kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

৫৭

মৎস্যগন্ধা

হরিশংকর জলদাস

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



মৎস্যগন্ধা

অঙ্কন : মানব

মহারাজা চিত্রাঙ্গদ হিংস্র। উগ্র। অসহিষ্ণু। নিজের পেশিশক্তিতে অধিক আস্থাশীল। দুর্বিনীত। মহামন্ত্রী রৈভ্য থেকে শুরু করে কনিষ্ঠ, বয়োজ্যেষ্ঠ কোনো অমাত্যই চিত্রাঙ্গদের কাছ থেকে মর্যাদা পান না। এমনকি ভীষ্মকেও তেমন সম্মানের আসনে বসায়নি চিত্রাঙ্গদ। ভীষ্মকেও তেমন করে গুরুত্ব দেয় না সে। কুরুরাজাদের যে গৌরবের পথ, সে পথে চলল না চিত্রাঙ্গদ। প্রত্যক্ষে এবং পরোক্ষে ভীষ্মের প্রভাব এড়িয়ে চলল সে।

সত্যবতী চিত্রাঙ্গদের এসব ধৃষ্টতা দেখেও না দেখার ভান করলেন। ভীষ্মের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে রাজ্যশাসন করার জন্য পুত্র চিত্রাঙ্গদকে একবারের জন্যও তাগাদা দিলেন না।

মাথার ওপর কোনো অভিভাবক না থাকায় চিত্রাঙ্গদ আরো বেশি অবিনীত ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠল। অনুপযুক্ত রাজার ঔদ্ধত্য চিত্রাঙ্গদকে একেবারেই গ্রাস করে ফেলল। ফলে রাজপ্রাসাদে এবং রাজপ্রাসাদের বাইরে তার বিরুদ্ধে বিরূপতা দানা বাঁধতে শুরু করল। প্রাসাদ অভ্যন্তরের অসন্তুষ্টি খুব বেশি দৃশ্যমান হলো না। ভীষ্মের মহিরুহ ব্যক্তিত্ব সব অতুষ্টির প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াল। ভীষ্ম যে দুই ভাইকে খুব ভালোবাসেন, তা কারো অজানা ছিল না। ভীষ্ম আগ বাড়িয়ে চিত্রাঙ্গদকে কোনো উপদেশ দিতেন না সত্য, কিন্তু চিত্রাঙ্গদের প্রতি সস্নেহদৃষ্টি ছিল তাঁর।

কিন্তু বাইরের বিরূপতা থামাতে পারেননি ভীষ্ম। রাজা হওয়ার পর কাছে-দূরের বেশ কিছু যুদ্ধাভিযান চালিয়েছে চিত্রাঙ্গদ। উদ্ধত রাজারা চিত্রাঙ্গদের কাছে নতজানু হয়েছে। তার প্রতাপের কাছে সবাই আনুগত্য প্রকাশ করলেও একজন বেঁকে বসেছিল। তার নামও চিত্রাঙ্গদ। গন্ধর্বরাজ ছিল সে। তার শৌর্য-পরাক্রম কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় ছিল না। শান্তনুপুত্র চিত্রাঙ্গদ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিল—যেকোনোভাবে গন্ধর্বরাজ চিত্রাঙ্গদকে পদানত করবে।

প্রথমে দূত মারফত পত্র পাঠাল চিত্রাঙ্গদ। চিঠিতে লিখল—তুমি একজন সামান্য গন্ধর্বরাজা। তোমার সৈন্যবল ক্ষীণ, রাজ্য ক্ষুদ্র। তুমি কত বড় বাহুবলী, এরই মধ্যে তা-ও আমার জানা হয়ে গেছে। তোমার পিতার কোনো সুখ্যাতি ছিল না। অখ্যাত এক তথাকথিত রাজার ঘরে তোমার জন্ম। এই ভারতবর্ষের খুব সামান্যসংখ্যক মানুষ তোমার বংশের নাম জানে।

অথচ আমার বংশের দিকে চেয়ে দেখো তুমি, সসাগরা এই ভারতভূমিতে একজনকেও খুঁজে পাবে তুমি, যে কুরুবংশের নাম শোনেনি। কিংবদন্তিতুল্য মহারাজ শান্তনুর শৌর্যবীর্য সম্পর্কে অবগত নয়, এমন রাজাও কোথাও খুঁজে পাবে না তুমি। আর আমার কথা তোমার তো না জানার কথা নয়। দোর্দণ্ড প্রতাপী মহারাজা কুরুনৃপতি শান্তনুর পুত্র আমি। আমার পরাক্রমের কথা নিশ্চিত তোমার কানে পৌঁছেছে। আমার সৈন্যবাহিনীতে যত সৈন্য আছে, তারা প্রত্যেকে একটা করে ঢিল তোমার বাহিনীর দিকে ছুড়ে মারলে মাটিচাপা পড়ে যাবে তারা।

আস্ফাালন ত্যাগ করো। আমার সামরিক শক্তির প্রাবল্যের কথা আন্দাজ করো।

তোমার প্রতি আমার উপদেশ—তোমার দেশ কুরুসৈন্য দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আগে আমার বশ্যতা স্বীকার করো। দেশের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে কুরুরাজের করদ রাজ্যে পরিণত হও। তাতে তোমার দেশ বাঁচবে, তুমি বাঁচবে।

ইতি

মহাপরাক্রমশালী

কুরুকুলাধিপতি

চিত্রাঙ্গদ।

চিত্রাঙ্গদ এই চিঠিতে একবারের জন্যও মহামহিম বীরশ্রেষ্ঠ ভীষ্মের নাম উল্লেখ করল না। এই পত্র লেখার আগে একবারের জন্যও ভীষ্ম বা মহামন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করল না চিত্রাঙ্গদ। তার নিজের ওপর গভীর আস্থা তাকে বেশিমাত্রায় দর্পী করে তুলল।

পত্র পেয়ে গন্ধর্বরাজ চিত্রাঙ্গদ বিন্দুমাত্র ভড়কে গেল না। কুরুরাজ চিত্রাঙ্গদের চিঠির ভাষা তার গায়ে জ্বালা ধরাল বটে, কিন্তু বিচক্ষণ বলে নিজেকে সংযত রাখল সে। সে জানে—বিপুল কুরুসৈন্যের কাছে তার সামরিক শক্তি ধোপে টিকবে না। কুরুরাজ ঢিল ছোড়ার কথা যা লিখেছে, তা মিথ্যা নয়। তাই বলে এ রকম অহংকার! এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য! নাহ্, এর একটা জবাব দেওয়া দরকার। গন্ধর্বরাজ ঠিক করল—সে চিঠিতে ওই পত্রের উত্তর দেবে না। দেবে বাহুবলে। মন্ত্রণাসভা ডাকল গন্ধর্বরাজ। মন্ত্রণাসভায় সিদ্ধান্ত হলো—যুদ্ধক্ষেত্রেই জবাব দেবে গন্ধর্বরাজ। প্রেরিত দূতকে জানানো হলো—গন্ধর্বরাজ্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। তোমার রাজাকে গিয়ে বলো—তার সামরিক শক্তির পরীক্ষা নিতে চায় গন্ধর্বরাজ চিত্রাঙ্গদ।

বার্তা পেয়ে কুরুরাজ ভীষণ ক্রোধান্বিত হয়ে উঠল। ক্রোধে মানুষ বিবেচনাশূন্য হয়ে যায়। ক্রোধীদের ভালো আর মন্দের বিচারশক্তি লোপ পেয়ে যায়। চিত্রাঙ্গদেরও বিচারক্ষমতা লুপ্ত হলো। সে ভুলে গেল—ক্রোধ মানুষের সব কিছু কেড়ে নেয়, দেয় না কিছুই।

কুরুরাজ চিত্রাঙ্গদ অবিবেচকের মতো সিদ্ধান্ত নিল। সে ঠিক করল—গন্ধর্বরাজকে শায়েস্তা করবে। এবং তা অবিলম্বে।

সেনাপতিকে ডেকে পাঠাল চিত্রাঙ্গদ। বলল, ‘যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও। আগামীকালকে যুদ্ধযাত্রা করব আমি।’

এ সেনাপতি পিতার আমলের সেনাপতি নয়। রাজসিংহাসনে আরোহণের পর আগের সেনাপতিকে বিদায় করেছে চিত্রাঙ্গদ। এ সেনাপতি বয়সে নবীন হলেও বিচক্ষণ। ক্রোধান্ধ রাজাকে নিবৃত্ত করার জন্য বলল, ‘এত অল্প সময়ের মধ্যে যুদ্ধপ্রস্তুতি প্রায় অসম্ভব মহারাজ।’

‘অতশত বুঝি না। কালকেই যুদ্ধাভিযানে যাব আমি। গন্ধর্বরাজ্য গুঁড়িয়ে দেব।’

‘মহারাজ, আপনার আদেশ মানি। কিন্তু যুদ্ধপ্রস্তুতি তো হঠাৎ করে নেওয়া যায় না।’

‘এত বড় সৈন্যবাহিনী আমার। বিব্রত কণ্ঠে তোমাকে কথা বলতে দেখে আমি খুব অবাক হচ্ছি সেনাপতি।’

সেনাপতি বসুষেণ চাইছিল মহারাজ চিত্রাঙ্গদকে এই যুদ্ধাভিযান থেকে নিবৃত্ত করতে। সে জানে, গন্ধর্বরাজ্য অতীব ক্ষুদ্র একটি রাজ্য। রাজ্যটি এত অপাঙেক্তয় যে এর বিরুদ্ধে কুরুরাজ চিত্রাঙ্গদের যুদ্ধাভিযান মানায় না। আর একটি গুপ্ত কারণের জন্যও বসুষেণের যুদ্ধাভিযানে অনীহা। গন্ধর্বরাজের রণকুশলতা আর বাহুবল সম্পর্কে বসুষেণ সম্পূর্ণভাবে অবগত। সে আরো জানে যে কুরুরাজের রণদক্ষতা নিতান্ত বালসুলভ। দ্বৈরথে কোনোক্রমেই পেরে উঠবেন না কুরুরাজ। কিন্তু শত চেষ্টায়ও নিবৃত্ত করা গেল না চিত্রাঙ্গদকে। তার দৃঢ় সংকল্প—গন্ধর্বরাজকে গুঁড়িয়ে দেবেই।

নিরুপায় বসুষেণ শেষ চেষ্টা করল। অসহায় কণ্ঠে বলল, ‘মহামন্ত্রীর সঙ্গে একবার আলোচনা করলে হয় না মহারাজ।’

মহারাজ নাক সিঁটকে বলল, ‘তুমি আর লোক পেলে না বসুষেণ।’ তিনকুল গিয়ে যাঁর এককুলে ঠেকেছে, তুমি বলছ তাঁর উপদেশ নিতে। তিনি বয়োভারে ন্যুব্জ। শীর্ণ শরীর। সেই শরীর বহু রকম রোগব্যাধির আখড়া। তিনি থাকেন নানা রকম ব্যাধির যন্ত্রণায় কাতর। আর তিনি দেবেন আমায় উপদেশ! হাসালে তুমি আমায় বসুষেণ।’ তরঙ্গময় অকূল সমুদ্রে ভেসে যাওয়ার সময় মানুষ যেমন খড়কুটোকেও আশ্রয় করে বাঁচতে চায়, বসুষেণও সে রকম করে চিত্রাঙ্গদকে বাঁচাতে চাইল।

কাতর কণ্ঠে বসুষেণ বলল, ‘আমাদের দেশের সবচেয়ে মাননীয় ব্যক্তি ভীষ্ম। আপনার দাদা তিনি। আপনার শুভার্থী। তা ছাড়া অপার তাঁর সমরাভিজ্ঞতা। একবার তাঁর পরামর্শ নিন মহারাজ।’

চিত্রাঙ্গদের দুটি চোখ ধপ করে জ্বলে উঠল। এইখানে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিল সে। দ্রুত নিজেকে সামলে নিল চিত্রাঙ্গদ।

নরম গলায় বলল, ‘এখানে আবার দাদাকে টানছ কেন? এ অতি ক্ষুদ্র অভিযান। একজন তুচ্ছ লোকের বিরুদ্ধে। সকালে বেরোব, বিকেলে বীরবেশে রাজধানীতে ফিরব। তখন না হয় দাদাকে যুদ্ধজয়ের আনন্দ সংবাদ দেব।’

‘তার পরও আমার বিবেচনায় মহামতি ভীষ্মকে একবার জানানো দরকার।’

এবার কঠোর রূঢ় কণ্ঠে চিত্রাঙ্গদ বলে উঠল, ‘তোমার কাজ সৈন্যবাহিনী দেখা, আমাকে উপদেশ দেওয়া নয়। কোন ব্যাপারে কার সঙ্গে কী পরামর্শ করব, সে আমি ভালো করে জানি। তোমাকে আদেশ দিচ্ছি—কাল সকালের আগে সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত রেখো। ভোরে ভোরেই বের হব আমি। আর হ্যাঁ, বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করে বোসো না। ছোট্ট একটা সৈন্যদল হলেই চলবে।’

প্রত্যুষেই বের হয়ে গিয়েছিল চিত্রাঙ্গদ। তার কক্ষের সামনে রথ প্রস্তুত ছিল। সশস্ত্র চিত্রাঙ্গদ এক লাফে রথে চড়ে বলেছিল। বলেছিল চালাও। ভীষ্ম কিছু জানলেন না, সত্যবতী কিছু জানলেন না। অমাত্যরাও অবিদিত থাকলেন।

আত্ম-অহংকারী বলদর্পী নির্বোধ কুরুরাজ চিত্রাঙ্গদের যুদ্ধাভিযান সম্পর্কে সবাই তখন জানতে পারলেন, যখন দুঃসংবাদটা রাজপ্রাসাদে এসে পৌঁছল।

হিরণ্মতী নদীর তীরে উভয় চিত্রাঙ্গদ মুখোমুখি হলো। গন্ধর্বরাজ্য ক্ষুদ্র হলে কী হবে, এর সৈন্যবাহিনী অত্যন্ত চৌকস। তারা জানে, যুদ্ধে প্রাণ দেওয়ার মধ্যে সৈন্যজীবনের সব মাহাত্ম্য নিহিত। এ ছাড়া চিত্রাঙ্গদের গুপ্তচররা দক্ষ। ওরা সহজেই কুরুরাজের সৈন্যসজ্জার কথা জানতে পারল। এবং ত্বরিত সে সংবাদ গন্ধর্বরাজের কাছে পৌঁছাল। সে রাতেই নিজ সৈন্যদের সঙ্গে কথা বলল গন্ধর্বরাজ। বলল, ‘আমি জানি তোমরা একেকজন রণদক্ষ রথী। যত বড় ধুরন্ধর হোক না কেন বা অসিদক্ষ, তোমাদের সামনে থেকে প্রাণ নিয়ে পালাতে পারবে না। নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে তোমরা মুহূর্তকাল দ্বিধা কোরো না। কারণ তোমাদের কাছে দেশের স্বাধীনতা অত্যন্ত পবিত্র, অত্যন্ত মূল্যবান। গন্ধর্ব দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তোমরা প্রাণ বিসর্জনে প্রস্তুত। ঠিক কি না বলো।’

সমবেত সৈন্যরা গর্জে উঠল, ‘আমরা প্রস্তুত মহারাজ।’ ‘কাল সকালে আমাদের দেশ আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রমণকারী কে জানো তোমরা?’ সতেজ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন রাজা।

‘না, মহারাজ।’ সৈন্যরা আবার বলল।

গন্ধর্বরাজ চিত্রাঙ্গদ বলল, ‘অথর্ব, বীর্যহীন, কুরুরাজ চিত্রাঙ্গদ।’ ‘ওদের আমরা গুিঁড়য়ে দেব মহারাজ।’ পাশে দাঁড়ানো সেনাপতি বলে উঠল।

কণ্ঠ নামিয়ে সেনাপতির উদ্দেশে গন্ধর্বরাজ বলল, ‘যত দ্রুত সম্ভব তুমি যুদ্ধযাত্রার আয়োজন করো। আজ রাতের মধ্যেই হিরণ্মতী নদীর তীরে সৈন্য সমাবেশ ঘটাও। ওই পথ বেয়েই চিত্রাঙ্গদ আমার রাজ্য আক্রমণ করবে। আক্রমণের ওটাই একমাত্র পথ।’

উভয় পক্ষের সৈন্য প্রস্তুত। সবার মনে যুদ্ধংদেহি ভাব। প্রত্যেকে নিজের নিজের অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। সম্মুখভাগে উভয় নৃপতি। রথারূঢ়। উভয়ের পিঠে তূণ। কাঁধে প্রলম্বিত ধনুক। ডান হাতে তলোয়ার। দুধারী। সামান্য বাঁকানো। ক্ষুরধার। রথের মধ্যেই অনতিদূরে গদা। নানা আকারের। লৌহনির্মিত। কোনো কোনোটাতে স্বর্ণালি প্রলেপ। উভয়ের শিরে শিরস্ত্রাণ। দেহজুড়ে তাম্রনির্মিত বর্ম।

কুরুরাজ চিত্রাঙ্গদ আক্রমণের আদেশ দেওয়ার জন্য অসিসমেত ডান হাত তুলতে যাবে, ওই সময় তার কানে গন্ধর্বরাজের উচ্চকণ্ঠ ভেসে এলো, ‘রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কেন করতে চাইছেন কুরুরাজ! কুরুরাজ ততোধিক উচ্চৈঃস্বরে বলল, ‘তোমাকে চুরমার করে দেওয়ার জন্য।’

‘আমার অপরাধ?’

‘তুমি অহংকারী আর বলদর্পী হয়ে উঠেছ।’

‘নিজের কথাই আমার ওপর চাপিয়ে দিলেন কুরুরাজ!’

‘কী বললে, আমি আত্মম্ভরী!’

‘নয়তো কী মহারাজ? কুরুরাজ্যের তুলনায় গন্ধর্বরাজ্য নিতান্ত ক্ষুদ্র একটি দেশ। এই ক্ষুদ্র দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছেন আপনি। এ  যেন খরগোশের বিরুদ্ধে হাতির লড়াই।’

‘তুমি আমাকে হাতি বললে মূর্খ?’ গর্জে উঠল কুরুরাজ। শ্লেষ মিশিয়ে গন্ধর্বরাজ বলে উঠল, ‘তা নয় তো কী? হাতি যেমন তার খুদে চোখ দুটি দিয়ে অতিসামান্য কিছু দেখতে পায়, গোটা বস্তুকে দেখতে পায় না। আপনিও তেমন। আপনি আমার শক্তি সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারেননি। যতই সৈন্যসামন্ত নিয়ে আসুন, লেজ গুটিয়ে পরাজয়ের কলঙ্ক মাথায় নিয়ে আপনাকে হস্তিনায় ফিরে যেতেই হবে।’

‘আমার প্রতি তুমি যে অবহেলা দেখিয়েছ, তার প্রতিশোধ নিতে এসেছি আমি আজ। আজ আমার হাতে তোমার প্রাণ যাবে। তোমার স্ত্রী বিধবা হবে। তোমার রাজপ্রাসাদে হাহাকার উঠবে। তোমার রাজ্যকে এই হিরণ্মতীর জলে আমি চুবিয়ে ছাড়ব।’ তারপর হুংকার দিলেন কুরুরাজ, ‘আক্রমণ করো।’

যুদ্ধ বেধে গেল। রক্তক্ষয়ী। বিধ্বংসী। প্রাণসংহারী এই যুদ্ধে শতসহস্র সৈন্য মারা যেতে লাগল। নদীর তীরজুড়ে মানুষের মৃতদেহ। কোথাও কাটা হাত, কোথাও ছিন্ন মস্তক। মানুষের রক্ত নদীজলে মিশে যেতে লাগল।

একটা সময়ে যুদ্ধ থামল। কুরু সৈন্যরা পিছু হটল। কুরুরাজের রথটি হস্তিনাপুরের দিকে দ্রুত ধাবমান। রথের ওপর চিত্রাঙ্গদের মৃতদেহ এলিয়ে আছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা