kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বই আলোচনা

শব্দেরা বহতা নদীর মতো

তুষার তালুকদার

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



শব্দেরা বহতা নদীর মতো

মাশুক চৌধুরীর কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয়ের বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। তাঁর কবিতা প্রথম যখন পড়েছি এক অব্যাখ্যেয় প্রশান্তি পেয়েছি। একেবারেই সহজ, সাবলীল, কোথাও কোনো আতিশয্য নেই। এ রকমটি দেখা যায় লাতিন কিংবা আফ্রিকার কবিদের বেলায়। একেবারে যা কবি বলতে চান তা স্পষ্ট কবিতায় বলে দেন। একইভাবে মাশুক চৌধুরীও কবিতার বাস্তবতা আর প্রতিদিনকার বাস্তবতার মাঝের ফারাক ঘুচিয়েছেন। তাঁর কবিতায় তিনি ভালোবাসার কথা বলেছেন, প্রেমের পূজা করেছেন, বেদনায় ডুব দিয়েছেন, আবার চলমান সময়ের ঘাত-প্রতিঘাতের ছবিও এঁকেছেন। এককথায় তাঁর কবিতা বহমান। অবিরত চলতে থাকে। তাঁর পাঠক সেই অবিরাম চলায় সঙ্গী হয়।

যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম তাতে ফিরে যাই। মাশুক চৌধুরীর কবিতা বহুদিন ধরে পড়তে পড়তে হঠাৎই পেয়ে যাই তাঁর নির্বাচিত কবিতা। দেখে ভালো লাগে। এ সংগ্রহের অনেক কবিতা আগেই পড়েছি, তবে বেশ কিছু না-পড়া ও নতুন কবিতাও এতে জায়গা পেয়েছে। যেমন ‘শিশুস্বর্গ’। এতে তিনি কল্পনা করেছেন এমন একটি রাষ্ট্রের, যেখানে পৃথিবীর সব শিশুর সব অধিকার সংরক্ষিত হবে। তাঁর কবিতা জানায়, শিশুদের অধিকার যারা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হবে তাদের পাঠানো হবে নির্বাসনে। মাশুক চৌধুরীর ভাষায়—

নিজের রক্তজাত সন্তানকে দুগ্ধদানে অনিচ্ছুক

মা নামের অভিশপ্ত রমণীদের

দুধেল গাভির খামারের বাধ্যতামূলক ট্রেনিং কোর্সে

পাঠানোর একটি ধারা থাকবে, সেই বিলে

আবার এশিয়া মহাদেশকে নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ও ভালোবাসার এক মেলবন্ধন ধরা পড়েছে ‘এশিয়া একটি অসমাপ্ত কবিতা’য়। এ কবিতায় তিনি এক অখণ্ড এশিয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। আবার আরেকটি দীর্ঘ কবিতা ‘যমজ মৃত্যু’ বলে বাংলাদেশকে নিয়ে কবির স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের কথা। মূল্যবোধের স্খলন, স্বাধীন বাংলাদেশের পরনির্ভরশীলতা, বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির ওপর পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব প্রভৃতি এ কবিতাটিকে এক মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছে। অধুনা এত বড় কবিতা লেখার চল খুব একটা চোখে পড়ে না। বলা প্রয়োজন, ‘প্রভাব’ শিরোনামে মাশুক চৌধুরীর সাতটি কবিতা এ সংকলনকে ভিন্নতা দিয়েছে। একই শিরোনামের কবিতাগুলোতে তিনি তাঁর ব্যক্তিজীবনকে প্রভাবিত করা নানা বিষয় ও মানুষ নিয়ে কথা বলেছেন। এ সিরিজ কবিতাগুলো আমাদের ভাবিয়েছে প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে, দেশ-রাজনীতি নিয়ে এবং সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে। তা ছাড়া, ‘অসহায় কবি’ নামে একটি নাতিদীর্ঘ কবিতা পাঠকদের খুব তৃপ্ত করবে বলে মনে করি। একইভাবে ‘বত্রিশ, নিহত বন্ধুর বাড়ি’, ‘মাধবী লতার জন্য কবিতা’, ‘যুদ্ধে কেউ জয়ী হয় না’, ‘স্মৃতির শহর’, ‘পাখির রাষ্ট্রকথা’ প্রভৃতি পাঠকদের চিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে বিশ্বাস করি।

সর্বোপরি মাশুক চৌধুরীর কবিতার কথোপকথন ভঙ্গি তাঁর বড় সম্পদ। এ সম্পদ তাঁর কবিতাকে শিল্পিত রূপ দিয়েছে। এর ফলে তিনি হয়ে উঠেছেন সেই কবি, যিনি মানুষের হৃদয়ের খুব কাছের। আশা করি গ্রনন্থটি পাঠকের ভালো লাগবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা