kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

মায়া বিষাদের কবি আবুল হাসান

কবির হুমায়ূন    

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



মায়া বিষাদের কবি  আবুল হাসান

অঙ্কন : প্রসূন হালদার

‘তিনি তো কবরস্থানে ঘুমাতেন। ক্ষুধার তীব্রতায় ফাঁকা পকেটে রেস্টুরেন্টে ঢুকে পেটপুরে খেয়ে বিল পরিশোধ না করে দৌড়ে পালাতেন। সুরাইয়া খানমকে ভালোবেসে ভালোবাসা না পেয়ে নিজেকে শেষ করে দিয়েছেন। গুণদার সঙ্গে এটা-ওটা-সেটা করে জীবন তছনছ করেছেন। ও হো, তিনি তো শিশুতোষ কবি!’ নব্বইয়ের শুরুতে এই রাজধানীতে যখন টুক টুক করে শহুরে বিভিন্ন গোত্রের কবিকুলের সঙ্গে সবে পরিচয় ঘটতে শুরু করে, আড্ডায়-আলাপে, কবিতা নিয়ে বাগিবতণ্ডায় কবি আবুল হাসান সম্পর্কে এই মিথভাষ্য প্রতিনিয়ত কানে আসত। কিন্তু কেউ তাঁর কবিতার করণকৌশল সম্পর্কে কিছু বলত না। তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থ পাঠের বিষয়ে আগ্রহী করে তুলত না। তখনো আবুল হাসানের কবিতা আমার পড়া হয়নি। কবিবন্ধুদের এসব বিচিত্র ভাষ্য শুনতে শুনতে তা ছাপিয়ে ইচ্ছা হয় আবুল হাসানের কবিতা পড়ার। কিন্তু কোথায় পাব তাঁর গ্রন্থ, তাতো জানি না।

ওই সময়টায় আমার কাছে বইয়ের দোকান বলতে স্টেডিয়াম মার্কেটের দোতলায় ম্যারিয়েটা, পল্টনে সাহিত্য প্রকাশ আর বেইলি রোডে সাগর পাবলিশার্স। চামেলিবাগের বাসা থেকে প্রায় প্রতিদিন বিকেলে একবার হলেও বেইলি রোডে যাওয়া হতো। সাগর পাবলিশার্সের তখনকার সেলসম্যান রমজানের সঙ্গে বেশ খাতিরও জমে গিয়েছিল। সম্ভবত ১৯৯৪ সালের দিকে রমজানকে আবুল হাসানের কথা বলতে দুদিন পরই আমার হাতে তুলে দেয় এক খণ্ডে আবুল হাসানের রচনা সমগ্র। আবুল হাসানের সেই রচনা সমগ্র এখনো আমার সংগ্রহে যত্নেই আছে। সময়-সুযোগ পেলে নিজের মতো করে এখনো পড়ি আবুল হাসানের কবিতা। তাঁকে নিয়ে কবিবন্ধুদের মিথভাষ্য কবেই উবে গেছে! বাংলা ভাষার প্রথম সারির কবিকুলের একজন হিসেবেই আবুল হাসানের কবিতাকে গ্রহণ করে নিই। কয়েক দিন পর পর যে কয়জন কবির কবিতা পুনরায় পড়ি, আবুল হাসান তাঁদের একজন। আমার কাছে কবি বন্ধুদের মিথভাষ্যে ঘুরে বেড়ানো আবুল হাসানের চেয়ে কবি আবুল হাসান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

দুই.

৪৫ বছর হতে চলল আবুল হাসান শারীরিকভাবে গত হয়েছেন। ‘রাজা যায় রাজা আসে’, ‘যে তুমি হরণ করো’, ‘পৃথক পালঙ্ক’—এই তিনটি কাব্যগ্রন্থ আর আগ্রন্থিত কবিতা নিয়ে (এই কবিতাগুলো দিয়ে অন্তত আরো দুটি কাব্যগ্রন্থ করা যেত) রাজার আসনেই আছেন তিনি। যে সময়টায় আবুল হাসান লিখতে শুরু করেছিলেন; যাঁদের সঙ্গে লিখতে শুরু করেছিলেন, বরং তাঁদের অনেকে কবিতায় বিস্মৃতির অতলে চলে গেছেন। কবিতা পাঠকরা মনে রেখেছেন, আরো বহুকাল মনে রাখবেন কবি আবুল হাসানকে। এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।

সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র,

                                                 মায়াবী করুণ

এটা সেই পাথরের নাম নাকি? এটা তাই?

এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?

পৃথিবীর তিন ভাগ জলের সমান কারো কান্না ভেজা চোখ?

মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা? তীব্র তীক্ষ তমোহর

কী অর্থ বহন করে এই সব মিলিত অক্ষর?

(আবুল হাসান/রাজা যায় রাজা আসে।)

একজন কবি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার শিরোনাম রাখলেন আবুল হাসান। আর বলে উঠলেন—সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র/ মায়াবী করুণ। এই যে উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র/ মায়াবী করুণ। এসব শব্দ বন্ধেই, শুরুতেই আবুল হাসান জানান দিয়ে রাখেন এক করুণ জীবনের আর্তি। কবিতাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষাদের সঙ্গে জীবনের জন্য কি যে মায়া জড়িয়ে রয়েছে, তা পাঠক মাত্রই টের পান।

 

তিন.

শৈশব থেকেই তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। ২৯ বছরের ছোট্ট জীবনে এই অসুস্থতা কখনো তাঁর পিছু ছাড়েনি। ধীরে ধীরে বেড়েছে। কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে তিনি ছিলেন অসম্ভব সৃষ্টিশীল। অনবরত কবিতা লিখেছেন। অসুস্থতার বিষাদময় জীবনে অসংখ্য বিষাদাক্রান্ত কবিতার পাশাপাশি কবির দায় ও কবিতার দায়ের কথা ভুলে থাকেননি। ফলে তাঁর তাবৎ কবিতা ঘেঁটে দেখা যায় তিনি ভুলে থাকেননি, এড়িয়ে যাননি ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষ, অবক্ষয়, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কথা। মৃত্যুচিন্তা, প্রেম, শৈশব স্মৃতি, মা-মাটি-মানুষ, প্রকৃতি—সবই তাঁর কবিতার পরতে পরতে স্থান করে নিয়েছে। আবার তিনি তাঁর সময়ে তাবৎ দুনিয়ার খোঁজ রেখে, তিরিশি কবিকুলের কাব্যজগৎ আত্মস্থ করে এবং নিজের চারপাশের সে সময়ের কবিদের কবিতার গতিপথে নজর রেখে নিজের একটি ঘরানা তৈরির চেষ্টা করেছেন। অনেকটা সফলও হয়েছেন, যা বিশেষ কোনো তত্ত্ব দ্বারা আক্রান্ত নয়। এই এত দিন পরও তাঁর সেই নিজস্ব ঘরানা টের পাওয়া যায়। হাজারো কবির কবিতার মধ্যে থেকে আলাদা করে বলে দেওয়া যায় এটি আবুল হাসানের স্বর। এটি আবুল হাসানের কবিতা। এটি আবুল হাসানের উচ্চারণ।

 

চার.

আবুল হাসানের অসংখ্য কবিতার পঙক্তি কবিতাপ্রেমী মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়। কবিতা ভালোবাসেন, কবিতায় যাপন করেন—এই বঙ্গে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি আবুল হাসানের একটিও কবিতা পড়েননি। দুটি লাইন মুখস্থ রাখেননি। পাঠকের কাছে আবুল হাসানের কবিতা-ঘরানা এভাবেই চিহ্নিত হয়ে আছে। উচ্চারণ করা মাত্র টের পাওয়া যায় এটি আবুল হাসানের কবিতা। এর জন্য তাঁকে কোনো সংঘ করতে হয়নি। কোনো দলে যোগ দিতে হয়নি। কোনো গোষ্ঠীর হাতে কবিতা তুলে দিয়ে যেতে হয়নি। তার আগেই তিনি গত হয়েছেন। আবুল হাসানের প্রচলিত যে কবিতাগুলো পাঠকের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়, বিভিন্ন আলোচনায় বারবার উল্লেখ করা হয়, তার বাইরের কবিতাগুলোয়ও তিনি স্ব স্বরে, স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

ক) শহরের কাছের শহর

            নতুন নির্মিত একটি সাঁকোর সামনে দেখলুম তীরতীর করছে জল,

            আমাদের সবার মুখ সেখানে প্রতিফলিত হলো,

            হঠাৎ জলের নীচে পরস্পর আমরা দেখলুম

            আমাদের পরস্পরের প্রতি পরস্পরের অপরিসীম ঘৃণা ও বিদ্বেষ।

            আমরা হঠাৎ কী রকম অসহায় আর একা হয়ে গেলাম!

            আমাদের আর পিকনিকে যাওয়া হলো না,

            লোকালয়ের কয়েকটি মানুষ আমরা

            কেউই আর আমাদের এই ভয়াবহ নিঃসঙ্গতা একাকীত্ব, অসহায়বোধ

            আর মৃত্যুবোধ নিয়ে বনভূমির কাছে যেতে সাহস পেলাম না!

 (বনভূমির ছায়া/রাজা যায় রাজা আসে)

খ) আমার কাছে আগুন ছিল না

            আমি চাঁদের আগুনে

            শাদা সিগ্রেট জ্বালিয়ে বসেছিলাম কুয়াশায়!

            কে ওখানে?

            শীতরাতে পউষ পাখির গলা শোনা গেলো জ্যোত্স্নায়, কে ওখানে?

(ঘুমোবার আগে/ যে তুমি হরণ করো)

গ) যতদূর থাকো ফের দেখা হবে। কেননা মানুষ

            যদিও বিরহকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক।

            মিলে যায়—পৃথিবী আকাশ আলো একদিন মেলে!

            এ সেতু সম্বন্ধ মিল, রীতিনীতি সবকিছুতেই আজ

            সুসংবদ্ধ, সুতরাং হে বিরহ যেখানেই যাও

            মিলন সংযোগে সেতু আজ আর অসম্ভব নয়!

(এপিটাপ/পৃথক পালঙ্ক)

পাঁচ.

আবুল হাসান নিজের এপিটাপ লিখে গেছেন। অসম্ভব মায়ায়-বিষাদে সাজিয়ে গেছেন নিজের কবিতা সংসার। ইউরোবাহিত কোনো তত্ত্ব নয়, বরং পূর্বসূরিদের কবিতা আত্মা আত্মস্থ করে একটু একটু করে গড়ে তুলেছেন নিজের কাব্য ঘরানা। আবুল হাসানের এই কবিতা-ঘরানা সব মন্তব্য, সব অযাচিত প্রচারণাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে দশকের পর দশক ধরে নিত্য প্রবহমান। কবিতাপ্রেমী মানুষদের বিরামশূন্য সাহচর্য, শুশ্রূষা দিয়ে যাচ্ছে আবুল হাসানের কবিতা। প্রবল প্রতাপে তিনি নিন্দুকের উদ্দেশে বলেও গেছেন—

তোমরা হারাও আর আমরা বারবার খুঁজে আনি

আমাদের চিতল মাছের পেটি, আমাদের বলক দেয়া ভাত, আমাদের ডালের শুকতো!

আমাদের যুবতীদের ভালোবাসা, ঘুম, কামকলা, আমাদের শিল্প

            সমাগম!

তোমরা ফেলে দাও আর পিছনে আমরা বারবার তুলে নেই

আমাদের রাজকুমারের ছবি, আমাদের ধুলো রাস্তা আমাদের অন্য

             সিংহাসন!

(পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী/অগ্রন্থিত কবিতা)

না। আবুল হাসানকে ভালোবাসার মানুষও কম নয়। আমাদের সময়ের কয়জন কবির এক মধ্য রাতের অভিযান তাঁর প্রতি ভালোবাসার বিষাদ মাখা নিখাদ মমত্ব হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে। চোখ ভরে ওঠে জলে। বুকের ভিতর চিনচিন করে। বন্ধু কবি আলফ্রেড খোকন তাঁর ‘আমার (অ) সাধারণ বন্ধুদের প্রেম’ গ্রন্থে লেখেন—

রাত দুটো। বনানী গোরস্তানের প্রধান ফটকে পৌঁছলাম। গেটের সামনে মশারি খাটিয়ে শুয়ে ছিলেন কবরস্থানের পাহারাদার। আশপাশে উদ্বাস্তু ও আরো অনেকে। অনতি দূরে বৃষ্টি হওয়ার সূত্রে হালকা ঠাণ্ডা। পাহারাদার জেগে ওঠে জানতে চাইল আমরা কারা, কেন এসেছি। আমি বললাম, ‘গেট খুলুন ভেতরে যাব।’ দারোয়ান কিংকর্তব্যবিমূঢ়, নিরুত্তর। কয়েক সেকেন্ড পরে সে মুখ খুলল, ‘এত রাতে কী করে সম্ভব?’ আমি বললাম, ‘খুব সহজ, আপনি গেট খুলবেন আমরা ভেতরে যাব। ভয় নেই, আমরা কবি, আপনার জন্য কোনো ঝামেলা হয়—তা করব না। আপনার ঘুম ভাঙানোর অপরাধে চা খাওয়াব, যাতে আমাদের জন্য কিছুক্ষণ জেগে থাকতে পারেন।’

দারোয়ান আমাদের অবস্থা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে গেট খুলে দিলেন। গেটের বাইরের ঘটনাকে পেছনে ফেলে আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। মারজুক দক্ষিণে, টোকন পুবে ছিটকে পড়ল। আমি স্বাভাবিকভাবে ওদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই অন্ধকারে এপিটাফ পড়ব কিভাবে? পড়তে না পারলে তো খুঁজে বার করা মুশকিল।’ টোকন বলল, ‘পেয়ে যাবি, মন দিয়ে খোঁজ।’ আমি বললাম, ‘এখানে নিশ্চয় আবুল হোসেন লেখা থাকবে, আবুল হাসান থাকবে না।’ মৃগাঙ্ক কিছুটা শঙ্কিত। ফলে সে সবার দিকে নজর রাখার দায়িত্ব নিয়ে নেয়।...

হঠাৎ কান্নার শব্দ। মুহূর্তেই এলাকার পরিবেশে একটা নিস্তব্ধতা নেমে আসে। কান্না ক্রমে হাহাকারে রূপ নেয়। একটু এগিয়ে দেখি আবুল হাসানের কবরের দুই পাশে উপুর হয়ে শুয়ে কাঁদছে দুজন। একজন কবি টোকন ঠাকুর, আরেকজন কবি মারজুক রাসেল। আমার দু’চোখ ভিজে উঠল। দুজনের মাথায় হাত রাখলাম। মারজুক খামচে কবরের কিছুটা মাটি তুলে নিয়ে কাগজে পুরে পকেটে রাখল। টোকন উঠে বসে ঘাসে। আমরা তিনজন। আবুল হাসানের কবরের পাশে সামান্য ঘাস, সেই ঘাসের চাদরে বসে পড়লাম। হারিকেন হাতে গোরস্তানের দারোয়ানের চোখে জল। আমরা আবুল হাসানের কবিতা পড়লাম। বিদায় নিতে নিতে টোকন বলল, ‘বেঁচে থাকলে বাসায় দেখা হতো। বেঁচে নেই বলে কবরস্থানে দেখা হলো। দেখা হতেই হবে।’ মারজুক বলল, ‘এই মাটি দিয়ে একটি মাদুলি বানাব।’ মৃগাঙ্ক বলল না কিছু। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সে বিহ্বলের মতো দাঁড়িয়ে রইল।

কবি আবুল হাসানের প্রতি এ সময়ের তিন কবির এই ভালোবাসা বিরল। তাঁর কবিতার মূল শক্তিই মধ্যরাতে এই তিন কবিকে বনানী কবরস্থানে তাঁর কবরে টেনে নিয়েছিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা