kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

বহুরূপী

মাহমুদ শরীফ

২১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে




বহুরূপী

অঙ্কন : মাসুম

সাইদ আলমের জন্ম বরিশালের মুলাদীতে। বাবা জমীরউদ্দিন শেখ মুলাদী প্রাইমারি স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক। মা ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ালেও তাঁর রয়েছে জ্ঞানের প্রতি অসীম আগ্রহ। ওরা তিন ভাই এক বোন। সাইদ দ্বিতীয়। বড় ভাই মেরাজ গ্রামে থেকেই উপজেলা অফিসে চাকরি করে। ছোট ভাই প্রাইম ব্যাংকে চাকরি করে। থাকে ঢাকায়। বোন রাহেলা সবার ছোট। স্বামীসহ চট্টগ্রামে থাকে।

শিক্ষক বাবা ও জ্ঞানপিপাসু মায়ের চার ছেলে-মেয়েই পড়ালেখায় ভালো। তবে সাইদ ব্যতিক্রম। অভাব সত্ত্বেও জমীরউদ্দিন মেজো ছেলেকে ভর্তি করান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিইন্যান্সে। মায়ের মত ছিল না। ছেলের পীড়াপীড়িতে রাজি হন। তবে যাওয়ার আগে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘মুলাদীর চেয়ে ঢাকা বড়। এখানকার কলেজের চেয়ে বড় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—সব বড় যেন বড়ত্বের জন্ম দেয়! খেয়াল রেখো।’

মা বলেছিল মনের বড়ত্বের কথা। ঢাকায় এসে সাইদকে পেয়ে বসল টাকার বড়ত্বের নেশায়।

বন্ধু আজফার হলজীবনের এক মাস না যেতেই বলল, দোস্ত, প্রাইভেট পড়া। টাকা না থাকলে হলের জীবনটা জমে না।

প্রস্তাবটা মনে ধরল। আজফারই ঠিক করে দিল ছাত্রী। লুবনা ক্লাস টেনে পড়ে। বাবা শিল্পপতি। মেয়েটা দেখতেও সুন্দরী। লুবনারা তিন বোন এক ভাই। ও মেজো। প্রথম মাস সপ্তাহে তিন দিন পড়াল। লুবনা মেনে চলল শিক্ষকের কথা। ব্যাপারটা বদলে গেল দ্বিতীয় মাসে। আপাতনিরীহ মেয়েটাই বলল, এখন থেকে সাত দিনই আসবেন। তিন দিন পড়ব, বাকি চার দিন চলবে আমার কথামতো।

সানন্দে রাজি হয়ে গেল সাইদ। কারণ তত দিনে মন দেওয়া-নেওয়া হয়ে গেছে। অনার্স, মাস্টার্স—দুটোতেই প্রথম বিভাগে পাস করে বিসিএস দিয়ে ঢুকল সরকারের আয়কর বিভাগে।

আজ নয়, সেই ২০০৫ সালে প্রথম বর্ষের সাইদ যখন সবেমাত্র শুরু করেছে বদলাতে, মায়ের চোখে ঠিকই ধরা পড়েছিল।

সাইদের বিয়ে হলো ২০১২-তে। ও তখন সহকারী কাস্টমস কমিশনার। রাজিয়ার মত ছিল না এ বিয়েতে। চাচ্ছিল বাধা দিতে ছেলেকে। কিন্তু স্বামী বাধা দিল তাঁকে। জমীর বলল, সন্তানের ওপর সবচেয়ে বড় দাবি মায়ের। যদি সন্তান শোনে। আবার সবচেয়ে কষ্টের দাবি মায়ের। যদি না শোনে।

জমীর বিষণ্নভাবে হাসল। বলল, অযথা কষ্ট পেতে যেয়ো না!

 

দুই.

২০১৮ সাল। সাইদ উপকমিশনার। অঢেল বিলাসিতা। বেতনটা ব্যাংকে জমে। লুবনাই বলেছিল চাকরিজীবনের শুরুতে, ‘বেতনে হাত দেবে না। বৃদ্ধ হলে হজ করার সময় কাজে দেবে। অন্য টাকায় তো আর...।’ ওদের এক ছেলে এক মেয়ে।

লুবনার মা সোনিয়া আহমেদ শিল্পপতির স্ত্রী। স্বামীর টাকার নিয়ন্ত্রণটা তার হাতে। বিয়ের আগেই লুবনাকে পরামর্শ দিয়েছে ওর মা, খেয়াল রাখবি সাইদের দিকে।

লুবনা মায়ের দেওয়া উপদেশকে নিয়ম করে ফেলল। প্রতিদিন সাইদের পকেটে যা ঢোকে, রাত আটটার পর চলে যায় লুবনার হাতে। প্রায়ই বলে, তোমার পকেটে পাঁচ শ টাকা থাকলেই তো চলে।

বিয়ের ছয় বছরের মাথায় এই টাকা দিয়েই উত্তরায় বিশাল  অ্যাপার্টমেন্ট কিনল। লুবনার নামে। সেদিন ২০১৮ সালের নভেম্বরের চার তারিখ। সব কাগজপত্র তৈরি করেই রওনা হলো এয়ারপোর্টের দিকে। সন্ধ্যার ফ্লাইটে সাইদ-লুবনা, লুবনার সব ভাই-বোনের পরিবার এবং মা-বাবাসহ কক্সবাজার যাবে। আজ লুবনার ছোট বোন শাহানার প্রথম বিয়েবার্ষিকী। লুবনা গত এপ্রিলেই বলেছিল, নভেম্বরে শাহানার প্রথম বিয়েবার্ষিকীর সব খরচ আমি দেব।

তখন তো রাহেলার বিয়ে। বাবা বলেছে আমাকে থাকতে। তুমি তো একবারও গেলে না।

দেখো, শাহানাকে কথা দিয়েছিলাম ওর প্রথম বিয়েবার্ষিকী আমি...। লুবনা কথা শেষ না করে তাকায় স্বামীর দিকে।

সাইদের বুক কেঁপে ওঠে। তাড়াতাড়ি বলে, তুমি আমার জান। তোমার কথাই আমার কথা।

বিকেল পাঁচটার সময় সাইদ ফোনটা পেল বাবার কাছ থেকে। জমীর সাহেব তাঁর এই ছেলেকে ঢাকায় পড়াতে গিয়ে একমাত্র সম্পত্তি পাঁচ বিঘা জমি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সেদিনই রাজিয়া প্রশ্ন তুলেছিল, সাইদকে ঢাকায় পড়ানোর খুব কি দরকার ছিল? পরে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সময় হাত পাততে না হয়।

রাহেলার তিন ভাই আছে না! ওরা দেখবে।

অন্য দুই ভাই তাদের সাধ্যমতো করেছে। সমস্যা হচ্ছে, তাদের সাধ্য কম। সাইদের সাধ্য অসীম। কিন্তু ‘দানে’র হাত বড় নয়। দুই মাস ধরে জমীরউদ্দিন ও মেরাজ অনুরোধ করে যাচ্ছে সাইদকে। প্রতিবারই সাইদ বলেছে চেষ্টা করবে। নভেম্বরের চার তারিখ বিকেলে ছোট ছেলে আহাদ বলল, বাবা, ব্যাংক থেকে লোনটা পেলাম না। সব মিলে পঞ্চাশ হাজার টাকার ব্যবস্থা হয়েছে।

তাহলে আরো এক লাখ দরকার।

আমি ফোন করি সাইদকে, বাবা? মেরাজ ইতস্তত করে বলল।

বড় ছেলেকে অসম্মানিত হতে দিতে চাইল না জমীর। ফোন করল নিজেই, খুব কুণ্ঠিতভাবে, সাইদ বাবা, জানো তো রাহেলার কালকে...।

ফোনের কথা শুনতে পেল লুবনা। শ্বশুরের কথার মাঝে ধাক্কা দিল স্বামীকে। বাবাকে শেষ করতে দিল না কথা। বলল, বিয়ে দিতে এত টাকা লাগে কেন?

বড় ছেলে মেরাজ পাশ থেকে সস্তা ফোনের সব কথাই শুনতে পেল। জমীর ফোনটা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল সে—তুই যে আমাদের ভাই এ কথা ভাবতে লজ্জা লাগে!

পাশ থেকে আহাদ চিত্কার করল, মেজো ভাই হচ্ছে নিমকহারাম।

ছোট বোন রাহেলা কিংবা ওদের মা কোনো মন্তব্য করলেন না।

 

তিন.

সাইদের অবশ্য স্ত্রীকে নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই; বরং মাঝেমধ্যে বিরক্তি নিয়েই মনে হয় এত সহজ-সরল ভালো মেয়েটাকে ওর পরিবারের লোকজন সমাদর করতে শিখল না।

২০১৯ সালের শুরুটা ভালো হলো না সাইদের জন্য। সেদিন ছিল জানুয়ারির সাত তারিখ। মাত্র অফিসে এসেছে। সাধারণত লুবনা সকালবেলা বাচ্চাদের স্কুলে দিয়েই মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যায়। সেখান থেকে ফোন করল, ‘শুনছ, মায়ের শরীরটা ভালো না। ব্লাডপ্রেসারটা খুব ওঠা-নামা করছে। বুকেও ব্যথা।’

এ্যাপোলোতে নিবা? আমি আসব?

সাইদের তাড়া দেখে হেসে ফেলে লুবনা। না, অত জরুরি কিছু না। কিন্তু সামনের সপ্তাহে মাকে ব্যাংককে নিয়ে চেক আপ করাতে চাই। তোমাকে কিন্তু সব ব্যবস্থা করতে হবে। হেসে ফেলে সাইদ। কী যে বলো! মায়ের জন্য অনুরোধ করতে হবে! এই শুক্রবারই যাব আমরা।

দশ তারিখ রাত আটটায় ওদের ফ্লাইট। সব সময়ই এমন হয়। কোনো একটা ভালো কাজে রওনা হওয়ার সময় মুলাদী থেকে ফোন আসবেই। আজও তার অন্যথা হলো না। লুবনারা নিচে নেমে গেছে। দরজা বন্ধ করে নিজে নামবে—ফোনটা এলো সেই সময়ই। ফোন করেছে মা। উদ্বিগ্ন কিন্তু মায়াভরা গলা, ভালো আছিস, বাবা?

এটা কোনো জরুরি প্রশ্ন নয়। উত্তর দিল না। বুঝতে সময় নিল না রাজিয়া। তাই মূল কথায় এলো, তোর বাবা খুব অসুস্থ। বুকে...।

মা, মাসের শুরুতে আমার হাতে টাকা নেই। এখন...।—মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই নিজের মতামত জানিয়ে দিল।

রাজিয়ার হাতেও সময় কম। ছেলের উত্তর জানা আছে। তাই ওই প্রসঙ্গে গেল না। কথা বলল, তবে এবার গলাটা শীতল, বেশি অসুস্থ তাই ফোন করেছি, যদি মনে হয় একবার দেখে যাস।

মা, এখন আমার সময় নেই। পরে কথা হবে।—ফোনটা রেখে দেয় সাইদ। রাগে শরীর জ্বলছে। শুভ কাজের সময় ঝামেলা করাটা ওদের অভ্যাস। রাজিয়ার চোখটা টলমল করছে। বড় নিঃশ্বাসটা বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে বিড়বিড় করল—এমন সন্তান যেন কেউ পেটে না নেয়!

 

চার.

১৪ তারিখ সন্ধ্যাবেলা সাইদ স্ত্রী আর শাশুড়িকে নিয়ে ব্যাংককের হোটেলে ফিরল। হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বলে দিয়েছে, কোনো সমস্যা নেই রোগীর। পাঁচ মিনিট পর ফোনের মেসেজ চেক করতে গিয়ে বুঝতে পারল সাইদ। ফোনের গলা অনিকের। তোর অফিস থেকে নম্বর নিয়ে ফোন করছি বলে কিছু মনে করিস না। আজ সকালে তোর বাবা মারা গেছে। মৃত্যুর আগে তোকে একবার দেখতে চেয়েছিল। আছর নামাজের পর দাফন করা হবে। ভালো থাকিস।

মেসেজটা দ্বিতীয়বার শুনল। তারপর মুছে দিল। কেন জানি চাইল না লুবনা জানুক। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।  চট করে তাকাল ঘড়ির দিকে। বাংলাদেশে এখন প্রায় সন্ধ্যা। তার মানে দাফন হয়ে গেছে।...ওরা কি আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারত?—নিজের মনেই ভাবল কথাটা। নাকচ করে দিল পরমুহূর্তেই। নাহ, এই-ই ভালো। অনুভূতিহীন মায়া আসলে প্রতারণা!

অনেক দিন পর লুবনা পাশে থাকার পরও ভালো ঘুম হলো না, তবে জেগেও ছিল না। টানা দুঃস্বপ্ন দেখে গেল। স্বপ্নেই দেখল ও মারা গেছে। ওকে ঘিরে রেখেছে অনেক মানুষ। কিন্তু কেউ কথা বলছে না। গম্ভীর! পরে বুঝল এটা কোর্ট। ওর বিচার হচ্ছে। বিচারক খুব সহজ একটা প্রশ্ন করলেন ওকে, আচ্ছা, বলো তো তুমি কেমন মানুষ? সঠিক উত্তর দিলে তোমার সব ইচ্ছা পূরণ করা হবে।

স্বপ্নেই সাইদের খুব হাসি পেল, বলে কী বিচারক? বোকা নাকি! এটা কোনো প্রশ্ন হলো? সাইদ বিচারকের চোখে চোখ রেখে বলল, আমি ভালো মানুষ।

সন্তানের আসল মা-বাবা কী বলো তো?—বিচারকের প্রশ্ন।

সাইদের মনে হলো, দূর থেকে কয়েকজন দর্শক ওকে দেখছে। স্পষ্ট দেখা না গেলেও চেনা মানুষ—এটা বোঝা যায়।

বুঝেও না বোঝার ভান করল পাল্টা প্রশ্ন করে, মানে! বুঝলাম না!

তোমার মা-বাবা কী বলো তো? তুমি কেমন? 

আপনি আমার স্ত্রীর ভাই-বোনদের জিজ্ঞেস করেন। ওরা প্রায়ই বলত, আমার মতো ভাই পাওয়া সৌভাগের।

নীরবতা ভাঙলেন বিচারক। মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, রাহেলা কী বলত? কিংবা মেরাজ, আহাদ?

ওরা...ওরা...ওরা তো দেখতে পারত না আমাকে। বলত, আমার মতো খারাপ ভাই যেন কারো না হয়!

বিচারক জিজ্ঞেস করল, বন্ধুরা কী বলত?

ওরা তো দেখতেই পারে না। বলে, আমি বন্ধু নামের অযোগ্য।

তাহলে তুমি কী? এবার বলো!

সাইদ তাকাল বিচারকের দিকে, চোখে সংশয়— আমি...আমি...ভালো... হাসির দমক উঠল দর্শকদের মাঝ থেকে।

দর্শকরা হেসেই যাচ্ছে। উঠে দাঁড়াল কয়েকজন। অনেক আক্রমণাত্মক মনে হচ্ছে। সাইদ এখন একনাগাড়ে চিত্কার করে যাচ্ছে, আসলে আমি খারাপ...না ভালো... খারাপ... ভালো... খারাপ!

বসে পড়ল সাইদ। দরদর করে ঘামছে। আতঙ্কিত। বিচারক তীক্ষ দৃষ্টিতে মাপছেন ওকে। বোঝা যাচ্ছে, সঠিক উত্তর দিতে না পারলে বড় ধরনের শাস্তি পেতে হবে। কী বলবে তাহলে? একই মানুষ ভালো ও খারাপ দুটোই হতে পারে? ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্কে!

ঘুম ভেঙে গেল সাইদের। বালিশ ভিজে গেছে ঘামে। বিয়ের সাত বছর পর প্রথম দেখল, লুবনা তার হাত ধরে ঘুমাচ্ছে না আজ। দুজন বিছানার দুই মাথায়!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা