kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন স্মরণ

প্রতিকূলতার ক্যানভাসে আঁকা প্রগতিবাদ

তুহিন ওয়াদুদ   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



প্রতিকূলতার ক্যানভাসে আঁকা প্রগতিবাদ

প্রতিকৃতি : প্রসূন হালদার

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে প্রধানত চিহ্নিত করা হয় মুসলমান নারী প্রগতির পথিকৃৎ হিসেবে। বস্তুত শুধু নারীমুক্তির দর্শন বিকাশের ধারায় তাঁকে মূল্যায়ন করলে অসম্পূর্ণ রোকেয়াকে পাওয়া সম্ভব। সম্পূর্ণ রোকেয়াকে পেতে হলে তাঁর মানবতাবাদী স্থান-কাল নিরপেক্ষ দর্শনকে মূল্যায়নে নিতে হবে। সমাজের বহুকৌণিক ভাবনাও তাঁর রচনাসম্ভারে লিপিবদ্ধ হয়েছে। রোকেয়া মূল্যায়নে তাঁর সেই সমাজগঠনমূলক অনুষঙ্গও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ভারতবর্ষে মুক্তবুদ্ধি চর্চার ধারাকে উদ্ভবের কালে সমুন্নত করার চেষ্টা করে গেছেন। যে মুক্তবুদ্ধি তথা বিজ্ঞানমনস্ক দর্শন মুসলমান-সনাতন ধর্মের গণ্ডিতে নয়, পুরুষ কিংবা নারী শ্রেণিবিশেষের পর্যায়ভুক্ত নয়। রোকেয়া দর্শনের উৎস বঙ্গভূমির ঘটনাপরম্পরা কিংবা স্থানিক বাস্তবতার নিরিখে হলেও তার ইঙ্গিত বিশ্বব্যাপী। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন যে কালের কর্মী কিংবা লেখক ছিলেন, তাঁর কাজগুলো সেই কালকে অতিক্রম করেছে। তিনি যে ভূখণ্ডে ছিলেন, সেই ভূখণ্ডের সীমাও তিনি ভেদ করে আজ বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছেন।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮০ সালে। ভারতবর্ষে তখন ব্রিটিশদের দোর্দণ্ড প্রতাপ। জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। জন্ম সমাজের বিত্তবৈভবে অগ্রসর পরিবারে হলেও ভারতবর্ষে তখন শিক্ষা-প্রগতির প্রদীপটি মৃদু মৃদু জ্বলছিল। হাতে গুনে কয়েকটি পরিবারে তখন শিক্ষা রং ছড়িয়েছে। সেই শিক্ষাও যে প্রগতিবাদের ধারায় ছিল তা-ও নয়। বলা যায়, বিট্রিশ উপনিবেশে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হওয়ার পর বিভিন্ন শ্রেণির উদ্ভব হয়েছিল। সেই শ্রেণির যারা সর্বোচ্চ এগিয়েছিল, তারাও কেরানি পর্যন্ত উঠতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৩২ সালে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন যখন প্রয়াত হন, তখনো সমাজ ছিল শ্রেণিবিভাজিত এবং অনগ্রসর।

বিংশ শতকের প্রথম তিন দশকে যাঁরা শিক্ষিত ছিলেন, সেই আলোকপ্রাপ্তদের সংখ্যা উল্লেখ করার মতো নয়। বিত্তশালী থেকে শুরু করে বিত্তহীন—সবার ক্ষেত্রে এ কথা অনেকটাই সত্য যে তারা ছিল প্রচলিত সমাজের অসার ভাবনার ভারবাহী মাত্র। কার্যকারণ সূত্রেই আমরা দেখি, রোকেয়ার পরিবারেও নারীকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখার চলিত রীতি।

রোকেয়া পরিবারের নারীশিক্ষাবিমুখ ভাবনাকে ভাঙতে এগিয়ে এসেছেন ওই পরিবারেরই নতুন প্রজন্ম। বলা যায়, রোকেয়ার ভাই-বোনেরাই এ ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করেছেন। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন পড়তে শিখেছেন তাঁর ভাই-বোনের সহায়তায়। রাতের বেলা কুপি জ্বালালে তার আলো বাইরে যাতে না যায় সেই ব্যবস্থা করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে তিনি পড়ালেখা করেছেন। যে সমাজে অগ্রসর জমিদারবাড়ির এমন করুণ বাস্তবতা ছিল, সেই সমাজে যে সাধারণদের পড়ালেখা কোন স্তরে ছিল, তা সহজে অনুমেয়। বিয়ের পর স্বামী সাখাওয়াত হোসেনও তাঁর স্বপ্নকে মেলে ধরার ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ দিয়েছেন। বস্তুনিষ্ঠ সমাজ বিনির্মাণের প্রতিকূল বাস্তবতা হলেও রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন যেসব আনুকূল্য পেয়েছেন, তা তাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বড় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মের পাঁচ বছরের মাথায় ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। ভারতবর্ষের রাজনীতি তখন বিট্রিশ আনুগত্যের নিগড়ে বাঁধা। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসও সেই আনুগত্য সাপেক্ষে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তবে পরবর্তী সময়ে এই সংগঠন ওই আনুগত্যের খোলসমুক্ত হয়েছিল। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে এই সময়ে। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। বিংশ শতকের প্রথম তিনটি দশকই ঘটনাবহুল। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এই কালখ সমাজ পরিবর্তনের প্রত্যয়ে এগিয়ে এসেছেন। বস্তুত তিনি ছিলেন সমাজ-রাজনীতি সচেতন। শুধু তা-ই নয়, তার দৃষ্টি ছিল সুদূরপ্রসারী।

কয়েক শ বছর আগে বিশ্বসমাজ ছিল শাস্ত্রশাসিত। শাস্ত্রের বিধানই হয়ে উঠেছিল জীবনের বিধান। অনেক সময় শাস্ত্রের বাইরে প্রচলিত আরো অনেক রীতিনীতিও হয়ে উঠেছিল বিশ্বাসের আধার। ভারতবর্ষও এর বাইরে ছিল না। তবে ইতালি-ফ্রান্স হয়ে ভারতবর্ষকেও মানবতাবাদী দর্শন স্পর্শ করে। বলা বাহুল্য, ইউরোপীয় মানবতাবাদ বঙ্গভূখণ্ডে আনয়নের পূর্বে ভারতবর্ষে মানবতার সাংগঠনিক চর্চা না থাকলেও বিচ্ছিন্নভাবে কখনো কখনো আলো ছড়িয়েছে। বড়ু চণ্ডীদাসের — ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’— চরণটি আমাদের সেই অতীত মানতে বাধ্য করে। মধ্যযুগের এই দর্শনই আজকের দিনের মানবতার মূল সুর। কিন্তু বঙ্গভূখণ্ডের বিচ্ছিন্ন মানবতাবাদী দর্শনচর্চা আমাদের এখানে একটি বৃহৎ স্রোত বিনির্মাণ করতে পারেনি। ফলে ইউরোপীয় মানবতার নিরিখে আমাদের রেনেসাঁস বিস্তার লাভ করেছে মর্মে প্রাজ্ঞজনরা ধারণাপত্র দিয়ে থাকেন। ইউরোপীয় সভ্যতার আড়ালে যে কদর্য রূপ আছে, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তারও চিত্র তুলে এনেছেন।

বঙ্গভূখণ্ডে যাঁরা মানবতাবাদী দর্শনচর্চার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন, তাঁদের অন্যতম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর সেই মানবতাবাদী চেষ্টার অন্যতম দিক ছিল অধিকারবঞ্চিতদের নিয়ে কথা বলা। পিছিয়ে পড়া নারীদের নিয়ে তিনি কাজ করেছেন এবং বিস্তর লিখেছেন। যে চাষিদের হাতে বঙ্গসমাজ টিকে ছিল, সেই চাষিদের দুঃখগাথাও তিনি তুলে ধরেছেন। ‘চাষার দুক্ষু’ নামের একটি প্রবন্ধে তিনি বাঙালিদের অনুকরণপ্রিয়তার তীব্র সমালোচনা করেছেন। সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্য কিভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তারও উল্লেখ আছে এ প্রবন্ধে। চাষার দুঃখ ঘোচানোর পথনির্দেশও করেছেন। ঐতিহ্যগত শিল্প এবং গ্রামীণ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে তাঁর জোরালো অবস্থান ছিল। ‘চাষার দুক্ষু’ প্রবন্ধে তিনি কৃষক সম্পর্কে লিখেছেন, “সে কেবল ‘ক্ষেতে ক্ষেতে পুইড়া মরিবে’, হাল বহন করিবে আর পাট উৎপাদন করিবে। তাহা হইলে চাষার ঘরে যে ‘মরাই-ভরা ধান ছিল, গোয়াল ভরা গরু ছিল, উঠান ভরা মুরগী ছিল’ এ কথার অর্থ কী? ইহা কি শুধুই কবির কল্পনা? কবির কল্পনা নহে, কাব্য-উপন্যাসও নহে, সত্য কথা।              

পূর্ব্বে ওসব ছিল, এখন নাই। আরে! এখন যে আমরা সভ্য হইয়াছি! ইহাই কি সভ্যতা? সভ্যতা কী করিবে, ইউরোপের মহাযুদ্ধ সমস্ত পৃথিবীকে সর্ব্বস্বান্ত করিয়াছে, তা বঙ্গীয় কৃষকের কথা কি?”

এন্ডি শিল্প নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখা আছে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের। গ্রামীণ জীবন যেমন তাঁর মননে ছিল, তেমনি ছিল বৈশ্বকি ধারণা। ধর্মবোধ সম্পর্কেও তাঁর ধারণা ছিল পরিষ্কার। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন মূলত শাণিত মেধা-মননে তাঁর কর্ম ও লেখনী সম্পাদন করে গেছেন। যে সমাজে মুসলমান নারীদের অবরুদ্ধ করে রাখাটাকেই শাস্ত্রীয় জ্ঞান করা হতো, সেই সমাজে তিনি সেই বিশ্বাসের অসারতা নিয়ে লিখেছেন এবং সমাজ পরিবর্তনে সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করে গেছেন।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সব লেখার মধ্যে তাঁর দর্শনের বিস্তার আছে। ‘অবরোধ বাসিনী’ রচনার মধ্যে যে ৪৭টি ঘটনার উল্লেখ আছে, তার মাধ্যমে তিনি নারীজাতির অবক্ষয়ের চিত্রই তুলে ধরতে চেয়েছেন। দুই খণ্ডে ‘মতিচূর’-এর প্রবন্ধগুলোতে তিনি প্রচলিত সমাজকে ভাঙার গানই যেন গেয়েছেন। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ রচনায় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রতিভার ওপর আস্থা আনয়নের জন্যই লিখেছেন। ‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসে তিনি ‘তারিণী-ভবন’ নামের যে ঠিকানা গড়ে তুলেছেন, তা অনেকটাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র ময়নাদ্বীপের মতো। ময়নাদ্বীপে হিন্দু-মুসলমান, উচ্চ-নিম্ন শ্রেণি ছিল না। আর তারিণী-ভবনেও আমরা ধর্মীয় আধিপত্য কিংবা কোনো কুসংস্কারের লেশমাত্র দেখি না। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন আজ থেকে প্রায় শত বছর আগে যে উপন্যাস লিখে গেছেন, বাস্তব সমাজ আজও সেই পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি। উপন্যাসের শেষে সিদ্দিকার উচ্চতর ব্যক্তিত্ব ‘পদ্মরাগ’কে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। জীবনের শুরুতে তাঁর বিয়েজনিত অপমান কিছুতেই সিদ্দিকা ভেলেননি। তারিণী সিদ্দিকাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন বরপক্ষের দুর্ব্যবহার ভুলে লতীফ আলমাসকে বিয়ে করার জন্য। উত্তরে সিদ্দিকা যা বলেছেন তার অংশবিশেষ এখানে প্রণিধানযোগ্য : “আমরা কি মাটির পুতুল যে, পুরুষ যখন ইচ্ছা গ্রহণ করিবেন? আমি সমাজকে দেখাইতে চাই যে, ‘সুযোগ জীবনে একবার ছাড়া দুইবার পাওয়া যায় না’; তোমরা পদাঘাত করিবে আর আমরা তোমাদের পদলেহন করিব, সেই দিন আর নাই।”

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে অখণ্ড সমাজটা দেখেছেন। এই সমাজের যেসব ভয়াবহ চিত্র তাঁকে আহত করেছে, সেসব দূরীকরণে তিনি সোচ্চার হয়েছেন। সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে কখনো লেখক বানিয়েছে, কখনো কর্মীতে পরিণত করেছে। ১৯১১ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠাও তাঁর সেই দায়বদ্ধতারই ফল। ১৯১৬ সালে ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ নামে যে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারও মূলে রোকেয়ার সামাজিক দায়বদ্ধতাই প্রধান। ৯ ডিসেম্বর দৈশিক এবং কালিক সীমা অতিক্রম করা লেখক সংগঠক রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের জন্ম ও প্রয়াণ দিবস। এই দিবসে তার প্রতি বিনম্র প্রণতি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা