kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

২৩তম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী

জীবনবোধের সাম্প্রতিক ও আধুনিক ভাষ্য

আতা সরকার

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জীবনবোধের সাম্প্রতিক ও আধুনিক ভাষ্য

গ্লোবাল ওয়ার্মিং-২ শিল্পী : কামরুজ্জামান (শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত)

মানুষের আদি ও অকৃত্রিম ভাষা চিত্রকলা। এটি পরস্পকে চেনা, বোঝা, জানা, ভাববিনিময়, এমনকি নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশের জোরালো মাধ্যম হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী বহু ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর যোগসূত্র ও বান্ধব ভিত্তি সৃষ্টির ক্ষেত্রেও চিত্রকলার ভূমিকা একে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে প্রকাশ করেছে। রংতুলির ব্যবহার একে করে তুলেছে নান্দনিক ও বর্ণাঢ্য। সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, চিত্রকলা মানুষ, জীবন, প্রকৃতি ও বিশ্ব চরাচরের বহিঃঅবয়বকেই শুধু চিত্রায়িত ও ধারণ করতে পারে নিপুণভাবে, অন্তর্জগেক তুলে আনার সাধ্য এই মাধ্যমটির নেই। বড়জোর জীবনের মনোবেদনা, আনন্দ, কষ্ট, উল্লাস যতখানি মুখমণ্ডলে ও অবয়বে ফুটে ওঠে। চিত্রশিল্প দৃষ্ট এই বিষয়গুলোকেই চিত্রিত করতে পারে। কিন্তু শিল্পীর যদি থাকে অন্তর্দৃষ্টি, থাকে যদি দার্শনিক ভিত্তি এবং হূদয়ের গভীরতা, তাহলে জীবনের অতল গহিনে ডুব দিয়ে জীবনের অন্তর্গত রূপ, রং, রসও তুলে এনে রঞ্জিত করতে পারেন তাঁর গভীর ব্যঞ্জনাময় অর্থবহ ক্যানভাসে। এ ক্ষেত্রে শিল্পী কবি ও দার্শনিকও হয়ে ওঠেন তাঁর প্রজ্ঞা ও দক্ষতা নিয়ে। সময়ের ধারায় এ সত্যটি আজ ক্রমেই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এর তরঙ্গ বাংলাদেশেও এসে অভিঘাত সৃষ্টি করছে। বদলে যাচ্ছে চিত্রকলার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভঙ্গি, প্রকরণ ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা-চেতনা ভাবনার নতুন মনোভাব। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত ২৩তম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে তারুণ্যের উচ্চারণ সুস্পষ্ট। আধুনিকতার প্রবহমানতায় উজ্জ্বল।

প্রীতিবিম্ব-৪      শিল্পী : ফারিয়া খানম তুলি (চিত্রশিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেন পুরস্কারপ্রাপ্ত)

এখন চিত্র প্রদর্শনী কলা-ব্যাকরণের অর্থহীন স্টিল লাইফের মধ্যে আটকে নেই, প্রতিটি ক্যানভাস, স্থাপনা ভাস্কর্য, সৌষ্ঠব প্রদর্শন বিভিন্ন মাত্রায় শিল্পীর নিজস্ব ভাষ্য প্রকাশ করতে উন্মুখ। এ ক্ষেত্রে আধুনিকতম প্রযুক্তি-প্রকরণ ব্যবহারেও কোনো দ্বিধা নেই।

বাংলাদেশে ৪৭ বছর ধরে এ প্রদর্শনী আয়োজিত হয়ে আসছে। এবারের প্রদর্শনী এতে নতুন মাত্রা সংযোজনের আভাস দিচ্ছে। এটি বিশেষ করে নবীন শিল্পীদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শনীও বটে। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন ৮৫০ জন, নির্বাচিত হন ৩১০ জন। নির্বাচিত শিল্পীদের ৩২২টি চিত্রকর্ম এবার প্রদর্শিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৫৯টি চিত্রকলা, ৫০টি ছাপচিত্র, ৪৫টি ভাস্কর্য, ১৭টি কারুশিল্প, ৩৭টি স্থাপনাশিল্প, ৭টি করে মৃিশল্প ও কারুশিল্প। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন শিল্পী কামরুজ্জামান। তিনি তাঁর ‘গ্লোবাল ওয়ামিং’-এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সংকটময় পরিবেশদূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন লিথোগ্রাফি। সম্মানসূচক পুরস্কার পেয়েছেন ভাস্কর্যে তানভীর মাহমুদ, মিশ্র মাধ্যমে করা তাঁর শিল্পকর্ম ‘প্রণিধান’-এর জন্য। ছাপচিত্রে রুহুল করিম রুশ, সন্দেহজনক প্রতিকৃতির জন্য। চিত্রকলায় রাফাত আহমেদ ‘সম্পর্ক’-এর জন্য এবং স্থাপনার জন্য সহিদ কাজী ক্যানভাসে উড প্লাস্টিকের অ্যাক্রেলিক কাজ ‘সোনালী আঁশ’-এর জন্য। এ ছাড়া বেঙ্গল ফাউন্ডেশন পুরস্কার পেয়েছেন উত্তম কুমার তালুকদার ‘জীবনের গল্প’-এর জন্য, চিত্রশিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেন পুরস্কার পেয়েছেন ফারিয়া খানম তুলি ‘প্রীতিবিম্ব-এর জন্য, এবং দীপা হক পুরস্কার পেয়েছেন সুমন ওয়াহিদ, মিশ্র মাধ্যমে করা ‘ম্যাপ’-এর জন্য।

জীবনের গল্প-১    শিল্পী : উত্তম কুমার তালুকদার (বেঙ্গল ফাউন্ডেশন পুরস্কারপ্রাপ্ত)

শিল্পীরা তাঁদের শিল্পকর্মে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করেছেন। মাধ্যমের নতুন মাত্রাও সংযোজিত হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে ডিজিটাল যুগের ছাপ লক্ষ করা গেছে। কেউ কেউ আধুনিক প্রযুক্তির উপকরণও ব্যবহার করেছেন। ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে শিল্পকলার নন্দনতত্ত্বের বিভিন্ন আঙ্গিকগত ভাষ্য। জীবন্ত ইনস্টলেশনও প্রদর্শিত হয়েছে। শিল্পীরা বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রবহমানতার পাশাপাশি আধুনিকতাকে যেমন গুরুত্ব দিয়েছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ও ভাষ্যও তাঁরা উপস্থাপন করেছেন। লক্ষণীয় হলো, শুধু শিল্পগত নান্দনিকতার পরিশীলনেই শিল্পী মনোনিবেশ করেননি, তাঁরা শিল্পের ভাষা নির্মাণেরও উদ্যোগ নিয়েছেন। তাই এবারের প্রদর্শনী শিল্পের স্থিরচিত্রে আবদ্ধ নয়, শিল্পকর্মে শিল্পীদের উচ্চারিত কণ্ঠস্বরও আমরা শুনতে পাই। এভাবে শিল্প হয়ে ওঠার উদ্যোগ নিয়েছে দর্শন, সংবাদভাষ্য, মনোজগতের রূপকার; কোথাও কোথাও প্রতিবাদেরও ভাষা—অনাচার, বৈষম্য, ধর্ষণের বিরুদ্ধে। এভাবে এ বছরের চিত্রপ্রদর্শনী সমকালীন চিত্রভাষ্য হিসেবে যেমন উপস্থাপিত হয়েছে, একই বিশ্বমাত্রা-আধুনিকতার বাঁক ফেরাও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এভাবেই তারুণ্য বিকশিত হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিকীকরণেরও প্রবণতা দেখা যায়। পরিবেশ নিয়ে উচ্চকণ্ঠও শোনা যায়। মনোজগতে প্রবিষ্ট হয়ে ভাবলোক নির্মাণেরও উদ্যোগ রয়েছে। দেখার চেষ্টা রয়েছে দেশের প্রকৃতি ও নিসর্গ, বিভিন্ন পেশার মানুষ। স্মরণ করা হয়েছে গণ-অভ্যুত্থান, হানাদারদের হত্যাযজ্ঞ, নদীর রক্তস্রোত এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ। তবে আধুনিকতা, বিশ্বায়ন ও সাম্প্রতিকতাই গুরুত্ব পেয়েছে। এর ভিড়ে আবহমান বাংলার সংগ্রামী জনপদ, অবারিত মাঠ, গগন ললাট ভুলে গেলে কি চলবে।

আমাদের শিল্পকর্মে আমাদের আত্মাও প্রতিষ্ঠা লাভ করবে—সেটাও প্রত্যাশা করা যেতে পারে।

মন্তব্য