস্টার কচ্ছপ! আমাদের জিনিস ব্যবহার করে দেখতে পারেন। আপনার গোঁয়ার পশুটার জন্য কিছু কিনে নিয়ে যান, যে কি না আপনাকে অপমান করার জন্য নিজের ক্ষতি করছে—তা না হলে কী কারণে ওটা ছোট হতে চাইবে, আপনিই বলুন?’

এবং এড়াতে না পারা সত্যটা হলো, কচ্ছপ কুঁকড়ে আরো ছোট হয়ে যাচ্ছে। সে আবার আগেকার সেই বাসনের আকার ফিরে পেয়েছে। এভাবে একসময় তার আর প্রায় কিছুই রইল না, রইল শুধু গোলমতো ছোট্ট একটা জিনিস, অতি ক্ষুদ্র, ভঙ্গুর, স্বচ্ছ, শুধু একটা দাগ—ভদ্রমহিলার কবজিতে যেমন হাতঘড়ি থাকে, ফোয়ারার গোড়ায় চরে বেড়ানোর সময় চোখে প্রায় ধরাই পড়ে না।

পরদিন—আহ্! পরদিন ওখানে আর কিছু থাকল না। কিছু থাকল না মানে কিছুই থাকল না। না কোনো কচ্ছপ, না কচ্ছপের কোনো ছায়া।

ভেতরটা পুরোপুরি ভরাট হয়ে যাওয়ায় শেখ সালমান গাঁজায় দম দেওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। তবে সারা দিন তাঁকে সেই একই ক্যাফের দরজায় চেয়ারের ওপর একটা স্তূপ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়, সেটা পাদ্রি পিটারসনের বাড়ির সরাসরি উল্টো দিকে। তাঁর চোখ বেমানান টাইপের বড় হয়ে গেছে, মড়ার মতো রং ধরা মুখে বিদঘুটে এবং ভীতিকর লাগে, চেহারায় এনে দিয়েছে সত্যিকার একজন জাদুকরের বৈশিষ্ট্য।

পাদ্রি পিটারসন ইংলিশ কনসালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, এই মুহূর্তে বাড়ি ফিরছেন তিনি। কনসাল তাঁকে ঠাণ্ডা সুরে এ রকম কিছু কথা বলেছেন:

‘আমি শুধু আপনাকে এটুকু বলতে পারি যে নিজেকে আপনি একটা গাধা প্রতিপন্ন করেছেন কিংবা একজন ফরাসি যেমনটা বলবে, আপনি গাধার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, নিজে গাধার ডাক ডাকছেন শোনার জন্য। সবচেয়ে ভালো যে কাজটা এখন আপনি করতে পারেন—অন্য কোথাও গিয়ে ধর্ম প্রচার করুন।’

—বিদেশি গল্প অবলম্বনে

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা