kalerkantho

রবীন্দ্রনাথের অমরত্বের ধারণা

মোহীত উল আলম

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



রবীন্দ্রনাথের অমরত্বের ধারণা

অঙ্কন : প্রসূন হালদার

‘তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ’, সম্রাট শাহজাহানকে উদ্দেশ করে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন। আজকে, ২২ শ্রাবণ কবির ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘শা-জাহান’ থেকে ততোধিক বিখ্যাত চরণটি উদ্ধৃত করে আমি একটি প্রশ্ন রাখতে চাই। আসলে কি মানুষ তার কীর্তির চেয়ে মহৎ হতে পারে? কবিতাটি পড়তে গেলেই আমার মনে বরাবর এ প্রশ্নের উদয় হয় এবং সম্প্রতি একটি কাজের কারণে সেটি আরো তীব্র হয়। চট্টগ্রামে আমি যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করি, সেটির দ্বিতীয় সমাবর্তন উপলক্ষে স্যুভেনির সম্পাদনার দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত আলহাজ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্মারক পাতা হিসেবে তাঁর একটি ছবি ছাপলাম এবং বিপরীত পৃষ্ঠায় বড় বড় হরফে ছাপা হলো, ‘তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ।’ ম্যাগাজিনটি প্রকাশ হলে ওই লেখাটি দেখে আমি ভাবতে লাগলাম, রবীন্দ্রনাথ আসলে কী বলতে চেয়েছেন!

সাধারণত আমরা জানি, মানুষ বেঁচে থাকে তাঁর কর্মে। অর্থাৎ তাঁর শারীরিক অবলুপ্তির পর তাঁর কাজ দিয়েই তাঁকে স্মরণ করা হয়। যেমন রবীন্দ্রনাথকে আমরা স্মরণ করছি তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য। যেমন আমরা বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করি তাঁর সৃষ্টি বাংলাদেশের জন্য এবং আর কয়েক দিন পরেই এই শ্রাবণ মাসেই আমরা তাঁর ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করব। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ‘শা-জাহান’ কবিতায় বলতে চেয়েছেন যে মানুষের যেকোনো কাজের চেয়েই মানুষটি বড়। রবীন্দ্র-সাহিত্যের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ বড় এবং বাংলাদেশের চেয়ে বঙ্গবন্ধু বড়।

অর্থাৎ কবিতার চেয়ে কবি বড়। সাহিত্যের একটি মৌলিক আপ্তবাক্য কিন্তু বলে যে ‘লাইফ ইজ শর্ট, আর্ট ইজ লং’। অর্থাৎ জীবন ছোট, শিল্প বড়। যেকোনো সংবেদনশীল মহৎ কবির মতো জীবনের অনিত্যতা রবীন্দ্রনাথকে ভুগিয়েছিল। ‘মানুষ মরে যায়, রেখে যায় স্মৃতি’—এ তাড়না থেকে রবীন্দ্রনাথ গান রচনা করলেন, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে।’ শেকসপিয়ার তাঁর অতিশয় সুদর্শন তরুণ বন্ধুকে নিবেদিত বহু সনেটে এ কথাটি ইনিয়ে-বিনিয়ে বলেছেন যে তোমার রূপ, দেহ, সকলি কালের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে হারিয়ে যাবে; কিন্তু তোমাকে স্মরণ করে আমি যে কবিতাগুলো লিখলাম, সেগুলোর মধ্য দিয়ে যত দিন মানুষ বাঁচবে কিংবা দেখার জন্য চোখ থাকবে তাদের, তত দিন তোমার স্মৃতি আমার কবিতার মাধ্যমে বেঁচে থাকবে। এ হলো অমরত্ব, শেকসপিয়ারের সংজ্ঞায়।

অর্থাৎ দেহের নশ্বরতা আর মানুষের অমরত্ব হলো বিপরীতমুখী। দেহ লয় হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু মানুষ কাজের মাধ্যমে—যেমন শেকসপিয়ারের সনেট, সম্রাট শাহজাহানের তাজমহল, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ—বেঁচে আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘মিথ্যা কথা।’ কোনো কিছুই অমরত্বের স্থায়ী প্রতীক নয়। কোনো কিছুই অমরত্বের স্থায়ী নিশ্চয়তা নয়। চিন্তার জটিল প্রকরণটা এ রকম : যিনি কীর্তি করবেন, সেটি নিয়ে মানুষ তাঁকে স্মরণ করবে তো বটেই; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সেটি বলছেন না, তিনি বলছেন যে যিনি কীর্তিটা করেছেন, সে কীর্তিটা নিয়ে তিনি অমরত্ব লাভ করে সন্তুষ্ট থাকবেন, সেটি সে কীর্তিমান মানুষের জীবন দর্শন নয়। কাজেই সম্রাট শাহজাহান রবীন্দ্রনাথের কবিতাটির প্রেক্ষাপটে প্রাথমিকভাবে বহমান কালের রথের যাত্রার বিপরীতে ‘তাজমহল’ তৈরি করে তাঁর প্রেমকে ‘রূপহীন মরণেরে মৃত্যুহীন অপরূপ সাজে’ একটি স্থায়ী রূপ বা সাকার অবয়ব দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কবিতাটির মধ্যপথে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বোধ করলেন যে বিমূর্ত প্রেমকে সাকার অবয়ব দেওয়া যায় না। তাই ‘মিথ্যা কথা’ বলে তিনি হুংকার দিয়ে উঠলেন। ‘তাজমহল’ সৃষ্টির কারণে সম্রাট শাহজাহান অমরত্ব লাভ করবেন, সেটি হওয়ার নয়। কারণ, রবীন্দ্রনাথের কথায়—তিনি সেটির (তাজমহলের) কথা বিলকুল ভুলে গেছেন : ‘কে বলে যে ভোল নাই?/কে বলে রে খোল নাই/স্মৃতির পিঞ্জরদ্বার?’ স্মৃতি অর্গলমুক্ত হলে স্মৃতি আর থাকে না। তাজমহল একটি নিরেট পাথরের হর্ম্য হয়ে দাঁড়িয়ে রইল শুধু। অবশ্য ইতিহাস বলছে, বৃদ্ধ সম্রাটের শেষ আট বছর যখন তিনি পুত্র সম্রাট আওরঙ্গজেবের হাতে আগ্রা ফোর্টে বন্দি জীবন যাপন করছিলেন, তখন দুর্গের একটি গবাক্ষ দিয়ে তিনি প্রতিদিন যমুনার অপর পারে দাঁড়িয়ে থাকা তাজমহলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। আগ্রা দুর্গের সে গবাক্ষপথটি এখনো আছে। যা হোক, সঞ্চয়িতায় সংকলিত ‘শা-জাহান’ কবিতার ঠিক আগের কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথের এ চিন্তার সূত্রের শুরুটা দেখা যায়। কবিতার শিরোনাম ‘ছবি’—যেটির গীতি সংস্করণ জর্জদা অর্থাৎ দেবব্রত বিশ্বাস বিখ্যাত করে গেছেন—‘তুমি কি কেবল[ই] ছবি, শুধু পটে লিখা’ গানটিতে। কিন্তু কবি তাঁর মানসীকে অনুযোগ করে বলছেন, তুমি  শুধু ছবি হলে তো ‘যেখানে দাঁড়ালে/সেখানেই আছ থেমে’, এবং জীবনের ‘এই তৃণ, এই ধূলি, ওই তারা, ওই শশীরবি,/সবার আড়ালে/তুমি ছবি, তুমি শুধু ছবি।’

কাজেই কোনো মনুষ্যকৃত সৃষ্টিকর্ম কখনো শাশ্বত স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে মানুষের অমরত্বকে ধরে রাখতে পারে না। মানুষ ক্ষণে ক্ষণে তার ওই স্বকৃত সৃষ্টিকে ছাড়িয়ে যায়, সেখানেই তার অমরত্ব বা মনুষ্যজীবনের সংজ্ঞা লুক্কায়িত।

‘শা-জাহান’ কবিতায় এ চিন্তাটির পরম্পরা অদ্ভুত নিটোল কাব্যময়। কবি প্রথম স্তবকে ইঙ্গিতে বলছেন, শা-জাহান তাঁর প্রেয়সী মমতাজের মৃত্যু হলে তাঁর জন্য যে ‘অন্তরবেদনা’, ‘একটি দীর্ঘশ্বাস’ কিংবা ‘একবিন্দু নয়নের জল’ অনুভব করলেন, তারই ফলে গড়লেন ‘কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল/এ তাজমহল।’ কিন্তু তাতে কী হলো? সম্রাটের হৃদয় কি তাতে বাঁধা পড়ে রইল? জীবনে যেখানে ‘রাজ্য’, ‘সিংহাসন’, ‘সৈন্যদল’ টুটে যায় ‘স্বপ্নসম’, যেখানে সব কিছু ভাঙাগড়ার অধীন, সেখানে ‘ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া’ বললেই হলো?

না, সম্রাট-কবির আত্মা তাজমহলের প্রস্তরীভূত সৌধ ছেড়ে সম্মুখে বহমান। তাজমহলকে জীবন্ত ব্যক্তিক সত্তা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাই বলাচ্ছেন, ‘প্রিয়া তারে রাখিল না, রাজ্য তারে ছেড়ে দিল পথ,/রুধিল না সমুদ্র পর্বত।/আজি তার রথ/চলিয়াছে রাত্রির আহ্বানে/নক্ষত্রের গানে/প্রভাতের সিংহদ্বার-পানে।/তাই/স্মৃতিভারে আমি পড়ে আছি,/ভারমুক্ত সে এখানে নেই।’ এখানে ‘আমি’ অর্থ ‘তাজমহল’।

রবীন্দ্রনাথের এই চিন্তাটা অনুসরণ করলে আধুনিক ভাষা-দার্শনিক রোলাঁ বার্থের ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ডেথ অব দ্য অথর’ শীর্ষক রচনায় কথিত সমপর্যায়ের একটি চিন্তার উল্লেখ করতে হয়। বার্থে বলেছেন, প্রতিটি প্রকাশিত গ্রন্থে লেখক নিজেকে কফিনাবদ্ধ করার মতো করে ফেলেন। অর্থাৎ ওই বইটি প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত লেখকের সৃজনশীল ও মননশীল চিন্তা ওই পর্যন্তই রইল। তার মৃত্যু ওইখানেই হলো। এটি বরং পাঠকের ওপর নির্ভর করে যে সে বইটির কী অর্থ করবে। ঠিক সে রকম ‘তাজমহল’ নিয়ে আমাদের নানা রকম মূল্যায়ন থাকবে; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলছেন যে সম্রাট-কবি যে তাজমহল নিয়ে শেষ পর্যন্ত তৃপ্ত হয়ে থাকবেন তা নয়। বা এ ‘সৌন্দর্যদূত’ যে যুগ যুগ ধরে ‘এড়াইয়া কালের প্রহরী’ হয়ে ঘোষণা করবে, ‘ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া!’ সেটি আসলে হওয়ার নয়, কারণ সেটি জীবনের রথের কাছে পরাজিত : ‘তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ,/তাই তব জীবনের রথ/পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার/বারম্বার।’ অর্থাৎ তাজমহলের ‘স্মৃতির পিঞ্জরদ্বার’ খুলে যে চেতনাটি বের হয়ে গেল, সে অধরা, অবোধ সত্তাটিই অমরত্ব। অর্থাৎ সাকার নয়, নিরাকার সত্তাই অমরত্বকে সংজ্ঞায়িত করে।

তাহলে আরেকটি মৌলিক এবং খুবই ঘরোয়া উপসংহারে আমরা উপনীত হতে পারি। মানুষের কীর্তি অবশ্যই অসাধারণ মাইলফলক; তাকে স্মরণে রাখার, তাকে অমরত্ব দেওয়ার একটি শক্তিশালী উপকরণ। কিন্তু মুদ্রার আরেক পিঠের সত্য, যেটি রবীন্দ্রনাথ ‘ছবি’ বা ‘শাজাহান’ কবিতার মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছে দিলেন, সেটি হলো শুধু কীর্তি বা কর্ম মানুষকে সংজ্ঞায়িত করবে তা নয়, এর বাইরেও রহস্যময় একটি ব্যাপার মানুষের মহত্ত্ব এবং তার মনুষ্যত্বকে পরিচিত করে তোলে। সে অমোঘ ডাক : ‘আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে।/তার নিমন্ত্রণ লোকে লোকে/নব নব পূর্বাচলে আলোকে আলোকে।’ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘এবার ফিরাও মোরে’র নিবেদন ওই অপার রহস্য ডাকের প্রতি : ‘কে সে? জানি না কে। চিনি নাই তারে/শুধু এইটুকু জানি, তারি লাগি রাত্রি-অন্ধকারে/চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর—পানে/ঝড়ঝঞ্ঝা বজ্রপাতে জ্বালায়ে ধরিয়া সাবধানে/অন্তরপ্রদীপখানি।’

এ অন্তরপ্রদীপখানি সতত জ্বলবে, শেকসপিয়ার সনেট লিখবেন, সম্রাট শাহজাহান ‘তাজমহল’ সৃষ্টি করবেন, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ সৃষ্টি করবেন; কিন্তু এঁদের কারোরই অমরত্ব ওই সৃষ্টিকর্মগুলোর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে ডুকরে কাঁদছে না, বরং এই সৃষ্টিকর্মগুলোকে ছাড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় চেতনার অবলম্বনে বলতে পারি—তাঁরা ছুটে চলেছেন ‘পথের মধ্যে... নিজ সিংহাসন’ পাতার জন্য নয়, তাঁরা হতে চান ‘আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে।’

রবীন্দ্রনাথের এই উপসংহারটিকে ঘরোয়া বলেছি এ জন্য যে জগতে সবাই কীর্তিমান পুরুষ হন না, সবাই শেকসপিয়ার, শাহজাহান, রবীন্দ্রনাথ বা বঙ্গবন্ধু হন না; কিন্তু কীর্তিকে ছাড়িয়েও মানুষের মহৎ হতে বাধে না। যদি সে মানুষ একবার ‘সংসারের তীরে’ ফিরে আসে।

সংসারের তীরে আমরা সবাই আছি, সবার মধ্যে কমবেশি মাহাত্ম্য আছে, সবাই হয়তো নিজ নিজ পরিমণ্ডলে কীর্তি থাকুক আর না থাকুক, একটু মহত্ত্বের জায়গা কি করে নেয়নি? সে জন্য পরম স্বস্তিতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছবির গায়ে উত্কীর্ণ করলাম, ‘তোমার সৃষ্টির চেয়ে তুমি যে মহৎ।’ এই অবাধ বিস্তারটুকু রবীন্দ্রনাথ থেকে পেলাম।

মন্তব্য