kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

নীল পাহাড়ের তিন কন্যা

শামীম আল আমিন   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



নীল পাহাড়ের তিন কন্যা

অঙ্কন : মাসুম

হঠাৎ তীব্র একটা আলো এসে লাগল চোখে। ঝলকানির মতো। আবার মিলিয়ে গেল। অন্ধকার। এই অন্ধকারের কোনো নাম হয় কি না জানা নেই। চোখ খুলে রাখা, বন্ধ রাখা—দুটোই সমান। অদ্ভুত একটা শব্দ এবার শোনা যাচ্ছে। মনে হয়, চারপাশে কিছু একটা হচ্ছে। রহস্যময় পরিবেশ। ভয় ভয় লাগছে আমার। কিছুটা ক্লান্তিও। শেষ মুহূর্তে একি যন্ত্রণায় পড়া গেল! অস্ট্রেলিয়ায় বন্ধুর কাছে বেড়াতে এসেছি। কালই চলে যাব। অথচ শেষ মুহূর্তে এ কোন অজানা, অচেনা জায়গায় চলে এলাম! আমাকে নিয়ে এলো কে! কিছুই বুঝতে পারছি না। দুই হাত সামনে তুলে হাতড়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করলাম। হঠাৎ মনে হলো, হাতে কিছু একটার স্পর্শ পেলাম। মানুষের স্পর্শ। চমকে উঠলাম। ভেতরটা কেঁপে ওঠল। ঝনঝন করে কিছু একটা বেজে ওঠল। আবার সেই আলো। বুকটা কেঁপে কেঁপে ওঠছে। আদিবাসীদের মতো পোশাক পরা, অপরূপ সুন্দরী এক নারী আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। উপেক্ষা করা যায় না। বারবার তাকাতে ইচ্ছা করে। সরাসরি তাকালাম তার দিকে। ‘তুমি কে?’

মিষ্টি হেসে মেয়েটা জবাব দেয়, ‘আমার নাম মেহনি।’

‘মেহনি, তুমি কোথা থেকে এসেছ? আমি কোথায়?’

‘আমি এখানেই থাকি। বন্দি হয়ে আছি। হাজার বছর ধরে তোমার প্রতীক্ষায়। অবশেষে তুমি এলে। আমার কাছে এসো।’ বলে হাত বাড়িয়ে দেয় রহস্যময়ী সেই নারী।

রীতিমতো চমকে উঠলাম আমি। ‘বলে কী এই মেয়ে! চিনি না, জানি না—বলে কিনা আমার জন্য দাঁড়িয়ে। ওর কাছে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।’ মনে মনে ভাবছি। ‘কী যন্ত্রণায় পড়া গেল!’

‘কী হলো, আসবে না? কাছে এসো।’ মেয়েটার আকুতি।

‘কিছুতেই না। আমি তো তোমাকে চিনি না। কেন আসব? আমি কোথায় সেটা বলো। কিভাবে এলাম এখানে?’

এ সময় অন্ধকারের মধ্যে মনে হলো, আরো দুটি মেয়েকণ্ঠ শুনতে পেলাম। ঝনঝন শব্দে হাসি। সেই হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়েছে মেহনি। হঠাৎ সেই আলোর ঝলকানি। ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম আমি। এবার তিনটি মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। মেহনির সঙ্গে আরো দুজন। অস্পষ্ট তাদের চেহারা। আলোর ঝলকের মধ্যে যতটা দেখা যায়।

‘তুমি কি সত্যি আমাকে চিনতে পারছ না?’

আমি প্রাণপণে বলে উঠলাম, ‘না, আমি তোমাকে চিনতে পারছি না।’

‘আমি মেহনি।’

‘চিনতে পারছি না।’

পাশেরজন বলে উঠল, আমি উইমলাহ। আর পাশে ওকে দেখছ, ওর নাম গুননেডু। আমরা তিন বোন। তুমি কি এবার আমাদের চিনতে পারছ?

আমি বললাম, ‘আমি তোমাদের চিনতে পারছি না।’

‘আমরা তিনটি পাহাড়। আমাদের ডাকা হয় থ্রি সিস্টারস নামে। এবার চিনেছ?’ এবার বলে ওঠে গুননেডু।

‘আমি তোমাদের কথা শুনেছি। তোমরা তো পাহাড়। তোমরা কী তবে আবার মানুষ হয়ে গেছ?’

মেহনি বলল, ‘না, আমরা এখনো পাহাড় হয়েই আছি। তুমি কী আমাদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কোনো সাহায্য করতে পারো। আমরা আর পাহাড় হয়ে থাকতে চাই না।’

আমি বললাম, ‘আমি কিভাবে করব। আমি জানি না।’

উইমলাহ বলল, ‘তুমি যদি ভালোবেসে মেহনিকে বিয়ে করো, তাহলেই আমরা সবাই মানুষ হয়ে যাব। সত্যিকারের ভালোবাসা চাই। তুমি হয়তো সেই মানুষ, যার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষায় মেহনি। সেই সঙ্গে মানুষ হয়ে ওঠার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় আমরা বসে আছি।’

‘কিন্তু আমি তো সুমনাকে ভালোবাসি। সে আমার অপেক্ষায়। আমাকে যেতে হবে। আমি যেতে চাই। কিভাবে যাব, একটু বলে দেবে তোমরা। প্লিজ...প্লিজ...!’

‘আমাদের জন্য তোমার কি এতটুকু মমতা হচ্ছে না? এতগুলো বছর আমরা পাহাড় হয়ে আছি। আমাদেরও তো মানুষ হতে ইচ্ছা করে। কতগুলো বছর তোমার পথ চেয়ে বসে আছি। তুমি এলে। অবশেষে তুমি এলে।’ আকুতির স্বরে বলে মেহনি।

‘না না, আমি কিছু করতে পারব না। কিন্তু জানতে ইচ্ছা করছে, তোমরা পাহাড় হলে কিভাবে?’

‘তুমি বুঝি জানো না?’ প্রশ্ন উইমলাহর।

‘জানতাম। কোথায় যেন পড়েছি। কিন্তু ভুলে গেছি।’

‘ঐ দিকে তাকাও। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তিনটা পাহাড় দেখতে পাচ্ছ। উচ্চতায় কিন্তু খুব কাছাকাছি। চারদিকের নীলের সমারোহের মধ্যে এই পাহাড়গুলোর গায়ের রং একটু আলাদা। খেয়াল করেছ? বাদামি আর লালচে ধরনের।’ বলতে থাকে মেহনি।

‘পাহাড় তিনটা তিন বোন; ইংরেজিতে ডাকা হয় থ্রি সিস্টারস নামে। আমরাই সেই তিন বোন। ভাবছ, পাহাড় আবার বোন হয় কী করে! এই এলাকাকে বলে ব্লু মাউন্টেন বা নীল পাহাড়। এর মধ্যে তিনটি আলাদা পাহাড়। আমাদের ঘিরে আছে এক অদ্ভুত শোকগাথা।’

‘তোমরা চাইলে তোমাদের করুণ কাহিনি শুনতে পারি আমি। কিন্তু তোমরা যদি পাহাড় হও, এখানে মানুষের মতো আলাদা কিভাবে দাঁড়িয়ে আছ?’ আমার চোখে-মুখে প্রবল বিস্ময়!

মেহনি বলে, ‘তুমি এসেছ, তাই আমাদের ছায়া বের হয়ে এসেছে। যদি তুমি ভালোবেসে আমাকে বিয়ে করো, তাহলে আমরা তিনজনই পুরোপুরি মানুষ হয়ে যাব।’

বলে কী এই মেয়ে! ভয় বাড়তে থাকে আমার। এর পরও জানতে চাই, ‘কী হয়েছিল তোমাদের?’

‘যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছ, সিডনি থেকে জায়গাটার দূরত্ব ৮১ কিলোমিটার। কুটুম্বা শহরের কাছে জ্যামিসন উপত্যকায়। অনেক অনেক বছর আগে থেকে এখানে আমাদের বাস। কুটুম্বাগোষ্ঠীর আমাদের তিন বোনের সঙ্গে প্রতিবেশী নেপিয়ানগোষ্ঠীর তিন যুবকের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু উপজাতীয় এই গোষ্ঠী দুটির মধ্যে বিয়েতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ধর্ম। তবে তিন ভাই এ নিয়ম মেনে নিতে পারেনি। তারা আমাদের তিন বোনকে জোর করে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ নিয়ে উপজাতীয় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বেধে যায় রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ। একপর্যায়ে সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে আমাদের তিন বোনকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ জাদুকর। তিনি আমাদের তিনজনকে পাহাড় বানিয়ে দিলেন।’ এ পর্যন্ত বলে থামল মেহনি।

‘সেই থেকে তোমরা পাহাড় হয়ে আছ? এত বছর ধরে কিভাবেই বা বেঁচে আছ?’ চোখে-মুখে সেই বিস্ময় ধরে রেখেই প্রশ্ন করলাম আমি।

‘যুদ্ধে ওই বৃদ্ধ জাদুকর মারা যাওয়ায় আর কেউ কখনোই আমাদের তিন বোনকে মানুষরূপে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। আমরা তো পাহাড়রূপে বন্দি। তাই আমাদের মৃত্যুও নেই।’ উত্তর দেয় মেহনি। ‘এখন তুমিই পারো আমাদের উদ্ধার করতে।’

‘আমি! কিভাবে সম্ভব? আমি তো সুমনাকে ভালোবাসি।’

হঠাৎ বিকট শব্দে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। ধড়মড় করে উঠে বসলাম। ঘেমে বিছানা ভিজে গেছে। কিছু সময় বুঝতে পারলাম না কী হচ্ছে! আমি কোথায়! চারপাশে তাকাতে থাকলাম। মেয়ে তিনটা কোথায়? এই যে একটু আগে সামনে ছিল। তিন পাহাড় হয়ে আছে যারা। একটু পরেই বুঝতে পারলাম, স্বপ্ন দেখছিলাম। মেয়ে তিনটার জন্য তীব্র মন খারাপ হতে লাগল। কোথায় হারিয়ে গেল তারা!

আসলে আজই সোলায়মানের সঙ্গে ব্লু মাউন্টেন দেখতে যাওয়ার কথা। সেই নীল পাহাড়েই রয়েছে থ্রি সিস্টারস। ওই এলাকা নিয়ে খোঁজ নিতে একটু পড়াশোনা করেছিলাম। তাতেই মাথার ভেতরে ঢুকে গেছে পুরো বিষয়টা। সোলায়মানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, টেরই পাইনি। বন্ধু হাসান গেছে কাজে। ওর বাসায়ই উঠেছি।

মনে পড়ে গেল, ‘একটা বইয়ে পড়েছি। স্বপ্নে মেহনি যে বৃদ্ধের কথা বলছিল, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের কাছে তিনি এখনো কিংবদন্তি হয়ে আছেন। আর তিন বোনের করুণ দুঃখগাথা নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে ‘থ্রি সিস্টারস’। বেলেমাটি আর নিরেট পাথরের তৈরি ব্লু মাউন্টেন অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল। সিডনির সীমানা ঘেঁষে যার অবস্থান। এই পর্বতমালার উত্তরে নেপিয়ান এবং পূর্ব-পশ্চিমে হকসবারি নদী। দক্ষিণে আছে কল ও কক্সেস নদী আর দুটি হ্রদ ‘বুররাগোরাং’ ও ‘ওলগান’। এসবই পড়েছি যেন মিলিয়ে নিতে পারি।

ইউনিভার্সিটির ছোটভাই সোলায়মান যখন বলল, আপনাকে নীল পাহাড় দেখাতে নিয়ে যাব, তখন খুব অবাক হয়েছিলাম। ‘পাহাড় কিভাবে নীল হয়!’

সোলায়মান বলেছিল, ‘সত্যিই তাই, খালি চোখে দেখলে ব্লু মাউন্টেনের আশপাশের পুরো এলাকাটি নীল দেখায়। আকাশের নীলের সঙ্গে পাহাড়ি নীল মিলিয়ে অদ্ভুত এক সৌন্দর্যের পটভূমি তৈরি করে। দেখলে মনটা জুড়িয়ে যায়।’

সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। পরদিন ঢাকায় ফিরে যাব। এই শেষদিনের সুযোগটা তাই হাতছাড়া করতে চাই না। কিন্তু আরো আগেই সোলায়মানের চলে আসার কথা। কোথায় যেন আটকে গেছে।

ফোনটা রিসিভ করার আগেই লাইন কেটে গেল। আবার ফোন এসেছে। ফোনের স্ক্রিনে নাম ভাসছে, ‘সোলায়মান’। এবার রিসিভ করার সুযোগ পেলাম। ‘হ্যালো।’

‘স্যরি ভাই, একটু দেরি হয়ে গেল। আপনি রেডি তো? আমি আধাঘণ্টার মধ্যে নিচে থাকব। আপনি নেমে আসবেন।’

আমি বললাম, ‘আমি রেডি।’ ফোনের লাইনটা কেটে উঠে দাঁড়ালাম। জানালা দিয়ে তাকালাম বাইরে। আকাশ দেখা যাচ্ছে। বাইরে ঝকঝকে রোদ। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। এই কিছুক্ষণ আগেই চলে গিয়েছিলাম অন্য এক জগতে। তিন বোনের সঙ্গে আমার কথা শেষ হলো না, ভাবতেই খারাপ লাগছে। আহা রে, এতগুলো বছর ধরে তারা পাহাড় হয়ে আছে। লোককথার সেই কাহিনি যেন আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। চোখের সামনের তিনটি মেয়ে যেন আমার কাছে বর্তমান। পাহাড়গুলো দেখার জন্য আরো ব্যাকুল হয়ে ওঠলাম। মনে মনে বললাম, ‘সুমনার সঙ্গে তো আমার সম্পর্ক চুকে গেছে, সেই কবে। আমি তাকে ধরে রাখতে পারিনি। অথচ স্বপ্নে কেমন আকুল হয়েই না তার কথা বলেছি। আসলে আমি তো একা!’

স্বপ্নে দেখা দৃশ্য বেশির ভাগ সময়ই মানুষ মনে রাখতে পারে না। কিছুক্ষণ আগের স্বপ্নটা আমার কাছে এখনো জীবন্ত। মনটা হু হু করে ওঠল। কিসের এক বেদনা। মনে মনে বললাম, ‘মেহনি, আমি আসছি।’

(অস্ট্রেলিয়ার একটি লোককাহিনিকে ঘিরে লেখা)

দুলাল আল মনসুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা