kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

লেখার ইশকুল

আবেগ প্রকাশের সময় নিয়ন্ত্রণ মানেননি মারিনা সুয়েতায়েবা

২১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



আবেগ প্রকাশের সময় নিয়ন্ত্রণ মানেননি মারিনা সুয়েতায়েবা

মারিনা ইভানোভনা সুয়েতায়েবাকে বিশ শতকের রুশ সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি মনে করা হয়। অনুবাদের মাধ্যমে তাঁর কবিতা সারা বিশ্বে আদৃত হয়েছে। ১৯১৭ সালের বিপ্লব এবং বিপ্লব-পরবর্তী দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভের পর এ দুটি বিষয় নিয়ে কবিতা লেখেন তিনি। সুয়েতায়েবার বাবা ইভান ভ্লাদিমিরোভিচ সুয়েতায়েবা ছিলেন মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রকলার অধ্যাপক। মানুষ হিসেবে বাবা কোমলহূদয়ের ছিলেন, তবে তাঁর চিত্রকলায় ডুবে থাকার কারণে পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচেনি কখনো। তা ছাড়া বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন মারিনার মা মারিয়া। মা ছিলেন কনসার্ট পিয়ানিস্ট। তিনি চাইতেন, মেয়ে কবি না হয়ে পিয়ানিস্ট হোক। এমনকি তিনি বলেও থাকতেন, সুয়েতায়েবার কবিতা দুর্বল। মায়ের যক্ষ্মা সারানোর জন্য চিকিত্সকের পরামর্শে মায়ের সঙ্গে সুয়েতায়েবা জেনোয়ার কাছে সমুদ্রের ধারে ছিলেন কিছুদিন। মস্কোজীবনের বাইরে প্রথমবারের মতো প্রকৃতির মাঝে স্বাধীনতার স্বাদ পান। মায়ের চাপাচাপির ফলে তাঁর ওপর বরং উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এরপর তিনি সংগীত থেকে নিজেকে সরিয়ে আনেন এবং কবিতায় নিয়োগ করেন নিজেকে। এ সম্পর্কে তিনি  বলেন, ‘তাঁর মতো একজন মা থাকার কারণে আমার কবি না হয়ে উপায় ছিল না।’ ১৯০৮ সালে সুয়েতায়েবা সোরবনে সাহিত্যের ইতিহাস পড়েন। সে সময় রাশিয়ার কবিতায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন চলছে। সিম্বলিস্ট আন্দোলনের প্রচার-প্রসার শুরু হয়ে গেছে। এই আন্দোলন তাঁর পরবর্তী কবিতায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। শুধু আন্দোলন নয়, এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কবি আঁদ্রেই বেলি, আলেকজান্ডার ব্লক প্রমুখের মতো কবিদের দ্বারাও প্রভাবিত হন। তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘সন্ধ্যার অ্যালবাম’ কবিখ্যাতি ছড়িয়ে দেয়। 

সুয়েতায়েবা মূলত গীতিকবি। তাঁর আখ্যানধর্মী কবিতায়ও সুরের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। ভ্যালেরি ব্রিউসোপ, ম্যাক্সিমিলিয়ান ভোলেশিন, ওসিপ ম্যানডিলস্ট্যাম, বরিস পস্তারনাক, রাইনার মারিয়া রিলকে, আনা আকমাতোভা প্রমুখ কবি তাঁর কবিতা শুরু থেকেই পছন্দ করেন। পরবর্তী সময়ের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে বিশেষভাবে ভ্লাদিমির নবোকভ এবং যোসেফ ব্রডস্কি তাঁর কবিতার প্রশংসা করেন। ব্রডস্কি বলেন, ‘কবিতায় কোনো কিছু সম্পর্কে তাঁর বলার থাকলে সে বিষয়টি প্রকাশক্ষম ও ধারণক্ষম অবস্থা পর্যন্ত নিয়ে যান। তাঁর কবিতা ও গদ্যে কোনো কিছুই অসমাপ্ত কিংবা অমীমাংসিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয় না।’ সমালোচক অ্যানি ফিনস বলেন, ‘সুয়েতায়েবা একজন উষ্ণহূদয়ের কবি; আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি নিয়ন্ত্রণ রাখেননি, প্রেমের কবিতায় তিনি নিজেকে পুরোপুরিই নাজুক অবস্থায় উপস্থাপন করেন। যাপিত আবেগের সত্যিকারের রোমান্টিক হিসেবে নিজেকে নিবেদন করেন পরিপূর্ণ বিশ্বাসে। জীবনের করুণ পরিণতি পর্যন্ত তিনি তাঁর সেই বিশ্বাসে থেকেছেন অটল।’

গীতিকবি হিসেবে যতটা পরিচিতি পান, ততটা না হলেও তাঁর একটি প্রধান পরিচয় ব্যঙ্গকবিতা লেখার জন্য। তাঁর উত্কৃষ্ট সৃষ্টির মধ্যে বেশ কিছু কবিতায় ব্যঙ্গের সুর বাজে। ‘জীবনের ট্রেন’, ‘মেঝে পরিষ্কারকের গান’ তাঁর ব্যঙ্গাত্মক কবিতার অন্যতম। দ্বিতীয়টিতে তিনি তুলে ধরেছেন লোককাহিনিনির্ভর আখ্যান।

দেশের টালমাটাল রাজনৈতিক অবস্থা আর দুর্ভিক্ষের কারণে সুয়েতায়েবার জীবনে নেমে আসে সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট। তাঁর এক মেয়ে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে মারা যান, শাসকচক্রের কুটিল জালে স্বামীর মৃত্যু হয়; তিনি নিজেও এ রকম জাল থেকে বের হওয়ার উপায় না পেয়ে আত্মহত্যা করেন এবং তাঁর ছেলে জর্জি যুদ্ধে শহীদ হন।

দুলাল আল মনসুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা