kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

যে জীবন ফুটবলের

মোজাফ্ফর হোসেন

১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



যে জীবন ফুটবলের

অঙ্কন : মাসুম

ফুটবল বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে কবে, ফের কবে শুরু হবে—এসবের খোঁজখবর এ পাড়ায় আসে না। উঠতি বয়সের ছেলেরা, যারা নানা কারণে বয়স হওয়ার আগেই উঠতি বলে চিহ্নিত হয়েছে, কিছু একটা পেলেই তাদের মেতে ওঠা স্বভাব। যেমন—ফুটবল যে ফুটবল ছাড়াই খেলা যায় সেটা এদের চেয়ে আর কেউ বেশি বোঝে না। লাথি মারার কিছু একটা পেলেই তারা ছাড়ে না। ফাটাছেঁড়া বল, কাপড়ের পুঁটলি, ময়লার জটলা, এমনকি পাথরের মতো শক্ত কোনো বস্তুতে এত তৃপ্তি করে লাথি মারে—সকাল-সন্ধ্যা মনে হয় যেন জগেক লাথি মারার জন্যই এদের জন্ম হয়েছে; অথচ এরা কেউ চিহ্নিত ফুটবলার নয়। এরা যে গোল গোল খেলে, সেটা ফুটবল বলে স্বীকৃতি দেয় না কেউ। যে দু-একজন ছেলের বাপ আছেন, কাজ থেকে ঘরে ফিরে মায়ের কাছে যদি জানতে চান ছেলে কোথায়, যদিও তাঁরা কালেভদ্রে সেটা জানতে চান, অনেক সময় উত্তরের জন্য অপেক্ষাও করেন না; অপেক্ষা যেদিন করেন, সেদিন আবার বউয়ের কাছ থেকে কোনো উত্তর আসে না, যেদিন অপেক্ষা করেন না সেদিন হয়তো বউটা মুখ ফসকে বলে ফেলে, ‘ওই অপয়ার খোঁজ কে রাখে! দেখো গে কারো পোঁদে কাঠি দিচ্ছে!’ ফলে ফুটবল খেলার বিষয়টি এভাবে অতি তাচ্ছিল্যে চাপা পড়ে যায়। মজিদ যখন বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায় রাতের কোনো একসময় এবং ওর বাপ যদি কোনো দিন জিজ্ঞেস করে বসেন, ‘ওই মাগির পুত, কই ছিলি?’ মজিদ তখন বলে, বেশির ভাগ দিনই কিছুই বলে না, যেদিন বলে সেদিন খুব বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয়।  মজিদ নিজেও স্বীকার করে না যে সে ফুটবল খেলছিল। এ নিয়ে ওর বাপ আর দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করেন না, করলেও মজিদ না শুনে ঘরে ওঠে কিংবা ছুট দেয় অন্ধকারে। যেদিন ঘরে ওঠে, সেদিন মায়ের কাছে কোনো নালিশ জমা থাকলে শোনায়। বলে, ‘মরির মা বলল, তুই নাকি ওগো পেয়ারা চুরি করছস।’ ‘হ, মরির মারে...!’ মজিদ উত্তর দেয়। এতে সে পেয়ারা চুরি করেছে না করেনি, তা পরিষ্কার হয় না। মজিদের মা তখন বলেন, ‘ডাঁসা ডাঁসা পেয়ারা; আমাকে একটা দিতি পারতিক।’ মজিদ তখন আরো খেপে গিয়ে বলে, ‘মাগি পেয়ারা চুরি করার জন্য চোর বলছে, বড় হই, একদিন ওরে দেখাবনে। আমারে চেনেনি।’ মজিদের কথায় ওর মায়ের প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। ছেলে বাপের মতো মিনমিনে হয়নি, বাঘের মতো তেজ পেয়েছে। এরপর মজিদের মা মনমরা হয়ে মজিদের বাপের কথা ভাবতে থাকে। আজও রাতে দুজন আসবে। ভুল করে সময়টা একই হয়ে গেছে। মজিদ যদি ছেলে না হয়ে মেয়ে হতো, তাহলে রাতটা ভাগাভাগি করতে পারত; কিন্তু ছেলে হয়ে অন্য রকম ভালো হয়েছে, এ রকম একটা তেজি ছেলে তার দরকার ছিল। মজিদের মা ভাবে।

আজ মজিদরা দুই দলে ভাগ হয়েছে। অন্যদিন কোনো দলটল থাকে না, গোল থাকে না, যে যার মতো লাথায়। কোনো গোলপোস্টের প্রয়োজন হয় না ওদের। আজ ওরা দুই দিকে চারটি ইট খাড়া করে গোল তৈরি করেছে। দুজন দাঁড়িয়েছে দুই দিকের গোলে। গোলকিপার নামেই, দুই দলে চারজন করে আছে, আটজনই একসঙ্গে বলের পেছনে দৌড়াচ্ছে। গোল আছে বটে; কিন্তু কেউ কোনো গোল করছে না, করলেও মনে রাখছে না। অথচ আজ যে দল হারবে, তাদের ৪০ টাকা দিতে হবে। জনপ্রতি ১০ টাকা। কিন্তু আজ ওরা বলটা পেয়েছে ভালো, পেটাতেই আরাম লাগছে। বাজারের বল না হলেও এবড়োখেবড়ো কিছু না। শক্ত, কিন্তু পাথর পেটানো পায়ে অত লাগছেও না। একটা চটের বস্তার মধ্যে পেঁচানো, ওরা বুদ্ধি করে কিছু ছেঁড়া ত্যানা ভরে নিয়েছে, তারপর এমন করে ঠাস দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধেছে যে ফুটবলের মতো গোল দেখাচ্ছে। ওরা খেলছে শহীদ বুদ্ধিজীবী করবস্থানের পেছনে।

ফুটবলের ভেতরের মূল বস্তুটা পেয়েছে প্রাচীরের ওপাশেই। বস্তার মধ্যে ছিল। লাল হয়ে ভিজে গেছে বস্তাটা। ওটা দেখেছিল মজিদই। কিন্তু বুদ্ধিটা দেয় মফে। তখন ওরা হাওয়ায় পা চালাচালি করছিল, অল্প অন্ধকারে মিছামিছি বল নিয়ে খেলার শিল্পটা ওদের রপ্ত আছে। এমন সময়ই তলপেট হালকা করতে গিয়ে বস্তাটা মজিদের চোখে পড়ে। মজিদ এমন করে তুলে ধরে যে গোল ফুটবলের মতো মনে হয়। ভেতরটা একবার দেখে নিয়ে মফে বলে, ‘হোক বাড়া, চল বল খেলি।’ আর কেউ দ্বিতীয়বার ভাবেনি। পাশেই গার্মেন্টের ফেলে দেওয়া কিছু ছিট পড়ে ছিল পেঁচিয়ে, অর্ধেকটা বেরিয়ে অর্ধেকটা মাটির মধ্যে পুঁতে, ওরা টেনে তোলে, বস্তার ভেতরে ঠেসে দিয়ে বাঁধে। সেই থেকে লাথাচ্ছে।

ওরা আটজন বাদে আরো তিনজন আছে, দর্শকসারিতে থাকলেও মন তাদের খেলাতে নেয়। চোখ সেঁটে আছে বলে। প্রত্যাখ্যাত হয়ে ভাবছে, এ রকম একটি বল পেলে ওরাও একদিন দেখিয়ে দেবে। ওদের তিনজনের মধ্যে সাদেক আর তোফা দুই ভাই। পিঠাপিঠি না যমজ কেউ বলতে পারে না। বস্তিতে তাদের বাবা আছে, মা থাকলে বলতে পারত। আর আছে বয়স্ক দাদি। এত বয়স্ক যে প্রতি রাতেই মনে হয় আজ তাঁর শেষ রাত; কিন্তু কোনো রাতই তাঁর শেষ রাত হয় না। সাদেক আর তোফা ধরে নিয়েছে তাদের দাদি আর কোনো দিনই মরবে না, আর দাদির মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ওদের খাওয়াদাওয়া, থাকার, ঘুমানোর অসুবিধা থেকেই যাবে। মজিদরা যখন খেলছিল তখন তোফার মনে অকারণেই ওর দাদির কথা মনে ভাসছিল। ভাবছিল, আজ রাতেও বুড়ি মরার মতো কাশবে, ওর এপাশ-ওপাশ করে নির্ঘুম রাতটা যাবে। একটা শান্তিময় ঘুমের খিদে ওদের পেটের খিদের চেয়ে কম জ্বালাতন করে না।

মজিদরা যখন খেলা শেষ করবে করবে করেও খেলা চালিয়ে যায়, তখনই নিউজবাংলা টেলিভিশন দেখতে থাকা দর্শকরা জানতে পারেন, বুড়িগঙ্গার নর্দমায় একটা লাশ পাওয়া গেছে। মাথা না থাকার কারণে তখনো লাশটি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ী অপহরণ হয়েছে দিনপাঁচেক হলো, পরিবার মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে পারেনি, তার লাশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিখোঁজ আছেন সাভারের এক স্কুলমাস্টার, বখাটের হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দেননি বলে নিখোঁজ হয়েছেন তিনি, এটাও বাসি খবর, মাথাবিহীন লাশটা তাঁরও হতে পারে। আর ঢাকার বাইরের হলে সম্ভাবনা আরো বাড়ে। বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতা নিখোঁজ আছেন বরিশালে, চট্টগ্রামে এক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, খুলনায় এক ডাক্তার। মাথাবিহীন লাশটি এঁদের যেকোনো একজনের হতে পারে কিংবা এর বাইরের কেউ, যার খবর এখনো মিডিয়া জানে না অথবা জেনেও মনে রাখা উচিত মনে করেনি।

যাঁরা নিউজ অলটাইম দেখছিলেন, তাঁরা জানতে পারেন অন্য একটি লাশের খবর। সেটিও ভেসে উঠেছে, তবে নর্দমায় নয়, নদীতে। যমুনা এখনো নর্দমা হতে বাকি। তবে এই দেহটি নারীর। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো বাসে ধর্ষণ করে মাথাটা কেটে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। মাথাটা এখনো যেহেতু পাওয়া যায়নি, সেহেতু লাশের পরিচয় নির্ণয় করা এখনই সম্ভব নয়। এরই মধ্যে চারটি মেয়ের নিখোঁজ সংবাদ জানাচ্ছে মিডিয়া। এর মধ্যে দুটি মেয়ের, একটির বাড়ি কুষ্টিয়া, অন্যটির নাটোর, সেদিন রাতে ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে বাড়ি ফিরছিল। একটা চাকরি করে গার্মেন্টে, অন্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী। আর দুজন নিখোঁজ আছে অন্য এলাকার, একজন কুমিল্লার, অন্যজন হবিগঞ্জ। যে মেয়েটির শরীর পাওয়া গেছে, সঙ্গে কোনো মাথা পাওয়া যায়নি, মৃত শরীরটা এই চারজনের একজন হতে পারে। মাথাবিহীন নগ্ন পুরুষের শরীর পরিবার যত সহজে চিনে নিতে পারে, তত সহজে মাথাবিহীন নারীর নগ্ন শরীর চিনে নিতে পারে না। মাথাবিহীন নারীর নগ্ন শরীর পরিবারের কাছে খুবই অচেনা। মাথাবিহীন নগ্ন নারী লাশের পিতাও শতভাগ নিশ্চিত হয়ে পিতৃত্বের দাবি জানাতে পারেন না। প্রাপ্তবয়স্ক মৃত কন্যার নগ্ন শরীরের দিকে তাকানো কতটা নির্দোষ আমরা বলতে পারব না। এ লাশটিও আপাতত অনির্ণীত থেকে যায়। দুটি লাশ অপেক্ষা করে মর্গে, নিখোঁজদের পরিবার অপেক্ষা করে দুটি মাথার।

ছেলেরা যখন বলটি আর চোখে দেখতে পায় না, অন্ধকারে মিলিয়ে যায় থেকে থেকে, তখনই খেলা ছাড়ে। ওরা এতক্ষণে টের পায় খিদে লেগেছে। ঘরে ফিরতে হবে। কিন্তু বলটির কথা ওদের মনে হয়। সাদেক আর তোফা তখনো দাঁড়িয়ে বলটির শেষ ঠিকানা দেখার জন্য। ওরা কোনো একটি মুহূর্তের জন্য এমন একটি বলের মালিক হতে চায়। কিন্তু মজিদ বয়সে ছোট হলেও বুদ্ধিতে পাকা। ও জানে, এ বল সংগ্রহ করার মতো নয়। রাতের অন্ধকারেই ওদের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে হবে। মজিদ বলটা হাতে তোলে, একটু হাঁটলেই একটা প্রবহমান ড্রেন বুড়িগঙ্গার পথে কিন্তু বুড়িগঙ্গার মতো নিশ্চল নয়।

সাদেক আর তোফা হতাশ হয়ে ফিরে আসে। তৃতীয় ছেলেটাও আসে। ওর কোনো নাম নেই, কারণ ও বোবা, কানে শোনে না। ফলে ইশারা করে ডাকতে হয়। সাদেক আর তোফার সঙ্গে সব সময় থাকে।

ওরা ফিরে যায়। সারা দিন আয়-রোজগারের জন্য এটাসেটা করা, তারপর সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত একটা বলের পেছনে ছোটাছুটি করে ক্লান্ত হয়ে কেউ কেউ হয়তো ঘুমিয়েও পড়ে। ঘুম থেকে উঠে কিংবা অন্য কোনো দিন এমন কোনো বল পাবে কি না এ নিয়ে ওরা চিন্তা করে না। ওদের চিন্তা পেট নিয়ে, জগতের আর কোনো কিছু নিয়ে ওদের চিন্তা করার দায় নেই।

কিন্তু ঘুমাতে পারে না সাদেক আর তোফা। একেই তো দাদির সেই পুরনো কাশির শব্দ, একটু পর পর ‘হামাক বাঁচা, হামাক বাঁচা’ বলে চিত্কার করে কেঁদে ওঠা, তাঁর সঙ্গে আজ যুক্ত হয়েছে একটা বল নিয়ে মজিদের দেখিয়ে দেখিয়ে খেলার জেদ। যেভাবে আজ ওরা ওদের দেখিয়ে দেখিয়ে খেলেছে, সেভাবে ওরা একদিন সকাল-সন্ধ্যা খেলতে চায়। ঘুম না আসা আর অন্যদিকে দাদির বেদম কাশি শুনে বুদ্ধি একটা ওদের মাথায় খেলে। বুদ্ধিটা প্রথমে আসে সাদেকের মাথায়, এরপর আসে তোফার মাথায়। ওরা কেউ কাউকে কিছু বলে না, একই সময় একই বুদ্ধি দুজনার মাথায় আসার বিষয়টি ওদের জন্য নতুন না।

ফজরের আজানের পর আকাশটা একটু ফরসা হতেই ওরা দৌড় মারে, যে ছেলেটির নাম নেই, নাম ধরে ডাকলে শোনে না, তাকে বিছানা থেকে গুঁতিয়ে তোলে, দুই ভাইয়ের তখন চিত্কার করে বলতে ইচ্ছা করে—আজ সারা দিন ওরা খেলবে; কিন্তু তাতে কোনো লাভ হবে না, যে শোনার সে বোঝে ইশারা, তোফা উল্টাপাল্টা কী ইশারা করে, অর্ধঘুমের মধ্যেই ছেলেটি ধরে ফেলে। ওরা তিনজনে দৌড় দেয় শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পেছনে। তিনজনে কিভাবে দুই দল হওয়া যায় ওরা বোঝে না, ওরা শুধু বোঝে—কোনো দিকে গোল না থাকলেও, সমানে সমানে বিভক্ত না হয়েও লাথি মারার জন্য গোলগাল কিছু একটা থাকলেই ভালো ফুটবল খেলা যায়।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা