kalerkantho

মহাদেব সাহার সাম্প্রতিক কবিতা

এমরান কবির

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মহাদেব সাহার সাম্প্রতিক কবিতা

কবি মহাদেব সাহা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা কবিতার অন্যতম স্পন্দন। প্রথম কাব্য ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’ বের হয় ১৯৭২ সালে। তারপর একে একে হয়েছেন অনেক কাব্যগ্রন্থের জনক। এই কবি এখনো কাব্যযাত্রায় সচল। প্রতিবছরই বের হয় তাঁর নতুন নতুন কাব্যগ্রন্থ। তাঁর সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ ‘হাতে অমৃতকুম্ভ, পান করি বিষ’ (২০১৬), ‘মাটির সম্ভার’ (২০১৭), ‘কোথা পাই দিব্যজ্ঞান’ (২০১৯)।

মানুষ বোঝেনি, এ জীবনই তার সবচেয়ে বড় যুদ্ধক্ষেত্র। তার দিকে শত শত অস্ত্র তাক করা। এক  মুহূর্ত চোখ ফেরানোর সুযোগ নেই। কারণ প্রতিটি মুহূর্তেই তার পরীক্ষা। এই পরীক্ষা যেন এক নিয়তি। পাশ ফেরানোর সুযোগ নেই। তাইতো হাতে অমৃতকুম্ভ থাকতেও পান করতে হয় বিষ। মানুষ যেন নিঃস্ব ক্রীতদাস।

‘হাতে অমৃতকুম্ভ, পান করি বিষ’-এ কবি যেন এই কথাগুলোই বললেন কবিতার অবয়বে। তাঁর সুদীর্ঘ ও সফল কবিতাযাত্রার এ পর্যায়ে এসে তিনি এ রকম জীবন দর্শনের মর্ম উপলব্ধি করলেন। জীবন-কুহরের নিবিষ্ট পরিব্রাজক হিসেবে এর মর্ম বহুমাত্রিক।

এই বহুমাত্রিক মর্মের গভীরে যেতে হলে যেতে হবে গ্রন্থভুক্ত উনচল্লিশটি কবিতার অন্তরমহলে, যেখানে প্রায়ই শোনা যায় কুহরণ। এই কুহরণের ভেতরে যেমন রয়েছে জীবনের নির্মম নিয়তি, তেমনি রয়েছে বিনির্মাণের ছাপ। তাইতো জীবনব্যাপী নিঃস্ব ক্রীতদাসের মতো বিষ পান করে করে তিনি জানাচ্ছেন, ‘আমি সব বিষ করেছি অমৃত’। (হাতে অমৃতকুম্ভ, পান করি বিষ)। এটাই বুঝি কবির সংগ্রাম। বিনির্মাণ কিংবা সাফল্যই।

সাফল্যের পেছনে থাকে কবির সংগ্রাম। সংগ্রামের অন্দরে থাকে বিনির্মাণের স্পৃহা। কবিকে সে জন্য হতে হয় স্বপ্নচারী। না হলে কিভাবে সারা জীবনের বিষকে তিনি করে তুলবেন অমৃত! ‘মাঠের মাতাল মুদ্রা/ধরতে গেলাম অনন্তের বুকে জমা মত্ত শিশির;... কুড়িয়ে নিয়েছি দুই হাত ভরে শুধু সহস্রবর্ষের, করুণ/পাণ্ডুলিপি, পাহাড়ের নিস্তব্ধ ধ্বনিপুঞ্জ/স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতে গিয়ে এই তো সঞ্চয়।’ (স্বপ্নচারীর ডায়েরি : হাতে অমৃতকুম্ভ, পান করি বিষ)

সেই সঞ্চয় কবিকে করে তুলেছে মিষ্টি প্রেমিক।  ‘ট্রেন ছাড়েনি মধ্যরাতে/বৃষ্টি তবু তোমার হাতে’— (মধ্যরাতে)। কখনো করে তুলেছে আবেগী ‘এগুলো কোন নদীর মতো, বর্ষাকালের বিলের মতো/দূর আকাশের ছায়ার মতো/ঠিক জানি না, ঠিক বুঝি না, ঘুরে ঘুরে ডাকি/কোন পাহাড়ে লুকিয়ে আছো হলুদ রক্তের পাখি?’ (কোথায় লুকিয়ে আছ, পাখি)। কখনো অস্থির, বিষণ্ন ‘এত দুঃখ ছড়িয়ে আছে ট্রাফিক সিগন্যালে, সমুদ্রের ধারে/নাচঘরে থেমে যাওয়া ঘুঙুরের মতো/এই সব চোখের জলের চিঠি যেন অরণ্যের শাদা ঘাসফুল/দেখেছি মানুষ মধ্যাহ্নে খুব অস্থির বিষণ্ন হয়ে যায় (শীতের শহর)। বোঝা যাচ্ছে, জীবনচারী কবি নাগরিক দুঃখে আক্রান্ত হচ্ছেন। মানুষের বিষণ্নতা তাকে বিষাদ বাক্য লেখাচ্ছে। কারণ তিনি দেখছেন, বইয়ের মলাটে নামছে অন্ধকার। তিনি দেখছেন, নাগরিক মানুষের বুক পকেটে খুব ভেজা ভেজা খাম। তারা নিস্তব্ধ দুপুরের মতো নিশ্চুপ হয়ে যাচ্ছে।

কাব্যগ্রন্থ ‘মাটির সম্ভার’ নামকরণের মধ্যেও বিশেষ তাত্পর্য লক্ষণীয়। দেখা যাচ্ছে, দূর পরবাসে থেকেও স্বদেশের মাটির টান তাঁকে আকুল করছে। বুকের ভেতরে অনুরণন তুলছে তাঁর ঘাসের ঘুঙুর।

কবিতায় কবির বেদনার স্বাক্ষর থাকে। এ বেদনা হতে পারে বহুমাত্রিক। কবিতায় তা মূর্ত করে তোলার সক্ষমতার ভেতরেই কবির প্রধান সার্থকতা নিহিত। ‘মাটির সম্ভার’ কাব্যগ্রন্থে দেখা যায় সেই বেদনার স্বাক্ষর। এ বেদনা বহুমাত্রিক হলেও এর কেন্দ্রে রয়েছে স্বদেশের স্মৃতি। এই স্মৃতি তাঁর সাম্প্রতিক কবিতাগুলোর প্রত্যেক ছত্রে সঞ্চারিত। কবিতার ছত্রে সঞ্চারিত এসব বেদনামন্থন আর স্মৃতিগুলো সহজেই পাঠকের মনন ও স্মৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।

বেদনাবিধুর একেকটি পঙিক্ত নিয়ে মাটির সম্ভার সন্নিবেশিত। বেদনাহত কবির প্রতি মুহূর্তে জেগে ওঠে মাতৃভূমির পবিত্র স্মৃতি, মাতৃভূমির ধূলিকণার পবিত্র স্পর্শ। এই স্পর্শ কবিকে শিহরিত করে। কবি যেন স্বপ্নচালিত হয়ে যান। আর খুঁজে বেড়ান সেই মাটির গন্ধ, ডুবে যেতে চান হারানো অনুষঙ্গের গভীরে ‘আমার হাতে জোনাকিগুলো সব তারার মতো ফুটে আছে/মেলে ধরো দেখবে সন্ধ্যার আকাশ,/বুকে দ্যাখো কণকচাঁপার গন্ধ, চোখে বর্ষার মেঘ/এই সব নিয়ে আমি আটলান্টিক পার হয়ে এসেছি;/দীর্ঘ জলপথে আমার সাথে এসেছে একঝাঁক ইলিশ/ গাঙশালিকের পাখার শব্দ, জলফড়িংয়ের নৃত্য,/দুপুরবেলার উদাস ঘুঘু পাখির ডাক,/এই চিত্রশালা বুকে নিয়ে আমি এত দূর চলে এসেছি;/আমার বুকের মধ্যে দ্যাখো বাউল গানের মূর্ছনা/ভোরের টুপটাপ শিশির-পড়া, আমি সঙ্গে নিয়ে এসেছি জ্যোত্স্না আর ঝাউবন;/আমি যখন আসি, তখন পিছু ডাকতে থাকে দুটি টুনটুনি পাখি/জাঙাল বেঁধে পিঁপড়েগুলি সব পিছে পিছে ছুটতে থাকে,/আমার দুই চোখ হয়ে ওঠে ভাদ্র মাসের ভেজা বন/আমি আটলান্টিক পার হয়ে এসেছি বুকে নিয়ে/এই মাটির সম্ভার (মাটির সম্ভার)।

কবিতাগুলোতে এভাবেই ফুটে উঠেছে আবহমান বাংলার চিত্র এবং সব কটির সঙ্গে কবির পরম স্মৃতি। আর দূর পরবাসে কবি যখন এসব থেকে অনেক দূরে, তখন এগুলো স্মৃতি হয়ে তাকে বেদনাবিধুর করে তুলছে। কবি সেসব বেদনা কবিতার অবয়বে প্রকাশ করেছেন। এতে একদিকে আবহমান বাংলার সামগ্রিক চিত্র যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি মূর্ত হয়ে উঠেছে মাতৃভূমির জন্য প্রবল হাহাকার ও পিপাসা।

জ্ঞানের মতো অসীম সত্তার সন্ধান শেষ হয় না কখনো। যতই তা আহরণ করা হয়, ততই তার বিশালত্ব বিষয়ে ধারণা প্রগাঢ় হয় এবং নিজের অজ্ঞাত জ্ঞান সম্পর্কে অবস্থান ও ধারণা জন্মে। তখন হীনম্মন্যতাই প্রকাশ পায় মনের মধ্যে। কারণ অজ্ঞাত অংশটুকুও যে বিশাল। সেই বিশাল অজ্ঞাত অংশ আয়ত্ত করার সময় কোথায়? মানুষ এক জীবনে যেমন অনেক বই পড়তে পারে না, তেমনি এক জীবনে কতই বা জ্ঞান আহরণ করতে পারে! কবি হলে তো জ্ঞানের পিপাসা আরো বহুগুণ থাকে। তাই তো সত্তরের দশকের কবি মহাদেব সাহা বিশাল কাব্যযাত্রার এ পর্যায়ে এসে বলতে পারেন, ‘কোথা পাই দিব্যজ্ঞান’।

দেশান্তরিত জীবন তাঁর কাব্যজীবনকে ব্যাপক প্রভাবিত করেছে। তাঁর সাম্প্রতিক কবিতায় সেসবের উজ্জ্বল উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ‘মেলাতে যাই অমৃত অঙ্গারে, গন্ধে/গরলে/হয় না, সব ভেসে যায় জলে/আদ্যোপান্ত আমূল ট্র্যাজেডি/হাসে নির্মম নিয়তি/বন্দি তার হাতে/কে যকৃবৎ বাধ্য করে/পঙ্কে ডুবি, পাহাড়ে উঠি;/কী করি, কিছুই জানি না/গোলাপ তুলতে কেবল আহরণ করি কাঁটা/অমৃতের বদলে বিষ/পরিত্রাণ নেই, জন্মাবধি এই অসুস্থ জীবন। (অসুস্থ জীবন)

তবু তিনি যাপন করে যান কবিজীবন। কারণ জ্ঞান বা দর্শন চিন্তাই তাকে কালের ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। দেয় কাব্যামরত্ব। তিনি স্মৃতিকাতর হলেও তার ভেতরে তিনি জীবন-জিজ্ঞাসা খোঁজেন। সত্যের উপলব্ধিজাত সত্তার লালন করেন। এভাবে তিনি জ্ঞানে আর আনন্দে, সত্যে আর অনুসন্ধানে, দর্শনে আর মননে কাব্যের সঙ্গে যাপন করে চলেন এক কবিজীবন। স্বনামধন্য এই কবি জন্মেছেন ০৫ আগস্ট ১৯৪৪ সালে। জন্মদিনে তাঁকে প্রণতি জানাই।

মন্তব্য