kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

অদ্ভুত আঁধার এক

সুদীপ্ত সালাম   

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



অদ্ভুত আঁধার এক

অঙ্কন : মাসুম

লাল ফোনের রিসিভারটি রেখে দিয়ে জামিল ফোনের কাছেই কয়েক মুহূর্ত পাথর হয়ে রইল। তার বুঝতে বাকি নেই কী হতে যাচ্ছে। এত দিনের সামরিক অভিজ্ঞতা তাকে ফিসফিস করে বলছে, ওরা খালি হাতে ব্যারাকে ফিরবে না।

আনজুমানের ডাকে জামিল সংবিৎ ফিরে পায়, ‘কী? কী হলো?’ জামিল বলল, ‘প্রেসিডেন্টের বাড়ি ওরা ঘিরে ফেলেছে।’ আনজুমান অধীর হয়ে জানতে চায়, ‘কারা ঘিরে ফেলেছে! কেন!’ জামিল উত্তর না দিয়ে বলল, ‘আমাকে এখনই ৩২ নম্বরে যেতে হবে।’ আনজুমান দুই হাতে জামিলের ডান হাতটি খপ করে ধরে ফেলে, ‘কি বলছ তুমি!’ জামিল হাতটি ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলে, ‘ভয় পেয়ো না। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসব। প্রেসিডেন্টের এমন বিপদে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না।’ আনজুমান সব বুঝে, সে এ-ও মনে করে—বঙ্গবন্ধুর বিপদে জামিলের ছুটে যাওয়া জরুরি। তার পরও প্রশ্নটি করেই ফেলে, ‘আমাদের কথা একবার ভাববে না?’ জামিল এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। আনজুমানের ছলছল চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর শুধু বলে, ‘বাচ্চাদের দিকে খেয়াল রেখো।’ আনজুমানের বুকে মোচড়ের ব্যথা অনুভব করে, একটি প্রশ্ন হৃদয় ফুটো করে বেরিয়ে আসে, ‘জামিল না বলল, ও তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে? তাহলে বাচ্চাদের খেয়াল রাখার প্রসঙ্গ আসছে কেন!’ জামিল তার কপালে একটি চুমু দেয়, প্রশ্নটি আনজুমানের আর করা হয় না।

জামিল নিজেই আলমারি খুলে পোশাক বের করে। আনজুমান জুতা জোড়া নিয়ে আসে। জুতা জোড়া পলিশ করেই রাখা ছিল, তার পরও আনজুমান পরম মমতায় শাড়ির আঁচল দিয়ে জুতাগুলো মুছে। ওদিকে জামিল ড্রেসিং টেবিলে কিছু একটা খুঁজছে, আনজুমান জানে তা কী। সে ওয়ার্ডরোবের ওপর থেকে জামিলের হাতঘড়িটা এনে দেয়। ঘড়িটা পরতে পরতে এই মাত্র জামিল লক্ষ করল, এখন ভোর পৌনে ৫টা। সময় শুকনো বালু হয়ে দ্রুত গড়িয়ে পড়ছে।

জামিলের বড় মেয়ে তাহমিনা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বাবার তৈরি হওয়া দেখছে। জামিল বলল, ‘কি মামণি ঘুম ভেঙে গেল? সকাল হতে অনেক দেরি, যাও ঘুমিয়ে পড়ো।’ মেয়ে এসব কথায় না গিয়ে সরাসরি বাবাকে প্রশ্ন করে, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ বাবা?’ জামিল সরাসরি উত্তর দিতে পারে না। মেয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে জামিল বলে, ‘একটি জরুরি কাজ এসে গেছে মা। যাব আর আসব।’ বাবা মেয়ের কয়েক সেকেন্ডের আলিঙ্গন। আনজুমান এসে মেয়েকে বলল, ‘আম্মু, বাবার দেরি হয়ে যাচ্ছে। চলো, চলো ঘুমিয়ে পড়ো।’ তারপর মেয়েকে নিয়ে সে চলে যায়। জামিলের তিন মেয়ে। বড় ও মেজোটা এক রুমে ঘুমায়, সবার ছোট ফাহমিদা জামিলদের সঙ্গে। ওই তো বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। জামিল ঘুমন্ত মেয়ের গালে চুমু দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে ফিরল। নিজেকে আয়নায় আপাদমস্তক দেখে নিচ্ছে একবার—তৈরি কর্নেল জামিল।

আনজুমান দুই টুকরা পাউরুটি ও একটি ডিম পোচ ডাইনিং টেবিলে রাখে। সে জানে এখন কোনোভাবেই জামিলকে তা খাওয়ানো যাবে না। তবু্ জামিল শোবার ঘর থেকে বের হয়ে দেখে আনজুমান ডাইনিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, টেবিলে সাজানো খাবার। জামিল শুধু বলল, ‘দেরি হয়ে যাবে...।’ আনজুমান কথা বাড়াল না। জামিল দুই মেয়ের ঘরের দিকে গেল। নিঃশব্দে দরজাটা একটু ফাঁক করে ঘুমিয়ে থাকা তাহমিনা ও আফরোজাকে দেখার চেষ্টা করল। আলোও জ্বালানো নেই। ভোরের অদ্ভুত অন্ধকার এখনো কাটেনি। তাই কেউ দেখতে পেল না, জামিলের চোখের নদীর বাঁধ ভেঙেছে। কিন্তু কেন? তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কি তাকে কোনো অশনিবার্তা দিচ্ছে? সে কি জেনে গেছে, সে এক অনিশ্চিত যাত্রায় বের হচ্ছে? যদি তা-ই হয়, তাহলে কেন তাকে এই যাত্রায় পা ফেলতে হবে? তার কর্তব্যবোধ তাকে সংশপ্তক হতে বাধ্য করছে?

সিঁড়ির দিকে নেমে যাওয়ার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে আনজুমান। তার চোখে ভয়ের ছায়া থাকলেও চোখ শুকনো। জামিল বের হওয়ার সময় একটু থামল, আনজুমানের মাথাটা নিজের বুকে টেনে নিয়ে বলল, ‘চিন্তা কোরো না। বাচ্চাদের দেখো। দোয়া করো।’ আনজুমান এবার আর কান্না ধরে রাখতে পারল না। নিঃশব্দে চোখের পানি ঝরছে। জামিলের বুক থেকে মাথা তুলে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিশ্রুতি চেয়ে বসল সে, ‘কথা দাও জীবিত ফিরে আসবে।’ জামিল আকস্মিত এই কথায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। কী বলবে সে! ঠিক তখন বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লাল গাড়িটির হেডলাইট দুটি জ্বলে ওঠে, গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে আইনউদ্দিন। ইঞ্জিনের কর্কশ শব্দ ভোরের নিস্তব্ধতা চিড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। জামিল আনজুমানের কথা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেল। স্ত্রীর কপালে আবার চুমু খেয়ে দ্রুতপায়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে যায় সে।

ঢাকার ভোরের সঙ্গে জামিলের পরিচয় অনেক দিনের। কিন্তু এমন ভোরের মুখোমুখি কখনো কি সে আগে হয়েছে? স্মৃতির সমুদ্রে তন্নতন্ন করে খুঁজেও জামিল এমন ভোরের মতো ভোরের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায় না। শখের ইয়াশিকা ম্যাট ক্যামেরা দিয়ে কত ভোরের ছবিই তো জামিল তুলেছে। এমন দানবীয় ভোরের প্রতিকৃতি কি ক্যামেরাবন্দি করেছে? ধীরে ধীরে অন্ধকার কাটছে। বাড়ছে ধূসরতা। বাতাস নেই, প্রাণ নেই—সব থমকে আছে, স্থিরচিত্রের মতোই। পুব আকাশে চিরল লাল রেখা। জামিলের কাছে রক্তের দাগ মনে হয়। দোকানপাট সব বন্ধ। রাস্তায় একটি কুকুরও নেই। থেমে থেমে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। গুলি ও গুলির শব্দের কোনো দল নেই, পক্ষ-বিপক্ষের গুলির শব্দের কোনো পার্থক্য নেই। জামিল তাই বুঝতে পারে না কোনটি শত্রুর আর কোনটি বন্ধুর গুলির শব্দ।

বাতাসের গতিতে গাড়ি ছুটছে ধানমণ্ডির দিকে। জামিল আইনউদ্দিনকে বলল, ‘আরো দ্রুত চলো আইনউদ্দিন।’ আইনউদ্দিন নিঃশব্দে গাড়ির এক্সেলেটরে পায়ের চাপ বাড়িয়ে দেয়। জামিলের মনে জড়ো হচ্ছে আশঙ্কা ও দুশ্চিন্তা। সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ ফোর্স পাঠিয়েছেন তো? ফোর্স কি প্রেসিডেন্টের বাড়িতে পৌঁছাতে পেরেছে? গণভবনের ৩০০ গার্ড রেজিমেন্টেরই বা কী খবর? জামিল নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করে। প্রেসিডেন্টের পক্ষে কোনো ফোর্স না পৌঁছে থাকলে তাকে একাই ঘটনার মোকাবেলা করতে হবে। অবস্থার মুখোমুখি হতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তার। ধনুকের মতো টান টান দৃঢ়তা তার রয়েছে। রয়েছে বলেই তো পরিণতির কথা না ভেবে, ভয়কে তুচ্ছ করে এই অদ্ভুত আঁধারেও শত্রুদের সামনে দাঁড়াতে একাই ছুটে যাচ্ছে সে। জামিল হয়তো বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারবে না, হয়তো তার সঙ্গেও মৃত্যুর দেখা হয়ে যেতে পারে; কিন্তু তার পরও সে যাচ্ছে। জামিল ভাবে, ‘আমি প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব। প্রেসিডেন্ট নিজে আমাকে ফোন করেছেন। আমি কিছু করতে পারি-না পারি, ইতিহাস অন্তত সাক্ষী থাকুক, আমি কাপুরুষ ছিলাম না। আমি আমার প্রেসিডেন্টকে বাঁচাতে, বঙ্গবন্ধুকে রক্ষায় অন্তত চেষ্টা তো করেছিলাম। আমার মেয়েদের কেউ যেন বলতে না পারে, তাদের বাবা বিশ্বাসঘাতক ছিল।’ জামিলের চোখের পানি ছলকে ওঠে।

লালমাটিয়ার কাছাকাছি এসে আরো কয়েক দফা গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেল। কতগুলো কাক ছত্রভঙ্গ হয়ে কা-কা করতে করতে পালাল। সোবহানবাগ মসজিদের কাছে ব্যারিকেড দেওয়া। সেনা সদস্যরা টহল দিচ্ছে। দূরে ৩২ নম্বরের দিকে ট্যাংক দাঁড় করানো। কয়েকজন সেনা সদস্য হাত দেখিয়ে গাড়ি থামাতে বলল। আইনউদ্দিন তার স্যারের দিকে তাকায়। জামিল গাড়ি থামাতে ইশারা করে। সুসজ্জিত দুজন সেনা সদস্য গাড়ির দুই দরজার দুদিকে দাঁড়ায়, তারা শক্ত করে বুকে ঝোলানো রাইফেল ধরে আছে। জামিল গাড়ির গ্ল্লাস নামিয়ে নিজের পরিচয় দিল। পরিচয় পেয়েও সেনা সদস্যদের আচরণে পরিবর্তন নেই। তারা জানতে চাইল, ‘কোথায় যাচ্ছিলেন?’ জামিল মাথা ঠাণ্ডা রেখে উত্তর দিল, ‘আমি প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব। আমি তাঁর বাড়িতে যাব।’ এই কথা শুনে সেনা সদস্যরা একটু দূরে গিয়ে নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ আলোচনা করল। একজনকে ওয়্যারলেসে কথা বলতেও দেখা গেল। সেই দুজন সেনা সদস্য ফিরে এসে বলল, ‘গাড়ি ঘুরিয়ে নিন। ওদিকে যাওয়া যাবে না।’ জামিল তাদের বোঝানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তারা বুঝতে রাজি নয়। জামিলও জানে নির্দেশের বাইরে একচুলও নড়বে না এরা। সে এবার গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। সেনা সদস্যরা তার দিকে রাইফেল তাক করে। জামিল হাত ওপরের দিকে তুলে বলে, ‘দেখুন, আমি নিরস্ত্র। আমাকে প্রেসিডেন্টের কাছে যেতে হবে...।’ তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে এক সেনা সদস্য বলে, ‘স্যার, আপনি ফিরে যান। আপনি ওদিকে যেতে পারবেন না। নির্দেশ আছে।’ জামিল হাল ছাড়ে না, হাত উঁচিয়ে রেখে বলে, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমি গাড়ি নেব না। আমি হেঁটেই যাব, যেতে দিন প্লিজ।’ সেনা সদস্যটি এবার তাক করা অবস্থায়ই রাইফেল লোড করে এবং নির্দেশ দেয়, ‘স্যার, শেষবারের মতো বলছি। ফিরে যান।’ জামিল এবার নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারায়। সে হাত নামিয়ে বলে, ‘আমি সেনাবাহিনীর বাইরের নই! আমি বলছি, আমাকে যেতেই হবে! যেতে দিন!’ কথাটি শেষ করেই সে ৩২ নম্বরের দিকে হাঁটা শুরু করে। কয়েক পা এগিয়ে যেতেই তার দিকে গুলি ছোড়ে সেই সেনা সদস্য। গুলি এসে লাগে জামিলের মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।

দুই-তিন সেকেন্ড, তারপর নিথর হয়ে যায় তার শরীর। কিন্তু ওই কয়েক সেকেন্ডে অনেক বছরের অতীত জামিলের চোখের সামনে ডানা মেলে দাঁড়ায়। দ্রুত—অকল্পনীয় দ্রুতগতিতে একের পর এক ছবি আসে, সরে যায়। একটি ছবিতে সে তার তিন মেয়েকে নিয়ে নদীর পারে বসে ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’ গানটি গাইছে। ডান পাশে তাহমিনা, বাঁ পাশে আফরোজা আর ছোট্ট ফাহমিদা তার কোলে। একটু দূরে বড় একটি রঙিন ছাতার নিচে খাবার সাজাচ্ছে আনজুমান। আরেকটি দৃশ্যে বঙ্গবন্ধু তার কাঁধে হাত রেখে বলছেন, ‘জামিল, এখন থেকে তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।’ জামিল বলছে, ‘জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আপনার সঙ্গে থাকব স্যার...’ এমন আরো কত দৃশ্য! কিছু স্পষ্ট, কিছু আবছায়া।

একসময় জামিল আর জামিল থাকে না, রাস্তায় পড়ে থাকা বেওয়ারিশ লাশে পরিণত হয়। ওদিকে বাংলাদেশ হারায় তার পিতাকে। সকাল ৬টার দিকে রেডিও বাংলাদেশ থেকে ভেসে আসে একটি ধাতব কণ্ঠস্বর, ‘আমি মেজর ডালিম বলছি ...।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা