kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

হাতের মুঠোয় শিল্প দুনিয়া

হামীম কামরুল হক

৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



হাতের মুঠোয় শিল্প দুনিয়া

তিন পরিচালক—কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্ সিদ্দিকী ও আহসান আকবর

সাহিত্যচর্চা শুধু বই লেখা ও পড়ার ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনে যেসব পরিসর থেকে সাহিত্য উঠে আসে, সেসব পরিসরের সঙ্গে আলাপ না হলে সাহিত্য যে অর্থে সামগ্রিক জীবনের পাঠ, সেটি বোঝা যায় না। ঢাকা লিট ফেস্টে সেই আলাপটাই ঘটে। গত ৭ থেকে ৯ নভেম্বর ২০১৯ বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের কিছু এলাকা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সমন্বিতভাবে হয়ে উঠবে এর আয়োজনস্থল।

এটি শুধু সাহিত্যের উত্সব নয়। সংগীত, বিজ্ঞানভাবনা, সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনা, সর্বোপরি জীবনভাবনা ও চর্চা, সেই অর্থে একটি সাংস্কৃতিক উত্সব। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লেখক, কবি-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি বিজ্ঞানী, সংগীতশিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, দার্শনিক, ভাবুক-চিন্তকরাসহ নানা পেশার চমকপ্রদ সব জ্ঞানী ও গুণী মানুষ এখানে জড়ো হন। ভাববিনিময় করেন। ঘটে বিশ্বের সাম্প্রতিক সাহিত্যকে বাংলাদেশের প্রাঙ্গণে হাজির করার ব্যাপার, তেমন বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বিশ্বের নানা দেশের মানুষের কাছে উপস্থাপনের ঘটনা। বলতে গেলে, বাংলাদেশে ঢাকা লিট ফেস্ট সাহিত্য ও সংস্কৃতির সবচেয়ে সপ্রতিভ উত্সব।

২০১২ সালে এর সূচনা হয়েছিল হে ফেস্টিভাল হিসেবে, পরবর্তীকালে এটি ঢাকা লিট ফেস্টে রূপান্তরিত হয়। শুরুতে এটি হয়েছিল ব্রিটিশ কাউন্সিলের ছিমছাম ছোট্ট পরিসরে, পরের প্রতিবছর এর আয়োজনস্থল বা ভেন্যু হয়েছে বাংলা একাডেমি।

এটা এখন প্রায় পরীক্ষিত যে বাংলা একাডেমিতে কোনো সাহিত্য-সংস্কৃতির উত্সব যেভাবে জমে ওঠে, এটি আর কোথাও সেই মাত্রায় জমে ওঠে না। বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশের প্রাণের এই প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় ঢাকা লিট ফেস্ট দুটি মাত্রা পায়। একদিকে এটি হয়ে ওঠে দেশীয় মেজাজের আন্তজার্তিক উত্সব, তেমনি আন্তর্জাতিক মেজাজের দেশীয় উত্সব।

সাহিত্যচর্চা বলতে গেলে একটি নাগরিক মেজাজের বিষয়। সে আপনি গ্রামে-মফস্বলে, শহরে-নগরে, যেখানেই করুন না কেন। অন্য স্থানে, মানে গ্রামে-মফস্বলে সাহিত্যের উত্সব তো নিত্যই হয়; কিন্তু সাহিত্য তো শুধু একটি ভাষার সাহিত্য দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। সাহিত্য মানেই বিশ্বের সব ভাষার সাহিত্য নিয়ে যে সাহিত্য। ফলে বারবারই বলতে হয়, ভাষা যার যার, সাহিত্য সবার। অন্যদিকে এই ‘সবাই’ কারা? ঢাকা লিট ফেস্টে এই ‘সবাই’-এর বিষয়টির মনে হয় একটা আলাদা মাত্রা আছে। নাগরিক মেজাজের না হলে চট করে এতে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া মনে হয় একটু কঠিন।

সাহিত্য তো সবার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিষয়; কিন্তু সবাই কি সাহিত্যমন্দিরে পূজা দিতে আসেন? কাব্যদেবীও কি সবার পূজা গ্রহণ করেন? আর পূজার অর্ঘ্য যদি সংকীর্ণ মনে দেওয়া হয়, তাতে যদি আত্মঅহংকারের ময়লা লেগে থাকে, কাব্যদেবী সেই পূজা গ্রহণ করেন না। সুজান সনটগের লেখায় পড়েছিলাম, আগেও জেনেছিলাম যে সাহিত্য হলো চরম ইগোইস্ট একটি বিষয়; কিন্তু অন্য অনেক চরমের মতো, যা সেই মাত্রায় উঠলে মুক্তি দেয়, সাহিত্য একটি ইগোইস্ট ব্যাপার হলেও ইগো থেকে মুক্তি দিতে পারে। বলতে কি, নিজেকে গৌরব দান করতে গিয়ে নিজেকে নিত্য অপমানের হাত থেকে সাহিত্য আমাদের রক্ষা করে। আমাদের সীমাকে ভেঙে দেয়, দেখায় আমির বাইরেও অনেক কিছু আছে, আমিটাকে সেখানে যুক্ত করতে না পারলে সেটি মুক্ত হয় না, আমিকে বিশাল ক্ষেত্রে রূপান্তর ঘটিয়ে জগতের সব কিছুকে নিজের আত্মার ভালোবাসার অংশ করে তোলার ভেতর দিয়েই আসলে সাহিত্য তার কাজ সারে। যেখানে সুগভীর অর্থে ভেতরে-বাইরের ভেদ দূর হয়ে যায়, আপন-পরের ব্যবধান ঘুচে যায়। ঢাকা লিট ফেস্টে সাহিত্যের এই উদ্দেশ্যটিও সাধন হয়।

অনেকেই এর ভেতরে পুঁজিবাদী গন্ধ পান, কারো কারো মতে, এটি ইংরেজি সাহিত্যের বাজার ও পাঠক বাড়ানোর মার্কেটিং পলিসি-জাত একটি উদ্যোগ; কারো মতে, এটি বাংলা ও বাংলাদেশের সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকর—এ রকম অনেক কথা বাতাসে ভাসে। কিন্তু ঢাকা লিট ফেস্টের যেকোনো সেশনে গেলেই আশা করি, এই কথাগুলো যে অমূলক তা টের পাওয়া যায়। ঢাকা লিট ফেস্টের বেশির ভাগ অনুষ্ঠানই সাক্ষাত্কার, আড্ডার মতো। মঞ্চে দুই বা ততোধিক আলাপ-আলোচনার জন্য থাকা নানা ক্ষেত্র থেকে আসা মানুষ, আর অন্যদিকে একঝাঁক দর্শক—এই-ই হলো এর বেশির ভাগ অনুষ্ঠানের রূপ। তাতে তো এটি একঘেয়েও হয়ে উঠতে পারত; কিন্তু তা হয়নি বা হয় না অনুষ্ঠানগুলোর বিষয়বৈচিত্র্যের কারণে এবং মঞ্চে থাকা আলোচনাকারী ও সামনে থাকা দর্শকদের সম্মিলিত ভাববিনিময়ের কারণে। মঞ্চসজ্জায় এবং আলোর বিশেষ প্রক্ষেপণে তৈরি হয় এমন পরিবেশ, যা অনুষ্ঠানগুলোকে আরো মায়াময়, মোহময় ও আকর্ষণীয় করে তোলে। কি এর অংশগ্রহণকারীদের ভেতরে, কি এর দর্শক-অভ্যাগতদের ভেতরে দেখা যায় দারুণ এক সপ্রতিভ অভিব্যক্তি।

বিগত সময়গুলোর মতো তিন দিনের এই উত্সবে যে বিপুল পরিমাণ অধিবেশন বা সেশন থাকে, তাতে একজনের পক্ষে একই সঙ্গে অনুষ্ঠানগুলোতে থাকা সম্ভব হয় না। দেখা গেছে, অনুষ্ঠানসূচি দেখে তিনি যে কটা অধিবেশনে থাকতে আগ্রহী, তার ভেতরে একই সময়ে পড়ে গেছে দুটি অধিবেশন, ফলে একটায় থাকলে তার অন্যটায় থাকা সম্ভব হয় না। আগ্রহীরা গুগলে গিয়ে ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৯-এর অনুষ্ঠানসূচি, অধিবেশন ও এতে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে সহজেই জেনে নিতে পারবেন।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লেখক-কবি-সাহিত্যিকরা মূলত বাংলা ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সমাজনীতি নিয়ে নানা অধিবেশনে বসেন। কোনো কোনো সময় কোনো লেখকের একক অধিবেশন বসে। সেগুলো বিশেষভাবে দর্শকদের আকৃষ্ট করে। যেমন—আহসান আকবরের একক সঞ্চালনায় হয়েছিল ভি এস নাইপলের অনবদ্য সেই অধিবেশনটি। এত দর্শক সেদিন বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে উপস্থিত ছিলেন যে একটা সুচ ঢোকার আর জায়গা ছিল না। তেমন ছিল সমকালীন আরবি সাহিত্যের বিশ্বখ্যাত আদোনিসের অধিবেশনটি—কায়সার হকের সঞ্চালনায়। এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা যায়—অধিবেশনে যার সাক্ষাত্কার নেওয়া হবে, তিনি যদি বাঙালিদের কাছে বা বিশ্বে ততটা খ্যাতির অধিকারী হন তো সেখানে দর্শক গিজগিজ করতে থাকে। আগের দুজন বাংলা ও বাংলাদেশের বাইরের লোক ছিলেন; কিন্তু সমকালীন বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটেছিল। অধিবেশনটির সঞ্চালনায় ছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। তাঁর অসামান্য উপস্থাপনা এবং হলভর্তি দর্শকের উপস্থিতি স্বয়ং লেখক শীর্ষেন্দুকে চমত্কৃত করেছিল।

ঢাকা লিট ফেস্টের এমন অনেক অধিবেশনই অনেকেরই অভিজ্ঞতার জগেক আন্দোলিত ও প্রসারিত করেছে, সাহিত্য ও জীবন সম্পর্কে তৈরি করেছে নতুন নতুন প্রশ্ন ও উদ্দীপনা।  এত বড় পরিসরে বর্ষীয়ান কবি-লেখকদের পাশাপাশি তরুণতম লেখকদের উপস্থিতি বলতে গেলে এমনভাবে এতটা থাকে, যা এই ঢাকা লিট ফেস্টের আগে খুব একটা দেখা যায়নি। ফলে নানা দিক থেকে ঢাকা লিট ফেস্ট আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিকেন্দ্রিক উত্সবের ধারায় অনন্য হয়ে উঠেছে।

এবারের ঢাকা লিট ফেস্টে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মণিকা আলি আগেই বাংলাদেশের আগ্রহী পাঠকমহলে বিশেষভাবে পরিচিত। আছেন ভারতের শশী থারুরও, যাঁর উপস্থিতি আগেও ঢাকা লিট ফেস্টের একটি অধিবেশনকে উজ্জ্বল করে তুলেছিল। তেমনি আছেন উইলিয়াম ডারলিম্পল। প্রায় সব মহাদেশের নানা দেশ থেকে আসা সাহিত্য ও সংস্কৃতিসেবীদের অংশগ্রহণের ধারায় আমরা ঢাকা লিট ফেস্টে দেবেশ রায়, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, অভিজিত্ সেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, নির্মলেন্দু গুণ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, জয় গোস্বামী, কামাল চৌধুরী, চিন্ময় গুহ, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, কিন্নর রায়, আসাদ মান্নান, মইনুল আহসান সাবের প্রমুখের পাশাপাশি দেখেছি ভি এস নাইপল, আদোনিস, বেন ওকরি, বিক্রম শেঠ, অ্যান্ড্রু মিলার, আমের হোসেন, মারিয়ো বেয়াতিন, নাদিম আসলাম, মোহাম্মদ হানিফ, অ্যাডাম জনসন প্রমুখকে। এ ছাড়া বাঙালি কিন্তু ইংরেজিতে লিখে থাকেন, তেমন বিশিষ্ট সাহিত্যব্যক্তিত্বদের প্রায় সবাই নানা সময়ে ঢাকা লিট ফেস্টে অংশগ্রহণ করেছেন। এর ভেতরে ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক সাদাফ সায, কাজী আনিস আহমেদ ও আহসান আকবরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়।

তবে শুরুতেই যেমন বলেছি, এটা শুধু সাহিত্যের উত্সব নয়, লোকসংস্কৃতির নানা আয়োজনসহ চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীতানুষ্ঠান ঢাকার লিট ফেস্টের দ্রষ্টব্য বিষয়। ২০১৮ সালের ঢাকা লিট ফেস্টে নন্দিতা দাস পরিচালিত ‘মান্টো’ নিয়ে বিপুল সাড়া পড়েছিল অভ্যাগতদের মধ্যে।

ঢাকা লিট ফেস্ট তরুণ লেখকদের জন্য দারুণ এক প্রণোদনার বিষয়। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস নিয়ে আয়োজিত সেশনগুলো থেকে নানা নির্দেশনা পেতে পারেন তাঁরা। এবার তেমন সেশনগুলোর কয়েকটির কথা উল্লেখ না করলেই নয় : প্রথম দিনে ‘ফিকশন : রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড রিফিউজি’, ‘ভাঙা বাংলা : ত্রস্ত নীলিমায়’, ‘গল্পের নশ্বরতা’, ‘দ্য স্টোরি টেলার’, ‘নীরব ইতিহাস : সরব সাহিত্য’, ‘সুকুমার বড়ুয়া : নিজের কথা ও ডকুমেন্টারি’, দ্বিতীয় দিনে ‘সমাজ ও সত্তা : দ্বান্দ্বিক বিরোধ’, ‘স্টোরিটেইলিং : দ্য মিস্ট্রি অব ইনহেরিটেন্স’, ‘যে গল্পের পাঠক নেই’, ‘বিয়ন্ড ব্রিকলেন’, ‘মুক্ত নারী : রুদ্ধ সমাজ’, তৃতীয় দিনে ‘অন দ্য রোড’, ‘রিভাইভিং দি আর্ট অব স্টোরিটেইলিং’, ‘ম্যাথস অ্যান্ড লিটারেচার’ এবং ‘সাহিত্য ও সাংবাদিকতা : দ্বৈতসত্তার মিল-অমিল’। এ ছাড়া অভিনয়, চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা, সংগীতের সেশনগুলোও হাতমকশো করা তরুণ-তরুণীদের বিশেষভাবে পথ দেখাতে পারে বলে বোধ করি। রাজনীতি, সমাজনীতি, যুদ্ধ, অভিবাসন, দেশান্তর ইত্যাদি নিয়ে যে যে অধিবেশন আছে, তা যে কারো জিজ্ঞাসু মনকে আরো তীক্ষ ও তীব্রতা এনে দিতে পারে।

সব মিলিয়ে এবারের ঢাকা লিট ফেস্টও বিগত সময়ের মতো আমাদের সাহিত্য ও সংগীতের চর্চায় নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার করবে বলেই আশা জাগছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা