kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ওলগা তোকারচুকের গল্প

হোটেল ক্যাপিটাল

অনুবাদ : ফাহমিদা দ্যুতি

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হোটেল ক্যাপিটাল

অঙ্কন : মাসুম

হোটেল ক্যাপিটাল শুধু বড়লোকদের জন্য। তাঁদের জন্য সেখানে আছে ইউনিফর্ম পরা কুলি, লম্বা ঠ্যাংওয়ালা পেছনে কাটা কোট পরা ওয়েটাররা, তাদের মুখে স্প্যানিশঘেঁষা উচ্চারণ। বড়লোকদের জন্য আছে চারপাশে আয়না লাগানো লিফট; আছে দরজার ব্রোঞ্জের হাতল, হাতলে আঙুলের ছাপ পড়তে দেওয়া হয় না; যুগোস্লাভিয়ার এক ছিমছাম নারীকর্মী দিনে দুবার পালিশ করে। লিফটের মধ্যে তাদের যাতে দম বন্ধ হওয়ার আতঙ্কে পেয়ে না বসে, সে জন্য আছে কার্পেট বিছানো সিঁড়ি। তাদের জন্য আছে বড় বড় সোফা, পুরু চাদরে ঢাকা বিছানা, বিছানায় থেকেই নাশতা করার সুযোগ, এয়ারকন্ডিশনিং ব্যবস্থা, তুষারের চেয়েও বেশি সাদা তোয়ালে, সুগন্ধি সাবান-শ্যাম্পু, খাঁটি ওক কাঠের তৈরি টয়লেট আসন, প্রতিদিন সকালে নতুন নতুন ম্যাগাজিন। তাঁদের জন্যই ঈশ্বর অ্যাঞ্জেলো অব সয়েলড লিনেন এবং জাপাতা অব স্পেশাল অর্ডার পয়দা করেছেন। তাঁদের জন্য সাদা ও গোলাপি পোশাকের পরিচারিকারা করিডর দিয়ে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে থাকে, আমি তাদেরই একজন। তবে ‘আমি’ কথাটা বলা মানে একটু বাড়িয়ে বলা হয়ে যায়; কেননা ওই সময় আমার ব্যক্তিত্বের মধ্যে আমার নিজের কিছু থাকে না। যখন করিডরের শেষ মাথায় সার্ভিসরুমে আমি দাগটানা অ্যাপ্রোন পরি, তখন আমার নিজের স্বরূপ আমার অবয়ব থেকে ঝেড়ে ফেলি : আমার শরীরের গন্ধ, আমার প্রিয় কানের দুল, আমার ওয়ারপেইন্ট মেকআপ, হাই হিলড জুতা—এগুলো খুলে ফেলি। এগুলোর মতো আমার নিজস্ব ভাষা, আমার অদ্ভুত নামটা, আমার রসবোধ, আমার মুখের রেখা, এখানে কারো কাছে বোধগম্য না হলেও আমার নিজস্ব খাবারের রুচি, ছোটখাটো ঘটনার স্মৃতি—সব ঝেড়ে ফেলি। আর কোনো পোশাক ছাড়াই আমি এই গোলাপি আর সাদা ইউনিফর্মে যখন দাঁড়াই, মনে হয় আমি সমুদ্রের কুয়াশার ভেতর থেকে উঠে আসছি। আর এই মুহূর্ত থেকেই হোটেলের তৃতীয় তলার পুরোটাই আমার, সপ্তাহের ছুটির দিনে এ রকমই।

আমি এখানে কাজ করা শুরু করি সকাল ৮টায়। আমার কাজের মধ্যে কোনো রকম তাড়াহুড়া করার দরকার হয় না। কারণ ৮টার সময় সব বড়লোকই ঘুমিয়ে থাকেন। হোটেল তাঁদের আদর করে বুকে জড়িয়ে রাখে, মৃদু দোলা দেয় যেন হোটেলটা পৃথিবীর গভীরে বিরাট খোলসে ঢাকা একটা ঝিনুক, আর বড়লোকেরা তার খোলসের ভেতরে রাখা অমূল্য মুক্তোর দানা। অনেক দূরে গাড়িঘোড়া জেগে ওঠে। পাতাল রেলের ঝাঁকুনিতে ওপরের ঘাসের ডগায় মৃদু কাঁপন তোলে। হোটেলের ভেতরের উঠোনে ঠাণ্ডা ছায়া লেগে থাকে।

আমি পেছনের দরজা দিয়ে হোটেলে ঢুকি। ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পরিচ্ছন্ন করার বিভিন্ন জিনিসের মেশানো একটা গন্ধ পাই। সদ্য লন্ড্রি করা লিনেনের গন্ধ, লোকজনের অতিরিক্ত মাত্রার আনাগোনায় দেয়ালগুলো যেন ঘেমে ওঠে। আমার সামনে ছোট অপরিসর লিফটটা এসে দাঁড়ায়, হুকুম পালনের অপেক্ষায় প্রস্তুত। আমি পঞ্চমতলার বাটনে টিপ দিই। সারা দিনের কাজ বুঝে নেওয়ার জন্য আমার তত্ত্বাবধায়ক মিস ল্যাংগের রুমের দিকে যেতে থাকি। সব সময়ই লিফট যখন তৃতীয় ও চতুর্থ তলার মাঝে আসে, এক রকম আতঙ্ক পেয়ে বসে আমাকে; লিফট যদি থেমে যায় তাহলে আমাকে এখানেই পড়ে থাকতে হবে চিরতরে। হোটেল ক্যাপিটালের শরীরের ভেতর ব্যাকটেরিয়ার মতো আটকে থাকতে হবে। আর হোটেল জেগে ওঠার সঙ্গেই কাজকর্ম শুরু হয়ে যাবে, ধীরে ধীরে আমাকে পেটের মধ্যে হজম করতে থাকবে হোটেল। আমার চিন্তাচেতনা থেকে শুরু করে আমার অবশিষ্ট সব কিছুই নিজের ভেতর শুষে নেবে। আমি নীরবে বিলীন হয়ে যাওয়ার আগেই হোটেল আমাকে খেয়ে নেবে। তবে শেষ পর্যন্ত লিফটটা দয়াপরবশ হয়ে ঠিক জায়গায় নেমে পড়ার সুযোগ দেয়।

নাকের ডগায় চশমা ঠিকমতো বসিয়ে মিস ল্যাং তাঁর ডেস্কে বসে থাকেন। তাঁকে দেখে মনে হয়, তিনি সব পরিচারিকার রানি, আটতলার সব রুমের বাসিন্দা তিনি একাই, শত শত বিছানার চাদর আর বালিশের কাভার বিতরণকারী তিনি, কার্পেট ও লিফটের প্রাসাদ সরকার, সব ঝাড়ু আর ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের সহচরীকে দেখতে এমনই হওয়ার কথা। চশমার পেছন থেকে তিনি আমার দিকে তাকান, একটা কার্ড বের করেন; কার্ডটা বিশেষভাবে আমার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। ওপরে-নিচে দাগ টেনে কার্ডের ওপরে তৃতীয়তলার পুরোটারই পরিকল্পনা আঁকা আছে, সব রুমের মর্যাদা পর্যন্ত ইঙ্গিত করা আছে কার্ডে। হোটেলের মেহমানদের দেখাশোনা করেন না মিস ল্যাং। হয়তো তিনি মনে করেন, মেহমানদের দেখাশোনার কাজ ওপরমহলের। মিস ল্যাংগের চেয়ে উচ্চ পর্যায়ের মর্যাদাসম্পন্ন কারো কথা কল্পনা করাও তো কঠিন।

 তাঁর কাছে হোটেলটা মনে হয় একটা নিখুঁত কাঠামো। হতে পারে নিষ্ক্রিয়, তবে একটা জীবন্ত কাঠামো। আর সেই কাঠামোটিরই যত্ন নিতে হয় আমাদের। নিশ্চিতই লোকজন এই হোটেল থেকে, হোটেলের মাধ্যমে কতখানে যাওয়া-আসা করেন, হোটেলের পিতলের স্তনাগ্র থেকে পানি পান করেন। তবে তাঁরা চলে যান; হোটেলটা এবং আমরা থেকে যাই। সে জন্যই মিস ল্যাং আমার কাছে রুমগুলোর এমন বর্ণনা দেন যেন এগুলো একেকটা আস্তানা। তবে তিনি রুমগুলোর বর্ণনা করেন পরোক্ষ ক্রিয়াপদের ব্যবহারে, যেমন লোকজনের দ্বারা দখল হয়ে আছে কিংবা কয়েক দিনের জন্য ময়লা হয়ে আছে। এ রকম বর্ণনা দেওয়ার সময় তিনি আমার পোশাকের দিকে, তড়িঘড়ি করে নেওয়া মেকআপের দিকে অসন্তুষ্টি নিয়ে তাকান। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মিস ল্যাংগের সুন্দর এবং কিছুটা ভিক্টরীয় যুগের হাতের লেখা কার্ড নিয়ে আমি করিডর ধরে হাঁটা শুরু করে দিই। কিভাবে আমার সর্বশক্তি নিয়োগ করে কাজ করতে পারি, তার পরিকল্পনা লেখা আছে কার্ডে।

ওই সময়ই আমি হোটেলের ডমেস্টিক এলাকা থেকে গেস্টস কোয়ার্টার্সে প্রবেশ করি। ওই এলাকার সুগন্ধি টের পেয়ে আমি বুঝতে পারি, কোথায় এসে গেছি। শুধু মাথাটা উঁচু করলেই বুঝতে পারি। কোনো সময় আমার অনুমান একেবারে মিলে যায়, দশে দশ পেয়ে যাই : এই গন্ধটা আরমানির কিংবা এটা পুরুষদের লাগারফেল্ড কিংবা নেশা ধরানো রুচিসম্মত বুচারোন। ভোগ ম্যাগাজিনের ফ্রি স্যাম্পল দেখে আমি এসব সুগন্ধি চেনা শিখেছি। ম্যাগাজিনে দেওয়া কনটেইনারগুলোও আমার চেনা। পাউডার, অ্যান্টি-রিঙ্কল ক্রিম, সিল্ক, চকোলেট স্কিন, বিছানায় ছলকে পড়া কাম্পারি, সূক্ষ্ম শ্যামাঙ্গীর ক্যাপ্রিস সিগারেট—এসবের গন্ধও আমি চিনতে পারি। আমার কাছে এসব গন্ধ মানে তৃতীয়তলার গন্ধ। কিংবা বলা যায়, তৃতীয়তলার পুরোপুরি নয়, তবে বিশেষ সুগন্ধের প্রথম স্তর মাত্র। পোশাক বদলানোর রুমের দিকে যেতে যেতে এ গন্ধটাই আমি তাত্ক্ষণিকভাবে টের পাই, লোকে যেমন পুরনো কোনো বন্ধুকে হঠাৎ করে চিনে ফেলে।

পোশাক বদলের রুমে একটা বিশেষ রূপান্তর ঘটে। গোলাপি ও সাদা পোশাক পরে বুঝতে পারি, আমি করিডরটাকে ভিন্ন চোখে দেখছি। আমি আর সুগন্ধ টের পাই না। দরজার পিতলের হাতলে আমার ছায়া আমাকে আর টানে না। আমার নিজের পায়ের আওয়াজ শোনার জন্য আর কান পাতি না। আমি প্রধানত করিডরের পথে সংখ্যা লিখিত দরজাগুলোর আয়তাকার চেহারা দেখার আগ্রহ বোধ করি। এই আটটি আয়তাকার চেহারার প্রতিটির পেছনে আছে একটা করে রুম। চারকোনার এই গণিকাস্থানটুকু প্রতিবার কয়েক দিনের জন্য অন্য লোকের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেয়। চারটা রুমের জানালার মুখ রাস্তার দিকে; রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্কটিশ পোশাক পরা দাড়িওয়ালা এক লোক ব্যাগপাইপ বাজায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা