kalerkantho

শুক্রবার । ৮ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৬ জমাদিউস সানি ১৪৪১

লেখার ইশকুল

আমার বই বন্দি হয়ে গেলে আমি মুক্ত থেকে লাভ কী : ভাসিলি গ্রসমান

৩ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



আমার বই বন্দি হয়ে গেলে আমি মুক্ত থেকে লাভ কী : ভাসিলি গ্রসমান

ভয়াবহ নিষেধাজ্ঞার শিকার প্রচণ্ড সাহসী এক রুশ কথাসাহিত্যিকের নাম ভাসিলি সেমিওনোভিচ গ্রসমান। নির্ভীক সাংবাদিক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়। জন্ম ১২ ডিসেম্বর ১৯০৫ সালে ইউক্রেনে। বাবা রাসায়নিক প্রকৌশলী, মা ফরাসি ভাষার শিক্ষক। নিজের পড়াশোনা বাবার মতোই রাসায়নিক প্রকৌশলবিদ্যায়। ১৯৩০-এর দশকে পেশা পরিবর্তন করে পুরোপুরি লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৩৬ সালের মধ্যে দুটি ছোটগল্প এবং একটি উপন্যাস প্রকাশ হয়। ১৯৩৭ সালে ইউনিয়ন অব রাইটার্সের অন্তর্ভুক্ত হন। সে বছরই স্তালিন পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম তালিকাভুক্ত করা হয়। তবে স্তালিন নিজে নামটি তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেন। কারণ হিসেবে মনে করা হয়, মেনশেভিকদের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা প্রকাশ পেয়েছে।

১৯৪১ সালে নািস জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে লাল বাহিনীর মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ‘রেড স্টার’ পত্রিকার জন্য কাজ করেন গ্রসমান। মস্কো, স্তালিনগ্রাদ, কার্স্ক এবং বার্লিন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরাসরি সংবাদ সংগ্রহ করেন তিনি। জার্মানির দখলে থাকা ইউক্রেন ও পোল্যান্ডে নিধনযজ্ঞের সরাসরি অভিজ্ঞতার যে বর্ণনা দিয়ে যান, সেটিই পরে হলোকস্ট নামে পরিচিতি পায়। নির্ভীক সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক গ্রসমান তখন কিংবদন্তিতুল্য যুদ্ধনায়ক হিসেবেও পরিচিতি পান। তাঁর লেখা ‘দ্য হেল অব ট্রেবলিনকা’ পরে নুরেমবার্গ ট্রায়ালে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।  

যুদ্ধের সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে লেখেন উপন্যাস ‘স্তালিনগ্রাদ’। পরে ইংরেজি অনুবাদে এটির নাম দেওয়া হয় ‘ফর আ জাস্ট কজ’। এ উপন্যাসের সর্বশেষ ইংরেজি অনুবাদে প্রথম নামটিই রাখা হয়েছে। 

রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞার কারণে গ্রসমানের সামান্য লেখালেখিই তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ করা গেছে। ‘লাইফ অ্যান্ড ফেইট’ উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি প্রকাশের জন্য জমা দেওয়ার পর কেজিবি তাঁর বাড়ি তল্লাশি করে। পাণ্ডুলিপি, খাতা, কার্বন কপি, টাইপিস্টের কপি, এমনকি টাইপরাইটারের ফিতা পর্যন্ত জব্দ করে নিয়ে যায় কেজিবির লোকেরা। কমিউনিস্টদের এক্সিকিউটিভ কমিটির প্রধান মিখাইল সাসলভ বলেন, গ্রসমানের বই আগামী দু-তিন শ বছরেও প্রকাশ করা যাবে না।

বই প্রকাশের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে গ্রসমান সরাসরি ক্রুশ্চেভকে চিঠিতে প্রশ্ন করেন, ‘যে বইয়ের জন্য জীবন উৎসর্গ করলাম সে বই যখন বন্দি হয়ে গেল, তখন নিজে শারীরিকভাবে মুক্ত থেকে লাভ কী?’ কিন্তু ‘লাইফ অ্যান্ড ফেইট’ এবং ‘এভরিথিং ফ্লোস’—উপন্যাস দুটি তখন প্রকাশের অনুমতি মেলেনি। লেখককেও ভিন্নমতাবলম্বী মনে করে সমাজের সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়।

‘লাইফ অ্যান্ড ফেইট’ ১৯৮০ সালে রুশ ভাষায় প্রকাশ করা হয় সুইজারল্যান্ড থেকে। লেখক কবি সেমিওন লিপকিন পাণ্ডুলিপি লুকিয়ে রেখেছিলেন; নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আঁদ্রেই শাখারভ গোপনে পাণ্ডুলিপির ফটোকপি করেছিলেন। আর লেখক ভ্লাদিমির ভোইনোভিচ গোপনে পাচার করেছিলেন দেশের বাইরে। দুজন গবেষক লেখক এফিম এটকাইন্ড ও শিমোন মারকিশ কিছুটা নষ্ট হয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপি অনেক কষ্টে আবার টাইপ করেছিলেন। এভাবেই আলোর মুখ দেখেছিল এই উপন্যাস। ‘এভরিথিং ফ্লোস’ উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশ করা হয় ১৯৮৫ সালে রবার্ট চ্যান্ডলারের ইংরেজি অনুবাদে। দ্রুত ব্যাপক প্রশংসা পায় এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ আখ্যাও পায়।

১৯৬৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর গ্রসমান মারা যান। 

 

দুলাল আল মনসুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা