kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

আল মাহমুদের জন্মস্মরণ

উত্তমপুরুষে অন্তর্গত কথন

তুহিন ওয়াদুদ

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উত্তমপুরুষে অন্তর্গত কথন

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

আল মাহমুদ বড় কবি। তাঁর এই ‘বড়’র আক্ষরিক কোনো পরিমাপ নেই। পাঠকপ্রিয়তা এবং শিল্পনৈপুণ্য তার মানদণ্ড। আপাদমস্তক শিল্পের উঠানে কাটিয়েছেন পুরো জীবন। তরুণ বয়সে সৃষ্ট শিল্পবোধ আল মাহমুদকে নিয়ে গেছে কবিতার পৃথিবীতে। আমৃত্যু কবিতার সঙ্গে বাস করে গেছেন। সৃষ্টি করে গেছেন কালজয়ী অসংখ্য কবিতা। কবিতার আঙ্গিক সৌষ্ঠব অক্ষুণ্ন রাখলেও তাঁর চেতনায় বড় রকমের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এ নিয়ে প্রগতিবাদীদের কাছে তাঁকে সমালোচনাও কম শুনতে হয়নি। যুক্তিনিষ্ঠ বিজ্ঞানমনস্কতার পথ ছেড়ে তিনি জীবনের একসময় হেঁটে গেছেন শাস্ত্রবাদী দর্শনের পথে। অথচ কবিতায় স্পষ্টতই নিজেকে শাস্ত্রপরিপন্থী হিসেবেই চিহ্নিত করেছিলেন।

আল মাহমুদ গদ্য-পদ্য উভয় ধারায়ই লিখেছেন। কিন্তু তাঁর পরিচিতি ও খ্যাতি মূলত কবিতাকে ঘিরে। তাঁর অনেক কবিতা মানুষের মুখে মুখে। তিনি রাজনীতি এবং সমাজসচেতন ছিলেন। পাকিস্তান শাসনামলে তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’ (১৯৬৩)। প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর ক্রমে ক্রমে তিনি নিজেই নিজের প্রতিভাকে অতিক্রম করতে থাকেন। তাঁর প্রকাশিত দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কালের কলস’ (১৯৬৬)। এ দুটি কাব্যগ্রন্থই তাঁকে ১৯৬৮ সালে এনে দিয়েছিল বাংলা একাডেমি পুরস্কার। তাঁর কবিতার পরম উত্কর্ষ সাধিত হয়েছে ‘সোনালী কাবিন’ (১৯৭৩) কাব্যগ্রন্থে। এরপর তিনি একে একে লিখেছেন ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ (১৯৭৬), ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’ (১৯৮০),‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ (১৯৮০), ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ (১৯৮৫), ‘আরব্য রজনীর হাঁস’ (১৯৮৭), ‘প্রহরান্তের পাশফেরা’ (১৯৮৮), ‘একচক্ষু হরিণ’ (১৯৮৯), ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’সহ (১৯৯৩) অনেক কাব্যগ্রন্থ। আল মাহমুদ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নিরবধি লিখে গেছেন। কবিতার বাইরে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধেও তাঁর লেখনীর বিস্তৃতি ঘটেছে। প্রায় অর্ধশত বই লিখেছেন তিনি।

কবিতা মাত্রই বিশেষ আঙ্গিকে ব্যক্তির ভাবকাঠামোর শব্দগত প্রকাশ। কবির অনভূতিলোকের প্রকাশের নিমিত্তে অনেক সময় উত্তমপুরুষের ব্যবহার দেখা যায়। উত্তমপুরুষের একবচনে আমি, বহুবচনে আমরা, পুরুষ ও ক্রিয়াপদ ভেদে হই, হব, করি, করব—এ রকম শব্দের আড়ালে আমরা কবিচরিত্রের সন্ধান পেয়ে থাকি। কবি উত্তমপুরুষের প্রয়োগে যে বিষয়বিন্যাস করেন, পাঠকের কাছে অনেক সময় তা কবির একান্ত নিজের বলে প্রতীয়মান হয়। আল মাহমুদের বেশির ভাগ কবিতায় উত্তমপুরুষে ভাবকাঠামোয় জন্ম নেওয়া বোধের কাব্যিক প্রকাশ ঘটেছে।

রাজনীতি, সমাজ, প্রণয় প্রসঙ্গ—সব কিছুই কবির উত্তমপুরুষে প্রতিভাত হয়েছে। ‘বিষয়ী দর্পণে আমি’ কবিতার নামেই নির্দিষ্টকৃত হয়েছে উত্তমপুরুষ। অন্যের বোধ আত্মস্থ করে এ কবির প্রাণ প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়নি। কবির আপন জীবনই এ কবিতার যেন প্রসঙ্গকথন হয়ে উঠেছে। দর্পণের সম্মুখে দাঁড়ালে কবি যেন অন্তঃকবিকে দেখতে পান। পরিশেষে আরো দেখতে পান কবির ভেতরে—‘শিশু আর পশুর বিরোধ।’ কবি নিজেকে আবিষ্কারের চেষ্টায় রত। তিনি নিজের ভেতরে থাকা কবির স্বরূপসন্ধানী হয়ে উঠেছেন। ঘুমের রহস্য খুঁজেছেন তিনি। তাঁর কবিতায় পাই—‘তীক্ষ চোখে অন্ধকার খুঁড়ে/আমি তাই খুঁজি শুধু কোথা আছে ঘুমের আফিম।’

‘তৃষ্ণার ঋতুতে’ কবিতায় ‘যাবো’, ‘খুঁজেছি’, ‘পাইনি’, ‘বুঝেছি’ শব্দগুলোর মাধ্যমে আল মাহমুদ নিজেকে কবিতায় প্রবিষ্ট করেছেন। আল মাহমুদ কবিতায় সাধারণ শব্দের শৈল্পিক খেলায় বারবার মেতেছেন। এজাতীয় কবিতাকে তিনি নৈর্ব্যক্তিক করে গড়ে তোলেননি। ব্যক্তিক অনুভূতি উত্তমপুরুষের মোড়কে উন্মোচন করেছেন। আল মাহমুদ আঙ্গিকের বিশেষত্ব এবং স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে কবিতাকলায় প্রায় একই রকম চেষ্টা বহুবার করেছেন।

‘আমরা পারি না’ কবিতায় নামের মধ্যে উত্তমপুরুষের বহুবচন রূপ আমরা দেখতে পাই। দশের ব্যর্থতাকে কবি আত্মস্থ করে প্রকাশ করেছেন। তিতাস নদী কবির শৈশবের নদী। স্মৃতিচারণামূলক কবিতা বয়নে উত্তমপুরুষ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে, এটিই সংগত। স্মৃতির আঙিনায় নদীর সঙ্গে কবির নিবিড় সম্পর্কের চিত্রই এখানে পরস্ফুিট। ‘লোক-লোকান্তর’ কবিতায় কবি নিজের চেতনাকে ‘শাদা এক সত্যিকার পাখি’র সঙ্গে অভেদ কল্পনা করেছেন। কবি নিজের চেতনায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। কবিতায় এই ইঙ্গিতও আছে যে তাঁর চেতনা প্রথাবিরোধী। কবির কাছে সব কিছুর চেয়ে কবিতার বিজয়ই বড় হয়ে ওঠে—‘যখনি উজ্জ্বল হয় আমার এ চেতনার মণি,/ মনে হয় কেটে যাবে, ছিঁড়ে যাবে সমস্ত বাঁধুনি/ সংসার সমাজ ধর্ম তুচ্ছ হয়ে যাবে লোকালয়।/লোক থেকে লোকান্তরে আমি যেন স্তব্ধ হয়ে শুনি/আহত কবির গান কবিতার আসন্ন বিজয়।’

কবিতা যে পুরুষ ভাষ্যে উপস্থাপিত হোক না কেন, তা যে কবির একান্ত অনুভূতিজাত, তা নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু কবি যখন ভাববাচ্যে লেখেন কিংবা উত্তমপুরুষের বাইরে লেখেন, তখন কবিতার বিষয় থেকে কবিকে কিছুটা দূর থেকে উপলব্ধি করতে হয়। যখন কবি অন্যের ভাষ্যে কবিতা বোনেন, তখনো কবি যেন বিষয় থেকে কিছুটা দূরেই থাকেন। কিন্তু যখন কবি উত্তমপুরুষে কবিতা লেখেন, তখন কবির বিষয়ে কবিকে তুলনামূলক অধিকতর ঘনিষ্ঠ বেশে পাওয়া যায়। আল মাহমুদের এজাতীয় কবিতার সংখ্যাই বেশি।

কবিরা অনেক সময় ব্যক্তিদর্শনও কবিতার আঙ্গিকে তুলে ধরেন। আল মাহমুদ যখন কবিতা রচনায় প্রবৃত্ত হন, তখনই যথেষ্ট নাম কুড়িয়েছেন। দীর্ঘকাল কবিতার স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি। সেই সময়ে তিনি শাস্ত্রপন্থী ছিলেন না। শাস্ত্রনিরপেক্ষ দর্শনই ছিল তাঁর চেতনাশক্তির গোড়ার কথা। সেই সময়ের একটি কবিতা ‘পিপাসার মুখ’। সেখানে তিনি লিখেছেন—‘হে মোহান্ত, তেমন কোনো শব্দ জানো কি/যার উচ্চারণকে মন্ত্র বলা যায়?/হে মোয়াজ্জিন তোমার আহ্বানকে কী করে আজান বলো, যা এতো নির্দিষ্ট।/আর হে নাস্তিক/তোমার উচ্চকণ্ঠ উল্লাসকে কোন শর্তে আনন্দ বলো/যা এতো দ্বিধান্বিত/তাই আমি নাস্তিক নই।/বিশ্বাসী নই।’ বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের বাইরে তিনি নিজেকে সংশয়বাদী ধারায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

আল মাহমুদের ‘আমি’ কবিতাটির নামই উত্তমপুরুষে। এ কবিতায় কবির আমিত্বের বিস্তার হবে—কবিতার শিরোনাম তারই ইঙ্গিত বহন করছে। সেই আমিত্বে কবির প্রথাগত বিশ্বাসের বিপরীতধর্মী দর্শনের পরিচয় মেলে। কবি লিখেছেন—‘তবু যে কি নির্বিকার, অথচ, ধার্মিক নই আমি/পৌঁছার আকাঙ্ক্ষা নেই কোনো সত্যে, কোনো দায়ভাগে,/ত্যাগেও অভ্যস্ত নই, কামনার কুলীন পরাগে/ফলাতে চাইনি কোনো মিথ্যে ফল। আমি কারো স্বামী/অথবা সন্তান নই, সাধারণ রাগে অনুরাগে/হয় না রক্তের গতি ধাবমান—আমি শুধু আমি।’

আল মাহমুদের বিশেষ একটি প্রবণতা হচ্ছে, বিষয়ের ব্যাপ্তি বড় হলেও সেখানেও উত্তমপুরুষের বীজ রোপণ করে দেওয়া। ‘কবিতা এমন’ কবিতায় কবি কবিতা সম্পর্কে দারুণ সব কথা লিখেছেন। এই কবিতায় উত্তমপুরুষে ব্যবহূত অংশটুকু বাদ দিলেও কবিতাটির কোনো শিল্পমান ক্ষুণ্ন হয় না। কিন্তু আল মাহমুদ স্বভাবগতভাবে উত্তমপুরুষের ব্যবহার করেছেন। কবিতার প্রথম পঙিক্ততেই শুধু সেই ব্যবহার হয়েছে—‘কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান/আমার মায়ের মুখ; নিমডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি...। ‘প্রকৃতি’ কবিতায় আদিম প্রবৃত্তির বিস্তার আছে। প্রাকৃতিক জীবনের বয়ানে গড়ে উঠেছে কবিতাটির আদ্যোপান্ত। সেখানেও ‘আমি’র ব্যবহার রয়েছে—‘কতদূর এগোলো মানুষ!/কিন্তু আমি ঘোরলাগা বর্ষণের মাঝে/আজও উবু হয়ে আছি।’

  জীবদ্দশায় আল মাহমুদ বেশ কিছু পুরস্কারে ভূষিত হন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার ছাড়াও একুশে পদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, শিশু একাডেমি (অগ্রণী ব্যাংক) পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদকসহ অনেক সম্মাননা পেয়েছেন। আল মাহমুদ জীবদ্দশায় তাঁর পাঠকপ্রিয়তা এবং তাঁর শিল্প সমালোচনা সম্পর্কে বিস্তর দেখে গেছেন। প্রয়াত হওয়ার পর এখনো এক বছর যায়নি। তিনি এখন মাটিতে মিশে আছেন। মিশে আছেন মহাকালের স্রোতে। তাঁর কাব্যসম্ভার তাঁকে মৃতের সারি থেকে দূরে রেখেছে। তাঁর সৃষ্টিই এখন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার এক অমোঘ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কবি বেঁচে থাকলে ১১ জুলাই তিনি জন্মবার্ষিকী পালন করতেন। এ বছরই তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রথম জন্মবার্ষিকী পালিত হলো। আল মাহমুদ যেখানেই থাকুন, আপনি ভক্তপাঠককুলের কাছে অন্তর্গত শ্রদ্ধায় সিক্ত হবেন প্রতিনিয়ত। শুভ জন্মস্মরণ কবি।

মন্তব্য