kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ধারাবাহিক উপন্যাস মৎস্যগন্ধা

মৎস্যগন্ধা

হরিশংকর জলদাস

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



মৎস্যগন্ধা

অঙ্কন : মানব

সিন্ধুচরণ উল্লাসে ফেটে পড়ে বলল, ‘দ্বিমত মানে! কোনো দ্বিমত নেই আমার। মেয়ে দেব না মানে! আপনার পিতার সঙ্গেই তো পুষ্পগন্ধার বিয়ে হবে।’

দেবব্রতের প্রতিজ্ঞা শুনে সঙ্গে আসা ক্ষত্রিয়রা-দেহরক্ষীরা হাহাকার করে উঠল। এই মুহূর্তে করার কী—দিশা খুঁজে পেলেন না অমাত্যরা। সমবেত কৈবর্তরা প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গেল। পরে মুখর হলো। মুখরতা অচিরেই কোলাহলে রূপান্তরিত হলো। অনেক রাজা-মহারাজার গল্প শুনেছি, এ রকম শুনিনি কখনো! বহু ত্যাগের বৃত্তান্ত শুনেছি গো, যুবরাজ দেবব্রতের মতো এ রকম ত্যাগের কাহিনি বাপের জন্মে দেখিওনি, শুনিওনি! বাপের দেহসুখের জন্য পুত্রের এ রকম আত্মত্যাগ কখনো শুনেছ তোমরা! এ রকম নানা মন্তব্য সমবেত কৈবর্তদের মুখে উচ্চারিত হতে থাকল।

উঠানে দাঁড়ানো যমুনার মা এক দৌড়ে ঘরে ঢুকল। উঁচু গলায় বলল, ‘আপনার সুদিন ফিরে এলো গো রানি মা। পুষ্পগন্ধার কপাল বদলে গেল গো। আপনি রানি ছিলেন। সামান্য কৈবর্তবংশের রানি। পুষ্পগন্ধা রানি হয়ে গেল গো গিন্নিমা। এক্কেবারে কুরুবংশের রাজরানি।’ যমুনার মায়ের কথা আর শেষ হয় না। বহুদিন আগে দাশরাজার এই উঠানেই এসে দাঁড়িয়েছিল একদিন মাসি আর এই যমুনার মা। মৎস্যগন্ধা তখন গর্ভবতী। বলাত্কারের সব চিহ্ন তখন মৎস্যগন্ধার শরীরজুড়ে। সেদিন দুজনে বহু চেষ্টা করেছিল মৎস্যগন্ধার সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু ভবানী দেখা করতে দেয়নি। নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে ওদেরকে বিরত রেখেছিল সেদিন। গাঢ় একটা ভয় তাকে চেপে ধরেছিল। যদি মৎস্যগন্ধার কলঙ্কের কথা জানাজানি হয়ে যায়! সেদিন কী করে মাসি আর যমুনার মাকে উঠান থেকে তাড়াবে, তা নিয়ে তত্পর ছিল ভবানী।

কিন্তু আজ দিন পাল্টে গেছে। আজ রাখঢাকের কিছু নেই। বরং আজ বলার দিন, চিত্কার করে বলার সময় আজ। দেখো তোমরা, পাড়াপড়শিরা ভালো করে দেখো—আমার পুষ্পগন্ধার কপাল কিভাবে বদলে গেল। কৈবর্তের মেয়ের কপালে রাজমহিষীর মুকুট উঠতে যাচ্ছে আজ। তার কপালে আজ রাজটিকা লাগছে। এখন থেকে তোমরা আর ওকে পুষ্প বা পুষ্পগন্ধা ডাকতে পারবে না। ডাকতে হবে মহারানি বলে। এখন যেমন হুটহাট করে পুষ্পগন্ধার সঙ্গে দেখা করছ, তার গা ঘেঁষে বসে সুখ-দুঃখের কথা কইছ, সেই দিন আজ শেষ হয়ে গেল। এখন থেকে তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে কুরুরাজ প্রাসাদের ফটকে গিয়ে ধরনা দিতে হবে। পুষ্পগন্ধা করুণা করলেই শুধু তার সঙ্গে দেখা করতে পারবে।

আজ যমুনার মায়ের কথাগুলো বড় ভালো লাগল ভবানীর। আদর করে তাকে কাছে বসাল। উঠানের ঘটনাগুলো সবিস্তারে জানতে চাইল ভবানী।

দেবব্রত প্রশান্ত মুুখে নিজ আসনে বসে আছেন। তাঁর হূদয়ে কী ক্ষরণ হচ্ছে! বোঝার উপায় নেই। পিতার লোভের যজ্ঞে আত্মাহুতি দেওয়া এক যুবকের সহজ-স্বাভাবিক চেহারা সবাই দেখতে পাচ্ছে। এ কোন দেবব্রত? এত বড় আত্মত্যাগী! এ রকম যুবক তো কোটিতেও একজন মেলে না। আত্মোত্সর্গের এই মন্ত্রটি কোন গুরুর কাছ থেকে শিখেছেন দেবব্রত? না না, তিনি দেবব্রত নন। আজ থেকে তিনি ভীষ্ম। যিনি প্রতিজ্ঞায় অটল, তিনিই তো ভীষ্ম! হঠাৎ সবচেয়ে বয়োবৃদ্ধ অমাত্যটি আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আবেগকম্পিত কণ্ঠে বললেন, ‘আপনাদের সামনে উঁচু আসনটিতে যিনি বসে আছেন, তাঁকে আপনারা সবাই চেনেন। তিনি কুরুরাজ শান্তনুর পুত্র দেবব্রত। আজ এই দেবব্রত আপনাদের সামনে যে কর্তব্যনিষ্ঠা এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞার প্রমাণ রাখলেন, তার তুলনা এই ভূমণ্ডলে নেই। কঠিন-কঠোর বিশুষ্ক তাপস তিনি। তিনি কর্তব্যনিষ্ঠ একজন অসাধারণ পুরুষ। আমি তাঁর নাম দিতে চাই ভীষ্ম। আজ থেকে সসাগরা এই ভারতবর্ষে ভীষ্ম নামেই পরিচিত হবেন আমাদের দেবব্রত।’

অমাত্যের কথা শুনে চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। ‘আমি আপনার কন্যার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’ বললেন ভীষ্ম।

‘অবশ্যই দেখা করবেন মহাত্মন।’ বিনয়ের অবতার হয়ে বলল সিন্ধুচরণ।

ভীষ্ম পাশে বসা অমাত্যের সঙ্গে কানে কানে কিছু কথা বললেন। একটু দূরে দাঁড়ানো সজ্জাকারী নারীদের দিকে হাত তুলে ইঙ্গিত করলেন অমাত্য। হস্তিনাপুর থেকে আনীত নারীরা বহু মূল্যের সাজসজ্জা-পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে সিন্ধুচরণের ঘরের মধ্যে গেল।

তারপর ভীষ্ম সত্যবতীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

তার আগেই সজ্জার কাজ শেষ হয়েছে। কুশলী হাতে হস্তিনাপুরের নারীরা সত্যবতীকে সাজিয়ে তুলেছে। রাজকীয় আভরণ-আবরণ সত্যবতীর সর্বাঙ্গে উঠেছে। চুল খোঁপাবদ্ধ হয়েছে। আগের অনাবৃত দেহাংশ মূল্যবান বেশভূষায় ঢেকে গেছে। নানা অলংকারে সত্যবতীর কপাল-নাসিকা-কর্ণ-হস্ত-পদ—সব কিছু অলংকৃত হয়েছে। একটু আগের ধীবরকন্যা পুষ্পগন্ধা রাজকীয় পোশাক-পরিচ্ছদের অন্তরালে হারিয়ে গেছে। বর্তমানের সত্যবতীকে দেখে সিন্ধুচরণ নিজ কন্যা বলে চিনতে পারবে না। সে যেন এখন রাজেশ্বরী।

সজ্জার কাজ শেষে ভীষ্মের কাছে সংবাদ পাঠানো হয়েছে। ভীষ্ম সত্যবতীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।

বলেছেন, ‘এসো মা, চলো। এখন আমরা আমাদের নিজ ঘরে যাব।’ ‘মা’! চমকে চোখ তুলে তাকাল সত্যবতী। দেখল, রাজকীয় আভিজাত্যে উজ্জ্বল এক যুবক তার সামনে দাঁড়িয়ে। গৌরবর্ণ। সুঠাম দেহ। অন্তর্ভেদী দুটি চোখ। মায়াময়। বয়সে নবীন হলেও ব্যক্তিত্বশালী। ‘হ্যাঁ, মা। আজ থেকে তুমি তো আমার মা-ই হলে।’ ভীষ্ম কোমল কণ্ঠে বলল।

সত্যবতী আবার বলল, ‘মা!’

‘হ্যাঁ। তুমি যে আমার মা, তাতে তো বিন্দুমাত্র মিথ্যা নেই।’

বিহ্বল কণ্ঠে সত্যবতী আবার বলল, ‘মিথ্যা!’

‘তোমার বাবা ধীবররাজ এই বিয়েতে সম্মত হয়েছেন। তবে হ্যাঁ মা, তোমাকে আমি একটু আগেই মা ডেকে ফেললাম। বিয়ের পরেই তো তুমি আমার আইনসিদ্ধ মা হবে।’

‘পুত্র!’ বলে থেমে গেল সত্যবতী। চট করে তার কৃষ্ণের কথা মনে পড়ল। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন। এত বছর পরে এ রকমই তো হবে কৃষ্ণ। দেহগঠন, চেহারা—সব তো সামনে দাঁড়ানো এই যুবকটির মতোই হবে সে। দেখে মনে হচ্ছে, সামনে দাঁড়ানো যুবকটি কৃষ্ণের সমবয়সী। কৃষ্ণ রে! কোথায় তুই এখন? আজ এই মুহূর্তে তোকে যে বড্ড বেশি করে মনে পড়ছে রে বাপ। মনে মনে বলে গেল সত্যবতী। ‘তোমাকে বলা হয়নি মা, আমি রাজা শান্তনুর পুত্র দেবব্রত। ঘটনা শুনে তোমাকে নিতে এসেছি মা। চলো মা, রাজধানীতে চলো। সেখানেই তোমাদের বিয়েটা সম্পন্ন হবে মা।’

দেবব্রতকে বড় ভালো লেগে গেল সত্যবতীর। দেবব্রতের মধ্যেও গহিন একটা বন্ধুত্বের ভাব জাগল। দেবব্রত আর সত্যবতী সমবয়সী নয়, এটা ঠিক। কিন্তু সত্যবতী গঙ্গার মতো বয়স্ক নয়। দেবব্রত আর সত্যবতীর মধ্যে বয়সের ফারাক খুব বেশি নয়।

শান্তনুর ঔরসে গঙ্গাগর্ভে দেবব্রত যখন জন্মায়, ঠিক সমসাময়িককালেই পরাশরের ঔরসে সত্যবতীর গর্ভে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন জন্মলাভ করে। দেবব্রত আর কৃষ্ণ দুজনই সমবয়সী। তাই আজ দেবব্রত যখন সামনে দাঁড়িয়ে ‘মা’ বলে সম্বোধন করলেন, সত্যবতীর হূদয়টা তোলপাড় করে উঠল। বাত্সল্য তাকে উন্মূল করল। সত্যবতী সহসা বুকের ভেতর পুত্রের আসনে দেবব্রতকে বসিয়ে দিল। সত্যবতীর কাছে দেবব্রত আর কৃষ্ণ একাকার হয়ে গেলেন।

সত্যবতীকে নিজের সঙ্গে নিয়ে হস্তিনাপুরের উদ্দেশে রওনা দিলেন ভীষ্ম। সেই যাত্রাপথেই সত্যবতীর সঙ্গে ভীষ্মের ভাব হয়ে গেল। একে অপরের বহুদিনের চেনাজানা যেন, বহু বর্ষের বন্ধুত্ব যেন পরস্পরের মধ্যে।

বটবৃক্ষটির অদূরে সেই যমুনাপার—খেয়াঘাট। খেয়াঘাটে দু-চারটি পানসি। পানসিগুলো দুলছে। গাঙ্গে তেমন ঢেউ নেই। যা আছে, তা চঞ্চলা পানসিগুলোকে নাচাতে যথেষ্ট। পারানির কাজ ভুলে হাঁ করে পাটনিরা কূলের দিকে তাকিয়ে আছে। কূলে বহু মানুষের ভিড়। গোটা সুবর্ণপুরের মানুষরা বুঝি খেয়াঘাটে জমায়েত হয়েছে।

সামান্য দূরে রাজকীয় জলযানটি অপেক্ষা করছে। শক্ত হাতে হাল ধরে হরনাথ বসে আছে। মাল্লারাও প্রস্তুত।

সত্যবতী কাঁদছে। বুক ভাসিয়েই কাঁদছে। কাঁদছে পাড়াপড়শির জন্য, কাঁদছে ওই বটগাছটির জন্য, কাঁদছে বটশিকড়ে বাঁধা তার পানসিটির জন্য। আর কাঁদছে এই বালুকাবেলার জন্য। সেই বেদনাঋদ্ধ সন্ধ্যাটির জন্য, জেঠা নরসিংহের জন্য। আর কাঁদছে যমুনার মায়ের জন্য, মাসির জন্য, ভুসুকু পাগলার জন্য। কেঁদে যাচ্ছে মা ভবানীর জন্য, বাবা সিন্ধুচরণের জন্য। এসবের সঙ্গে তার যে আজন্ম সম্পর্ক! ছোট্টটি থেকে বড় হয়ে উঠতে উঠতে, কিশোরী থেকে যুবতি হয়ে উঠতে উঠতে সত্যবতী যে এদেরই সাহচর্য পেয়েছে!

এ কান্নার সঙ্গে সত্যবতীর নানা রকম আবেগ জড়িয়ে আছে। এ কান্নার পেছনে আছে বালিকাবেলার স্মৃতি, আছে গভীর বেদনার হাহাকার, আছে নিবিড় শ্রদ্ধার অকুণ্ঠ সম্পর্ক, মাতৃঋণের শ্রদ্ধার্ঘ্য এবং আছে দ্বিধাযুক্ত বিতৃষ্ণ। বটবৃক্ষটি তার বহু আনন্দ-বেদনার সাক্ষী, পানসিটি জীবননির্বাহের আধার। নরসিংহ জেঠা তার জীবন নির্মাণের কারিগর। ভবানী জননী না হয়েও জননীর অধিক। নিঃসন্তান এই নারীটির প্রতি সত্যবতীর ঋণের শেষ নেই। বাবা সিন্ধুচরণ তার জীবনে ছিল মহার্ঘ। এই বাবাই তাকে জীবনের দিকে ফিরে তাকাতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ভালো এবং মন্দকে চেনার মানসিকতা তৈরি করে দিয়েছে এই বাবা সিন্ধুচরণই।

কিন্তু সেই বাবার জন্য আজ সত্যবতীর করুণা হচ্ছে। বাবা সিন্ধুচরণ তাকে নিয়ে তো সওদাগরি করেছে। আজ দেবব্রতের সঙ্গে বাবার কী কথাবার্তা হয়েছে সঠিক জানে না সে। যমুনার মা ঘরে ঢুকে মাকে কী কী বলছিল। কিন্তু ওসব শোনার মানসিকতা তার ছিল না তখন। তার মন উড়ে গিয়েছিল রাজা শান্তনুর কাছে। অপরিচিত হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদের কোন কক্ষে বসে রাজা তার জন্য অপেক্ষা করে আছেন? কিন্তু সেদিনের বাবার কথা তো নিজ কানে শুনেছে সত্যবতী। বিয়ের মধ্যে নানা শর্ত আরোপ করছিল বাবা। বাবার কথা শুনে কী বিষণ্নই না হয়ে গিয়েছিল রাজার মুখ। যে মুখমণ্ডল প্রাপ্তির আনন্দে ভাসছিল, বাবার কথা শুনে সেই আনন্দোদ্ভাসন মুহূর্তে উবে গিয়েছিল। করুণ সেই মুখটির কথা মনে হলে আজও সত্যবতীর বুকটা চুরমার হয়ে যায়।

না জানি বাবা সিন্ধুচরণ আজ দেবব্রতকে কোন শর্তের ফাঁদে জড়িয়ে নিয়েছে। কোন অপমানকর অঙ্গীকারে দেবব্রতকে আবদ্ধ করেছে। সেদিনের সেই কূটচাল, যা বাবা রাজা শান্তনুর সঙ্গে চেলেছিল, নিশ্চয়ই আজও যুবরাজের সঙ্গে পাশার সেই ঘুঁটিটিই ফেলেছে। সেদিন রাজার সামনে বাবা যে রকম নাছোড় ছিল, যে কূটাচারী ছিল, আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি নিশ্চয়ই। নইলে দেবব্রতের উজ্জ্বল চোখ দুটির আড়ালে এ রকম বিষাদের ঝড় কেন? অন্য কেউ না বুঝুক, সত্যবতী তো বুঝতে পারছে—প্রবল প্রতাপী এক বেদনার ঝড় দেবব্রতের ভেতরটা লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে এই মুহূর্তে।

ভীষ্ম বলল, ‘ওঠো মা। পানসিতে ওঠো। এই পানসি তোমাকে ওই জলযানে নিয়ে যাবে।’

‘মা—।’ বলে ভবানীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল সত্যবতী। ভবানী সত্যবর্তীকে একেবারে বুকের কাছে টেনে নিল। ভবানীর মন বলে উঠল—‘ভবানী, সত্যবতীর সঙ্গে এই তোমার শেষ দেখা।’ পাড়াপড়শির মধ্যে কী রকম এক করুণ গুঞ্জন উঠল। সিন্ধুচরণকে প্রণাম করে পানসিতে বাঁ পা রাখল সত্যবতী।

ভীষ্ম হস্তিনাপুরে উপস্থিত হলেন। রাজপ্রাসাদে। রাজার প্রকোষ্টে। সুবর্ণপুর থেকে হস্তিনাপুর অনেকটা দূরের পথ। পথশ্রান্তি ভীষ্মের চোখে-মুখে। শ্রান্তিকে ছাপিয়ে ভীষ্মের অবয়বে আনন্দ উঁকি দিচ্ছে। সফলতার আনন্দ। বিপুল ব্যক্তিগত ক্ষতির বিনিময়ে হলেও বাবার প্রার্থিত নারীকে রাজধানীতে পিতার কাছে নিয়ে আসতে পেরেছেন ভীষ্ম। রাজান্তপুরে মা সত্যবতী অবস্থান করছে। তার সঙ্গ পাওয়ার পথে আর কোনো বাধা রইল না বাবার সামনে।

রাজা শান্তনুকে দেবব্রতের সুবর্ণপুর যাত্রার কথা না জানানোর কথা বলে গেলেও দুদিনের মধ্যে জেনে গিয়েছিলেন মহারাজা। মহামন্ত্রী রৈভ্যই জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন। ডেকে পাঠিয়েছিলেন মহারাজা রৈভ্যকে। ভূমিকা ছাড়া জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘দেবব্রতকে দুদিন ধরে দেখছি না। সে কোথায়?’

 বেশির ভাগ সময়ই রাজা আনমনা থাকেন। কে কোথায়, কী করছে? রাজ্য কিভাবে চলছে—এসবের ধারধারেন না রাজা। রৈভ্য ভেবেছিলেন, রাজার এই উদাসীনতা তাঁকে মিথ্যা বলা থেকে বাঁচিয়ে দিল। কিন্তু তা হলো না। রাজা জিজ্ঞেস করলেন—দেবব্রত কোথায়? মহামন্ত্রী রৈভ্য লুকোচুপিতে গেলেন না। একবিন্দু না লুকিয়ে আদ্যোপান্ত সব খুলে বললেন, রাজা শান্তনুকে।

শান্তনু উদ্বিগ্ন হওয়া তো দূরের কথা; বরং সুখানুভূতিতে শিহরিত হলেন।

কী রকম নিরুদ্বেগ কণ্ঠে বললেন, ‘কবে ফিরবে, জানেন কিছু।’

বিস্মিত কণ্ঠে মহামন্ত্রী বললেন, ‘খুব শিগগির ফিরে আসবেন মহারাজা। মাননীয়া সত্যবতীসহ!’

  চলবে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা