kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

মার্কেসের প্যারিস জীবনে তাচিয়া পর্ব এবং কর্নেল

দুলাল আল মনসুর

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



মার্কেসের প্যারিস জীবনে তাচিয়া পর্ব এবং কর্নেল

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, তাচিয়া কুইনতানা

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলেন, ‘প্রত্যেক মানুষের তিনটি জীবন থাকে : একটি জনসমক্ষের জীবন, একটি ব্যক্তিগত জীবন, আরেকটি গোপন জীবন।’ কথাগুলো তিনি বলেন ১৯৯৩ সালের জুন মাসে তাঁর জীবনীকার জেরাল্ড মার্টিনকে। মার্টিন জানতেন, মার্কেসের প্যারিস জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিলেন তাঁর প্রেমিকা তাচিয়া কুইনতানা। তাচিয়া সম্পর্কে কথা বলতে বললে তিনি কিছু বলতে চাননি। সে সময় তাচিয়া সম্পর্কে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন মানুষই জানতেন।       

তাচিয়ার জন্ম ১৯২৯ সালে স্পেনে। ক্যাথলিক মা-বাবার তিন কন্যার মধ্যে অন্যতম তিনি। গৃহযুদ্ধের পরে ফ্রাংকোর আমলে তাঁর বাবা ফ্রাংকোকেই সমর্থন করতেন। বাবা ছিলেন কবিতাপ্রেমিক। মেয়ের ছোটবেলা থেকে প্রতিনিয়ত কবিতা পড়ে শোনাতেন। এভাবেই তাচিয়ার মধ্যে কবিতার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। ১৯৫২ সালে বিলবাওতে তাচিয়ার পরিচয় হয় তখনকার দিনের বিখ্যাত স্প্যানিস কবি ব্লাস দে ওতেরোর সঙ্গে। তাঁর চেয়ে ১৩ বছর বড় ওতেরোর নানা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ১৯৫২ সালের শেষের দিকে তাচিয়া স্পেন থেকে ফ্রান্সে পাড়ি জমান। মাস ছয়েক থাকেন চোখ-ধাঁধানো প্যারিসে। তারপর স্পেনে ফিরে এসে আবার যান ১৯৫৩ সালের মাঝামাঝি। এবার যান সেখানে ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্যে। নাটকের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। কৌতূহলী, অভিযানপ্রিয় এবং সব পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ার মতো মানসিকতা ছিল তাঁর। 

১৯৫৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মার্কেস প্যারিস যান। সাধারণত ক্যাপুলেড ও অ্যাকোপোলোর মতো সস্তা হোটেলে খাওয়াদাওয়া করতেন। অন্য লাতিন আমেরিকানরা বুদ্ধিজীবী হাওয়া গায়ে লাগানোর জন্য সাধারণত সোরবোন কিংবা লুভরে ঘুরতেন। প্যারিসের গিলডেড আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখার চেষ্টা করতেন; কিন্তু মার্কেস দিন কাটাতেন রাস্তার বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তখনই তাঁর জীবনে চলে আসে এক আকস্মিক পরিবর্তন। মার্চের এক সন্ধ্যায় ২৬ বছর বয়সী স্প্যানিশ অভিনেত্রী তাচিয়ার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। প্রথম দেখায় মার্কেসকে তাচিয়ার পছন্দ হয় না। উদ্ধত হলেও কোমলতার স্বভাব ছিল মার্কেসের। অন্যদিকে তাচিয়ার পছন্দ ছিল নিজের চেয়ে একটু বেশি বয়সী পুরুষ, যেমন পেয়েছিলেন ওতেরোকে। মার্কেস তাঁর সমবয়সী; তার ওপরে তাঁর সাংবাদিকতার পেশা নিয়ে মার্কেসের মধ্যে খানিক অহংকারী ভাবও ছিল। সেই সন্ধ্যায় তাঁদের দেখা হওয়ার মাঝে যে বন্ধুটি ছিলেন, কিছুক্ষণ পর তিনি পানশালা ত্যাগ করেন। মার্কেস ও তাচিয়া উভয়ের মধ্যে সেখানে চালানোর মতো কথা না পেয়ে প্যারিসের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কথা বলেন। তাচিয়া প্রথমে মুগ্ধ হন মার্কেসের আত্মনির্ভরশীল হাসি, কথা বলার ভঙ্গি ও কণ্ঠস্বরে। সে সময় মার্কেসের হাতে টাকা-পয়সাও ছিল। বান্ধবীকে পানীয়, এক কাপ চকোলেট দিয়ে আপ্যায়ন করা কিংবা সিনেমার টিকিট কিনে দেওয়া কোনো ব্যাপারই ছিল না। তবে তাচিয়ার সঙ্গে দেখা হওয়ার তিন সপ্তাহের মাথায় মার্কেসের পত্রিকা ‘লে ইনডিপেনডেন্ট’ বন্ধ হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ তাঁকে কলম্বিয়া ফিরে যাওয়ার টিকিট পাঠিয়ে দেয়; কিন্তু মার্কেস টিকিট ভাঙিয়ে থেকে গেলেন প্যারিসেই। তখন আপাতত কারণ হতে পারে ইউরোপে আরো কিছুদিন থেকে যাওয়ার ইচ্ছা, তিন মাস ধরে লেখা উপন্যাস ‘ইন ইভল আওয়ার’ শেষ করা কিংবা নতুন প্রেমিকাকে ছেড়ে না যাওয়ার মানসিকতা। কিন্তু তাচিয়ার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর মার্কেস বুঝতে পারলেন, তাঁর উপন্যাসের গতি তেমন এগোচ্ছে না। অনেক বছর পরে এই মার্কেসই দৃঢ় সিদ্ধান্তে বুঝতে পারতেন, তিনি কী লিখবেন এবং যা লেখার সংকল্প করেছেন তা ঠিকমতো লিখে ফেলেছেন। অথচ সে সময় একটা লেখা ভেঙে গিয়ে যেন আরেকটা হয়ে ওঠার পরিস্থিতি তৈরি করেছে তাঁর সামনে।

এ রকম মুহূর্তে মার্কেস তাঁর চলমান উপন্যাসের কাজ আপাতত গুটিয়ে রেখে কর্নেলকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মার্কেস ও তাচিয়ার প্রেম তাঁদের নিজেদের কাছেই বিস্ময়কর, আবেগতাড়িত ও পুরোপুরিই অপ্রত্যাশিত মনে হয়। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের আর্থিক টানাটানি শুরু হয়ে যায়। মাঝে মাঝে তাঁদের খাবারের নিশ্চয়তাও থাকত না। অবশ্য এ রকম অভাবের অভিজ্ঞতা মার্কেসের নতুন নয়, বোগোতা, কার্তাজেনা ও বারাংকুইলা থাকাকালে তাঁকে এমন অভিজ্ঞতা পার করতে হয়েছে। প্যারিসেও মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাছ থেকে মার্কেস হাড্ডি চেয়ে এনেছেন, যাতে তাচিয়া সেগুলো দিয়ে আপাতত পাতলা ঝোল রান্না করতে পারেন। কখনো খালি বোতল এবং পুরনো খবরের কাগজ সংগ্রহ করে বিক্রি করেছেন মার্কেস। কলম্বিয়ায় বন্ধুদের কাছে খবর পাঠিয়েছেন তাঁকে আর্থিক সাহায্য পাঠানোর জন্য। তাঁর অপেক্ষা করার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় তাঁর নানার পেনশনের জন্য অপেক্ষা করার এবং তাঁর নতুন উপন্যাসের কর্নেলের অপেক্ষার।

এ রকম পরিস্থিতিতে নেমে আসে আরেক বিপদ। তাঁদের সম্পর্কের দুই মাসের মাথায় তাচিয়া বুঝতে পারেন, তাঁর পেটে বাচ্চা এসেছে। তখন তাচিয়া কাজকর্ম করতে থাকেন : লোকজনের বাচ্চাদের দেখাশোনা করা, কারো বাড়ি পরিষ্কার করে দেওয়া ইত্যাদি। বাসায় ফিরে যথারীতি রান্নাও করা ছিল তাঁর দায়িত্বে। কারণ মার্কেস এরই মধ্যে তাচিয়াকে ‘জেনারেল’ ডাকা শুরু করেছেন। প্রায়ই তাঁদের ঝগড়াঝাটি লেগে যেত। তবে তাচিয়া স্বীকার করেছেন, মার্কেসের মনটা ছিল যথেষ্ট মায়াভরা। তাঁর মতে, কোমলতার আরেক নাম মার্কেস। ভালোবাসার মুহূর্তে তাঁরা বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও আবেগের বিনিময় করতেন। ভবিষ্যৎ সন্তানকে নিয়ে নানা পরিকল্পনা করতেন। মার্কেস দারুণ গান করতে পারতেন। দিনের বেলা যেখানে যেমন থাকুন না কেন, মার্কেস তাচিয়ার জন্য চমৎকার রাত উপহার দিতেন। রাতে দুজনের বোঝাপড়া হতো চমৎকার। তাচিয়া স্বীকার করেছেন, দুজনের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি যখন তৈরি হয়েছে—প্রধানত তাঁর নিজের কারণেই হয়েছে। লাতিন আমেরিকার সহনশীল স্বভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি যখন যেটা যেমন চেয়েছেন মার্কেস তাঁকে সেটা তেমন করেই করতে দিয়েছেন। সাড়ে চার মাস অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার সময় বেপরোয়া হয়ে তাচিয়া সিদ্ধান্ত নেন বাচ্চা গর্ভপাতের। তিনি মেটারিনিটে পোর্ট রয়েল হাসপাতালে ভর্তি হন। আট দিন থাকার পর ফিরে আসেন। তখন দুজনই বুঝতে পারেন, তাঁদের সম্পর্ক আর টিকবে না।

১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে তাচিয়া প্যারিস ছেড়ে মাদ্রিদে চলে যান। তাঁকে বিদায় দেওয়ার সময় মার্কেস কয়েকজন বন্ধু নিয়ে স্টেশনে যান তাচিয়াকে ট্রেনে তুলে দিতে। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে যায় তাঁদের স্টেশনে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে। ভালো করে বিদায় জানাতেও পারেন না তাচিয়া। শুধু জানালা দিয়ে তাকিয়ে থেকে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। ট্রেন চলার সঙ্গে মার্কেসও কিছু দূর চলতে থাকেন; তাঁর সারা মুখে ছড়িয়ে থাকে বেদনাভরা হৃদয়ের সমস্ত আবেগ।

তাচিয়া চলে গেলেন। কিন্তু মার্কেসের হাতে রয়ে গেল ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ উপন্যাস। তাঁর জন্য অনন্য বিষয় হচ্ছে, এ উপন্যাসে সমসাময়িক কাল। অর্থাৎ ঠিক যখন লেখা হচ্ছিল সেটাই। ১৯৫৬ সালের শেষের কয়েক মাস। এ উপন্যাসের রূপরেখা সাজানো হয়েছিল তাচিয়া মাদ্রিদের উদ্দেশে প্যারিস ছেড়ে যাওয়ার অনেক আগে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কর্নেল মাকোন্দোর বাসিন্দা। পেনশনের জন্য অপেক্ষমাণ কর্নেলের আর কোনো উপায় নেই তাঁর নিজের এবং স্ত্রীর খাওয়া-পরার জন্য। সরকারের পেনশন বিভাগ থেকে একটা চিঠি এসেছিল, সে-ও ১৫ বছর পার হয়ে গেছে। তবু তাঁর পোস্ট অফিসে যাওয়া থামেনি : আশা আছে, চিঠি আসবে। কিন্তু চিঠি আসে না। গোপনে বিরোধী রাজনৈতিক প্রচারপত্র বিলি করার অপরাধে একমাত্র ছেলে অগাস্টিন নিহত হয়েছে সরকারের হাতে। রেখে গেছে তার চ্যাম্পিয়ন লড়াকু মোরগ। মোরগটা ছেলের নিজের প্রতিনিধিত্ব করে, এ ছাড়া মর্যাদা, প্রতিরোধেরও প্রতীক এটা। 

তাঁর এই প্রিয় উপন্যাস লেখার প্রেরণা সম্পর্কে মার্কেস বলেন, এটা লেখার পেছনে বেশ কয়েকটা উৎসাহ কাজ করেছে। প্রথমত, অনেক দিন আগে বারাংকুইলার এক মাছের বাজারে একটা নৌকার জন্য এক লোককে অপেক্ষা করতে দেখেছিলেন। দ্বিতীয়ত, আরো বেশি ব্যক্তিগত উৎস হলো তাঁর নানার স্মৃতি : তিনিও হাজার বছরের যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর তাঁর পেনশনের জন্য অপেক্ষায় থেকেছেন। অবশ্য উপন্যাসের কর্নেলের সঙ্গে মার্কেসের নানার শারীরিক অবয়বে খানিক আমিল আছে। বরং মার্কেসের বন্ধু সুরকার রাফায়েল এসকালোনার বাবা কর্নেল ক্লিমেন্তে এসকালোনার হালকা-পাতলা চেহরার সঙ্গে উপন্যাসের উপোসী কর্নেলের মিল আছে বলে জানান মার্কেস। তিনিও হাজার বছরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তৃতীয়ত, ভায়োলেনসিয়ার সময়কার কলম্বিয়ার অবস্থা থেকে মার্কেস এ উপন্যাস লেখার প্রেরণা পান। চতুর্থত, এ উপন্যাসের শৈল্পিক প্রেরণা পান ভিত্তোরিও ডি সিকার চলচ্চিত্র ‘উমবার্তো ডি.’ থেকে। এখানে এক গরিব বৃদ্ধ তার ভাড়া করা রুমটা ছাড়তে চায় না। মালিক মহিলা তাকে বের করে দিচ্ছে। তার একমাত্র বন্ধু কাজের মেয়ে এবং কুকুর—এরা কোনো কাজে আসছে না। কর্নেলের মোরগের মতোই বৃদ্ধের কুকুরটা তার প্রিয় এবং গর্বের ধন। মার্কেসের নিজের অবস্থাও এই বৃদ্ধের সঙ্গে মেলে কিছুটা।

তবে পঞ্চমত, মার্কেসের না বলা কারণটাই সবচেয়ে নিকটতম ও দ্ব্যর্থহীন। মার্কেস ও তাচিয়ার জীবনের ওই সময়ের সব নাটকীয় ঘটনা এবং তাঁদের জীবনের ও উপন্যাসটির পটভূমিতে থাকা সুয়েজ সংকট হলো সেই গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বাস্তব জীবনে এবং উপন্যাসে নারী চরিত্র পুরুষটির দুর্বলতা ও স্বার্থপরতা কিংবা একগুঁয়েমি সহ্য করছেন। উভয় পুরুষেরই ভাষ্য হলো, তার সামনে ঐতিহাসিক মিশন আছে। পুরুষটার সে মিশনটা তার নারী সঙ্গীর চেয়েও বড়। উভয় জায়গায়ই চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে নারী। বাস্তবে মার্কেস ও তাচিয়ার সন্তান গর্ভপাতে শেষ হয়ে যায়; উপন্যাসে কর্নেল ও তাঁর স্ত্রীর ছেলে নিহত হয়। মার্কেসের কাছে তাঁর উপন্যাসটা সৃজনশীল গর্বের বস্তু; কর্নেলের কাছে তার মোরগটা তার মর্যাদা ও পরিচয়ের প্রতীক। উপন্যাসে কর্নেলকে তাঁর স্ত্রী বলে, ‘আমরা আমাদের ছেলের রেখে যাওয়া এতিম।’ এ কথাগুলোই মার্কেস ও তাচিয়ার প্রেমের সমাধির বাণী হওয়ার মতো। এ উপন্যাসের সঙ্গে বাস্তবের ঘটনার আরেকটা মিল হলো, কর্নেলের স্ত্রীর ক্রমাগত চাপ ও অনুরোধ সত্ত্বেও কর্নেলের মোরগ টিকে থাকে। একই রকমভাবে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেলেও মার্কেস এ উপন্যাসটি লিখে শেষ করে ফেলেন। উপন্যাসটিও টিকে থাকে। এটা সম্পর্কে তাচিয়া নিজেও বলেছেন, এ উপন্যাসের কথা তাঁদের নিজেদের অবস্থারই প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘লেখার সময়ই আমি পড়েছি। আমার তখনই ভালো লেগেছে এ উপন্যাস।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা