kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

মৃত্তিকামায়া

বাশিরুল আমিন

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



মৃত্তিকামায়া

অঙ্কন : মাসুম

কাইয়ুম আসতে দেরি করছে দেখে দুই হাতে থুতু দিয়ে বেশ জোরেই কোদাল বসিয়েছিল রইস মিয়া; কিন্তু এই শক্ত খরখরা মাটি থেকে ফিরতিবার কোদালটা তুলতে গিয়েই বিপাকে পড়ে যায়। কোমর সোজা হচ্ছে না তার, সোজা করার জন্য যে কবারই চেষ্টা করেছে, প্রতিবারই কোমর থেকে মগজ অবধি বিদ্যুতের মতো তিরিক করে উঠে চিকন একটি ব্যথা, ককিয়ে ওঠে রইস মিয়া। প্রায় ১০ মিনিট এভাবে কোদাল গেড়ে উপুড় হয়ে ছিল। একটুও নড়াচড়া করেনি। প্রশ্বাস নিচ্ছিল ধীর লয়ে। এই ১০ মিনিটে সে যা বোঝার বুঝে নেয়। তারও যে পাড়ি জমানোর সময় চলে এসেছে তা বুঝতে আর বাকি থাকে না—চোখের সামনে ভাসতে থাকে একটি-দুটি-দশটি-একশটি-হাজারটি কবর; যা এই জীবনে সে খুঁড়েছিল। আরো বিবিধ বিষয় এসে তার মনে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে। ক্ষুদ্র এই সময়ে নিজের জীবনের বিস্তৃত অংশ ঘুরে আসে স্মৃতির পথ ধরে—সেই নেংটাকাল থেকে যৌবনের উত্তপ্ত দিনগুলো, যুদ্ধের ময়দান থেকে নাজমাদের পুকুরঘাট, নিজ সংসার থেকে আপ্তারুদ্দির মেসবাড়ি। কিন্তু ঘুরতে ঘুরতে যখনই আপ্তারুদ্দির লাশের কাছে আসে, তখনই থমকে দাঁড়ায় তার কল্পনা।

রইস মিয়ার ভাতিজা-কাম-সহকারী কাইয়ুম এসে টেনে সোজা করে তোলে তাকে, দাঁড়াতে গিয়ে রইস মিয়ার মনে পড়ে—এই বুঝি উড়ে যাবে তার প্রাণপাখি। ফলে মাগো... বলে জোরে চিৎকার করে ওঠে। তার চিৎকারে আচমকাই জেগে যায় নিবিড় এই গোরস্তান। পাশের ঝোপ থেকে দু-একটি শিয়াল আর বেজি দৌড়ে পালায়, বাঁশঝাড় থেকে কক কক করে উড়ে যায় বেশ কিছু বক। সূর্যটা নিভে আসতে থাকে। সূর্য সুবোধ শিশুর মতো নিজেকে সঁপে দেয় পশ্চিম দিগন্তের কোলে। কার্তিকের সন্ধ্যা, হালকা কুয়াশার সঙ্গে মৃদু বাতাস। এই বাতাসে রইস মিয়ার ঠনঠনে খালি গতর শীতে কাবু হয়ে যাওয়ার কথা; কিন্তু তা হয়নি; বরং গরমে দরদর করে ঘেমে উঠছে সে। মাথাটা ঝিম ধরে আসছে। কাইয়ুমের কাছে পানি চায়। কাইয়ুম পানির জন্য মসজিদের টিউবওয়েলের দিকে গেলে কাঁধের গামছাটা মাটিতে বিছিয়ে লেটা দিয়ে বসে পড়ে রইস মিয়া। নিজেকে শিশুর মতো অসহায় ভাবতে থাকে। সন্ধ্যার ম্রিয়মাণ আলোয় হাতের কুঁচকে যাওয়া চামড়ার দিকে তাকায়, ভাঁজ গোনে। সাদা হয়ে যাওয়া শণের মতো চুলে হাত বুলায়। তেষট্টি পেরোনে শুঁটকির মতো শরীরটা আর দেখতে মন চায় না তার। কপালে জমে উঠা ঘামবিন্দু মুছে পানির মগ হাতে নেয়। পুরো মগ শেষ করে অবস বদনে শুয়ে পড়ে গামছায়। চোখ বুজে হিসাব মেলায়, জীবনের জমা-খরচের পাতাটা ভাসতে থাকে আবছা আবছা।

চার বছর ধরে এই ভয়ংকর কোমরের ব্যথা, যেমনি হঠাৎ করে তিরিক করে ওঠে, আবার তেমনি চলে যায়। আরো কিছু ছোটখাটো রোগবালাই আছে, তবে এসব তার পেটানো মজবুত শরীরকে কাবু করতে পারে থোড়াই। সে জানে, ব্যথাটা এমনিতেই চলে যাবে, তাই ওষুধ বা অন্য কোনো কিছুর তালাশ করে না। তবু তার কোমর মালিশ করে দেয় কাইয়ুম। মালিশ শেষ হলে উঠে দাঁড়ায় রইস, হাতে থুতু মেখে সহকারীকে নিয়ে আবার কাজে লেগে যায়। যতই তার বয়স বাড়ুক, শরীর নুয়ে আসুক, শরীরের তাকত কমেছে সমান্যই। এখনো এই দশ গ্রামে, এমনকি পুরো জেলায় তার মতো সুনিপুণ কবর খুঁড়তে পারে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কত রকমের কবর যে খুঁড়তে জানে সে। তার মতো বগলি কবর মনে হয় পুরো দেশেই কেউ খুঁড়তে জানে না। সিন্দুক কবরও খোঁড়ে, তবে খুবই কম। কবরের জায়গা নির্ধারণ, মাপজোখ করা, বাঁশ কাটা, পাটি কেনা ইত্যাদি পর্ব সে খুব মনোযোগ সহকারে সম্পন্ন করে। অন্যরা কবর খোঁড়া শেষ করে, তারপর গোসল করে। রইস মিয়া তার উল্টো—কবর খোঁড়ার আগে গোসল করে, চুলে খোলা নারকেল তেল আর সারা শরীরে আতর মেখে আসে। কবর খোঁড়ার মজুরি নিয়ে সে দরকষাকষি করেছে—এ রকম ইতহাস নেই। কত কবর বিনা পারিশ্রমিকে খুঁড়ে দিয়েছে। এ পেশায় তার কাজের অভিজ্ঞতা প্রায় এক মানুষের জীবনের সমান, পঞ্চাশ বছর ধরে কবর খুঁড়ছে সে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এই গ্রামে ৫ নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার হলো। এ রকম কার্তিক মাসে চারদিক থেকে আসতে লাগল মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ। তখন সে নতুন কবর খোঁড়া শিখেছে। মানুষ মরার খবর শুনলেই দৌড়ে যায়। সেক্টরে এক শুক্রবারে লাশ এলো ৮টা, সবগুলোই ক্ষতবিক্ষত। উৎকট গন্ধ বেরোচ্ছে। কেউ কবর খুঁড়তে রাজি হচ্ছে না। কমান্ডারের কাছে কে একজন তার নাম বলল—নাম শুনে ডেকে পাঠালেন তাকে। বললেন গর্ত খুঁড়ে সবাইকে একসঙ্গে দাফন করতে। কিন্তু রইস মিয়া জানাল, সে পারবে না। দাফন যদি করতেই হয় তবে সবাইকে আলাদা আলাদা কবরেই দাফন করবে সে। যারা দেশের জন্য শহীদ হয়েছে, তাদের সে এভাবে অসম্মান করতে পারে না। কমান্ডার খেপে গেলেন; কিন্তু সতেরো বছর বয়সী রইস মিয়া অনড়। শেষতক তার কথাই কথা। বন্ধু মনসুরকে সঙ্গে নিয়ে সারা রাত বাঁশ কাটল, কাফন-পাটি ইত্যাদি জোগাড় করল, কুপি বাতির আলোয় সে রাতেই আটটি কবর খুঁড়ল দুই বন্ধু মিলে। কমান্ডার অবাক হলেন। পিঠ চাপড়ে বললেন—যাও মিয়া, এখন পাঞ্জাবিগো কবর খোঁড়ো গিয়া। কবর খোঁড়া রেখে রইস মিয়া ট্রেনিংয়ে গেল, ট্রেনিং শেষে যুদ্ধে।

পাশের গ্রামের আপ্তারুদ্দির সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েই পরিচয় হয় রইস মিয়ার। আপ্তারুদ্দি তখন কলেজে পড়ে। তার সঙ্গেই টেকেরঘাট-মঙ্গলকাটা এলাকায় যুদ্ধ করেছে। এলএমজি চালানোটা শিখেছে আপ্তারুদ্দির কাছ থেকেই। যুদ্ধ থেকে ফিরে রইস মিয়া আবার তার পেশায় ফিরে যায়। চারদিকে তার নাম-ডাক। আর তখন রোগেশোকে, অনাহারে মানুষও মরছে বেশুমার। আপ্তারুদ্দি জেলা শহরে আবার তার পড়াশোনা শুরু করে, তাকে দেখতে মাঝেমধ্যেই শহরে যেত রইস মিয়া। কখনো কবর খুঁড়তে যেত, রাতে আর ফিরত না গ্রামে। আপ্তারুদ্দির মেসেই থেকে যেত রাত।

আরো একটি কারণে আপ্তারুদ্দির কাছে যেতে হতো তার। চিঠি লেখানোর জন্য। যুদ্ধ থেকে ফিরে পেকপাড়ার নাজমার প্রেমে পড়েছিল রইস মিয়া। লেখাপড়া জানত না বলে চিঠি লেখার জন্য যেতে হতো আপ্তারুদ্দির কাছে। পাশের গ্রামে এই বন্ধুর কবর খুঁড়তে খুঁড়তে এসব কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল রইস মিয়া গোর খোদকের মাথায়। সে জীবনে বহু আত্মীয়-স্বজনের কবর খুঁড়েছে, এমনকি তিন মাস বয়সী নিজের মেয়েরও; কিন্তু এতটা কাতর হয়নি কখনো। মৃত্যুর খবর সাধারণ মানুষের ভেতর একটা দুঃখবোধ তৈরি করলেও রইস মিয়াকে কখনো তা ছোঁয় না। সে জানে, মৃত্যু একটি সাধারণ ঘটনা। এবং সে প্রায়শই মৃতের বাড়িতে গিয়ে কোরআন থেকে আয়াত পড়ে লোকজনকে সান্ত্বনা দেয়—‘কুল্লু নাফসিন যায়িকাতুল মাউত।’ সে বলে, মানুষের বেঁচে থাকাটা যেমন স্বাভাবিক-সাধারণ, মৃত্যুটাও তেমনি। কিন্তু আজ কেন জানি তার কাছে মৃত্যু আর স্বাভাবিক-সাধারণ থাকে না।

আপ্তারুদ্দি কবর খুঁড়তে খুঁড়তে ভিন্ন একটা জগতে চলে যায়, মৃত্যু-পরবর্তী কোনো জগতে—যেখান থেকে নিজের জীবন দেখা যায়। অন্যমনস্কতার কারণেই হোক আর বন্ধু বিয়োগের কারণেই হোক, রইস মিয়া কোদাল চালনায় কোনো বিরতি দিচ্ছে না। বিশ্রাম নিচ্ছে না। কতটুকু খোঁড়া হলো, তা-ও মেপে দেখছে না একটিবারের জন্য। কাইয়্যুমের সঙ্গে এসে যোগ দিয়েছে আরো দুজন মুসল্লি। একজন হ্যাজাক বাতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর অন্যজন মাটি সরাচ্ছে। তারা তিনজন কথাবার্তা ইত্যাদি বললেও রইস মিয়া নিপাট নীরব। একটিও রা নেই তার মুখে। সে চলছে গভীর থেকে গভীরে, জীবনের গহিনে। কোদালের একেকটি কোপে তুলে আনছে জীবনের একেকটি অধ্যায়।

পিতৃহারা ছোট্ট সংসারে রইস মিয়া আর তার মা। কবর খোঁড়াখুঁড়ি আর বাবার রেখে যাওয়া জমিতে কৃষিকাজ করে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে। বন্ধুর পরামর্শে দিন-তারিখ ঠিক করে ঘরে তুলে আনে প্রেমিকা নাজমাকে। ঘর হলো, সংসার হলো; একে একে পাঁচ ছেলে আর তিন কন্যার পিতা হলো রইস মিয়া। আপ্তারুদ্দিও পড়াশোনা শেষ করে গ্রামে এসে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করে, ছেলে-মেয়ে মানুষ করে। তাদের মধ্যে পেশা আর সামাজিক অবস্থানের শ্রেণিবিন্যাস ঘটলেও বন্ধুত্বে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি। ছেলে-মেয়ের বিয়ে-শাদি হোক আর নিজেদের গোপনতর বিষয়াদির আলাপ হোক—সব কিছুই একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করত। ধীরে ধীরে তারা যুবক থেকে প্রৌঢ় হয়, প্রৌঢ় থেকে বৃদ্ধ, অবসর কাটাতে কাটাতে হৃদরোগের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে আজ টুপ করে জীবন থেকে ঝরে পড়ে আপ্তারুদ্দি।

খবর শুনে বন্ধুর কবর খুঁড়তে মৌলা গ্রামে আসে। রইস মিয়া ভাবে, এত ছোট কেন মানুষের জীবন, কী ভঙ্গুর আর ক্ষণস্থায়ী এ জনম! মরণ দেখতে দেখতে আবেগহীন হয়ে যাওয়া মানুষটি বুঝে উঠতে পারে না মৃত্যু আসলে কী জিনিস! কোন দিকে তার যাত্রা? কোন পথে? মৃত্যু ছাড়া কি পালানোর আর কোনো পথ নেই?

এশার আজানের সময় কবরের দিকে দৌড়ে আসে কয়েকটি ছেলে। হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বলতে থাকে, আপ্তারুদ্দি স্যারের লাশ বাড়ি আসবে না। শহরে দরগাহ মাজারে দাফন করা হবে। তার বড় ছেলে এমনই ব্যবস্থা করেছে। ততক্ষণে কবর খোঁড়া শেষ, কী অদ্ভুত সুন্দর কবর। কবর থেকে উঠে বেরোতে গিয়েও বেরোতে পারলেন না রইস মিয়া। হাহাকার করে ওঠে কবরটি, রইস মিয়া আলো-অন্ধকারে অপলক তাকিয়ে থাকেন নিজ সৃষ্টির দিকে। না, এভাবে ফাঁকা কবর রেখে যাওয়া যায় না। আবার কবরকে শুধু শুধু মাটি দিয়ে ভরাট করাটাও ঠিক হবে না। ধীরে, অতি ধীরে আবার কবরে নামে রইস আলী। তার সঙ্গে কবর খুঁড়তে থাকা কাইয়্যুম ও অন্যরা হতাশ হয়ে কোদাল ফেলে এদিক-ওদিক চলে যায়। রইস মিয়া কবরেই রয়ে যায়। কী যেন কথা তার কবরের সঙ্গে, সে আর এখান থেকে উঠবে না। লাশের মতো লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে আকাশের দিকে মুখ করে। কুয়াশার ভেতরে ঘোলা হয়ে নামছে চাঁদের আলো, ঢুকে পড়ছে রইস মিয়ার শরীরে; আর রইস মিয়া যেন তলিয়ে যাচ্ছে অতল কোনো সাগরে... অন্ধকার সুড়ঙ্গে—গহিন থেকে গহিনে...

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা