kalerkantho

ভিজিটিং কার্ড

শামীম আরা চৌধুরী

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



ভিজিটিং কার্ড

অঙ্কন : মাসুম

ড্রেনের পাশে কাঁচা রাস্তার ধার ঘেঁষে বিরাট বিরাট লাউয়ের মাচা দেখে মন আনন্দে নেচে ওঠে। মর্নিং ওয়াক করার সময় কখনো গাছের গোড়ায় খানিক পানি ঢেলে আসি। তর তর করে বেড়ে ওঠা আর শিশিরভেজা বড় বড় পাতায় মাচানভরা লাউগাছগুলো দেখলে বড্ড আদুরে মনে হয়। কিছু সময় দাঁড়িয়ে দেখি, লাউ ডগাগুলো মাচানের ওপর থেকে কেমন মুখ তুলে তাকিয়ে দেখছে পথিকের চলাচল।

খালা ঘুরে ঘুরে গাছের সেবা করে যাচ্ছে। ছাই ঢেলে পোকা তাড়াতে যারপরনাই ব্যস্ত। মশারির জাল বিছিয়ে বেড়া করে ঘিরে রেখেছে। মানুষের নজর থেকে বাঁচার জন্য মাটির পাতিল উপুড় করে কালো আর সাদা দিয়ে ভূতের মুখ এঁকে ঝুলিয়েছে। এটাকে নাকি কাকতাড়ুয়া বলে। মাকেও দেখেছি বাঁশের লাঠির মাথায় অমন কাকতাড়ুয়া ঝুলিয়ে রাখতে। গাছপাগল। প্রকৃতিপাগল।

আমারও পাগল পাগল অবস্থা। বাজার থেকে লাউ-কুমড়ার বীজ কিনে খালার মাচানের কাছাকাছি সোঁদা মাটি দেখে পুঁতে দিই। টুকরা লাঠি জোগাড় করি। গাছের ডাল খুঁজতে থাকি। বীজগুলোকে নিরাপদ রাখাই এখন প্রথম কাজ। হাঁটার নেশা বেড়ে যায়। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ-কালাম শেষ করেই ছুটি দেখতে। আশপাশের বাসিন্দাদের পানির ট্যাংক থেকে মগ-বোতল ভরে পানি নিয়ে ওদের গায়ে ঢালি। মাটি আলগা করি। কিছুদিনের ভেতরেই চারাগুলো মুখ দেখাতে শুরু করে। কচি চারাগুলো দেখে দেবশিশুর মতো মনে হতে থাকে। নিচ থেকে নরম মাটি তুলে চারাগুলোর গোড়া ভরাট করে দিই। কাঠি দিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করি। দিন দিন ওগুলো বড় হতে থাকলে আমার আনন্দ আর ধরে না। খালাও সহযোগিতা করে। মাচান দিই। অল্প দিনেই মাচান ভর্তি হয়ে যায়। লাউ ধরে যথেষ্ট। আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকি। প্রতিদিন গভীর পর্যবেক্ষণে রাখি। সুতা পরিমাণ বেড়ে ওঠার মাপকাঠি চালাই। নাহ্, কয়েক দিন পরেই কুঁড়িগুলো লাল হয়ে পড়ে। শেষ হয়ে যায়। খালারটা ছাপিয়ে আমারটায় বদনজর।

খালার লাউ মাচানটা বেশ বড়। প্রচুর লাউ ঝুলেছে। স্বগর্বে সেগুলো বেড়েও উঠছে। বাঁশের ঘেরার ফাঁক গলে যেটুকু দেখা যায়, বোঝা যায় সবগুলোই বেশ পরিপূর্ণ। চুরি হয়ে যাওয়ার কথা বললে বলে, এমন খোলা জায়গায় দু-একটা হয়তো চুরি যায়। অনেকেই খালের পাশ দিয়ে সারি সারি গাছ লাগাতে শুরু করেছে। বেশ তো সবুজায়ন হচ্ছে এলাকা। নানা গাছ। লাউ-কুমড়া, টমেটো-আলু, ডুমুর-করলা, জার্মানি লতা, পেপুল, তেলাকুচা, শিম, পাট—কী নেই সেখানে। মন তো নাচবেই।

আবাসিক এলাকার পাশ দিয়ে একসময় পরিকল্পিতভাবে একটি খাল রাখা হয়েছিল। সময়ের প্রয়োজনে অর্ধেক খাল ভরাট করে রাস্তা বানানোর কাজ চলছে। পরিবেশবাদীদের বাধার মুখে কাজটা দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে। আর সেই মোক্ষম সময়টাতে মানুষগুলো মেতে উঠেছে দখল বাণিজ্যে। খালের জায়গা দখল করে রাতারতি গড়ে উঠেছে বস্তি। বস্তি ঘিরে যত রকম ব্যবসা, ছোট ছোট বাজার, চায়ের টং, দোকান। দেখলে মনে হবে, গ্রামের কোনো বাজার।

খাল ভরাটের মুহূর্তে আগেভাগে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী দখল নিয়ে নেয়। নতুন-পুরনো টিন-বাঁশ জোগাড় করে কয়েকটি করে রুম তুলে ফেলে। হালকা করে ঢালাই দিয়ে ফ্লোরটা বানায়। এক রুমে নিজে থাকে। এক রুমে ছেলে, বউ-বাচ্চা। বাকিগুলো ভাড়া দেয়। তাকে সবাই মেনে চলে। সে বাড়িওয়ালা।

জোয়ান ছেলেটার এক মাসের বাচ্চা রেখে কিডনি ড্যামেজ হয়ে অকালে মারা গেল বলে কিছুদিন বেশ কান্নাকাটি করল মোটা বাড়িওয়ালা খালা। ছেলের বউ বাইরে খুব একটা বের হয় না। স্বামীর বাড়ি আঁকড়ে পড়ে আছে। স্বামী স্বর্গ। বাপ-মায় বিয়ে দিছে। এখন জীবন যাবে, এখান থেকে আর বের হওয়া যাবে না। বাপের বাড়ি যাওয়া হয় না খুব একটা। কোথায় যাবে, সেখানের চিত্র তো একই। একজন ননদও সঙ্গে আছে। বাচ্চা হওয়ার জন্য মায়ের কাছে এসেছে। ননদ-শাশুড়ি আর ছোট ছোট দুই-তিনটা বাচ্চা নিয়ে মৃত ছেলেটার জীবন্মৃত বউটা ভালোই আছে।

খালা সারা দিন ঘুরে ঘুরে বাড়ি দেখাশোনা করে। পয়সা রুজি করার চেষ্টা করে। আর একটু জায়গা ঘিরে নিতে পারলে কয়টা টাকা বেশি আসবে। লক্ষ্মীমন্তর বউটা বাচ্চাকাচ্চা সামলে রান্নাবান্না আর ঘরদোরও সামলায়। ননদ, শাশুড়ির মন রাখে। কখনো তাকে বাইরে দেখা যায় না। মোটা খালা ড্রেনের পাশে তক্তা বিছিয়ে বসে বসে গল্প করে। গায়ে তখন কোনো ব্লাউজ থাকে না। মাঝে মাঝে শাড়িটা সরে যেতে থাকলে টেনেটুনে ধরে। ঝাঁঝালো কণ্ঠে ডাকে, বউমা...

খাল পেরোলেই দ্বীপ। চারদিকে পানি। মাঝখানে এক টুকরো মাটি। মাটি মানে খাসজমি। আর সেখানে চল্লিশ ঘর বসত। কেউ নিজের দায়িত্বে টিন দিয়ে ছোট ছোট খুপরি তুলে ভাড়া দিয়ে রেখেছে। খালের ওপর চওড়া বাঁশের সাঁকো। সাঁকো পেরিয়ে ছোট-বড়-আবাল-বৃদ্ধ রাত-দিন চলাচল করে। এপারের চেয়ে ওপারে ভাড়া কিছু কম। গ্যাসের সাপ্লাই দিতে পারেনি খাসজমির মালিক বাড়িওয়ালা। কিন্তু বিদ্যুতের সাপ্লাই ঠিকই দিয়েছে। ঘর তাই খালি পাওয়াই যায় না। দ্বীপের বাসিন্দা মহিলারা সব বাসাবাড়িতে কাজ করে জীবিকা অর্জন করে। পুরুষরা তরকারি বিক্রি করে, নয়তো মাটি কাটে।

চল্লিশ ঘর জুড়ে মাঝে মাঝে আনন্দের সানাই বাজে। একজনের বিয়ে বা মুসলমানি হলে। সবাই রং মাখে। কাঁচা রাস্তা ধরে দৌড়ায়। কে কাকে রঙের ভেতর ডুবাবে। আনন্দে মাতোয়ারা হয়। 

কখনো কলহে মেতে ওঠে। যেন চরম শত্রু। চিত্কার আর হৈ-হল্লায় পাড়া বাজিমাত। এই অংশে প্রতিযোগিতার পালাটা শক্তপোক্ত। কেউ থামে না। হেরে গিয়ে ঘরের কোনায় নাকি সুরে কাঁদে। বাচ্চাগুলো তখনো মিলেমিশে খেলা করে। ওরা জানে, এ কলহ ক্ষণস্থায়ী। আবার একজন আরেকজনের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বিকেল হলে দলা পাকিয়ে খোশগল্পে মেতে উঠবে। 

ওদের জীবনে বছরের বারো মাসই ঘুরে-ফিরে আসে। গরম আসে। টিনের তপ্ত গরমে ওরা সিদ্ধ হয় না। ওদের শরীর তামাটে। ঝড়ের দাপটে কখনো চালার টিন উড়ে যায়। দ্বীপের বাসিন্দারা তখন খুঁটি ধরে বসে থাকে। আল্লাহর নাম স্মরণ করে। বাতাসের জোর হালকা হলে খেয়াল হয় কাঁথা-বালিশ ভিজে একশা। কষ্টের স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাটা চিত্কার করে ওঠে আমার বই-খাতা ভিজে গেছে। উদোম ঘরে আকাশ দেখে কোনো রকমে রাতটা কাটায়।

তবু ওরা আঁকড়ে থাকে চল্লিশ ঘরে। প্রায় সব ঘরের চাল ফুটো। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। বাড়িওয়ালার ভ্রুক্ষেপ নেই। মাস শেষে ভাড়া দিতে দেরি হলে যত ভ্রুক্ষেপ। অকথ্য ভাষায় গালাগাল শুনতে হয়। সেসব উপেক্ষা করে মানুষগুলো থেকে যায়। থাকতে হয়। 

ভাড়ার টাকাগুলো তাই গুছিয়ে রাখে সব কিছুর আগে। ঘর মেরামতের কথা বলতেই যত দ্বিধা। বাড়িওয়ালা আবার ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। বারবার তার কাছে যাওয়া যাবে না। বিরক্ত হবে। তার চেয়ে একটু না হয় কষ্টই হলো। দৃশ্যগুলো ক্যামেরায় তোলা মনে হয়। মন জেগে ওঠে আরো বেশি। কষ্টের, না আনন্দের—বোঝা যায় না। ওদের সঙ্গে মনবিনিময় হয় আমার। বসে থাকি ঘরের দাওয়ায়। টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শুনতে শুনতে গুন গুন করে গান ধরি, যদি মন কাঁদে...

ওখানে আমার বুয়ার আবাস। যাওয়া-আসা চলতে থাকে। মাঝেমধ্যে খালাদের ছোট্ট টংঘরের চা খাই। গল্প করি। ওদের সুখের জীবনে ঈর্ষান্বিত হই। কে কত বেচাকেনা করল, কার ঘরে কী সুখ, কী দুখ—এসব শুনে কাটাই কিছু সময়। টংয়ে বসে দূরে তাকাই। একজন গাই পুষেছে। খাঁটি দুধের আশায় বোতল হাতে কিছু মানুষ জড়ো হয়েছে। আস্ত সরিষা এনেছে একজন। মেশিনে ভেঙে জায়গায় বসে খাঁটি সরিষার তেল করে দিচ্ছে। কত উত্ফুল্ল মানুষ, আমাকে এক কেজি দাও, আমাকে হাফ। দেখে মন কেমন করে। ভেজালের ভিড়ে খাঁটি খুঁজে ফেরার কী আকুলতা।

মাঝপথে জটলা হচ্ছে। ছেলেগুলোর কথা-কাটাকাটির উচ্চকণ্ঠ। ওরা সবাই স্কুলপড়ুয়া বালক। টিনএজ। ব্যাগ ঘাড়ে চলে এসেছে চায়ের দোকানে। হয়তো স্কুল পালিয়েছে। সবার হাতে স্বচ্ছ কাচের কাপে লাল টকটকে ধোঁয়া ওঠা চা। কেউ একটা বিস্কুট মুখে পুরছে। কেউ কলা-রুটি। হাসি-তামাশা আর হাততালির মাঝে গরম গরম কথায় চাচা মিয়ার চায়ের কাপে টুংটাং আওয়াজ বিরতিহীনভাবে বাড়তে থাকে। পাল্লা দিয়ে বাড়ে তর্কের জোর। কেউ হারতে নারাজ। পর্যায়টা মুখ থেকে চলে আসে লাঠির ভেতর। একপর্যায়ে বাঁশের লাঠিসোঁটা হাজির। একজনকে পেটানো হচ্ছে বেদম। কী তার দোষ। পুলিশ ভ্যানের ভেপু শোনা যায়। কেউ পালিয়ে বাঁচল। ওরা যাচ্ছে পুলিশ ভ্যানে। পড়ে থাকছে লাঠিসোঁটা আর তর্কের বিষয়। বৃষ্টি।

এবার বৃষ্টি কম। বৈশ্বিক উষ্ণতা। জলবায়ুর প্রভাব। আবার বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। বিশ্বব্যাপী বন্যা পরিস্থিতির অবনতি। আমরা কি ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছি। এগুলো মন ভাবনায় ফেলে।

বুয়াকে বাসায় পাওয়া গেল না। সারা দিন কাজ করে বেড়ায়। সাত থেকে আট বাসায় কাজ করে। ফুরসত নেই। দেশের বাড়ি থেকে মাছ-তরকারি এসেছে। মাছগুলো কেটেকুটে পরিষ্কার করে রাখা দরকার। অন্য কাউকে খোঁজাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। আজকাল এই কাউকে খোঁজা বোকামি। কারো হাতে স্পেয়ার সময় নেই। সবাই ঘণ্টা-মিনিট হিসাব কষে চলে। মাছ কাটতে সময় নষ্ট হয়। তাই নারাজ। বুয়ার ওপর মনটা একটু উষ্মা হয়। চাইলে ফোন নম্বর দেয় না। তার নাকি নম্বর মুখস্থ হয় না।

সকালে এসেই আমার ওপর চড়াও। বাসায় গেছিলেন খালা। বসপার পারেন নাই। আমি তো ইট্টু পরই চলে আইছি।

কাউকে তো পেলাম না, কার কাছে বসব? আমার সহজ উত্তর। ফোন নাম্বারটা দিলে তো আর কষ্ট করে যেতে হতো না।

বইলছি না, আমার মনে থাকে না নাম্বার। কত দিন বইলছি আমারে একটা কার্ড বানায় দেন।

কী কার্ড?

ক্যান, ওই যে ছোট ছোট সাদা কার্ড, নাম লেহা থাকে। ফুন নাম্বারও লেহা থাকে। ভিজিট না কী জানি কয়। আমাগো বাড়ির ভিতরের সবাই কার্ড বানায় আনছে। রহিমের নানির কার্ড খুপ দারুণ হইছে। ঘরভাড়া দেয়, খায়। বেটির স্বামী নেই। সন্তান নেই। ঘর খালি থাকলি খাবে কী। কার্ড করে করে মানুষরে দিচ্ছে।

আপনি আমার একটা বানায় দেন। ফোন নাম্বার মনে থাকে না। কতজন সারা দিন খুঁজে। যে নাম্বার চাবে। তারে একখান করে কার্ড দিয়ে দেব।

তুই কি ভিজিটিং কার্ডের কথা বলছিস?

হ হ, খালা। আমারে এক হাজার ভিজিটিং কার্ড বানায়া দেন।

মন্তব্য