kalerkantho

বিদায় টনি মরিসন

দুলাল আল মনসুর   

৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিদায় টনি মরিসন

আমেরিকার সাহিত্যের দুজন মহান কথাসাহিত্যিকের নাম বলতে গেলে প্রথমেই উইলিয়াম ফকনার এবং টনি মরিসনের নাম আসে। তিনি ছোটগল্প, নাটক, শিশুসাহিত্য, সাহিত্য সমালোচনা এবং সর্বোপরি উপন্যাস লিখেছেন। মরিসন প্রধানত আফ্রিকান-আমেরিকানদের জীবনের চিত্র এঁকেছেন তাঁর উপন্যাসগুলোতে। তাদের সংস্কৃতি, তাদের ঐতিহ্য, অতীত ও বর্তমানের সম্পর্কের কথা বলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের জীবন সম্পর্কে তাঁর লেখা পুরোপুরিই অনন্য। চিরাচরিত পদ্ধতি পরিহার করেছেন সচেতনে। 

জন্ম ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১ সালে ওহাইওতে। ছোটবেলা থেকে গল্প-কাহিনি আর লোককথা শুনে বড় হয়েছেন মরিসন। বাড়ির বড়রা ছোটদের আফ্রিকান-আমেরিকান লোককাহিনি শোনাতেন। বিশেষ করে ভৌতিক গল্প শুনতে পছন্দ করতেন মরিসন। তাঁর দাদির কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার মতো বইপত্রও থাকত। পরিবারে অগ্রজদের অনেকেরই সংগীতের প্রতি নিবেদন ছিল।

টনি মরিসন ১৯৫৩ সালে হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক শেষ করার পর কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৫ সালে ইংরেজিতে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন। হওয়ার্ডে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের আগে দুই বছর টেক্সাস সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। ওখানে থাকতে একটা কথাসাহিত্যের কর্মশালায় অংশ নেন। নিজের লেখার নমুনা দেখানোর দরকার হলে একটি গল্প লিখে জমা দেন। সেই গল্পটিই পরে প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’ হয়ে যায়। 

মরিসনের অনন্য বর্ণনাভঙ্গির কারণে উপন্যাসের নিরপেক্ষ সর্বশেষ মূল্যায়ন অনেকটাই পাঠকের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। কাহিনির গণ্ডি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেন লেখক। কখনো কখনো সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী আংশিক বয়ানের দায়িত্ব নিলেও বেশির ভাগ আখ্যান তুলে ধরা হয় বিভিন্ন চরিত্রের বর্ণনায়। এভাবে বহু স্বরের সংমিশ্রণ ঘটান তাঁর উপন্যাসে। নারী, পুরুষ, শিশু—সব রকমের চরিত্রের নিজস্ব বয়ান সরাসরি হাজির করেন। অন্যদিকে কাহিনির ভেতরের সময়কে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করেন না। দৈনন্দিন জীবনের নানা অনুষঙ্গের পাশাপাশি পুরাণকথা, জাদুবিদ্যার কারসাজি, কুসংস্কার—এসবের অবস্থান খুব স্বাভাবিক এবং বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় উপস্থাপনাকৌশলের গুণে। তাঁর উপন্যাসকে প্রায়ই মার্কেসের উপন্যাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়। মরিসন নিজেও বলেছেন, তাঁর প্রিয় লেখকদের অন্যতম হলেন মার্কেস।   

মরিসনের উপন্যাসগুলোতে প্রথমত কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনের নানা বঞ্চনা আর নিগ্রহের কথা বলা হয়। শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় তাদের জীবন কতটা বঞ্চিত, তারা কোথায় কোথায় নির্যাতনের শিকার হয়েছে, হচ্ছে—এসব থাকেই। অন্যদিকে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা কতটা নিম্নতর জীবন যাপন করছে, সেটাও দেখানো হয়। কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা সব ধরনের পুরুষের দ্বারাই নির্যাতিত, বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা। মরিসনের প্রায় সব উপন্যাসেই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিশুরা, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ শিশুরা। এভাবেই সমাজের বিভিন্ন স্তরের নির্যাতন আর বঞ্চনার চিত্র পাওয়া যায় টনি মরিসনের উপন্যাসগুলোতে। তবে শুধু বঞ্চনা, কষ্ট, নির্যাতনই থাকে না তাঁর উপন্যাসে। প্রেমের প্রাণবন্ত উপস্থাপনাও আছে অনেক। তাঁর ‘গড হেল্প দ্য চাইল্ড’ উপন্যাসে ব্রাইড এবং বুকারের প্রেমের মধ্যে প্রাণবন্ত ও জোরালো জীবনীশক্তির প্রকাশ দেখা যায়।

টনি মরিসন ১৯৭০ সালে প্রকাশ করেন প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’। এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র এক কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরী পেকোলা। সৌন্দর্যের মানদণ্ডে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের কারণে সমাজে প্রচলিত আছে, নীল চোখ আর সাদা ত্বক হলো সুন্দরের প্রতীক। সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ এবং বিশ্বাসের প্রবাহে পেকোলাও প্রার্থনা করে, তার চোখ যেন নীল হয়ে যায়। উপন্যাসের বেশির ভাগ অংশ তুলে ধরা হয়েছে ক্লডিয়া ম্যাকটিয়ারের মতো একজন পার্শ্বচরিত্রের বয়ানে। পেকোলা ব্রিডলাভের জীবন মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে শেষ হয়ে যায়। এমন একটি চিত্র সরাসরি পেকোলার চোখে না দেখে অন্যদের চোখে দেখার মধ্যে এক ধরনের বিশ্লেষণী বিষয় কাজ করে। পাঠক নিজ বিচারে বুঝতে পারেন, সব ঘটনার নিরপেক্ষ অর্থ। নারীদের নিগ্রহ, শিশুদের ওপর নির্যাতন এবং সর্বোপরি কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর সমাজের প্রচলিত মূলবোধের চাপ কিভাবে ব্যক্তির জীবনকে ধ্বংস করে দেয়, এখানে সেটাই দেখিয়েছেন মরিসন। 

১৯৮৭ সালে প্রকাশ করেন তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস ‘বিলাভিড’। একজন আফ্রিকান আমেরিকান দাস নারীর সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈর করেন এই উপন্যাস। মার্গারেট গার্নার নামের এক ক্রীতদাস নারীর দাসত্ব থেকে পালিয়ে আসার ইতিহাস থেকে মরিসনের এই উপন্যাস লেখা হয়। পালিয়ে আসার পরও গার্নারকে দাস-প্রভুরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। সন্তানকে যাতে দাসত্বে ফিরে না যেতে হয়, সে জন্য সে তার দুই বছর বয়সী মেয়েকে মেরে ফেলে। আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে সফল হওয়ার আগেই গার্নার আবার ধরা পড়ে যায়। মরিসনের উপন্যাসে মৃত মেয়েটা অশরীরী আত্মা হিসেবে তার মা এবং পরিবারের অন্যদের কাছে ফিরে ফিরে আসে। 

মরিসনের সর্বশেষ উপন্যাসের নাম ‘গড হেল্প দ্য চাইল্ড’ প্রকাশ করেন ২০১৫ সালে। হালকা ত্বকের অধিকারী মা সুইটনেস তার মেয়ের জন্মের সময় মেয়ের দিকে তাকিয়ে চমকে যায়। তার মতে, তার মেয়ের কালো চেহারা মধ্যরাতের মতো, সুদানের লোকদের মতো কালো। মা হয়েও মেয়েকে নিজের হাতে ছুঁতে তার ঘৃণা বোধ হয়। মেয়ে লুলা অ্যান ইচ্ছা করে ছোটখাটো ভুলত্রুটি করে, যাতে মা তাকে নিজের হাতে মারে। এভাবে মায়ের হাতের ছোঁয়া পেতে চায় সে। বড় হয়ে লুলা অ্যান হয়ে যায় ব্রাইড, একজন সফল নারী। ব্রাইডের কাহিনির সমান্তরালে চলে এবং তার গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে যায় আরো কিছু ঘটনা, যেগুলোতে দেখা যায় শিশুদের ওপর বড়দের নির্মম নির্যাতন। এক মা তার শিশুকে দিয়ে যৌনতার বেসাতি করে। আরেকজন ভদ্রচেহারার লোক শিশু-কিশোরদের ওপর অত্যাচার করে এবং তাদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। উপন্যাসের শেষে ব্রাইড এবং তার প্রেমিক স্বামী তাদের অনাগত সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা ভাবে। 

মরিসনের অন্যান্য উপন্যাস হলো—‘সুলা’, ‘সং অব সলোমন’, ‘টার বেবি’, ‘জ্যাজ’ ‘প্যারাডাইস’, ‘লাভ’ এবং ‘হোম’। টনি মরিসন আমেরিকান বুক অ্যাওয়ার্ড এবং পুলিত্জার পুরস্কারসহ আরো অনেক সম্মানে ভূষিত হন। আমেরিকার সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯৬ সালে ন্যাশনাল বুক ফাউন্ডেশন তাঁকে সম্মাননা জানায়। ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম প্রদান করেন। ২০১৬ সালে পিইএন/সল বেলো অ্যাওয়ার্ড ফর অ্যাচিভমেন্ট ইন আমেরিকান ফিকশন পান তিনি। টনি মরিসন ১৯৯৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।

সারা বিশ্বের পাঠকদের বিষাদে ডুবিয়ে টনি মরিসন চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। গড হেল্প টনি মরিসন।

মন্তব্য