kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

মাটিকাটা উপাখ্যান

রাশেদ রহমান

৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মাটিকাটা উপাখ্যান

অঙ্কন : প্রসূন

৯ আগস্ট, ১৯৭১...।

হানাদার বাহিনীর সাতটি জাহাজ সিরাজকান্দি ঘাটে নোঙর করেছে। জাহাজগুলোর তিনটি আকারে বিরাট, দুটি ছোট আকারের, সবচেয়ে বড় যে দুটি জাহাজ, এ দুটি ত্রিপল দিয়ে ঢাকা। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, দুটি অতিকায় মৃত হাতি, মৃত্যুর পর পেট ফুলে ঢোলের আকার ধারণ করেছে...।

এলাকাবাসী, যুদ্ধের শুরুতেই ভয়ে গ্রাম ত্যাগ করেছে, যমুনা পার হয়ে, নদীর ওপারে কোথাও আশ্রয় নিয়েছে, যে দু-চার ঘর আছে, গরিবগুবরো মানুষ; তাদের বিশ্বাস, তারা কোনো দলাদলিতে নেই, যুদ্ধটুদ্ধ কিছু বোঝে না, ভোটটাই না হয় নৌকা মার্কায় দিয়েছে, এ তো দেশের সব মানুষই দিয়েছে; তাদের ধারণা—হানাদাররা তাদের কিছু বলবে না, তারা ভূঞাপুরে আক্রমণ চালাবে। কারণ, তারাও শুনেছে ভূঞাপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি আছে। কিন্তু জাহাজগুলোর নড়াচড়া নাই। সেন্ট্রি হানাদাররা জাহাজের ছাদে বসে ঝিমোচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে সিরাজকান্দির দু-চারজন যারা বাড়িতে আছে, ঘাটপাড়ে এসে তারা এই দৃশ্য দেখেছে, তারা অনুমান করে—জাহাজগুলোর গন্তব্য হয়তো অন্য কোথাও, এখানে বিশ্রাম নিতে নোঙর করেছে।

দিন শেষে সিরাজকান্দিতে রাত নেমে আসে। জাহাজগুলো নদীর তীর ঘেঁষে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজের সারেং কিংবা হানাদার সদস্যদের কোনো তত্পরতা নেই। জাহাজগুলো কোথায় যাবে, কী তাদের উদ্দেশ্য, কমান্ডার হাবিবের এ সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই। এনায়েত করিম শুধু বলে দিয়েছেন, জাহাজগুলোর ওপর নজর রাখো, সুযোগমতো আক্রমণ করলেই জাহাজের পতন ঘটবে; কিন্তু এই বার্তার রহস্য কী কমান্ডার হাবিব তা জানেন না। এ নিয়ে অত কিছু ভাবনাচিন্তা করারও তাঁর সুযোগ নেই। কমান্ডারের নির্দেশ—জাহাজ আক্রমণ করতে হবে, ব্যস। এখন তাঁর মাথায় চিন্তা একটাই—কোথায়, কিভাবে আক্রমণ করা যায়।

কমান্ডার হাবিব তাঁর গেরিলা গ্রুপ ও কমান্ডোদের নিয়ে বসলেন। মোতাহার হোসেন, জিয়াউল হক, গোলাম নবী, সামাদ গামা, রেজাউল করিম—সবাই চৌকস কমান্ডো। এঁদের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রেজাউল করিমের নাম ছড়িয়ে পড়েছে দুর্ধর্ষ কমান্ডো হিসেবে। যা হোক, সলাপরামর্শ শেষে সিদ্ধান্ত হলো—জেলের বেশ ধরে ওদের কাছাকাছি যেতে হবে। প্রথমে স্বয়ং হাবিব মোতাহার ও জিয়াউলকে নিয়ে জেলের বেশে বের হলেন। হাবিবের পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি, মাথায় গামছা, কাঁধে ঝাঁকিজাল। অন্যদের কাছেও হাতজাল, পলো ইত্যাদি মাছ ধরার সরঞ্জাম। ছদ্মবেশী জেলেরা মাছ ধরার ভান করতে করতে জাহাজের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। তাদের দেখে তিন হানাদার ও এক বাঙালি স্পিডবোট নিয়ে নদীর কিনারে এলো। এক হানাদার জিজ্ঞেস করল—এ ধারমে মুক্তি কাঁহা হ্যায়? হাবিব উত্তর দিল—এ ধারমে মুক্তি নেহি হ্যায়।

—তোমরা কে?

—আমরা গরিব জাইলা, স্যার। মাছ ধইরা খাই।

—চমচম, খাসি, মুরগি কাঁহা মিলেগা?

—পোড়াবাড়ি মিলেগা, স্যার...।

কথাবার্তার ফাঁকে, নানা কৌশলে কিছু তথ্য, এই যেমন জাহাজে কী আছে, অস্ত্র থাকলে এই অস্ত্র দিয়ে মুক্তিলোকদের শেষ করা যাবে কি না ইত্যাদি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করল। হাবিব বলেছেন—মুক্তিলোকরা গাদ্দার, ইন্ডিয়ার দালাল—এসব কথা শুনে হানাদাররা খুব খুশি হয়েছে। ওরা তো আর জানে না, এই জেলেদের হাতেই দুই দিন পর ওদের প্রাণপাখি খতম হবে।

 

১০ আগস্ট...।

এদিনও জাহাজবহরের কোনো নড়াচড়া নাই। কী আছে ওদের মনে, কে জানে...!

হাবিবরা যে তথ্য পেয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। আরো তথ্য প্রয়োজন। জাহাজে আক্রমণ করতে হলে তাদের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। দুপুর বারোটার দিকে মোতাহার, জিয়াউল, ফজলু ও জামসেদকে আবার পাঠানো হলো। জেলের বেশেই গেল ওরা। তবে ওরা নদীতে নামার আগে গ্রামে ঢুকল। সাধারণ মানুষ ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে কথা বলল। তাদের সঙ্গে দেখা হলো ঘাটঘেঁষা সিরাজকান্দির বাসিন্দা মানিক মিয়ার সঙ্গে। সে সবিস্তারে বর্ণনা করল, কোন জাহাজে কী ধরনের অস্ত্র আছে, জাহাজবহরে কতজন হানাদার সেনা আছে। মূল যে খবর ছিল—ত্রিপল-ঢাকা জাহাজ দুটিতেই সব অস্ত্র। এ দুটিকেই আক্রমণের প্রধান টার্গেট করতে হবে।

মানিক মিয়ার কথা শুনে গেরিলাদের চক্ষু চড়কগাছ! মোতাহার জিজ্ঞেস করল, ‘এই খবর তুমি কিভাবে পেলে মানিক ভাই?’

ভোরের আজানের আগে জাল নিয়ে নদীতে গিয়েছিলাম। জাহাজবহরের কাছাকাছি যেতেই এক লোক স্পিডবোট নিয়ে কাছে এলো। নিজের পরিচয় দিয়ে বলল—তার নাম গোলাম মোস্তফা। জাহাজের সারেং। সে আমাকে সব জানিয়ে বলল—আমি যেন খবরটা মুক্তিবাহিনীর কাউকে জানাই।

অন্তত তিন কম্পানি হানাদার সৈন্য আছে জাহাজবহরে। শত্রুর বিশাল শক্তি। হাবিবরা সংখ্যায় মাত্র ৩০ জন। সঙ্গে কিছু স্বেচ্ছাসেবক আছে। শত্রুর জাহাজবহরে আক্রমণ করতে হলে আরো শক্তি প্রয়োজন। সিরাজকান্দি থেকে কমান্ডার হাবিব ভূঞাপুর উপদপ্তরে সিগন্যাল পাঠালেন—‘আরো সাহায্য চাই।’ এ সময় হাবিবের কাছে ছোট্ট একটি বার্তা এলো, ‘এইমাত্র সর্বাধিনায়কের কাছ থেকে নির্দেশ এসেছে, সুবিধামতো অবস্থান থেকে জাহাজে শুধু আক্রমণ করো। আক্রমণ করলেই জাহাজের পতন ঘটবে।’ কিন্তু কেন, কী করে তার কোনো উল্লেখ নাই। না থাকুক। কমান্ডার হাবিব ভাবলেন, যেহেতু সর্বাধিনায়কের নির্দেশ, ‘আক্রমণ করো’; সুতরাং অন্য কিছু ভাবার কোনো সুযোগ নেই। তিনি মাটিকাটায় গিয়ে সবাইকে অ্যাম্বুশ করতে বললেন। রাতের বেলা কমান্ডার হাবিব একাকী নদীতীরের রাস্তা ধরে একেবারে শত্রুর অবস্থানের কাছাকাছি গিয়ে তাদের গতিবিধি লক্ষ করলেন। নিরাপদ দূরত্বে থেকে অনেকক্ষণ ঘুরে-ফিরে দেখলেন, হানাদাররা খুব একটা বের হচ্ছে না।

 

১১ আগস্ট...।

সকাল আটটার দিকে একজন স্বেচ্ছাসেবক দৌড়ে এসে জানাল, জাহাজগুলো উত্তর দিকে যাত্রা করেছে। প্রাণ যায় আর থাকুক, শিকার হাতছাড়া হতে দেওয়া যাবে না। কমান্ডার হাবিব মুক্তিযোদ্ধাদের যার যার অবস্থানে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিলেন।

সাতটি জাহাজই সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে ধীরে ধীরে যমুনার জল কেটে উত্তর দিকে যাচ্ছে। হাবিব নির্দেশ দিলেন, ‘কেউ উত্তেজিত হবে না। শত্রুর শক্তি আমাদের চেয়ে অনেক বেশি।’

সবাইকে যথাযথ নির্দেশ দিয়ে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে বুকে হেঁটে হাবিব কিছুটা এগিয়ে গেলেন। তাদের কাছে চারটি এলএমজি, তিনটি দুই ইঞ্চি মর্টার, একটি ব্রিটিশ রকেট লঞ্চার, কয়েকটি রাশিয়ান ও ব্রিটিশ রাইফেল।

 

সকাল ১১টা...।

শত্রুর জাহাজগুলো এগিয়ে চলছে। ঢিপঢিপ করছে মুক্তিযোদ্ধাদের বুক। এবার এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! রেঞ্জের কাছাকাছি এসে গেছে ত্রিপলে ঢাকা অতিকায় দুটি জাহাজ। একটি এসইউ ইঞ্জিনিয়ার্স এলসি-৩, অন্যটি এসটি রাজন। জাহাজ দুটির দুই পাশে দুটি মেশিনগান নিয়ে হানাদার সেনারা চটুল গল্প-গুজবে মশগুল।  জাহাজ দুটি মুক্তিবাহিনীর রেঞ্জের মধ্যে আসতেই গর্জে ওঠে কমান্ডার হাবিবের এলএমজি। সঙ্গে সঙ্গে অন্যরা মর্টার, এলএমজি ও রাইফেল থেকে অবিরাম গুলিবর্ষণ করতে থাকে। রেজাউল করিম অব্যর্থ নিশানায় দশ-বারোটি দুই ইঞ্চি মর্টারের শেল নিক্ষেপ করে। তার ডান পাশের মঞ্জু সামনে অত বড় টার্গেট পেয়ে যেন উন্মাদ হয়ে ওঠে। সে পনেরো-বিশটি রকেট শেল ছুড়ে জাহাজের সারেংয়ের কেবিন ও নিচতলায় হানাদার সৈন্যদের অবস্থান ঝাঁঝরা করে ফেলে।

সারেংয়ের কেবিন ঝাঁঝরা হলেও সারেং গোলাম মোস্তফা ভাগ্যক্রমে বেঁচে ছিল। হানাদাররা বেশির ভাগই নিহত হয়। জীবিতরা স্পিডবোটে সিরাজগঞ্জের দিকে পালিয়ে যায়। গোলাম মোস্তফা তখন জাহাজের ছাদে উঠে ‘বাঁচাও, বাঁচাও, আমি সারেং মোস্তফা’ বলে চিত্কার করে নদীতে ঝাঁপ দেয়। স্বেচ্ছাসেবক হাসান গোলাম মোস্তফাকে উদ্ধার করে।

মোস্তফা এসেই বলল, ‘দুই জাহাজে বিশ কোটি টাকারও বেশি অস্ত্রশস্ত্র আছে। আপনারা তাড়াতাড়ি মাল খালাস করুন।’ জাহাজ দখলের ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মাল খালাস শুরু হয়ে যায়। ভূঞাপুর উপদপ্তর থেকে চলে এসেছেন এনায়েত করিম, বুলবুল খান মাহবুব, মোয়াজ্জেম হোসেন খান, দুদু মিয়া। তাঁরা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এত অস্ত্র! সীমিত অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধারা কী কষ্টে যে যুদ্ধ করছে। হানাদারদের এক শ গুলির বিপরীতে তারা গুলি করছে একটা। এখন সমানে সমান গুলি করতে পারবে।

এনায়েত করিম কমান্ডার হাবিবকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন। বুলবুল খান মাহবুব যেন বাকরুদ্ধ। কথা বলতে পারছেন না। কিন্তু তাঁর করোটিতে সৃজিত হচ্ছে কবিতার পঙক্তি, ‘সবাই ভুলতে পারে, আমরা কি পারব কখনো/ভুলে যেতে এইসব রোমাঞ্চের দিন...।’

 

রাত ১০টা...।

তখনো জাহাজের অর্ধেক অস্ত্রশস্ত্রও নামানো হয়নি। কিন্তু কমান্ডার হাবিব আর থাকতে সাহস পেলেন না। যেকোনো মুহূর্তে তাঁরা আক্রান্ত হতে পারেন। তিনি জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।

সারেং গোলাম মোস্তফা জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটিকাটায় শুরু হয়ে গেল কেয়ামত।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা