kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে

আজাদুর রহমান

১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে

অঙ্কন : প্রসূন হালদার

আমৃত্যু লালন ছেঁউড়িয়ায়ই ছিলেন। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর, ১১৬ বছর বয়সে তিনি আখড়ায়ই মারা যান। বাংলা মাসে দিনটি ছিল ১ কার্তিক। সেই ধারা মেনেই এ বছর পহেলা কার্তিক—মানে ১৭ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাচ্ছে তিন দিন-তিন রাতের স্মরণোত্সব। প্রয়াণ দিবস হলে কী হবে! সংখ্যাতীত ভক্ত-অনুরাগী, আউল-বাউলের পদচারণে তা ক্রমেই মচ্ছবে পরিণত হয়। একতারা, দোতারা, ঢোলখোল, হারমনি, বাঁশি, জোয়ারি, চাকতি, খমক হাতে একের পর এক মজমা জমান বাউলরা। ভাবজগতের চৈতন্যে বেজে ওঠে—তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে। গান থামে না। টানা কয়েক দিন মজে থাকে লালনবাড়ি। প্রথম দিনের মধ্যরাতেই দেওয়া হয় সাধুসেবা—খিচুড়ির সঙ্গে সবজি। সকালে বাল্যসেবা, মানে পায়েস, ক্ষীর ইত্যাদি। দুপুরে পূর্ণসেবা—ভাত, মাছ ভাজা, সবজি, ডাল আর দই। সাধুসেবার পাশাপাশি সুবিধাজনক সময়ে চলতে থাকে দীক্ষাগ্রহণ পর্ব।

কত কিসিমের সাধু-বাউল যে আছেন, না দেখলে বোঝার উপায় নেই! সাধুর এ বাজারেই পাওয়া যায় বাউলিয়ানার সরেজমিনে আচারনিষ্ঠা এবং সাধনভজনের স্বরূপবৃত্তান্ত। একেক বাউল একেকভাবে কথা তোলেন, তাঁদের ভাবভঙ্গিও অন্য রকম। গভীর কথাগুলো তাঁরা এমন সহজ গলায় বলে যেতে থাকেন যে সেসব টুকরো কথাবার্তাগুলো সাজিয়ে-গুছিয়ে তোলা যায় না; বরং যখন যা পারা যায় লিখে নিতে হয় হাবিজাবি কাগজে। ফকির শরাফউদ্দিন শাহর কথাই ধরা যাক। কুমারখালীর নন্দলালপুরের এই সাধু মর্জিমাফিক কথা বলেন। বলতে বলতে কথার খেই হারিয়ে ফেলেন এবং হঠাত্ করেই লালনে নেমে আসেন—‘উনি হলো সেই, মানুষরূপে এসে অবতার করলেন। সেই মানে সেই রাজ, তাঁকে সামনে রেখে সে জ্ঞানের রাজা। সিরাজ সাঁই বলে কোনো লালন নাই। লালনের জন্ম নাই, উনি ভিন্ন মানুষ। এখন একেকটা মানুষ একেকটা মন্তব্য করছে। বহু কিছু বিভ্রান্তি করছে। এসব কথা বলতে গেলে ছোট জ্ঞানে আমাদের কষ্ট হয়। আমার আব্বায় ক’ছে—সাঁইজির আইনডা যেন ভ্যারাইটিজ না হয়’—এ পর্যন্ত বলার পর শরাফ প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে ফেলেন—লালন বলেছেন, ‘মা জননী নিষ্ঠুর হলে, কে বোঝে শিশুর যাতনা।’ ওরা তো নিষ্ঠুর, নিষ্ঠুর না হলে তো আমাকে উদ্ধার করত। যৌবনকালে যদি উদ্ধার করতে না পারল, তবে তো উদ্ধার হয় না। হাসন রাজা এমন এক অপরাধ করলেন,  নারী নিয়ে অপরাধ। নারী নিয়ে অপরাধ করতে করতে নারী দিয়েই তিনি লাভবান হলেন। অর্থাত্ যে বস্তু নিয়ে অপরাধ করলেন, সেই বস্তু দিয়েই ফিনিশিং দিলেন। লালন শাহ্ কী বললেন জানেন? যাতে খাইলি তাতেই ম’লি। যে দুধ খেয়ে বড় হলাম, সেইতেই তো মলাম। ও আমারে একসময় উদ্ধার করছে, আবার যৌবনকালে দেখাতে আইছে—তুমি আমাকে চিনো কি না? চিনতে গিয়ে কেউ মারা যাচ্ছে, কেউ বাঁইচা আইছে। শরাফ থামেন না—শোনেন, প্রেম হলো দুই প্রকার—একটা নিহেতু প্রেম, আরেকটা হেতু প্রেম। হেতু প্রেমে সে মারা যাবে আবার নিহেতু প্রেমে মানুষ বাঁইচে যাবে। মানে উদ্ধার হবে। এক প্রেমে মানুষ মারা যাচ্ছে, আরেক প্রেমে মানুষ উদ্ধার হচ্ছে।

কথা বলতে বলতে আমরা চা খেয়ে নিই। চা খেয়ে নিজকে মনে হয় সামান্য জিরিয়ে নিল সরাফ উদ্দিন, তারপর ভেজা গলায় ফের শুরু করলেন—পথ হলো দুটো। এক. সে যা করায়; আমি তা-ই করি। দুই. আমি যা করি, সে তা-ই করায়। সে যা করায় আমি তা-ই করি মানে হলো আমাকে যেদিন নেবে আমি যাব। আর আমি যা করি সে তা-ই করায় মানে—চোরেরও করায়, বাটপারেরও করায়। আবার যে মিথ্যা কথা কয়, তারি (তারই) সত্যি কথার দরকার আর যে লোক মিথ্যা কথা বলে না, তাঁর সত্যি কথার দরকার নাই। যে তেজের ঘরে তেজিয়ান সে-ই পারে। লালন একেক জায়গায় একেক পদ দিয়েছে, বোঝাটা বড় কঠিন হয়া যাচ্ছে। একেক সময় একেক ভাব আছে। সকালের এক ভাব। দুপুরে এক ভাব। বিকেলে এক আর রাতে আরেক ভাব। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাঁচ রকমের ভাব এবং ভুবন আছে। আবার নামের  পেছনে কাম আছে। জ্ঞান হলো রাখাল আর মন মানে গরু; ও খালি খেতে চায়। ধরাধামে ধরা খেলে মুখের কথায় কি চিঁড়ে ভেজে! আপনার জন্মের পর আপনার সঙ্গে ১৮ জন চিজ ছিল। ১৪ জন পলাইছে। যেই সাবালক হলেন ১৪ জন পালাল, এখন চারজন আছে। চারজন মানে আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস। সঙ্গে আছে। বাতাস ফেল করলে, বাকি তিনজনের আর কাজ থাকে না। তখন তিনজনে বসে হাসে। বলে, তোর জন্য আমরা এত খাটি! আপনি আমি নিজ গুণে গুণ টানি। আর মহাজনেরা আমাদের মতো নয়, তাঁরা বাতাস ছাড়া নৌকা ছাড়েন না, তাঁরা ধনী...শরাফ লাগাতার বলে যেতে থাকেন। আমি কথার মধ্যে কথা ঢুকাই না; বরং নিরিবিলিতে শুনতে থাকি শুধু।

পিতা গফুর শাহ আমার গুরু। ধরেন, আমার বাবা যে পথে আমাকে নিয়ে গেছেন, এখন মানুষের সঙ্গে চলা কঠিন। আল্লাহ বলেছেন, আমি ধরা দিই, ধরা নিই। আবার দেখেন, যে মাস্টার সে-ই ছাত্র। ছাত্র মাস্টার হবে, মাস্টার ছাত্র হবে। আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে মানুষকে ভালোবাসতে হবে। তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবাসতে হবে। দুনিয়াটা হলো বাজার। লাখোজনের মধ্যে একজন সাধক থাকেন। আমি তো এ পথে আসতে নিষেধ করি। বাউল জবটা খুব পানিশমেন্ট জব। আমি যে সাজগোজ নিয়ে চলি, তাতে কারো সঙ্গে কথা বলতে গেলে মাপকাঠি দিয়ে কথা বলতে হয়। যেহেতু জ্ঞানীর সাজ নিয়েছি, জ্ঞানী হতে চাচ্ছি, তাহলে রাস্তায় চলার সময় মূর্খকে আগে সাইড দিতে হবে। কারণ সে সাইড দেবে না, সে তো জানে না। আমি জানি তাই আমাকেই আগে সাইড দিতে হবে; কিন্তু আমরা কেউ সাইড দিতে চাচ্ছি না...।

পাবনার ফকির ইয়াকু শাহ শরাফ শাহর মতো লাইন বাই লাইন গুছিয়ে কথা বলেন না। তিনি নিজেকে নিয়েই মত্ত থাকেন। বদ হাওয়া লেগেছে খাঁচায়, কী হবে পরান পাখির! —এই যার ধ্যান-জ্ঞান, বাইরের এই জাত-জগত্ নিয়ে তাঁর ভাবনার সময় কোথায়! বাড়ি পাবনায় হলে কী হবে, লালন অন্তপ্রাণ ইয়াকুবের মন পড়ে থাকে ছেঁউড়িয়ার বারামখানায়। কোনো না কোনো ছুঁতো ধরে তিনি কুষ্টিয়ায় চলে আসেন। বারো মাসের মধ্যে গড়ে চার-পাঁচ মাস তিনি আখড়াবাড়িতেই থেকে যান। তবে উত্সবের কথা আলাদা। মচ্ছব শুরু হওয়ার দেড়-দুই মাস আগ থাকতেই ইয়াকুব মালসামানা সঙ্গে করে ছেঁউড়িয়ায় চলে আসেন। ইয়াকুবের পরিষ্কার কথা—‘মানুষের রূপ না দেখলে আমি থাকতে পারি না। এখানে এসে মানুষের রূপ দেখি। তাদের জন্য দোয়া করি।’ ঘোরাঘুরি শেষে লালন অডিটরিয়ামের পাকা মেঝের এক কোনায় ইয়াকুব একা একা শুয়ে থাকেন। সম্বল বলতে মশারি আর পুরনো কাঁথা-বালিশের সঙ্গে সামান্য টুকিটাকি জিনিসপত্র। বিছানার পাশেই বাউলদের মজমা চলে। গান চলে একটানা। গানের  পেছনে গান। মাঝে দুপুরে—খানিক বিরতি দেয় বটে। তারপর আবার। রাত এগারো-বারোটা পর্যন্ত চলতে থাকে সেই গান। গানে গানেই কেটে যায় সারা দিন। লালনের গান ইয়াকুবকে দিশাহারা করে দেয়। তিনি গানের তালে মাথা দোলাতে থাকেন—‘দেখ্না মন ঝাঁক মারিয়ে এই দুনিয়াদারি...’

এক বাউল গান ধরেছেন। ইয়াকুব ইশারা করেন। তারপর বয়স্ক আঙুল উঁচিয়ে বলেন, ওই যে একটা গান হচ্ছে—‘আমার ঘরখানায় কে বসত করে?’ প্রশ্ন করার পর নিজেই পাল্টা উত্তর দেন—‘বাবা, আল্লাহ্ বসত করে।’ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমি ফের প্রশ্ন করি—কে বসত করে? পাল্টা প্রশ্নে তাঁর মুখে এক চিলতে বিজ্ঞ হাসি খেলে যায়—‘কে আবার, আল্লাহ বসত করে। পাখিই আসল বস্তু বাবা, পাখি তো খায়। পাখিই সব করায়। পাখি আছে, আমি আছি। পাখি নাই, আমি নাই।’ বলতে বলতেই তিনি আফসোস করে ওঠেন—‘ও বাবা লালন তো বললেন, নবী না মানে যারা মোয়াহেদ কাফির তাঁরা—এই দুনিয়ায়। নবী না মানলে চলবে! যে যা করে করুক। নিজের পথ পরিষ্কার থাকলে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থাকলে, আমার লাভ। দুনিয়াটা কিসের ওপর চলতাছে বলতে পারব না। আল্লাহ জানেন। দুনিয়া তো বাবা কানার হাট-বাজার—লালন কয়ে গ্যালো, আমি কই নাই।’ ইয়াকুব আনমনে আরো কী সব গভীর কথা বুদবুদ করে বলে যেতে থাকেন। সেসব নিগূঢ় কথাবার্তা আমি ঠিক ধরতে পারি না। তাঁর দিকে হাসিমুখে চেয়ে থাকি। লালনের গান-বাজনা হলে তাঁর মনে খুব আনন্দ হয়। এখানে এসে তিনি লালন ফকিরের কাছে নালিশ করেন—‘বাবা লালন তুমি উকিল হয়া আল্লাহর কাছে নালিশ করো, আমার পাপ মুক্ত করো।’ ইয়াকুবের ধারণা, ধ্যান করলে এবং নিগূঢ় তত্ত্বযোগে কলব পরিষ্কার করলে তাঁকে (আল্লাহ) দেখা গেলেও যাইতে পারে।

কথার ফাঁকে তিনি আবার গানে মন দেন এবং আনন্দে হাসতে থাকেন। তালের সঙ্গে মাথা দুলিয়ে মন্তব্য করেন—‘কানটা এখনো পরিষ্কার আছে বাপ, দেলটা পরিষ্কার রাখতে হবে। চোখে কিছু কম দেখি। এত ঝামেলার মধ্যে কে যে মুক্তি পাবে বোঝাই তো মুশকিল! বলার পর নিজেই ব্যাখ্যা দেন—‘কে মুক্তি পাবে, না পাবে—সে একমাত্র আল্লাহ মালিক জানেন। লালন তো কয়াই গ্যালো—সত্য বল্, সুপথে চল্। লালন তো আল্লাহর বান্দা। সে-ও তো বলেনি যে তুমি মুক্তি পাবা।’ এরপর গলা নিচু করেন—‘আল্লাহ কে ধরা যাবে না, সে থাকে কোনা কানিচতে।’

আসলে ইয়াকুব নিজের মধ্যে এমন ভাবে মগ্ন হয়ে থাকেন যে কে কী প্রশ্ন করল—এসবে তাঁর মন লাগে না। তিনি নিজ মর্জিমতো কথা বলেন, নিজের ভাবগতি অনুযায়ী উত্তর দেন। তাঁর এলোমেলো কথাগুলো ঠিকঠাক ছকমতো গোছানো যায় না। বিসমিল্লাহ বলে চায়ে চুমুক দেন। তারপর কী মনে করে ব্যক্তিগত কথাগুলো বলেন, ‘দ্যাখেন ঘরে স্ত্রী ছিল, মারা গেছে। সে সময় আমি জুয়ান ছিলাম। বিয়ে করলে করতে পারতাম। করি নাই। এ পর্যন্ত বলে, নিজ থেকেই কথা এলোমেলো করে ফেলেন—‘আমার গুরু তুল্লাহ্ শাহ্ শিখিয়েছে, দিলে ময়লা থাকলে হবে না। এই পথে হাঁটতে হলে জিকির করতে হবে। দিল পরিষ্কার থাকলে আল্লাহকে দেখা যাবে। আমার নসিবে দেখা আছে কি না বাবা বলতে পারি না। পাখি যদি চলে যায় তখন আর কী থাকে বাবা! পাখি মানে স্বয়ং আল্লাহ, সে আছে, আমি আছি। বাবা, সে নাই, আমিও নাই। জমিজমা—ওসব দরকার নাই। আমি পাপমুক্তি চাই। এই দেহটাই তো ঘর, হাড়হাড্ডি, চামড়া—এগুলো হলো ঘরের ছাউনি। পায়ের ওপরে শূন্য, শূন্যর ওপরে খাঁচা। খাঁচার মধ্যেই সে বসে থাকে। ম্যালা ভুল হয়া যায় বাবা, কথা ঠিক থাকে না; ভুল হয় কী হয় না আল্লাহই জানে।’

...কথা শেষ করে লালন সমাধির পাশ দিয়ে ফিরে যাই। বাউল নাদিম শাহ্ দরাজ দিলে গান ধরেছেন, ‘রাত পোহালে পাখি বলে, দেরে খাই—দেরে খাই।...’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা